বাঙালির হাজার বছরের গৌরবময় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সঙ্গীত কেন্দ্র করে শিল্প-সংস্কৃতির তীর্থভূমি প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয়েছে দু’দিনব্যাপী— ‘বাংলার মাটির উৎসব (Festival Terres du Bengale)’।
৮ ও ৯ নভেম্বর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের
‘লা কামিলিয়েন’ হলে আয়োজিত এই অনন্য উৎসবের আয়োজন করে Terres du Bengale, Association FranceKriti, Multidimension ও Terra Incognita।
উৎসবের লক্ষ্য ছিল ফ্রান্স ও বাংলার সাংস্কৃতিক বন্ধনকে দৃঢ় করা এবং চলচ্চিত্র, সংগীত ও কবিতার মাধ্যমে বাংলা ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক দর্শকদের সামনে তুলে ধরা।
দুই দিনজুড়ে উৎসবে প্রদর্শিত হয় একাধিক প্রামাণ্যচিত্র ও চলচ্চিত্র, যা দর্শকদের নিয়ে যায় বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষদের জীবনযাত্রার গভীরে।

শনিবার, ৮ নভেম্বরের প্রদর্শনী শুরু হয় অজয় রায়ের নির্মিত “Color of Freedom” প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে। ফ্রান্স ও বাংলাদেশের মধ্যে যাতায়াত করে নির্মাতা ২৪ বছর ধরে অনুসরণ করেছেন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমদকে—যিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। ছবির প্রদর্শনীর পর নির্মাতা অজয় রায় ও শিল্পী চরিজা শাহাবুদ্দিন অংশ নেন আলোচনায়।
এরপর প্রদর্শিত হয় প্রকাশ রায়ের “Bangladesh, naissance d’un drapeau”। এটি এক ঐতিহাসিক প্রামাণ্যচিত্র, যেখানে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা জন্মের পেছনের ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয়েছে আর্কাইভ ফুটেজ ও নির্মাতার ব্যক্তিগত অনুসন্ধানের মাধ্যমে।

দিনের শেষ প্রামাণ্যচিত্র ছিল সৌরভ ব্যানার্জি ও অন্নু জলালের “Bonobibbi, la femme de la forêt”। সুন্দরবনের দেবী বনবিবিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই চলচ্চিত্রে দেখানো হয় কিভাবে বনবিবির বিশ্বাস ও কিংবদন্তি আজও স্থানীয় মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিতে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
রবিবার, ৯ নভেম্বরের শুরু হয় জর্জ লুনোর নির্মিত “Le chant des fous” দিয়ে—একটি সঙ্গীতধর্মী প্রামাণ্যচিত্র, যা দর্শকদের নিয়ে যায় বাউলদের জগতে, এই মরমি সঙ্গীতশিল্পীদের জীবন ও দর্শনের সন্ধানে।
এরপর পর্দায় আসে লাডলি মুখোপাধ্যায়ের “Mon Pabaner Nao”, যেখানে ফ্রান্সে বসবাসরত বাউল সংগীতশিল্পী পবন দাস বাউল ও মিমলু সেনের সৃজনযাত্রা, তাদের বন্ধু ও শিল্পীসমাজের সঙ্গে মিলনের গল্প ফুটে উঠেছে।
দুপুরে প্রদর্শিত হয় আমিরুল আরহামের নির্মিত “The 1971 War in the Eyes of Pakistanis”—একটি গভীর ও সাহসী প্রামাণ্যচিত্র। এতে যুদ্ধকালীন পাকিস্তানি নাগরিকদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে দেখা হয়েছে এক ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে।
পরে পর্দায় আসে দেবলীনা ঘোষের “Kirtan, the Heritage of Bengal”, যা বাংলার কীর্তনধারার ঐতিহ্য, দর্শন ও সঙ্গীতরসের এক চিত্রমালা। প্রদর্শনীর পর অনুষ্ঠিত হয় পরিচালকের সঙ্গে আলোচনা, যেখানে তিনি কীর্তনের আধ্যাত্মিক দিক নিয়ে মত বিনিময় করেন।

দিনের শেষ প্রদর্শনী ছিল অরুণ হালদারের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র “Rêve d’un instant”—চিত্রশিল্পী সালভাদোর দালিকে উৎসর্গ করা একটি ভিজ্যুয়াল ট্রিবিউট, যা নির্মাতা তৈরি করেছেন প্যারিসে তাঁর শৈল্পিক অনুপ্রেরণার সূত্র ধরে।
প্রতিটি প্রদর্শনীর পর দর্শকরা অংশ নেন আলোচনা পর্বে, যেখানে নির্মাতারা তুলে ধরেন তাঁদের ভাবনা ও অভিজ্ঞতা।
সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা
শনিবার ও রবিবার সন্ধ্যায় আয়োজিত সাংস্কৃতিক পর্বে সংগীত, কীর্তন ও আবৃত্তির পরিবেশনা মুগ্ধ করে সবাইকে।
সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী শর্মীলা রায়, পবন দাস বাউল, মৌসুমী চক্রবর্তী ও আরিফ রানা। কীর্তন পরিবেশন করেন দেবলীনা ঘোষ। দুই দিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তবলায় ছিলেন অনুভব চট্টোপাধ্যায়। আবৃত্তি পরিবেশন করেন অর্পিতা রায়, এবং ফ্রান্স কৃতি (France Kriti) সংস্থার পক্ষে জেরেমি কদ্রন, আবু বকর আল আমিন, নিনা কাবানো এবং জান্নাতুল নাঈম প্রীতি।

বাংলা সংগীতের সুর ও কবিতার শব্দে সেদিন প্যারিসের বাতাস ভরে ওঠে আবেগে, দেশপ্রেমে ও শিল্পের মহিমায়।
উৎসব শেষে আয়োজকরা জানান, ফেস্টিভ্যাল তের দ্য বেঙ্গল ভবিষ্যতেও নিয়মিতভাবে আয়োজন করা হবে, যাতে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি আরও বিস্তৃত পরিসরে বিশ্বদরবারে ছড়িয়ে পড়ে।
রাকিবুল ইসলাম, শুদ্ধস্বর ডটকমের ফ্রান্স প্রতিনিধি ।

