বাংলা কথাসাহিত্যের আকাশে যাঁদের নাম উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করে, তাঁদের মধ্যে হুমায়ুন আহমেদ অন্যতম। তাঁর সাহিত্য পাঠককে যেমন মুগ্ধ করেছে, তেমনি তাঁর ব্যক্তিত্বও ছুঁয়ে গেছে অসংখ্য মানুষের হৃদয়। এই মহৎ মানুষটির সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল জার্মানিতে—ফ্রাঙ্কফুর্টে আন্তর্জাতিক বইমেলার সময়। সেই স্মৃতি আজও আমার হৃদয়ে এক কোমল আলোয় জ্বলে আছে।
বাংলাদেশে থাকাকালীন সময়েই হুমায়ুন আহমেদের নাম আমার কাছে পরিচিত। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদুল্লাহ হলে থাকতেন, রাসায়ন বিভাগের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অথচ সেই বিজ্ঞানমনস্ক মানুষটি যখন নন্দিত নরক নামে এক উপন্যাস লিখলেন, আমরা সবাই বিস্মিত হয়ে গেলাম। তাঁর লেখা যেন এক নতুন ধারার জন্ম দিল—সরল ভাষায় বলা গভীর গল্প, যেখানে সাধারণ মানুষের জীবন ও অনুভূতি মিশে যায় নিখুঁতভাবে।
প্রবাসজীবনে এসে বাংলা বই থেকে দূরে সরে গিয়েছিলাম। তখন বিদেশে বসে বাংলা বই পাওয়া ছিল কঠিন। তাই আমার পাঠের স্মৃতি যেন থেমে ছিল সেই নন্দিত নরক-এর পাতায়। এমন সময় খবর পেলাম—হুমায়ুন আহমেদ আসছেন ফ্রাঙ্কফুর্টে, ২০০২ সালের বইমেলায় অংশ নিতে। বাংলাদেশ জার্মান সোসাইটির আমন্ত্রণে তাঁর এই সফর, সঙ্গে ছিলেন তাঁর নিত্যসঙ্গী ও প্রকাশক অন্যপ্রকাশ-এর প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম—যিনি দেশে-বিদেশে সর্বত্রই হুমায়ুন আহমেদের ছায়াসঙ্গী ছিলেন।
সেই সময় ফ্রাঙ্কফুর্টে আরও উপস্থিত ছিলেন কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্স-এর সুবীর মিত্র ও তাঁর স্ত্রী জয়িতা মিত্র, এবং ঢাকার অঙ্কুর পাবলিশার্স-এর মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ। আমি তাঁদের সবাইকে আমার বাড়িতে নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানালাম। সে এক স্মরণীয় রাত—মধ্যরাত পর্যন্ত গল্প, হাসি, সাহিত্য আর স্মৃতির মিশেলে ভরে উঠেছিল ঘর। সুবীরদা তখন হেসে বলেছিলেন,
“তোমার সৌভাগ্য, দুই বাংলার দুই শ্রেষ্ঠ লেখক—সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও হুমায়ুন আহমেদ—তোমার অতিথি হয়েছেন।”
হুমায়ুন আহমেদকে প্রথমবার সামনে দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম। তাঁর মধ্যে কোনো আড়ম্বর নেই, কোনো দূরত্ব নেই। এমন সহজ, এমন অমায়িক মানুষ জীবনে খুব কমই দেখা যায়। তিনি কথা বলতেন পরম স্বাভাবিক ভাষায়, যেন অনেক দিনের পরিচিত। তাঁর খাওয়াদাওয়া, পোশাক—সবকিছুতেই ছিল এক অনাড়ম্বর সরলতা। আলুর ভর্তা, ডাল, মাছের ভর্তা ছিল তাঁর প্রিয় খাবার। ফ্রাঙ্কফুর্টের নামীদামী রেস্টুরেন্টের বদলে তিনি বারবার বলতেন,
“দেশি খাবারই খেতে ইচ্ছে করছে।”
আমরা তাই তাঁর জন্য সেভাবেই রান্না করতাম। পরবর্তীতে তিনি আরও কয়েকবার আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। আমার ছোট ছেলে রাহুলের বয়স তখন ৭ , আর হুমায়ুন আহমেদ ম্যাজিক জানতেন—আমার ছেলেকে তিনি ছোট ছোট জাদু দেখিয়ে মুগ্ধ করতেন। সেই মুহূর্তগুলো আজও আমার চোখে ভাসে—একজন বড় লেখক হয়েও কতটা সহজভাবে শিশুদের সঙ্গে মিশে যেতে পারেন, সেটি তাঁর মধ্যে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।
তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি খুব সহজেই সবাইকে আপন করে নিতে পারতেন। তাঁর উপস্থিতি ছিল উষ্ণ ও আলোকিত। কথার মধ্যে ছিল হাস্যরস, আন্তরিকতা আর গভীর মানবিকতা। মনে হতো, তাঁর চারপাশে এক অদৃশ্য আলো ছড়িয়ে আছে, যেখানে এসে সবাই একটু শান্তি পায়।
ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার একটি ছোট্ট ঘটনা আজও মনে আছে। আনন্দ পাবলিশার্স-এর স্টলে বসে ছিলেন জয়িতা মিত্র। হাতে হুমায়ুন আহমেদের একটি বই, ডুবে আছেন গল্পে। আমরা ঠিক করেছিলাম শহরে মার্কেটিংয়ে যাব, কিন্তু জয়িতা বৌদি তখন বই থেকে চোখ তুলতে পারছেন না। আমি বললাম, “চলেন, এখনই যাই।” তিনি হেসে উত্তর দিলেন,
“বই শেষ না করে উঠতে পারব না।”
এই ছোট্ট ঘটনাই প্রমাণ করে, হুমায়ুন আহমেদের লেখার জাদু কতটা প্রবল ছিল। তাঁর বই একবার পড়া শুরু করলে শেষ না করে কেউই উঠতে পারত না।
হুমায়ুন আহমেদ কেবল একজন লেখক ছিলেন না—তিনি ছিলেন সময়ের এক গল্পজাদুকর। তাঁর লেখায় শহুরে জীবনের হাসি-কান্না, প্রেম-বিরহ, মানুষ ও মায়ার এক অপরূপ রূপ ফুটে উঠেছে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, সাহিত্য মানে কেবল উচ্চারণ নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনের সহজ ভাষায় বলা এক গভীর সত্য।
জার্মানির সেই দিনগুলো এখন বহু দূরের স্মৃতি। কিন্তু যখনই তাঁর লেখা হাতে নিই বা তাঁর কোনো নাটক দেখি, মনে হয় তিনি এখনো আছেন—আমাদের পাশেই, আমাদের প্রতিদিনের কথার মধ্যে, আমাদের স্মৃতির ভেতর।
হুমায়ুন আহমেদ ছিলেন সেই মানুষ, যিনি কলম দিয়ে মনের অন্ধকারে আলো জ্বালাতে পারতেন। জার্মানির সেই অচেনা শহরে, এক শীতল সন্ধ্যায়, আমি যে মানুষটির সরল হাসি, অমায়িক কথা আর জাদুকরী উপস্থিতি দেখেছিলাম—তিনি আজও আমার হৃদয়ে বেঁচে আছেন, ঠিক তাঁরই লেখা কোনো গল্পের নায়কের মতো। আজ ১৩ ই নভেম্বর তার জন্মদিনে এই প্রিয় মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালবাসা ।
হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম ।

