“জলের শ্যাওলা”- গোলকধাঁধাঁর রাজনীতিটা রাজপথের সাত নং ক্রনিক ঋতু কী? আচ্ছা, রাজনীতির কোন ঠিকানা হয় কি? উত্তরটি দেবার আগে যে কেউ ভাববেন, উদ্ভট প্রশ্ন। তবে ৫৪ বছরের বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক চরিত্র বিবেচনায় নিলে বলাই বাহুল্য যে, বিশেষ করে আমাদের দেশের রাজনীতির একটি নির্দিষ্ট ঠিকানা আছে এবং সেটা হলো রাজপথ। পৃথিবীর সব দেশেই অবশেষে রাজনীতি ও রাজনীতিদ্বারা সফলতা আসে রাজপথ থেকেই তবে পৃথিবীর কোথাও আমাদের রাজনীতির মতন ক্রনিক (Chronic) বা দীর্ঘস্থায়ী বারো মাসের রাজনীতির অবস্থান নিশ্চিত রাজপথে হয় না। বাস্তবিক ও কঠিন সত্য হচ্ছে আমাদের ছয় ঋতুর সাথে রাজনীতিটাও সাত নং ঋতু যা একপ্রকার গোলকধাঁধাঁর রাজনীতি।
গোলকধাঁধা বলতে মূলত জটিল পথকে বোঝায় যেখান থেকে সহজে বের হওয়া যায় না। ৫৪ বছরের স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিটা বরাবরই একটা গোলকধাঁধা। আমাদের রাজনীতিটা এতটাই গোলকধাঁধাঁর যে, কিছুদিন কোন কারণে শান্ত থাকলে মনে হয় কিসের যেন অভাব। যদিও কালেভদ্রে কখনও কখনও শান্ত হয়। আমরা জনগণ সেভাবেই যেন অভ্যস্ত। মানুন আর নাইবা মানুন, কোন এক সুপ্ত হৃদয়ে আমাদের চাওয়াটাও এমন থাকে যে, রাজনীতিতে সারাক্ষণ কিছু একটা ঘটতে থাকুক। যত ঘটনা তত হাট- বাজার আর চায়ের টংয়ে জমজমাট আড্ডা এবং সাথে ব্যবসা। ভাল বা মন্দ যাই আমাদের রাজনীতিতে ঘটুক আমরা আলোচনা- সমালোচনা আর দোষারোপে ব্যস্ত থাকতে মনে হয় বেশ পারদর্শী এবং ভালবাসি। সম্ভবত এটা আমাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের একটি বিশেষ উপসর্গ। রাজনীতি আর দর্শন মূলত মুদ্রার এপিঠ- ওপিঠ হবার কথা। তবে আমরা দর্শনটাকে পাশ কাটিয়ে আপন সুবিধে আর ফয়দা লুটের রাজনীতিটা নিশ্চিত বেশি চর্চা করি। উদহারণ দিয়ে লেখার প্রয়োজন হবে না কারণ রাজনীতি এবং দর্শন এবং ফয়দা ইত্যাদি নিয়ে একটু গভীরতার সাথে যে কেউ নিজের ছকে ফেলে ভাবলেই মিলিয়ে নিতে পারবেন।
রাজনীতি এবং দর্শন এখানেই মূলত জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই জটিল থেকেও জটিলতায় পরিণত করা হয়েছে। কিভাবে? ইংরেজির প্রবাদ “Excess of anything is bad” এই প্রবাদটা আমাদের সবার জানা তবে বলাই বাহুল্য যে, অতিরিক্তের ফল মন্দ হয় জানার পরেও আমরা চর্চায় বরাবরই অভ্যস্ত। এখানে একটি বাংলা কমন প্রবাদ বলি, ” রশি বেশি টানলে ছিঁড়ে যায়”। সবার জানা এবং বহু লেখায় বহুবার উল্লেখ করেছি তবে এখানে আবার প্রয়োজনেই উল্লেখ করছি। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় এ দেশের বেশিরভাগ সংখ্যক মানুষ (পার্সেন্ট % বলতে পারবো না), যেভাবেই হোক, যাদের দ্বারাই প্রভাবিত হয়ে হোক অথবা আপন প্রয়োজনেই হোক কিংবা গণতন্ত্রের নামে যে ভোট গায়েব হয়েগিয়েছিল, সেটা উদ্ধারের জন্যই হোক, মোদ্দা কথা বেশিরভাগ জনমানুষেরাই রাজপথে ছিল এবং অভ্যুত্থান ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল। অবশেষে সেই অভ্যুত্থানের ফসল বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
লক্ষ্যণীয যে, এই সরকারে উড়ে এসে জুড়ে বসল বৈদেশ থেকে একঝাঁক জ্ঞানী- গুণী আর বিশাল বিদ্বানগণেরা। জনমানুষের মনে একপ্রকার বিশ্বাসের জন্ম হলো, হোক না বৈদেশ থেকে, উনারা বিদ্বানজন এবং অতঃপরতো এই দেশেই উনাদের জন্ম। যেহেতু আমাদের রাজনীতিবিদরা বারবার আমাদের সাথে ধোকাবাজীতে মেতেছিল এবং জবান দিয়েও জবানের বরখেলাপ করেই চলছিল তাই জনমানুষের মনে একপ্রকার বিশ্বাস জন্মালো, এবার হবে। আফসোসের যে, অনেকটাই সাঁতার না জানা এবং কচুরিপানা ধরে বাঁচার দর্শন। অবশ্য খুব দ্রুতই জনমানুষেরা টের পাচ্ছিল যে, ভুল পথেই সব ছুটছে। কিভাবে?
শুরুতেই অযাচিত যে নমুনা এলো, বাতিল করার এবং সব বাতিল কর। সংবিধান বাতিল কর, সংঙ্গীত বাতিল কর, পতাকা বাতিল কর, বৈদেশনীতি বাতিল কর, ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে ফেলো। বেশ লক্ষ্যণীয যে, জনমানুষের মনে তখনও কিন্ত সন্দেহের বীজ বপন হয়নি দুটি কারণে। একেতো আছেই পড়শীদেশের উপর রাগ- ক্ষোভ- গোস্বা। যা বেশ ভাল মাত্রায় জনমানুষের মনে বিষ হিসেবে বহু কৌশলে ছড়ানোই ছিল যদিও দোষটা ছিল দীর্ঘদিনের পূর্বের সরকারের (ব্যাখ্যার প্রয়োজন হবে না, নিশ্চয়ই) এবং দুই, যে বিষয়টি সত্যিই সার্বিক অর্থেই জনমানুষের মনে ক্রিয়া করেছিল, তা হলো আমাদের রাজনীতিবিদের উপর ভরসা না থাকা এবং সাথে দেশের বিদ্বানজনদের উপরেও (এখানেও ব্যাখ্যার প্রয়োজন হবে না, নিশ্চয়ই), ফলাফল এ দেশীয় বটে তবে মূলত বৈদেশের বিদ্বানদের উপরই ভরসা।
আরও লক্ষ্যণীয যে, আমাদের রাজনীতিবিদ বা দেশের বিদ্বানজনদের শতভাগ উপেক্ষা করে, বেশ কিছুদিন অপেক্ষামান থেকে, এমন কি সরকার বিহিন দেশ রেখে অতঃপর কিন্ত প্রফেসর ইউনূস সাহেবকে ডেকে আনা হয়েছে। ওই যে বললাম ভরসার সমস্যাটা দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে। বেশ জানি, অনেকেই হয়তো যুক্তি দেখাবেন, সব পূর্ব পরিকল্পিত, হ্যা সেটাও ফেলে দিচ্ছি না। তবে কঠিন বাস্তবতা হলো, এই দেশের জনমানুষেরা কিন্ত প্রফেসর ইউনূসের অপেক্ষামান ছিল তিনদিন। স্বীকার করুন আর নাইবা করুন, ইহাই সত্য। আফসোসের হলো, প্রফেসর ইউনূস এবং উনার পছন্দের পরিষদ দেখিয়ে দিবেন, ছিঁড়ে ফেলবেন, ধুয়ে মুছে সব ঠিক করে ফেলবেন, এমন মনোভাব নিয়ে নামলেন বটে তবে গোড়ায় চরম আঘাত আনলো দেশটির জন্মের ইতিহাসে। প্রথম দিকে এই আঘাত নিয়েও জনমানুষেরা কিন্ত মোটেও সোচ্চার ছিল না। হাতে গুণে কিছু পাগল টাইপের লোকেরা কালক্ষেপন না করে, কলম তুলে নিয়েছিল শুরু থেকেই। সেই পাগলের মাঝে নিজেকেও রাখতেই পারি। তবে আমি আবার জোর গলায় বলছি, সংখ্যাটা খুব বেশি ছিল না। এমনকি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোরও তেমন কোন ক্রিয়া ছিল না।
ওই যে উপরেই বাংলা প্রবাদ লিখেছি, “রশি বেশি টানলে ছিঁড়ে যায়”, অবশেষে এই দেড় বছরের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেটাই করতে সক্ষম হয়েছে বটে। অবশ্য এটাও সত্য যে, এর পিছনে আবার বিশেষ রাজনৈতিক দলগুলোর একটি বড় রকমের প্রভাব সরকারের উপর ছিল বটে এবং এখনও বেশ বিরাজমান। লক্ষ্য করলে দেখবেন, খোদ সরকারের দ্বারাই হোক বা বিশেষ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাবেই হোক, বা বৈদেশিক রাষ্ট্রের চিকন ক্রিয়ায় হোক, অবশেষে কিন্ত সকল সমঝোতার ছকে যখন স্বাক্ষর করার পরেও, গোপনে নিজেদের দর্শন বা প্রয়াশকেই অগ্রগামী রেখে, হজম করতে বলা হয়, তখন এটা অন্তত স্পষ্ট হয় যে, এই সরকারের প্রধানসহ সকল বিদ্বান বৈদেশিক জনেরা একটি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিলেই এসেছিলেন এবং বলাই বাহুল্য যে তখন কোন না কোনভাবে প্রমাণীত হয়ে যায় যে, সকল কিছুই মূলত পূর্ব পরিকল্পিত। যদিও সফলতা এখন অবধি না এলেও, আফসোসের যে জনমানুষের বিশ্বাসের দুর্বলতাকে চরমভাবে ব্যবহার করেছে।
জনমানুষের বিশ্বাসের দূর্বলতা নিয়ে অল্প কিছু কথা না বললেই নয়। লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, বাম ঘরানার রাজনৈতিক দল বলেন বা নেতা বলেন, তাদের দুর্বলতার কারণেই জনমানুষেরা বাম ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলোকে কোন সমর্থন করে না। তবে বেশ লক্ষ্যণীয যে, বাম ঘরানা থেকে কেউ যদি যেকোনভাবেই রাষ্ট্রের দায়িত্বের কোন চেয়ারে আসে, সেই একই জনমানুষের ভরসার মাত্রা বা পারদের স্কেল উর্ধগতির থাকে। বলাই বাহুল্য যে, জনমানুষের সুপ্ত হৃদয়ে একপ্রকার জাগরণ থাকে যে, বাম ঘরানা থেকে আসা যেহেতু, তাই ভাল না হোক, অন্তত মন্দ হবার নয়। কোন না কোনভাবে জনমানুষের হৃদয়ে বামদের প্রতি একপ্রকার ভাল বিশ্বাসের মাত্রা আছেই বলা যায়, যদিও সেই বিশ্বাসের উপর এই দেশের জনমানুষেরা আজ অবধি ভরসার প্রমাণ রাখেনি। এবারতো রীতিমত ধাক্কা হজম করলো। এটা বলাই যায়।
লক্ষ্য করলে দেখবেন, এই সরকারের বেশিরভাগ চেয়ার কিন্ত পূর্বের বাম ঘরানার লোকদের দ্বারাই পূর্ণ হয়েছিল তবে আফসোসের যে, জনমানুষের সুপ্ত হৃদয়ে এবারই প্রথম (বলছিলাম সামগ্রিকভাবে) বাম ঘরানার বিশ্বাসে চরম আঘাত আসলো বা ধাক্কা লাগলো। এই দেশে বামদের এমনেই করুন অবস্থা বিরাজমান। আগামীতে এই অবিশ্বাস বারবার উদহারণ হয়েও সামনে আসবেই আসবে।
লেখার শুরুতেই ঋতুর কথা লিখছিলাম। অবশেষে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখে এটা স্পষ্ট হয় যে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সক্ষমতা বলি বা দক্ষতা বলি (ability & skills), দুটোই প্রমাণ হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই এবং সেই প্রমাণ সাপেক্ষে বলাই যায়, শেষ। এই যে লিখলাম ‘শেষ’, এই শেষের নজিরটাই সপ্তম ঋতু হয়েই আবার ফিরছে রাজপথে। যা বরাবরই এই দেশে বহাল ছিল রাজপথে এবং রাজনীতি তার আপন ঠিকানায় ফিরলো। অবশেষে এই ঠিকানা থেকেই পত্র যাবে আগামীর বাংলাদেশের জন্য। ভাল বা মন্দ জানি না। তবে বড়ই আফসোসের যে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের “skills & ability” দুটোই যে বিশাল শূণ্য ছিল সপ্তম ঋতু তার নতুন প্রমাণ।
বুলবুল তালুকদার

শুদ্ধস্বর ডটকম

