মুজিববাদ মওদূদীবাদ মূর্দাবাদ জিন্দাবাদ

“জলের শ্যাওলা”- খুব সহজভাবে বললে বলতেই হয় মুজিববাদ মূলত যা, বা যেভাবে উৎপত্তি তার ধারে কাছেও না গিয়ে, দেশ স্বাধীনতার পরে স্রেফ ৭২ এর সংবিধানকে টার্গেট করে ৭২ এর সংবিধানকেই মুজিববাদ বানিয়ে ফেলেছে একটি পক্ষ। এখানে ছল চাতুরি বা কলা কৌশলের খেলার চেয়েও সরাসরি টার্গেট করে বাতিল করার চেষ্টার নামে অপচেষ্টা এবং নিজেদের মওদুদীবাদকে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস চলছে।

মুজিববাদের সংজ্ঞায়ন বর্তমান বহুরকম দেখছি। বাস্তবিক অর্থেই মুজিববাদ কি? সেই ব্যাখ্যায় না গিয়েও এক অর্থে বলাই বাহুল্য যে, যুদ্ধকালীন সময় মূলত সব বাদই ছিল মুজিববাদ। সেটা স্লোগানের কথা বলুন, প্রতীকীর কথা বলুন, আদর্শের কথা বলুন কিংবা স্পৃহা বা মানসিক শক্তির কথা বলুন। সব কিছুই ছিল মুজিবকে সামনে রেখে। জ্বি হা, শেখ মুজিব তখন এতটাই ক্যারিশমেটিক লিডার ছিল যে, সর্বত্রই যা ঘটেছে সব মুজিবকে পূর্ণপাত্রে রেখেই ঘটেছে এবং মানুন আর নাইবা মানুন, মুজিবের নামেই দেশ স্বাধীন হয়েছে। সেই সময়ে সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর মাঝে হাতে গুণে কিছু সংখ্যক মানুষ নামের প্রাণী ছিল যারা, এই দেশের মাটি মানুষকে অগণ্য ও অপমান করে মওদূদীবাদের সূত্রেই পাকিপ্রেমী হয়ে উঠেছিল। এতটাই পাকিপ্রেম ছিল যে, আমার/ আপনার মা- বোনদের পাকিদের হাতে তুলে দিয়েও বিধাতার শুকরিয়া আদায় করতো, সুবহানআল্লাহ- আলহামদুল্লিলাহ্ বলে।
৭১ এ সেই ক্ষুদ্র সংখ্যক মানুষ নামের পাকিপ্রেমী বাদে সকল মানুষের হাসি- কান্না- দুঃখ- কষ্ট- দুই হাত তুলে উপরওয়ালার নিকট প্রার্থনা, নিজের সন্তানদের যুদ্ধে পাঠানো, নিজেরা খেয়ে না খেয়ে জীবনকে বাঁচানো, শত মাইল হেঁটে বর্ডার পেরিয়ে জীবন বাঁচানো, দেশের মধ্য আগুন- গুলির মাঝেও নিজেদের জান টিকিয়ে রাখার চেষ্টা, গভীর রাতে মুক্তিযোদ্ধাদের গাঙ পাড় করিয়ে দেওয়া, লুকিয়ে রাতের বেলায় চাউল- ডাউল যা সেই সময় ঘরে ছিল তা দিয়েই মুক্তিযোদ্ধাদের দু’মুটো ভাত খাওয়ানো, ভূষির ঘর, খেড়ের পালা, মাচার উপর মুক্তিযোদ্ধাদের একটু ঘুমের ব্যবস্থা করা কিংবা ঘরের ছোট্ট ছেলেটিকে দিয়ে সড়কের মোড়ে দাঁড় করিয়ে নজর রাখা কোন রাজাকার- আলবদর বা পাক আর্মির আগমন হচ্ছে কিনা, এই সকল কিছুই ঘটেছে মুজিবকে সামনে রেখেই এবং মুজিবের নামেই। এত কষ্ট মানুষের ছিল তবুও দুই হাত তুলে মুজিবের জন্য দোয়া করত সেই মানুষগুলো। এই যে মানুষের কষ্ট- দুঃখ থেকে হৃদয়ের চাওয়া- পাওয়া ও প্রার্থনা সবই মুলত আপেক্ষিক অর্থে মুজিববাদের অংশ। বিনা মুজিবে যুদ্ধকালীন মানুষ হৃদয়ের শ্বাস প্রশ্বাসও চলতো না। এক সংবিধানকে মুজিববাদের বৃত্তে বেঁধে মুজিব বাদের কতল করা অত সহজ হবার নয় কেননা ৭১ এর এত এত বিষয় ইতিহাস বারবার সাক্ষ্য দেবে যে।
উল্টো দিকে মওদূদীবাদ কার বা কি এবং উৎপত্তি নিয়ে বলার প্রয়োজন নেই কেননা জামায়াতে ইসলামের মওদূদীবাদ সমন্ধে খোদ ধর্মপ্রাণ মুমিন আর ইসলামের বহু মাজহাবের মাঝেও শত প্রশ্ন আছে। সরলপ্রাণ মুসলিম মিল্লাতকে মওদূদী তার ভ্রান্ত মতবাদের বন্দি করে মুসলমানদের ঈমান আকীদায় বেঘাত ঘটিয়েছে, এমন প্রশ্ন বহু উচ্চারিত হয় এবং হচ্ছে। মওদূদীবাদ ওদের বিষয় ওরাই দেখুক। ওটা সাধারণ মুসলমানের মাথা ব্যথার কোন কারণ হবার নয়।
প্রশ্ন হলো এই স্বাধীন ভূমিতে ৭১ এ দেশ বিরোধী থেকেও কি করে এখন আবার সেই মওদূদীবাদীরা এতটা শক্তিশালী হয় উঠলো এবং মওদূদীবাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেশের জন্মসূত্রের সংবিধানের থাবা বসানোর হীম্মত দেখায়? এই প্রশ্নের উত্তরে ৫৩ বছরের স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতির চুলচেরা বিশ্লেষণ না করেও বলা যায়, চরম ভুল পথে রাজনীতির চর্চাই আজকের দিনে এই হাল। যুদ্ধ বিধ্বস্ত ও ধ্বংসস্তুপের দেশটি ৫৩ বছরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বটে তবে যে সূত্রে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা ছিল, উল্টো শত ভুল সূত্রেই হেঁটেছে। ফলাফল আজকের দিনে জামায়াতীদের উচ্চবাচ্য ও দেশের জন্মসূত্রের সংবিধান নিয়েও আস্ফালন জনমানুষদের দেখতে হচ্ছে, সহ্য করতে হচ্ছে।
কঠিন বাস্তবতা হচ্ছে, ৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধের শতভাগ বিপক্ষে থাকা এবং মানবতাবিরোধী অবস্থান করা এবং ৫৩ বছরের স্বাধীন দেশে আজ অবধি সেই কৃতকর্মের জন্য খেদ, অনুতাপ বা অনুশোচনা না করা জামায়াতে ইসলামকে এই স্বাধীন দেশে দেশপ্রেমিক শক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করা, এমনকি সেনা বাহিনীর দেশপ্রেমের সাথে সম পর্যায়ে তুলোনা করা, এগুলো ইতিহাসের নির্মম রসিকতা ছাড়া ভিন্ন কিছুই নয় এবং সাথে মুক্তিযুদ্ধকে চরম অপমান করার সামিল। তাহলে প্রশ্ন উঠবেই কেন তাহলেও জামায়াতে ইসলামের এহেন কর্মকাণ্ডের পরেও জনমানুষের বড় একটি অংশ তাদের প্রতি সমর্থন দিচ্ছে এবং ঝুঁকে যাচ্ছে তাদের প্রতি? জামায়াতে ইসলামের সমর্থন অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে এটা অনস্বীকার্য সত্য। সেখানেই সেই মওদূদীবাদের ধর্মের খেলা বড় রকমের অস্ত্র বটে। ধর্ম এবং ধর্মকে ব্যবহারের নামে ধর্মের অপব্যবহার করে সরল ও সাধারণ জনমানুষের ধর্মের দূর্বলতাকে কাজে লাগানো, এগুলো মওদূদীবাদেরই অংশ এবং বলাই বাহুল্য সফলতা তাদের একবারেই কম নয় কিন্ত। মোদ্দা কথা ধর্ম বলে কথা যে।
মূর্দাবাদ অর্থ নিপাত যাক বা ধ্বংস হোক বা পতন ঘটুক ইত্যাদি। এই মূর্দাবাদের নামে মূলত জামায়াতে ইসলামি টার্গেট করেই এগুচ্ছে স্বাধীনতার মূল চেতনাকে মূর্দাবাদ বানাতে। দেশ জন্মের ৫৩ বছরের জন্মসূত্রের চেতনার যে রাজনৈতিক চর্চার চরম দূর্বলতা ঘটে এসেছে এবং তদুপরি বিগত সরকারের সতেরো বছরের যে চরম ফ্যসিজম চর্চা চলেছে, যেখানে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চার কোন সূত্রই কার্যকর ছিল না, ঠিক সেখানটায় মওদূদীবাদী জামায়াতে ইসলাম নিজেদের বেশ কার্যকরীভাবেই স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে, এটা স্বীকার করতেই হবে। রাজনৈতিকভাবে রাজনীতির অপচর্চার মোক্ষম ব্যবহার বলতে যা বুঝায়।
প্রশ্ন তবুও থেকেই যায়, মওদূদীবাদের চরকায় কি স্বাধীনতার সূত্র চরকির মতন চক্কর খাবে ? এই উত্তরটি বর্তমান পরিস্থিতিতে অতটা সহজ হবার নয় বলেই মনে হচ্ছে। তবে রক্তের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা এই ভূখণ্ড অর্জিত হয়েছে, সেই রক্ত এই মাটির জনমানুষদের উপলব্ধিতে আসবেই এবং আসতে বাধ্য হবে। ইনকিলাব জিন্দাবাদ বা জিন্দাবাদের স্লোগান বেশ উচ্চারিত হচ্ছে বটে তবে বলাই বাহুল্য যে, যে ঘোরে পরে এমনটা চলছে সেটা খুব বেশি দীর্ঘায়ীত হবার নয়। জামায়াতে ইসলামের একপ্রকার জোয়ার যা বহমান আছে, সেটার ভাটার নিশানাও বেশ লক্ষ্যণীয বটে।
দেশে একটি গণ অভ্যুত্থান ঘটেছে একান্তই প্রয়োজনে এবং লক্ষ্য- উদ্দেশ্য যা ছিল সেটাও শুরুর দিকে বেশ পরিষ্কার মনে হলেও এই গণ অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলাম জল ঘোলা করেই চলছে এবং তাদের মওদূদীবাদের লক্ষ্য- উদ্দেশ্য হাসিলের প্রয়াসে ধর্মকেই প্রধান বর্ম করে এগুচ্ছে। গণ অভ্যুত্থানের শুরুর দিকে সকল ইসলামিক শক্তিগুলোকে মনে হচ্ছিল জামায়াতে ইসলামের খপ্পরে আটকাচ্ছে। তবে ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বেশ অনুমেয় হয় যে, যে প্রভাব শুরুর দিকে ছিল, সেই প্রভাবে বেশ ভাটাও পরিলক্ষিত হচ্ছে। উদহারণস্বরুপ বলা যায়, জনমানুষের সমর্থনের গণ অভ্যুত্থানকে পুঁজি করে বিপ্লবের নামে জামায়াতে ইসলাম নিজেদের আপন দর্শন ও লক্ষ্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে জুলাই অভ্যুত্থানের নামে যে ঘোষণা পত্র জারির চেষ্টা বছরের শেষ দিনে করেছিল, সেখানে খোদ তাদের সমর্থনের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও সরে আসতে বাধ্য হয়েছে। এই হোঁচট থেকেও অনুমান করা যায় যত রটে তত ঘটে না।
একটি কথা স্বীকার করতেই হবে, রাজনৈতিক নানান ঘাত- প্রতিঘাতে ঘোরে পরে জনমানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে হয়তো অল্প সময়ের জন্য পরিবর্তন আসতেই পারে। তবে সময়ে আবার সেই পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন ঘটবেই যখন দেশটির জন্মসূত্রের প্রশ্ন সামনে চলে আসবে। বেশ লক্ষ্যণীয যে, গণ অভ্যুত্থানের পরপরই জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, ভূখণ্ড এবং অতঃপর বহুল চেষ্টা সংবিধান পরিবর্তন এগুলো নিয়ে যে ঢেউ উঠেছে বা উঠাইয়াছে, সব ঢেউই কিন্ত ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসছে। লক্ষ্য করুন, বর্তমানে জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত বাতিল, ভূখণ্ড ইত্যাদির পরিবর্তন নিয়ে কোন বাহাস নেই। হ্যা মুজবাদী আওয়াজ তুলেন সংবিধানের কতলের চেষ্টা অব্যাহত আছে বটে তবে এই প্রচেষ্টারও বেহাত হবেই হবে কেননা দেশটির জন্ম কিন্ত তিরিশ লাখের রক্ত আর দুই/তিন লাখ মা- বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়েই ঘটেছে।
দূর থেকে কাশবন ঘণ ও সাদা। প্রমাণীত সত্য যে, এখানে কোন যদি/ কিন্ত নেই, স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি মওদূদীবাদের জামায়াতে ইসলামকে জনমানুষের গণ অভ্যুত্থানের পরে বেশ শক্তিশালী মনে হলেও বাস্তবিক অর্থে এই স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াতে ইসলাম মূলত এই স্বাধীন দেশের দূর্বল ও সর্বোচ্চ ঘৃণিত দল। দূর্বল কেননা ওরা এই স্বাধীন দেশের জন্মের বিরোধী বলেই এবং ঘৃণিত কারণ জামায়াতে ইসলাম আজ অবধি স্বাধীনতা বিরোধী বলেই। কঠিন সত্য হলো স্বাধীনতা বিরোধীতা কর্মকাণ্ডের বিপরীতে ওদের আজ অবধি কোন প্রকার অনুশোচনা নেই, নেই কোন ক্ষমা চাওয়ার প্রয়াস। কেননা থাকলে খোদ জামায়াতে ইসলামের প্রধান গত কয়েকদিন পূর্বেই “যদি” শব্দ দিয়ে বলতো না, যদি ৭১ এ জামায়াতে ইসলাম ভুল করে থাকে। মূলত এই যদি শব্দ দিয়ে ওরা এখনও ৭১ এর কর্মকাণ্ডকে যায়েজ করে যাচ্ছে। ওদের মূর্দাবাদ শব্দটির ব্যবহার করেই শেষে লিখছি, নিপাত যাক দেশের স্বাধীনতা বিরোধী মওদূদীবাদের জামায়াতে ইসলাম। উজ্জ্বল হোক স্বাধীনতার চেতনায় মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ।
বুলবুল তালুকদার 
শুদ্ধস্বর ডটকম 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.