“কৌশলের নামে রাজনৈতিক প্রতারণা : ভোটবিহীন নেতাদের বিএনপি–নির্ভর সংসদ স্বপ্ন”

বাংলাদেশের রাজনীতিতে “কৌশল” শব্দটি এখন আর বুদ্ধিমত্তার প্রতীক নয়, বরং তা হয়ে উঠেছে সুবিধাবাদী রাজনৈতিক প্রতারণার মার্জিত শব্দ। সাম্প্রতিক সময়ে গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁনের পদত্যাগ এবং বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করার ঘোষণা সেই পুরনো রোগেরই নতুন উপসর্গ। দলের সভাপতি নুরুল হক নুর একে নির্বাচনী কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা দিলেও বাস্তবতা ভিন্ন—এটি আদর্শ বিসর্জনের আরেকটি নগ্ন উদাহরণ।

নুরুল হক নুর নিজেই স্বীকার করেছেন, বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ নিয়েই রাশেদ খাঁন নির্বাচনে অংশ নেবেন এবং দল থেকে তাকে এই “অনুমতি” দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন হলো—যে দল এতদিন নিজেকে বিকল্প রাজনীতি, সংস্কার এবং নতুন ধারার রাজনীতি বলে প্রচার করেছে, তারা কীভাবে আরেকটি বড় দলের ভোটব্যাংকের ওপর ভর করে সংসদে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে? এটিকে কৌশল বলা যায় না, এটি স্পষ্ট রাজনৈতিক আত্মসমর্পণ।

এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। নির্বাচন এলেই বাংলাদেশে কিছু ক্ষুদ্র রাজনৈতিক দল ও তথাকথিত নেতার মুখোশ খুলে যায়। এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদের সাম্প্রতিক বিএনপিতে যোগদান তার জ্বলন্ত উদাহরণ। রাজনীতিতে দীর্ঘদিন থাকার পরও নিজ দলের কোনো ভিত্তি তৈরি না করে কেবল এমপি হওয়ার লোভে দল বিলুপ্ত করে বিএনপির ছায়ায় আশ্রয় নেওয়া রাজনীতির চরম দৈন্যদশা প্রকাশ করে।

শোনা যাচ্ছে, ববি হাজ্জাজও একই পথে হাঁটতে পারেন। অন্যদিকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রব পন্থী জেএসডি গণতন্ত্র মঞ্চ থেকে বেরিয়ে গেছে। রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনও কয়েকদিন আগেই বিদায় নিয়েছে। অথচ  “গণতন্ত্র মঞ্চের” মূল মুখ—মাহমুদুর রহমান মান্না, জুনায়েদ সাকী ও সাইফুল হক—এখনো বিএনপি সমর্থিত মঞ্চে বহাল তবিয়তে আছেন। কেন ? কারণ খুব সহজ—নমিনেশনের আশ্বাস।

এরা সবাই বছরের পর বছর বড় বড় কথা বলেছেন—সংস্কার, গণতন্ত্র, নতুন রাজনীতি, বিকল্প শক্তি। কিন্তু ভোটের মাঠে নিজেদের শক্তি যাচাই করার সাহস কখনো দেখাননি। সংগঠনের পরিধি বাড়াতে তৃণমূলে যাওয়ার কোনো চেষ্টা করেননি। জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য আন্দোলন গড়ে তোলেননি। কারণ তারা শুরু থেকেই ধরে নিয়েছিলেন—বিএনপির ভোটেই তারা সংসদে যাবেন।

এখন যখন সেই বাস্তবতা প্রকাশ্যে এসেছে, তখন মান-সম্মান বাঁচানোর জন্য “কৌশলগত সিদ্ধান্ত” নামের একটি রাজনৈতিক শব্দচাতুরীর আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, আদর্শ বিসর্জন নয়, কৌশলের প্রয়োজনে যোগদান। বাস্তবে এটি রাজনৈতিক ধাপ্পাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়।

যে নেতা বা দল নিজের ভোটব্যাংক তৈরি করতে পারেনি, যার পেছনে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন নেই, সে কীভাবে সংসদে গিয়ে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবে? সংসদ কি দয়া করে দেওয়া কোনো পদ? নাকি জনগণের ভোটে অর্জিত একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব?

এই তথাকথিত নেতারা আসলে রাজনীতিকে পেশা হিসেবে নয়, বরং শর্টকাট ক্যারিয়ার হিসেবে দেখেন। দল গঠন করেন, ব্যানার ঝুলান, টকশো করেন—কিন্তু মাঠে নামেন না। কারণ মাঠে নামলে বোঝা যাবে, তাদের পেছনে কেউ নেই। তাই নির্বাচন এলেই বড় দলের দরজায় ধর্না দেন, আর দরজা খুললেই নিজেদের আদর্শ বিসর্জন দিয়ে ঢুকে পড়েন।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এরা নতুন প্রজন্মের কাছে রাজনীতিকে হাস্যকর করে তুলছেন। তরুণরা যখন দেখে আদর্শ, সংগ্রাম আর ত্যাগের বদলে কেবল কৌশল আর সুবিধাবাদই রাজনীতির মূল চাবিকাঠি, তখন তারা রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এর দায় কে নেবে?

বিএনপি একটি বড় দল, তাদের নিজস্ব ভোটব্যাংক আছে—এ নিয়ে বিতর্ক নেই। কিন্তু সেই ভোটব্যাংকের ওপর ভর করে যারা বিনা পরিশ্রমে সংসদে যেতে চান, তারা আদতে রাজনীতিবিদ নন, তারা রাজনৈতিক যাত্রী। সুযোগ পেলে এক দলে, সুযোগ না পেলে আরেক দলে—এটাই তাদের চরিত্র।

আজ যারা বলছেন “কৌশলগত কারণে” বিএনপিতে যাচ্ছেন, কাল পরিস্থিতি বদলালে তারাই আবার নতুন কোনো ব্যানারে হাজির হবেন। কারণ তাদের কোনো আদর্শ নেই, নেই রাজনৈতিক নৈতিকতা। আছে শুধু একটি লক্ষ্য—এমপি হওয়া।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই সুবিধাবাদী ধারা যতদিন চলবে, ততদিন সত্যিকারের বিকল্প রাজনীতি গড়ে উঠবে না। জনগণও একসময় এই মুখোশধারীদের চিনে ফেলবে। ইতিহাস সাক্ষী—ভোটবিহীন নেতাদের সংসদ স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত দুঃস্বপ্নেই পরিণত হয়।

কৌশলের নামে এই রাজনৈতিক প্রতারণা বন্ধ না হলে রাজনীতির প্রতি মানুষের অনাস্থা আরও গভীর হবে। আর সেই দায় শুধু এসব সুবিধাবাদী নেতাদের নয়, তাদের আশ্রয়দাতা বড় দলগুলোকেও নিতে হবে।

লেখক : হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক : শুদ্ধস্বর ডটকম । 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.