প্রতি বছরের ন্যায় আবারো আমাদের মাঝে ফিরে এলো আগষ্ট মাস। এই আগষ্ট মাস বাঙ্গালী জাতির জন্য শোক আর বেদনার মাস। বাঙালীর শোকের মাস। শোকাবহ আগষ্ট মাস।
১৯৭৫ সনের এই মাসেই পৃথিবীর ইতিহাসের বাংলাদেশের এই জঘন্যতম, নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কে স্বপরিবারে হত্যা করে গোটা বাঙালি জাতিকে কলঙ্কিত করেছিল সেনাবাহিনীর কতিপয় উচ্চবিলাসী, উচ্ছৃঙ্খল বিপথগামী সেনাসদস্য। সেদিন রাতে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ঐতিহাসিক ভবনে ঘাতকদের নির্মম বুলেটে ঝাঁঝরা করে দেয় জতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের বুক।
ঐ সময় অকুতোভয় বঙ্গবন্ধু ঘাতকের বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েও খুনিদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন ‘তোরা কী চাস? আমাকে কোথায় নিয়ে যাবি?’ বঙ্গবন্ধুকে দেখেও হাত কাঁপেনি বিশ্বাসঘাতক খুনিদের হৃদয়, গুলি চালিয়েছে নিসংস্র খুনের চাহনীতে।
১৯৭৫ সালের আগষ্ট মাসের রাতে বাঙ্গালী জাতি হারিয়ছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। এই কলঙ্কিত ও কালো রাতে ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি, তাদের হাতে একে একে প্রাণ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল, রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর সহোদর শেখ নাসের, কর্নেল জামিল।
খুনিদের বুলেটে সেদিন আরও প্রাণ হারান বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবলীগ চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, শিশু বাবু, আরিফ রিন্টু খানসহ বঙ্গবন্ধুর পরিবার পরিবারের ১৬জনসহ আত্নীয় স্বজন অনেকেই। ওই সময় কেবল প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার ছোট বোন শেখ রেহানা দেশে না থাকার কারণে।
সেনাবাহিনীর কতিপয় উচ্চবিলাসী উশৃংখল ও বিপথগামী সেনাসদস্য কতৃক স্বপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ঐ দিন সারা বিশ্বে নেমে আসে শোকের ছায়া এবং বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ স্থম্ভিত, বিস্মিত এবং গভীরভাবে শোকাভিভূত হয়েছিলেন। ঘাতকদের নির্মম, নৃশংস আচরণেের জন্য সারা বিশ্ব বাঙ্গালী জাতির উপর ঘৃণাও বর্ষন করেছিলেন। চারিদিকে ছিঃছিঃ পড়েছিল ঘৃণার বিষবাষ্প যে, বাঙ্গালী জাতি একি করলো। যে মানুষটি বাঙ্গালী জাতিকে মুক্ত ও স্বাধীন করতে গিয়ে নিজের জীবন যৌবন উৎসর্গ করেছিল, সীমাহীন কষ্ট, দুঃখ-যন্ত্রণা, জেল-জুলুম, অত্যাচার আর নির্যাতন ভোগ করেছিলেন সেই বাঙ্গালীর হাতেই তাকে নির্মমভাবে খুন হতে হলো। ইহা বিশ্ব ইতিহাসে বড়ই মর্মান্তিক।
বঙ্গবন্ধু হত্যার পর অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে নোভেল বিজয়ী পশ্চিম জার্মানীর নেতা উইলি ব্রানডিট বলেছিলেন,” মুজিবকে হত্যার পর বাঙ্গালীদের আর বিশ্বাস করা যায় না। যে বাঙ্গালী শেখ মুজিবকে হত্যা করতে পারে তারা যে কোন জঘন্য কাজই করতে পারে। ” হাঁ, সত্যিকার অর্থেই বাঙ্গালী জাতিকে চিরকাল সেই ঘৃণ্যতম কলঙ্কের চিহ্ন বয়ে বেড়াতে হবে।
ভারত বংশোদ্ভূত বৃটিশ নাগরিক ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক নীরদ সি চৌধুরী বাঙ্গালীদের বিশ্বাসঘাতক বর্ননা করে বলেছেন বাঙ্গালী জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কে হত্যার বিশ্বের মানুষের কাছে নিজেদের আত্মঘাতী চরিত্রকেই উন্মোচিত করেছেন। টাইমস্ অব লন্ডন ১৯৭৫ সালের ১৬ আগষ্ট সংখ্যায় উল্লেখ করা হয় ” সবকিছু সত্বেও বঙ্গবন্ধুকে বাঙ্গালী জাতি কতৃক সবসময় স্বরণ করা হবে। কারণ, বঙ্গবন্ধুকে ছাড়া বাঙ্গালী জাতি এবং বাংলাদেশের বাস্তব কোন অস্থিত্ব নেই। ঐ একই দিন লন্ডন থেকে প্রকাশিত ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় বলা হয়েছিল,” বাংলাদেশের লাখ লাখ লোক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জঘন্য হত্যাকান্ডকে তাদের অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করবে”।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কে হত্যার মাধ্যমে সেদিন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শত্রুদের কুট-কৌশল ও ষড়যন্ত্র এবং আক্রমনের শিকার হয়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ।
এতদসত্বেও অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো ষড়যন্ত্রকারীরা কিন্তু থেমে নেই। ১৯৭৫এর পরবর্তী সময়ে আমরা সর্বদাই একি চিত্র প্রত্যক্ষ করেছি যে, স্বাধীনতাবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীরা এই আগষ্ট মাসকে কোন না কোন অযুহাতে বেছে নিয়েছেন তাদের নানা রকমের দুরভিসন্ধিমূলক ষড়যন্ত্রমুলক অপতৎপরতা পরিচালনা ও বাস্থবায়নের জন্য; আগষ্ট মাস এলেই তাদের এই হিংস্র ও ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডকে ঢেকে রাখতেই শুরু করে দেয় নানারকমের ষড়যন্ত্রমুলক কর্মকাণ্ড।
২০০৪ সালের এই আগষ্ট মাসেই আমরা প্রত্যক্ষ করেছি সারা দেশে একযোগে মৌলবাদী ষড়যন্ত্রকারীদের কতৃক সংঘটিত সিরিজ বোমা হামলার মতো পৈশাচিক হামলার শিকার হয়েছেন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের মানুষ এবং তারা তাদের হিংস্রতম চরিত্রের সাক্ষী হয়ে রয়েছেন।
পরবর্তীতে ২০০৪ সালের ২১শে আগষ্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে এমনই আরেকটি ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা ছিল বাঙালী জাতির জন্য আরেকটি কলঙ্কময় দিন। সেদিন আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতৃত্বকে নেতৃত্ব শূন্য করাই ছিল ষড়যন্ত্রকারীদের এই জঘন্য ও পৈশাচিক গ্রেনেড হামলার মূল উদ্দ্যেশ্য। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করে দিয়ে দেশকে সাম্প্রদায়িক জঙ্গী রাষ্ট্রে পরিনত করাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। ” রাখে আল্লাহ্ মারে কে”— সেদিন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা কে নিশ্চিহ্ন ও ধ্বংস করে দিতে হামলে পরেছিল ৭১এর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রেতাত্নারা এবং ১৫ই আগষ্টের ঘাতকরা। সুপরিকল্পিত এই গ্রনেড হামলার ঘটনা ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা কে ধারাবাহিক হত্যাচেষ্টার এক চুড়ান্ত রুপ। কিন্তু সেদিন বঙ্গবন্ধু কন্যা মহান রাব্বুল আল-আমীন এর অশেষ কৃপায় প্রাণে বেঁচে গেলেও তাঁর শ্রবণেন্দ্রিয় ও চোখ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সত্যি সত্যিই ঐদিন আলৌকিকভাবে তিনি মৃত্যুর দোয়ার থেকে ফিরে আসেন। যদিও সেদিন আইভি রহমানসহ অসংখ্য নেতা-কর্মী হতাহত হয়েছিলেন এবং আহতদের মাঝে অনেকেই আজো সেই বীভৎস ক্ষত ও যন্ত্রণা শরীরে নিয়ে বয়ে বেড়াচ্ছেন।
এখানে স্পষ্টতঃ উল্লেখ করা যায়, ঘাতকচক্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করলেও তাঁর স্বপ্ন ও আদর্শের মৃত্যু ঘটাতে পারেনি।
বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা নেতৃত্বে জাতি আজ স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী এবং উন্নয়ন ও গণতন্ত্রবিরোধী চক্রের যে কোনও অপতৎপরতা-ষড়যন্ত্র ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করে দেশ আজ এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ আজ বিশ্বের কাছে উন্নয়নের রুল মডেল।
বঙ্গবন্ধু দৃঢ় বিশ্বাস করতেন, “স্বাধীন বাংলাদেশে কোনও বাঙালি তাঁর নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে না, সেজন্যই তিনি গণভবনের পরিবর্তে থাকতেন ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের নিজ বাসভবনে। যে বাড়িটি বাঙালির স্বাধিকার-স্বাধীনতা আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবে অসম্ভব প্রিয় ছিল বঙ্গবন্ধুর। এখানে থেকেই তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে দেশ গড়ার কাজে সর্বশক্তি দিয়ে আত্মনিয়োগে ব্রতী ছিলেন।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমদ বিচারের হাত থেকে খুনিচক্রদের রক্ষা করতে কুখ্যাত ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করেন। পরে জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সকে আইন হিসেবে অনুমোদন করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার কার্য্যক্রম বন্ধ করে দেন।
১৯৮১ সনে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা শত বাঁধাবিপত্তি ডিঙিয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এঁর হাতে গড়া সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ হাল ধরেন। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতাসহ শক্তিশালী নেতৃত্বের কারনে ধীরে ধীরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একটি দেশপ্রেমিক শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠনে পরনত হয় এবং দীর্ঘ গনতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে এগিয়ে চলে।
বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা’র ডায়নামিক নেতৃত্বের ফলে দীর্ঘ ২১ বছর পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়।
দীর্ঘ ২১ বছরপর আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ১৫ই আগষ্ট রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রথম শোক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এসে সে সিদ্ধান্ত বাতিল করে। তবে ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসে আবার রাষ্ট্রীয়ভাবে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।
পরবর্তীতে ২০১০ সনে জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পুনরায় সরকার গঠন করে। ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স নামে কালো আইনটি বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার কার্যক্রম শুরু করে এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০১১ সালের জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারবর্গের হত্যাকারীদের মধ্যে পাঁচ আত্মস্বীকৃত খুনির ফাঁসির দণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয়।
শেখ হাসিনা’র নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকার ৭১এর মহান মুক্তিযুদ্ধে জামাতে ইসলামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্য্য শুরু করেন।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবর রহমান এর সূযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা’র নেতৃত্বে দেশ আজ উন্নয়নের সিরি বেয়ে এগিয়ে চলেছে …… বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উন্নয়নের রুল মডেল।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আজ স্পষ্টতঃ প্রমানিত যে ” জীবিত মুজিবের চেয়ে মৃত মুজিব আরো অনেক অনেক বেশী শক্তিশালী ” .

এডভোকেট আব্দুল হান্নান রঞ্জন
সহ-সভাপতি, সাধারণ গ্রন্থাগার, নেত্রকোণা।

