জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গতকাল প্যালেস্টাইনের পূর্ণ সদস্যপদ এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের এক ঐতিহাসিক ভোটাভুটি হয়েছে। ১৪২টি দেশ এ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে, মাত্র ১০টি দেশ বিরোধিতা করেছে, আর ১২টি দেশ ভোটদানে বিরত থেকেছে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় গৃহীত এই প্রস্তাব আন্তর্জাতিক মহলের এক স্পষ্ট বার্তা—প্যালেস্টাইনের রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার অধিকার অস্বীকার করা যায় না। ভারতসহ এশিয়ার একাধিক দেশও এ প্রস্তাবে সমর্থন জানিয়েছে। তবে প্রশ্ন রয়ে যায়—এই প্রস্তাব বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে? জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবগুলো আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। ফলে বাস্তব পরিবর্তন আনতে হলে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন প্রয়োজন। আর এইখানেই এসে দেখা দেয় সবচেয়ে বড় জটিলতা: যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতা। অতীতে বহুবারই দেখা গেছে, ইজরায়েলের বিরুদ্ধে কিংবা প্যালেস্টাইনের পক্ষে কোনও পদক্ষেপ নিতে গেলে ওয়াশিংটনের ভেটোই প্রধান অন্তরায় হয়েছে।
২০২৪ সালেও নিরাপত্তা পরিষদে প্যালেস্টাইনের পূর্ণ সদস্যপদ প্রস্তাব তোলা হয়েছিল, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্যালেস্টাইনের রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি অনেকটাই বিস্তৃত। বর্তমানে প্রায় ১৪৭টি দেশ প্যালেস্টাইনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু সেই স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও জাতিসংঘে তারা এখনও কেবল “পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র”—যাদের উপস্থিতির অধিকার আছে, কিন্তু ভোটাধিকার নেই। এরই মধ্যে গাজার মানবিক পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের হামাস হামলার পর ইজরায়েলি বাহিনী যে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে, তা এখন কার্যত গণহত্যার পর্যায়ে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ৬০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ত্রাণ সংগ্রহের লাইনে দাঁড়ানো সাধারণ মানুষকেও ইজরায়েলি সেনাদের গুলির মুখে পড়তে হয়েছে। শিশুরা অনাহারে ও অপুষ্টিতে মারা যাচ্ছে। গাজা আজ এক ধ্বংসস্তূপ, এক মানবিক নরক। এমন এক প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের প্রস্তাব নিঃসন্দেহে নৈতিক গুরুত্ব বহন করে।
এটি বিশ্ব জনমতের প্রতিফলন—দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানই শান্তির একমাত্র টেকসই পথ। কিন্তু বাস্তবের সঙ্গে নীতির ফারাক এখানেই স্পষ্ট। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন: “প্যালেস্টাইন বলে কিছু নেই, সব ভূমিই ইজরায়েলের।” এ অবস্থায় ইজরায়েল এই প্রস্তাব মানবে, এমন সম্ভাবনা আপাতত নেই বললেই চলে। তাহলে প্রশ্ন জাগে—এই প্রস্তাবের কার্যকারিতা কোথায়? বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাধারণ পরিষদের এমন সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াবে, কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন আনতে হলে প্রয়োজন কঠোর পদক্ষেপ—যেমন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ, কিংবা আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের উদ্যোগ। শুধুমাত্র প্রস্তাব বা বিবৃতি দিয়ে গাজার মানুষকে রক্ষা করা যাবে না। আজকের এই প্রস্তাব নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। এটি বিশ্ব সম্প্রদায়কে মনে করিয়ে দেয়, প্যালেস্টাইনের ন্যায্য অধিকার অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু যতক্ষণ না শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো—বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র—আপনার অবস্থান পরিবর্তন করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এ ধরনের প্রস্তাব কেবল কাগুজে প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
হাবিব বাবুল , রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং শুদ্ধস্বর ডটকমের প্রধান সম্পাদক ।

