৭ সপ্তাহ ঢাকায় আত্মগোপনে থাকার স্মৃতি তুলে ধরে মিল্লাত বলেন, “আমি সূর্যের আলো দেখতে পাইনি।” এরপর মোটরসাইকেল, গাড়ি ও হেঁটে ২২ ঘণ্টার ভ্রমণ শেষে তিনি কলকাতায় পৌঁছান। সেখানেই তিনি এখন স্ত্রীসহ একটি ভাড়া অ্যাপার্টমেন্টে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন।
২০০৭ সালে স্কটল্যান্ডে চিকিৎসা পেশা ছেড়ে দেশে ফিরে রাজনীতিতে যোগ দেন হাবিবে মিল্লাত। পরে তিনি দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দ্য স্ক্রল-এ দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা দিল্লিতে চলে যাওয়ার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগের সব রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। এর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অভিযোগ দাখিল করেছেন মিল্লাত, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কানাডাভিত্তিক গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্নেন্স-এর কাছে দাখিলকৃত একটি রিপোর্ট।
সেই রিপোর্ট অনুযায়ী, গত এক বছরে জনতার হাতে অন্তত ৬৩৭টি সহিংস ঘটনায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন এবং ১১৬ জন সাবেক এমপি বর্তমানে কারাবন্দী।
সম্প্রতি বিবিসি-র একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, কলকাতায় আওয়ামী লীগ একটি অফিস খুলেছে। এ খবর ঢাকায় প্রবল প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। বাংলাদেশ সরকার একে ‘দেশের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবমাননা’ হিসেবে আখ্যা দেয়। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘প্রতিক্রিয়াটি ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।’
এ প্রসঙ্গে হাবিবে মিল্লাত বলেন, “আমরা সামাজিক প্রাণী। একসাথে বসলে কেউ যদি তাকে অফিস বলে, সেটা ভিন্ন কথা।” অন্যদিকে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল বলেন, “যেটিকে অফিস বলা হচ্ছে, সেটি একজন ব্যবসায়ীর জায়গা। মাঝে মাঝে সেখানে বসা হয়, এটা স্বাভাবিক।”
নাদেল বর্তমানে কলকাতায় সাধারণ জীবনযাপন করছেন। একসময় তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক ছিলেন। এখন ব্যাংকে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন, রিকশাওয়ালার সঙ্গে দর কষাকষি করছেন—তবুও দলের প্রতি আনুগত্যে অনড়।
কলকাতায় বসেই ভার্চুয়াল মাধ্যমে বাংলাদেশে থাকা কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন নেতারা। কেউ কেউ দিল্লি গিয়েও শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, যিনি বর্তমানে একটি হত্যা প্রচেষ্টা মামলার আসামি, এখন নিউ টাউনে বসবাস করছেন। সেখান থেকেই প্রতিদিন দলীয় যোগাযোগ রক্ষা করছেন তিনি।
সম্প্রতি হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎকারের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেন, “এটা হৃদয়গ্রাহী এবং অনুপ্রেরণাদায়ক ছিল।”
হাবিবে মিল্লাত আশাবাদী, নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পেলে আওয়ামী লীগ তাদের সাংগঠনিক শক্তি দিয়ে উল্লেখযোগ্য ভোট পাবে। যদিও দেশের প্রধান দুটি বিরোধীদল—বিএনপি ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি—এই সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিয়েছে।
বিএনপির রুহুল কবির রিজভী বলেন, “আওয়ামী লীগকে তাদের অপরাধের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পেতে হবে।” ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির সারোয়ার তুষার বলেন, “তাদের নির্বাচনে ফেরার কোনো সুযোগ নেই।”
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারতের অবস্থান কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত। অতীতে বিএনপি-জামায়াত জোটের সময় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিদ্রোহে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ থাকায়, দিল্লি অনেকটাই আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। তবে নতুন বাস্তবতায় কৌশল পাল্টাচ্ছে ভারত।
অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের গবেষক আদিত্য গোদারা বলেন, “ভারতের এখন বাস্তবতা হলো, পরবর্তী নির্বাচনে যে-ই ক্ষমতায় আসুক, তাদের সঙ্গেই কাজ করতে হবে।”
কলকাতা একসময় ছিল আওয়ামী লীগের লড়াইয়ের ঘাঁটি। মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকারও এখান থেকেই পরিচালিত হয়। হাবিবে মিল্লাত বলেন, “এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। মানুষ ভাবে ভারত আমাদের একটি রাজ্য মনে করে। তাই খুব সতর্কভাবে পা ফেলতে হচ্ছে।”
তবে কলকাতা থেকে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলছে—নতুন রূপে, নতুন কৌশলে।

