সিদ্ধার্থ সিংহের ধারাবাহিক উপন্যাস’পাতাদের ঘরবাড়ি’‌ (দশম পর্ব)

যেহেতু মাকে বললেও টুম্পার কোনও কথায় ওর মা উত্তর দেন না, রিচিকে বলেন ‘যা, তোর দাদাকে খাবার দে গে যা’— তাই বেশ কিছু দিন হল টুম্পা আর ওর মাকে খাবার দেওয়ার কথা বলে না। তাই প্রতিদিনের মতো আজও অনেক রাত করে অফিস থেকে ফিরেই জামাকাপড় ছেড়ে কলতলায় হাতমুখ ধুতে যাওয়ার সময় জানালা দিয়ে বোনের উদ্দেশে টুম্পা বলল, খাবারটা বেড়ে রাখ। আমি আসছি।

খানিক বাদে টুম্পা ঘরে ঢুকে দেখল, বোন কোথায়! খাবার বেড়ে পাতের সামনে বসে আছেন তার মা। এ দৃশ্য যেন বহু দিন পরে দেখল সে। ভাবল, বোন নিশ্চয়ই পড়াশোনা করছে। ব্যস্ত আছে। তাই বুঝি ও মাকে বলেছে ভাত বাড়ার কথা। মা তাই…

খেতে বসতে গিয়ে টুম্পা দেখল, এমনিতে হাতের কাছে যা পান এটা-ওটা-সেটাই ওর মা পেতে দেন বসার জন্য। কিন্তু আজ মা পেতে দিয়েছেন মেয়ের বিয়ে হলে জামাইকে বসিয়ে খাওয়াবেন বলে বড় সাধ করে নিজের হাতে বানানো উলের কাজ করা আসন। ও সেই আসনে বসে পাতের দিকে তাকাতেই অবাক। ও যা যা খেতে ভালবাসে তার বেশ কয়েকটা পদ ভাতের ওপরে ও ধার দিয়ে সাজানো। বাকিগুলো থালার পাশে ছোট ছোট বাটি করে দেওয়া। বাদ যায়নি ওর সবচেয়ে প্রিয় বকফুল ভাজাও। প্লেট যেন উপচে পড়ছে। গন্ধ শুঁকেই মনে হচ্ছে আজ মা-ই রান্না করেছেন। এ সব ওর বোন রাঁধতে পারলেও করতে চায় না। তাতে বরং ভালই হয়েছে, মা যখন রান্না করেছেন, বিশেষ করে বকফুলটা, তা হলে তো কথাই নেই।

ও মনে করে, এই পৃথিবীর আর কেউ ওর মায়ের মতো এত সুস্বাদু করে বকফুল ভাজতে পারেন না। তাই ডাল দিয়ে ভাত মেখে মুখে তোলার আগেই একটা বকফুল টুক করে তুলে কামড় বসাল তাতে। আর মুখে নিতেই সে যেন ফিরে গেল বহু দিন আগে, তার ছেলেবেলায়।

 

অন্যান্য দিন দুপুরে তাকে খাওয়ানোর জন্য তার মাকে হন্যে হয়ে খুঁজতে হত। বারবার করে বলতে হত, ‘কী রে খাবি না? অনেক বেলা হয়ে গেল তো! এর পর আমরা কখন খাব বল তো!’ কিন্তু ওর মা যে-দিন বকফুল ভাজতেন, সে-দিন মায়ের রান্না শেষ হওয়ার আগেই ও নিজেই পিঁড়ি নিয়ে বসে যেত। বলত, মা খুব খিদে পেয়েছে। তাড়াতাড়ি খেতে দাও। ওর মা-ও বুঝতে পারতেন, ওর এই তাড়া আসলে খিদের জন্য নয়, তাঁর হাতের বকফুল ভাজা খাওয়ার জন্য। তাই ওকে তাড়াতাড়ি খাওয়ানোর জন্যই ওর মা প্রায় প্রতিদিনই, আর কারও জন্য না হোক, অন্তত টুম্পার জন্য দু’-চারটে বকফুল ভাজতেনই।

 

আজ সেই বকফুল পেয়ে একটা একটা করে তুলে টপাটপ খেতে লাগল ও। এবং শেষ বকফুলটা তুলে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, আর নেই?

ওর মা বললেন, আছে। খা না।

টুম্পা বুঝতে পারল না, যে-মা তার ওপরে নানা কারণে রেগে থাকেন, আজ সেই মা-ই তার জন্য হঠাৎ করে ভাত বাড়তে গেলেন কেন! নিশ্চয়ই কোনও খুশির খবর আছে। কিন্তু সেই খুশিটা কীসের! সে তো আজ সকাল থেকে বাড়িতেই ছিল না।

ঢাকুরিয়া, যাদবপুর, বালিগঞ্জ আর সোনারপুরের টিকিট কাউন্টারের সামনে লিফলেট লাগানোর পরে, যেহেতু সেই লিফলেটে তার আর মামার মোবাইল নম্বর দেওয়া ছিল, তাই অনেক ছাত্রই তাদের দু’জনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। যত জন যোগাযোগ করেছিল, তাদের মধ্যে শেষ পর্যন্ত ছ’জনের সঙ্গে ফাইনাল কথাবার্তা হয়ে গিয়েছে। কয়েক জন অগ্রিম টাকাও দিয়ে গিয়েছে। পাঁচ জনই কলেজের ছাত্র। একজন শুধু সোনারপুর স্টেশনের কাছে একটি বেসরকারি অফিসে কাজ করে। সদ্য ঢুকেছে। তার বাড়ি পশ্চিম মেদিনীপুরে।

আজ বিকেলেই একজন এসে গিয়েছে। কাল-পরশুর মধ্যে বাকিরা এসে যাবে। টুম্পা যে ঘরে শুত, সে ঘরটা ছাড়াও ও দিককার আরও একটা ঘর ওদের থাকার জন্য ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। কারণ, ওই ঘর দুটোর মাঝখানে যেমন দরজা আছে, তেমনই আলাদা দরজাও রয়েছে ও দিক দিয়ে বাইরে যাওয়ার। আবার এ দিককার দরজাটা আটকে দিলেই ওদের সঙ্গে আর কোনও সম্পর্ক থাকবে না। খুব ভাল ব্যবস্থা। তাই সকাল থেকেই প্রতাপের হাতে হাতে খাট, আলমারি, চেয়ার ছাড়া ও দিকের দুটো ঘরেরই যাবতীয় জিনিসপত্র এই ঘরে এনে টুম্পা গুছিয়ে রেখেছে। এমন ভাবে রেখেছে, যাতে তাদের কোনও অসুবিধে না হয়।

টুম্পা এখন অনেকটাই নিশ্চিন্ত। সে যা মাইনে পায়, তাতে নিজের সংসারে দিয়ে কাউকে কিছু দেওয়া সত্যিই খুব মুশকিল। তবু প্রত্যেক মাসেই ব্র্যান্ডেড তেল, পাউডার, শ্যাম্পু, নেলপালিশ, বিস্কুট-সহ নানা জিনিসপত্র কেনার জন্য এক থোকে না হলেও মামির হাতে প্রায়ই যে টাকাটা দিতে হয়, হিসেব করলে দেখা যাবে তার পরিমাণও খুব একটা কম নয়।

মামার কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওই সব খরচের পরেও যদি তাকে আরও টাকা দিতে হয়, তা হলে সে দেবে কী করে! যাক, এই ছেলেগুলোর কাছ থেকে সব মিলিয়ে মামা যা পাবে, আশা করি তাতে তার সংসার খুব ভাল না হলেও, মোটামুটি চলে যাবে।

ভাইয়ের চাকরি চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যে বিকল্প আয়ের একটা বন্দোবস্ত হয়েছে, এটা জেনেই কি তার মা আজ এত খুশি হয়েছেন! হতে পারে! টুম্পা মনে মনে ভাবল, মা হয়তো ভেবেছেন পুরোটাই আমার কৃতিত্ব। কিন্তু শুধু বালিগঞ্জ নয়, ঢাকুরিয়া আর যাদবপুর স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের সামনে যে রোকনই লিফলেট লাগিয়ে দিয়েছিল, আর সত্যি কথা বলতে কী, যারা ও বাড়িতে থাকার জন্য আসছে, তাদের চার জনই তো যাদবপুরের লিফলেট দেখেই এসেছে। মানে অর্ধেকেরও বেশি বাহবা কিন্তু রোকনেরই পাওয়া উচিত। তবু তার মা-ই শুধু নন, মামা-মামিরও ধারণা, এ সব তারই হাতযশ।

টুম্পার খাওয়া শেষ হতেই ওর মা বললেন, তুই রিচির ঘরে গিয়ে একটু বস। আমি তোর বিছানাটা করে দিচ্ছি।

অবাক হয়ে টুম্পা বলল, বিছানা! বিছানা করতে যাবে কেন?

— শুবি না?

— আমি তো ও বাড়িতে শোব।

টুম্পার মা বললেন, ওখানে কোথায় শুবি? লোক এসেছে না?

— না না। আজ তো মাত্র একজন এসেছে। সে তো ও দিকের ঘরে শোবে। অন্য ঘরটা তো ফাঁকা…

— বাকিরা কবে আসবে?

টুম্পা বলল, কাল-পরশু চলে আসবে।

— কী দরকার ওখানে যাওয়ার? নিজের ঘর খালি পড়ে আছে। এখানে শো।

— না না। আমি ওখানেই শোব।

টুম্পার মা বললেন, তোদের যা চালচলন! যে ছেলেটা এসেছে সে একদিনেই সব টের পেয়ে যাবে। আর তার মারফত অন্য ছেলেগুলো। তর পর সেখান থেকে মুখে মুখে গোটা দুনিয়া।

— কী টের পেয়ে যাবে?

— সেটা কি আমার মুখে শুনতে চাস?

টুম্পা রেগে গেল, আমাকে না খোঁচালে তোমার ভাল লাগে না, না?

— এতে খোঁচাখুঁচির কী আছে? সত্যি কথা বলতে গেলেই গা চিড়বিড় করে, না?

— হ্যাঁ, করে। তোমার এই কথার জন্যই আমার এখানে থাকতে ইচ্ছে করে না…

— তা করবে কেন? ওখানে তো মধু আছে।

— হ্যাঁ আছে। আমি বলছি, আছে। এ বার খুশি তো?

টুম্পার মা নিজের মনেই বিড়বিড় করতে লাগলেন, ছি ছি ছি ছিঃ… এমন ছেলে আমি পেটে ধরেছিলাম… কোথায় ভাবলাম, যাক, এত দিনে তা হলে বাঁচা গেল… বাড়ির ছেলে এ বার বাড়ি থাকবে। তা নয়, এখনও সে বলছে, ও বাড়িতে শুতে যাবে… কী পাপ যে করেছিলাম, কে জানে… আমাদের মান-সম্মান যেটুকু ছিল, এ বার বুঝি সেটুকুও ডুবিয়ে ছাড়বে…

চিৎকার করে উঠল টুম্পা, তুমি চুপ করবে? না, এক্ষুনি বেরিয়ে যাব?

— সে তো যাবিই। আমি চিৎকার করলেও যাবি, আমি চুপ করে থাকলেও যাবি। এ আর নতুন কথা কী? আমি কি আর তোকে ধরে রাখতে পারব? না, সে ক্ষমতা আমার আছে, বল?

— ধ্যাৎতেরিকা! বলেই টুম্পা নিজের ঘরে গিয়ে চোস্তা-পাঞ্জাবি পরতে লাগল। আর তখনই তার মনে হল, ও… এতক্ষণে বুঝলাম! এই জন্যই মা খুশি হয়েছিলেন, না! এত খুশি হয়েছিলেন যে, জামাইয়ের জন্য নিজের হাতে বানিয়ে রাখা উলের আসনটা পর্যন্ত আমাকে পেতে দিয়েছিলেন। বোনের কাছে চাইলেও, নিজের হাতে ভাত বেড়ে দিয়েছিলেন। তার সবচেয়ে প্রিয় যে খাবার, সেই বকফুল খুঁজে খুঁজে জোগাড় করে এনে তার জন্য ভেজেছিলেন। মা ভেবেছিলেন, মামির বাড়িতে মেসে লোক থাকতে এসেছে মানে, এ বার থেকে তাঁর ছেলে বাড়িতেই থাকবে। তাঁর চোখের সামনে থাকবে। তাঁর ছেলের নামের সঙ্গে তাঁর ভাইবউয়ের নাম জড়িয়ে আর কেউ কিছু বলতে পারবে না। এই জন্য! এই জন্য! এই জন্য! এই জন্য তার মা এত খুশি হয়েছিলেন! টুম্পা ঘর থেকে বেরোনোর আগে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

 

২০

 

অফিস থেকে বেরিয়ে টুম্পা, সমীরণ আর ওদের অফিসের রঞ্জিত হাঁটতে হাঁটতে লিন্ডসে স্ট্রিটের উল্টো দিকে মনোহর দাস তরাগের দিকে যেতে লাগল। সরাসরি সমীরণ নয়, এই রঞ্জিতই টুম্পাকে আজ বলেছিল, সমীরণদের একান্নবর্তী পরিবারের সমস্যার কথা। বলেছিল, আমরা ওর সমস্যার সমাধান করতে না পারি, বুদ্ধি তো দিতে পারি। ওর পাশে যে আমরা আছি, অন্তত একটু মানসিক শান্তি দিতে পারি।

যত দিন যাচ্ছে, ওদের পরিবারের সবাই নাকি কেমন মরিয়া হয়ে উঠছে। দু’আঙুল জায়গা পেলেও সেটা কী ভাবে কব্জা করা যায়, তার চেষ্টা করছে। কেউ কারও কথা শুনছে না। কেউ কাউকে মানছে না। কেউ কাউকে সহ্যও করতে পারছে না। ভাল কথা বলতে গেলেও খিঁচিয়ে উঠছে। বাড়ির মধ্যে কেমন যেন একটা অরাজকতার সৃষ্টি হয়েছে।

ওর বড়জেঠু বহু দিন আগে নিজে থেকেই বলেছিলেন, এর মধ্যেই একদিন সবার সামনে সিন্দুক খুলে ওদের বৃদ্ধ প্রপিতামহর রেখে যাওয়া সেই নির্দেশিকাটা বের করবেন। কিন্তু আজ এ থাকলে কাল সে থাকছে না, কাল এর সময় হলে ওর সময় হচ্ছে না। এই ভাবে এক দিন এক দিন করে পিছোতে পিছোতে তিন মাস পার হয়ে গেছে। আরও কত মাস পার হবে, কে জানে! যে জোশ নিয়ে বাড়ির সবাই ওই নির্দেশিকা দেখার জন্য টগবগ করে ফুটছিল, দেরি হওয়ার ফলে সেটা যেন ধীরে ধীরে কেমন থিতিয়ে পড়ছে। আর এটা নিয়ে কেউ কথা বলতে গেলেই এ দিচ্ছে ওর দোষ। ও দিচ্ছে তার দোষ। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। সমীরণ তো পড়েছে মহাবিপদে। কী করা যায় বল তো?

রঞ্জিতের কথা শুনে টুম্পা সঙ্গে সঙ্গে ডেকে পাঠিয়েছিল সমীরণকে। তোদের বাড়িতে কী হয়েছে রে? জিজ্ঞেস করতেই সমীরণ ইতস্তত করে এ-দিকে ও-দিকে তাকাচ্ছিল, কেউ তাদের কথা শুনছে কি না… অফিসের সবাই তো আর সমান না। কে কোনটাকে কী ভাবে নেবে… পরে হয়তো এটা নিয়েই তার পিছনে হাসাহাসি করবে! নানা কথা বলবে!

সমীরণের আচরণ দেখেই টুম্পা বলেছিল, ঠিক আছে, তা হলে এখন থাক। ছুটির পরে আমরা নাহয় কাছাকাছি কোথাও একটু বসে ব্যাপারটা শুনবখ’ন। তখনই ঠিক হয়েছিল এই মনোহর দাস তরাগে আসার কথা।

আগে এটা একটা পচা ডোবার মতো ছিল। পানাপুকুরে ভর্তি। আশপাশের লোকেরা যার যা খুশি আবর্জনা ফেলত, ডাবওয়ালারা ডাব বিক্রির পরে খালি খোলগুলো এর মধ্যেই ফেলে দিয়ে যেত। রাস্তার ভিখারি, কাগজকুড়ুনির ছেলেমেয়েরা পা টিপে টিপে খুব সন্তর্পণে তার মধ্যে নেমে যেত। তার পর আরও সাবধানে জলের নীচে আলতো করে হাত ঢুকিয়ে যে ডাবের খোলটা পেত, অন্য হাতের তালু দিয়ে ঝপ করে তার কাটা মুখটা চেপে ধরে পারে উঠে আসত। তার পর পলিপ্যাকের ভিতরে উপুড় করে ডাবের ভিতরে থাকা জল ঢেলে দিত। জলের সঙ্গে কখনও বেরিয়ে আসত ছোট্ট ছোট্ট সট্টেল, ব্ল্যাকমলি, ফাইটার মাছ। কখনও-সখনও পোকামাকড়ও।

যে সব অফিসবাবুরা তখন পাশ দিয়ে যেতেন, ওদের দেখলে উপযাচক হয়ে কেউ কেউ ধমকও দিতেন। বলতেন, এই, নোংরা জলে নামছিস কেন রে? ঘা-পাঁচড়া হবে তো… ওঠ, ওপরে ওঠ। উঠে আয়…

তখন কেউ কেউ তাঁদের সামনে উঠে এলেও তাঁরা চলে যাওয়া মাত্রই ফের নেমে পড়ত ওই জলে। রঙিন মাছের খোঁজে।

এখন আর সে সব নেই। সেই জলাশয়ের চার দিক রেলিং দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে। টলটল করছে পরিষ্কার স্বচ্ছ জল। হাজার খুঁজলেও সেখানে একটা পলিপ্যাকও পাওয়া যাবে না। জলাশয়ের মাঝখানে তিন-চার তলার সমান ফোয়ারা উঠছে। পাড়ে দাঁড়ালে হাওয়ায় ভেসে সেই ফোয়ারার ঝিরিঝিরি জলের ছাঁট গায়ে এসে লাগে। চোখেমুখে পড়ে। দারুণ লাগে। কয়েকটা প্যাডেল করা বোট-ও রাখা আছে এ-দিকে সে-দিকে। কিন্তু এগুলো কারা চালায়, কারাই বা চড়ে, চড়ার জন্য টিকিট কাটতে হয় কি না, কাটতে হলে সেই টিকিট কোথা থেকে কাটতে হয়, ওদের তিন জনের কেউই তা জানে না। অবাঞ্ছিত কেউ যাতে ভিতরে ঢুকতে না পারে, ভিতরে ঢুকলেও কেউ যাতে অসামাজিক কাজ তো নয়ই, সামান্য ঢলাঢলিও করতে না পারে, সে জন্য গেটের কাছে রয়েছে উর্দিধারী পাহারাদার।

ওরা তিন জনে ভিতরে ঢুকে একটা ফাঁকা বেঞ্চ পেয়ে তাতে গিয়ে বসল। চার দিকে এত সুন্দর পরিবেশ যে, ওদের মন ভরে গেল। কেউ তাকিয়ে রইল জলের দিকে। কেউ মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগল হাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফোয়ারার এলোমেলো ওড়াটাকে। কেউ আবার উপর দিকে মুখ তুলে চেয়ে রইল আকাশের দিকে। তিন জনই চুপচাপ। কেউ কোনও কথা বলছে না। হঠাৎ সমীরণ বলে উঠল, কী করব বুঝতে পারছি না…

কী জন্য এখানে এসেছে, সেটা বোধহয় সমীরণ ছাড়া ওরা দু’জনেই ভুলে গিয়েছিল। তাই সমীরণের গলা শুনে নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসল রঞ্জিত। টুম্পা বলল, ভেঙে পড়িস না। ভেঙে পড়ার মতো এখনও কিছু হয়নি।

সমীরণ বলল, এর পরেও এই কথা বলছিস?

— বলছি। জানবি, একটা প্রকাণ্ড বড় গাছ, যেটা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মাটির নীচে শিকড়বাকড় চালিয়েছে, যতই বন্যা হোক, প্লাবন হোক, ধস নামুক, গোড়ার মাটি আলগা হয়ে যাক, তবু সেটা পড়তেও কিন্তু যথেষ্ট সময় লাগে। মনে রাখবি, একটা ছোট ঢেউতেও ডিঙি নৌকো উল্টে যেতে পারে, কিন্তু যত বড় ঢেউই আসুক না কেন, একটা জাহাজকে খুব সহজে টলাতে পারে না। তোদের পরিবারটা হচ্ছে একটা একান্নবর্তী পরিবার। একটা জাহাজের মতো। একটা প্রকাণ্ড বটগাছের মতো…

সমীরণ বলল, সেই গাছে কিন্তু অলরেডি ঘুণ ধরতে শুরু করে দিয়েছে।

টুম্পা বলল, শুরু হয়তো হয়েছে। কিন্তু ছড়িয়ে পড়েনি। এখনও অনেক সময় আছে।

— না রে, আমার তা মনে হয় না। যে ভাবে সবাই উত্তপ্ত হয়ে আছে…

— উত্তপ্ত হলে ঠান্ডা করতে হবে।

সমীরণ বলল, কী দিয়ে?

— দ্যাখ, অনেক রকম উপায় আছে… তুই কোনটা ব্যবহার করবি, সেটা তোর ওপর নির্ভর করছে।

— আমার তো কোনও কিছুই মাথায় আসছে না। চারিদিকে শুধু অন্ধকার দেখছি…

— জানবি, অন্ধকারের মধ্যেই আলো থাকে। সেটা খুঁজে নিতে হয়।

— অত খোঁজার মতো অবস্থায় নেই রে আমি। তুই-ই বল, কী করা যায়… একটু বুদ্ধি দে।

টুম্পা জিজ্ঞেস করল, তুই কি তুকতাকে বিশ্বাস করিস?

— তুকতাকে! পাশ থেকে রঞ্জিত হঠাৎ বলে উঠল, এই, কী হচ্ছে এটা!

টুম্পা বলল, কেন? কী হয়েছে?

রঞ্জিত বলল, এখানে একটা সিরিয়াস সমস্যা নিয়ে কথা হচ্ছে। সেখানে তুকতাক, তাবিজ-মাদুলি, শিকড়বাকড়— কী হচ্ছে কী? এগুলো ছাড়। সত্যিকারের একটা সমাধানের পথ বল…

টুম্পা বলল, তোর কি মনে হয় এগুলো সব ভুলভাল, আজেবাজে জিনিস?

রঞ্জিত বলল, দ্যাখ, আমি এ সবে বিশ্বাস করি না। তবু কিছু দিন আগে আমার দাদা বলল, এখানে যে লোকটা শনি-মঙ্গলবার শিকড় নিয়ে বসে, সে আজ আসেনি। তোর অফিস তো ওই দিকে, ছুটির পর ডালহাউসি থেকে ক’টা শিকড় এনে দিতে পারবি? আমি বললাম, পারব। কী শিকড় আনতে হবে লিখে দে। দাদা লিখে দিল। ছুটির পর আমি ডালহাউসি গিয়ে দেখি, রাস্তার ওপরে বস্তা মতো কী একটা পেতে তার উপরে টাল দিয়ে কতকগুলো শিকড়বাকড় নিয়ে একজন বসে আছেন। তাঁর কাছ থেকে যখন শিকড় নিচ্ছি, তিনি বললেন, এটা হাতে হবে, না কোমরে? আমি বললাম, কোমরে। সুতোটা একটু বড় দেখে দেবেন দাদা। লোকটা ওটা বাঁধতে বাঁধতে বললেন, এটা তো আপনার নয়। আমি বললাম, হ্যাঁ, এটা আমার না। আমার দাদার। উনি বললেন, আমি একটা শিকড় দেব, আপনি বিশ্বাস করে পরবেন? যদি পরেন, তা হলে আপনি একেবারে রাজা হয়ে যাবেন… আমার অত্যন্ত বিরক্ত লাগল। শিকড়বাকড় পরে রাজা! স্টোন কিনতে বললেও, টাকা থাকলে নাহয় একটা নেওয়া যেত। না। গুণাগুণের জন্য নয়। বিপদে পড়লে যাতে সেটা বিক্রি করে সেই বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে পারি, সে জন্য। তা বলে শিকড়! আমি বললাম, আপনার কাছে যদি রাজা হওয়ার শিকড় থেকে থাকে, তা হলে আপনিই পরুন না। রাতারাতি রাজা হয়ে যাবেন। আপনাকে আর এ ভাবে ফুটপাতে বসতে হবে না…

টুম্পা বলল, শুনে উনি কী বললেন?

— বললেন, আমি তো রাজাই। ভাবুন তো, এই ডালহাউসির মতো একটা জায়গায় যেখানে আমি বসে আছি, সে যত ছোট জায়গাই হোক, তার দাম কত… প্রথমত রাস্তার ওপরে এমন জায়গা তো কেউ পাবেই না… পেলেও, তার দাম কত, একবার খোঁজ নিন। তা হলেই বুঝতে পারবেন, আমি রাজা কি না…

টুম্পা বলল, তুই কী বললি?

— কী আর বলব বল! ওই রকম একটা আধ পাগলা লোকের সঙ্গে কথা বলা যায়! বলতে গেলে আধপাগলা তো নয়, আমি পুরো পাগলাই হয়ে যেতাম। তাই দাদার শিকড়গুলো কিনেই আমি ওখান থেকে কোনও রকমে পালিয়ে এসেছিলাম।

টুম্পার দিকে তাকিয়ে সমীরণ বলল, শিকড়টিকড়ে কাজের কাজ কিছু হয়?

টুম্পা বলল, শিকড়ে হয় কি না আমি জানি না। তবে গঙ্গাসাগরের মেলার সময় বাবুঘাটের কাছে যে অস্থায়ী ছাউনি করা হয়… সেখানে তো প্রচুর সাধুটাধু আসেন, আমি একজন সাধুকে চিনি, যিনি অনেক কিছু জানেন… তন্ত্রমন্ত্র… তুকতাক… টোটকা…

সমীরণ উৎসুক হয়ে জানতে চাইল, তাতে কাজ হয়?

—অন্যদের ক্ষেত্রে হয় কি না আমি জানি না। তবে আমার ক্ষেত্রে হয়েছে।

রঞ্জিত সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, কী হয়েছে?

টুম্পা বলল, সেটা বলা যাবে না।

— আমাকেও না?

— না। বললে, সেই মন্ত্রের গুণ নষ্ট হয়ে যাবে।

সমীরণ বলল, তাই? তা হলে আমাকে একদিন তাঁর কাছে নিয়ে চল না…

— এখন কী ভাবে নিয়ে যাব? উনি আসুক।

— কবে আসবেন?

টুম্পা বলল, গঙ্গাসাগরের মেলার সময়।

— সে তো এখনও অনেক দেরি…

— সব সময় হুটোপাটি করবি না তো। মনে রাখবি, সবুরে মেওয়া ফলে। যখন যে সময়ে যেটা হওয়ার কথা, তার আগে কিছুতেই সেটা হবে না।

সমীরণ জিজ্ঞেস করল, কত খরচ পড়ে?

— যৎসামান্যই।

— কাজ হবে তো?

টুম্পা বলল, হবে। হয়তো দেখা যাবে তিনি তাঁর কমণ্ডলু থেকে একটুখানি জল কোনও পাত্র করে তোকে দিলেন। বললেন, কতটা লাগতে পারে বুঝে নিয়ে সেই মতো এটার সঙ্গে গঙ্গাজল মিশিয়ে রাত্রিবেলায় বাড়ির সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়বে, তখন পরিষ্কার জামাকাপড় পরে গোটা বাড়িতে এটা ছিটিয়ে দিবি… আবার কাগজে মুড়ে কোনও ধুনো দিয়ে বলতে পারেন, এই ধুনোটা নিয়ে যা। ধুনুচির মধ্যে নারকোলের ছোবড়া জ্বালিয়ে তার মধ্যে এই ধুনোটার গুঁড়ো দিয়ে সারা বাড়ি দেখাবি, যাতে ওই ধোঁয়া পুরো বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে… অথবা কোনও জবাফুল দিয়ে বলতে পারেন, যা, আজ রাতে স্নানটান করে যে খাটে তুই ঘুমোস, সেই খাটের পায়ার নীচে খুব ভাল করে এটা চাপা দিয়ে রাখ। টানা তিন দিন। তার পর ওটা কাছাকাছি কোনও পুকুরটুকুরে ফেলে দিস।

সমীরণ বলল, তাতে কাজ হবে?

— আলবাত হবে। হবেই। বাড়ির মধ্যে গঙ্গাজল মেশানো ওই কমণ্ডলুর জল যে পাড়াবে কিংবা ওই ধুনোর ধোঁয়া যার নাকে যাবে, হয়তো দেখবি তার পর দিনই সে আপাদমস্তক পাল্টে গেছে।

— আর খাটের পায়ার নীচের ওই জবাফুল?

টুম্পা বলল, সেটা জানি না।

— তা হলে ওটা বললি কেন?

— আসলে দেখেছি তো, লোককে জবাফুল দিয়ে তিনি ও সব বলেন, তাই বললাম…

রঞ্জিত জিজ্ঞেস করল, ওঁর কোনও ফোন নম্বর-টম্বর নেই, না?

— থাকতে পারে। তবে আমার কাছে নেই।

সমীরণ হতাশার স্বরে বলল, কিন্তু গঙ্গাসাগর মেলা মানে তো…

টুম্পা বলল, তোর তাড়া আছে দেখে মনে হচ্ছে অনেক দিন। আসলে কিন্তু খুব বেশি দিন নেই। দেখতে দেখতে এসে যাবে। এত দিন যখন সহ্য করেছিস, আর ক’টা দিন কর না… তার পরেও যদি তোর মনে হয়, না। আমাকে এক্ষুনি ওই সাধুবাবার কাছে যেতে হবে, তা হলে বলবি, আমি নাহয় একদিন উদয়নারায়ণপুরে চলে যাব।

— উদয়নায়ারণপুর!

— হ্যাঁ, হাওড়ায়। ওই উদয়নায়ারণপুরে দামোদর নদের কাছেই নাকি একটা বড় রক্ষাকালীর মন্দির আছে। ওখানেই ওঁর বাড়ি।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে সমীরণ বলল, ঠিক আছে, তুই যখন বলছিস, তা হলে তাই হোক…

ঠিক তখনই রঞ্জিত বলে উঠল, কী রে সমীরণ, দেখলি তো? তোকে বলেছিলাম না, টুম্পাকে বল। টুম্পা কোনও না কোনও একটা ব্যবস্থা ঠিকই করে দেবে…

টুম্পা বলল, এই, বার খাওয়াস না তো… চল।

তিন জনই উঠে দাঁড়াল। তার পর মনোহর দাস তরাগের গেট থেকে বেরিয়ে চায়ের দোকান থেকে চা খেয়ে সমীরণ চলে গেল মেট্রো স্টেশনের দিকে। শিয়ালদার বাস ধরার জন্য টুম্পা গিয়ে দাঁড়াল সামনের বাস স্টপেজে আর ওদের ‘আসছি’ বলে চোখের পলকে কোন দিকে যে রঞ্জিত চলে গেল, আর দেখা গেল না।

চলবে……..

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.