“জলের শ্যাওলা”- বে অফ বেঙ্গল গার্ডিয়ান বাংলাদেশ কোন জটিলতায় পড়তে যাচ্ছে, শতভাগ কারো কোন মালুম নেই। ইহাই সত্য। বিশ্বের চার পরাশক্তির গোলকধাঁধা চক্করে বাংলাদেশ কিভাবে নিজেকে রক্ষা করবে সেটা আমাদের জাতীগতভাবে খুব দ্রুতই ভাবা উচির। তা না হলে চার বিশ্ব পরাশক্তির চক্কর আমাদেরকে বাস্তবিক অর্থেই চক্করে চক্করে ধরাশায়ী করবেই করবে।
বাংলাদেশের সঙ্গে মায়ানমারের ২৭০ কিলোমিটারের সীমানা রয়েছে। বাংলাদেশের বান্দরবান, রাঙামাটি ও কক্সবাজারের মতো তিনটি জেলা রয়েছে মায়ানমারের ঠিক পাশেই। এই সীমান্তবর্তী জায়গাগগুলিতেই বর্তমানে আরাকান তাঁদের দাপট দেখাচ্ছে। আরাকানরা মূলত বৌদ্ধ ধর্মের। মায়ানমারের মুসলিম রোহিঙ্গাদের সাথে বহু পূর্বের দন্দ। রাখাইন এখন প্রায় পুরোটাই আরাকানদের দখলে।
আরাকান আর্মি, রাখাইন প্রদেশ, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আগমন, জাতিসংঘের প্রধানের আগমন, রোজা রাখা, ভাষণ দেওয়া, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া, এগুলো সমন্ধে মোটাদাগে সবার জানা আছে নিশ্চয়ই। আমার বলার বিষয়টি ভিন্ন। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন উচ্চারণ করেছিলেন, আরাকান অঞ্চলের বিশ্বের পরাশক্তির টার্গেট একটি খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা চলছে। সেই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর বচনটি আমরা বাস্তবিক অর্থেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হইনি। উল্টো রাজনৈতিক চাল বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছি। ওই তুচ্ছতাচ্ছিল্যের কারণটি হলো যেহেতু আমরা রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভিতরের কোন অংশ নই, তাই আসল সত্য জানা সত্যিই মুশকিলের। সুতরাং সাধারণ জনমানুষের উপলব্ধিটাও তেমনভাবেই প্রকাশ পায়।
এখানে অবশ্য বলা ভাল যে, আমাদের গণমাধ্যমগুলোর দায়বদ্ধতা অনেক বেশি। প্রধানমন্ত্রীর এত গুরুত্বপূর্ণ বচনের পরেও আমাদের বিজ্ঞ গণমাধ্যমগুলো কোন প্রকার অনুসন্ধানী রিপোর্ট করলো না। একটিও না। আজকাল বাস্তবিক অর্থেই গণমাধ্যমগুলোর অনুসন্ধানী রিপোর্ট নেই বলা চলে। ডিজিটাল যুগে টেবিলের ল্যাপটপ বা স্ট্যান্ড কম্পিউটারে উপরেই ভরসা করে বেশিরভাগ রিপোর্ট হয়। মাঠে- ঘাটে সাংবাদিকতা একেবারেই কমে এসেছে। ঠিক এটার কারণেই কখনও কখনও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর চেয়েও শক্তিধর হয়ে উঠে। যদিও এটা জাতির জন্য মোটেও সুখকর নয়। তবে বাস্তবিক অর্থেই চলছে তেমনটাই।
আমাদের জুলাই- আগস্ট অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুন একটি সরকার এলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নয় মাস হতে চলছে এবং স্বাভাবিক কারণেই এই লম্বা সময়ে অভ্যুত্থানের বহু বাস্তবিক চিত্র বা পিছনের উপসর্গগুলো অনেকটাই সামনে চলে এসেছে এবং আরও আসছে। যে সরকারকে দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘ ১৫ বছর একটুও হিলাতে পারলো না অথচ মাত্র অল্প কয়েকদিনেই কিনা এত্তবড় একটি অভ্যুত্থান হয়ে গেলো এবং সরকার ধ্বসে পড়লো এবং উজির- নাজির সবাইকে নিয়ে দেশান্তরীত হয়ে গেলো। বিশ্বের ইতিহাসে এমন কাহিনীর বিরল। তাহলে প্রশ্ন উঠবেই কি করে সম্ভব হলো?
হ্যা সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সেই বচন খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়ার কথা স্মরণ না করে পারা যাবে না। সেই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর বচনের গুরুত্ব অনুধাবন না হলেও, অনেকটা চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ার মতন এখন আমারা বুদ্ধিমান হয়ে বিষয়টি ভাবছি। ভাবার আরও বহুবিধ কারণ আমাদের সম্মানিত প্রধান উপদেষ্টা নিজেই আমাদের জানিয়েছেন, ম্যাটিকুলাস প্লানের কথা এবং আমেরিকানদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন আমেরিকায় গিয়ে। যেহেতু স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস সাহেব বলেছেন তাহলে সেটার গুরুত্ব অবশ্যই আছে। এটাকে এখন আর অবহেলা করার সুযোগ নেই কারণ পূর্বের প্রধানমন্ত্রীর বচন উপেক্ষা করেছিলাম তবে এখন আবার সেটা অনেকটাই বাস্তবতা হিসেবেই সামনে আসছে।
সাধারণভাবে আমাদের মতন আমজনতা যা বরাবরই শুনে আসছি তা হলো মার্কিনিদের বাংলাদেশের উপর একটি লক্ষ্য আছে। প্রায়শই আমরা সেন্টমার্টিনে মার্কিনিদের নজরে কথা শুনি। সেন্টমার্টিনে মার্কিনিদের সেনা ঘাঁটি করার ইচ্ছার কথা শুনি কারণ বলতে মার্কিনিদের বর্তমান বড় শত্রু চীনকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা শুনি। বহু বছর ধরেই এমন সব বচন আমরা শুনে আসছি। তাই বলাই বাহুল্য যে, একেবারেই হাওয়ার বচন নিশ্চয়ই নয়। অপরদিকে মায়ানমারে মার্কিনিদের তৎপরতা সেই কবে থেকেই চলে আসছে। যেখানে আবার চীনের দাপটটাও একেবারে কম নয়।
ভারতের সাথে মার্কিনিদের দহররম মহরম থাকলেও সেন্টমার্টিনে মার্কিনিদের ঘাঁটি ভারতকে যে ঘিরে ফেলবে না, তা নয় যে। ভারত নিজেও এই অঞ্চলে মার্কিনিদের এমন তৎপরতা সহজে মেনে নেবে না। সাথে রাশিয়ার প্রশ্নটাও চলে আসবে। রাশিয়া নিজেও নিজেদের স্বস্তির খোঁজে থাকবে। সেই সূত্রেই ভারত রাশিয়ার সন্ধি অস্বাভাবিক হবে না। এমন সব জটিল সমীকরণ হিসেবের ফাঁকে যদি আরাকানে ভর করে ক্ষুদ্র একটি দেশ যেমন পূর্ব টিমু আছে, তেমনটা গড়া যায়, সেটাই মার্কিনিদের জন্য সোনায় সোহাগ হবে। মার্কিনিদের সেই চেষ্টার নিশানা বেশ লক্ষ্যণীয হচ্ছে।
ফিরে আসি শেখ হাসিনার সেই বাণীতে। এই ম্যাটিকুলাস প্লান একটি শক্তিধর সরকারের পতন অল্প দিনেই ঘটে গেলো এবং পিছনের যে মার্কিনিদের শক্তির ক্রিয়া আছে, যা আমাদের প্রফেসর ইউনূস সাহেবের বচন থেকেই আমরা পাই, সেখানে ভাবনা কিন্ত জড়িয়ে যায়। এমনটা ভাববার কোন কারণ থাকতে পারে না যে, ইউনূস সাহেবের প্রতি কেবলমাত্র ভালবাসা থেকেই মার্কিনিরা বিনা স্বার্থেই হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। কথায় আছে না, মার্কিনিরা যাদের বন্ধু তাদের শত্রুর প্রয়োজন হয় না যে। সুতরাং বিষয়টিকে অত হালকা না নিয়ে আমাদের জাতিগতভাবে ভাবা উচিত। তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে ভোগান্তির স্বীকার আমাদের এই ছোট্ট ভূখণ্ড বাংলাদেশের সকলকেই ভুগতে হবে যে।
আমাদের দেশের একটি বড় সমস্যা হলো আমরা জাতির স্বার্থে কখনোই এক হয়ে উঠতে পারিনি। বলছিলাম আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর কথা। এমনকি ৭১ এও আমরা সামগ্রিকভাবে শতভাগ এক হতে পারিনি। আমাদের স্মরণে রাখা প্রয়োজন ৭১ এ তবুও জাতিগতভাবে আমরা বৃহত্তর অংশ এক ছিলাম বলেই একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে সক্ষম হয়েছিলাম। এত রক্তের স্বাধীন দেশটিকে যেন আমরা ক্ষুদ্র স্বার্থের কাছে নত হতে না দেই। বারবার ভাবুন এই স্বাধীন দেশটির পিছনে অনেক অনেক রক্ত। স্মরণে রাখুন দশের লাঠি একের বোঝা। দেশের স্বার্থেই এমন দূর্বিষহ সময়ে আসুন দেশের স্বার্থকে এগিয়ে রাখি।
বারবার স্মরণ রাখুন, অত্র এশিয়া অঞ্চল বর্তমান বিশ্বের হটকেক। এই অত্র অঞ্চল এবং ভৌগলিক কারণেই আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশ হঠাৎই বিশ্বে হটকেক হয়ে উঠেছে কেননা দ্বন্দ্বটা আমাদের সাথে মোটেও নয়। ওটা মূলত মার্কিনিদের সাথে সমানতালে অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির দিক থেকে উপরে উঠে আসা চীনের কারণে। বাংলা প্রবাদ, “পাতা পুতায় ঘষাঘষি/ মরিচের দশা শেষ”। তাই যতটুকু সম্ভব আসুন একত্রিতভাবে ক্ষুদ্র স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে দেশের স্বার্থ ভাবি। মানুন আর নাইবা মানুন, এটা নেহাত সত্য যে, আমাদের এই ছোট্ট ভূখণ্ডটি আন্তর্জাতিক রোষানলে বা বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের ক্রোধে ইতিমধ্যেই আমরা পড়ে গেছি। কঠিন বাস্তবতা হচ্ছে এই রোষানল ও ক্রোধ আমাদের কোন একদিন ভোগাবেই। জ্বি হা বিশ্বের রাজনীতিটাই এমন। তাই ভাবুন, বিশ্ব রাজনীতির দোলাচলের হাত থেকে নিজেদের রক্ষাকবচ একমাত্র হতে পারে জাতিগত শক্তি। সময়েই ভাবুন।

বুলবুল তালুকদার
শুদ্ধস্বর ডটকম

