১ম পর্ব গ্রন্থপর্যালোচনা: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে লেখক শিবদাস ঘোষ শিবদাস ঘোষের অমার্ক্সবাদী তত্বের স্বরূপ সন্ধানে

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে – শিবদাস ঘোষ। প্রথম প্রকাশ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সাল। ২৪ এপ্রিল ও ১১ জুলাই ১৯৭১ সালের শিবদাস ঘোষের দুইটি পৃথক বক্তব্যকে একত্রিত করে এসইউসিআই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে নামে পুস্তিকা প্রকাশ করে। পুস্তিকা প্রকাশের আগে ‘ বাংলাদেশ ‘ নামক পত্রিকা ও এসইউসিআই এর মুখপত্র গণদাবী পত্রিকায় শিবদাস ঘোষের বক্তব্য ছাপা হয়েছিল। ১৫ জানুয়ারী ১৯৭২ সালের সংস্করণের ভূমিকা থেকে জানা যায় ২৪ এপ্রিল ১৯৭১ সালের শিবদাস ঘোষের বক্তব্য বাংলাদেশ কেন্দ্রীক। আর ১১ জুলাই ১৯৭১ সালের বক্তব্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে চীনের ভূমিকা নিয়ে। অল্প পরিসরে শিবদাস ঘোষ অনেক গুলি গুরুত্ব পূর্ন বিষয় মার্ক্সবাদের মোড়কে আলোচনা করেছেন।

শিবদাস ঘোষের পুস্তিকার নাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে হলেও সরাসরি বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছে কম। এই পুস্তিকার তিন ভাগের এক ভাগ ১৯৭১ সালের চীন কমিউনিস্ট পার্টি ও চীন পররাষ্ট্র নীতির খোলামেলা সাফাই গেয়েছেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে শিবদাস ঘোষের গৃহীত নীতি ইন্দিরা গান্ধী ও কংগ্রেসের বক্তব্যের বাম সংস্করণ মাত্র। শিবদাস ঘোষ – এসইউসিআই সহ ভারতের বামপন্থী দল গুলি বাংলাদেশকে ১৯৭১ সালের যুদ্ধ দিনে রাজনৈতিক ভাবে সমর্থন করেছিল। ভারতীয় বামপন্থীরা যে কারণে বাংলাদেশের আত্ম নিয়ন্ত্রণের অধিকার ও পাকিস্তান থেকে বিছিন্ন হওয়ার সংগ্রমাকে সমর্থন করেছিল। সেই কারণ গুলি ১৯৭১ সালে ও বর্তমান কালে বিদ্যমান থাকার পরেও কাশ্মীর , নাগাল্যান্ড , মিজোরামের আত্ম নিয়ন্ত্রণের অধিকার ও ভারত থেকে বিছিন্ন হওয়ার অধিকারকে প্রায় সবগুলি বামপন্থী দল সমর্থন করে না। জাতীয়তাবাদী বামপন্থার জ্বলন্ত উদহারণ এসইউসিআই সহ ভারতীয় বামপন্থী দল গুলি।

 

ধান ভানতে শিবের গীত: ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট নিধন

 

শিবদাস ঘোষ বেশ কিছু অসঙ্গতি মূলক কথা বলেছেন। যেমন ১৯৬৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট নিধন সম্পর্কে শিবদাস ঘোষ লিখছেন ” তাদের [ ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট] দ্বিতীয় ত্রুটি ছিল, তারা পার্টির শক্তি বৃদ্ধির সাথে জনসারারণের সংস্কৃতিগত এবং রুচির মান কোন স্তরে রয়েছে এবং তাদের সমাজের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ কতখানি তা বিচার করেনি এবং তাকে উন্নত করে তুলে ধরার একটা প্রতিনিয়ত প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়নি।” – (পৃষ্ঠা ২৬)

যাঁরা শিবদাস ঘোষ পড়েছেন তাঁরা জানেন উন্নত রুচি সংস্কৃতি অপ্তবাক্য হচ্ছে শিবদাস ঘোষের পোষা ময়না শব্দ গুচ্ছ । যেখানেই শিবদাস ঘোষ পথ হারা হয়েছেন এই খানেই শিবদাস ঘোষ রুচি সংস্কৃতির দোহাই দিয়েছেন। প্রথম প্রশ্ন হলো ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়া কমিউনিস্ট পার্টির ইংরেজিতে প্রকাশিত বই -পত্র ছিল না বললেই বলা চলে। ইন্দোনেশিয়া ডাচ উপনিবেশ ছিল। কিছু ডকুমেন্ট ডাচ ভাষায় থাকা অস্বাভাবিক নয়। ইন্দোনেশিয়া বহু ভাষা ও বহু জাতির দেশ। কোন ভাষায় প্রকাশিত বই পুস্তক পড়ে শিবদাস ঘোষ সিদ্ধান্ত আসলেন উন্নত রুচি সংস্কৃতি এর অভাব ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট নিধনের দ্বিতীয় কারণ ছিল । ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট নিধন নিয়ে কয়েক ডজন বই ইংরেজীতে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত বইগুলি  এই  হত্যাকাণ্ডের কাণ্ডের পিছেনে উন্নত রুচি সংস্কৃতির অভাব যে কোন ভূমিকা পালন করছেন না তা উল্লেখ করেন নাই। ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট নিধন নিয়ে যারা বই লিখেছেন তাদের সকলেই পুজিঁবাদী ব্যাবস্থার পক্ষের। এর পরেও প্রায় সব গুলি বই সিদ্ধান্তে এসেছে এই হত্যাকাণ্ডের পিছনে সিআইএ – আমেরিকা জড়িত।

 

শিবদাস ঘোষ যদি অন্তত ১৯৬৮ সালে পিকিং থেকে প্রকাশিত People of Indonesia, Unite and Fight to Overthrow the Fascist Regime পুস্তিকা টি পড়তেন তবে আরো যাই হোক পোষা ময়না তত্ব ‘ উন্নত রুচি সংস্কৃতির ‘ অভাব হিসাবে বিষয়টি উল্ল্যেখ করতেন না। এই পুস্তিকায় ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। “Statement by the Political Bureau of the Central Committee of the Indonesian Communist Party” August 17, 1966. এবং “Self-Criticism by the Political Bureau of the Central Committee of the Indonesian Communist Party”- September 1966. দুইটি গুরুত্ব পূর্ন তথ্য সূত্রকে শিবদাস ঘোষ আমলে নিলে ইন্দোনেশিয়া সম্পর্কে যা বলছেন তা বলতে পারতেন বলে মনে হয়। এই বিবৃতি গুলি সরাসরি ইংরেজিতেই লেখা ও ইন্দোনেশিয়ানা কমিউনিস্ট পার্টির আত্মগোপনকারী নির্বাসিত সদস্যদের দ্বারা লিখিত।

 

ইন্দোনেশিয়ায় রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থান ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দ্বীপপুঞ্জের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ এবং কৌশলগত সম্পদের উপর নিরংকুশ

অপ্রতিদ্বন্দ্বী নিয়ন্ত্রণ লাভের অভিযানের। অক্টোবর, ১৯৬৫ এর ইন্দোনেশিয়ার সামরিক অভ্যুত্থান ছিল সিআইএ এবং ইন্দোনেশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর মার্কিন-প্রশিক্ষিত এবং সমর্থিত কমান্ডারদের দীর্ঘ-পরিকল্পিত অপারেশনের ফলাফল। ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট নিধন সম্পর্কিত আমেরিকা ও সিআই এর অনেক তথ্য প্রকাশিত। বিবিসি সহ এই জাতীয় সংবাদ সংস্থা এই সব তথ্য প্রকাশ করেছেন। বিবিসি সহ এই জাতীয় সংবাদ সংস্থা গুলি কোনভাবেই শ্রমিক শ্রেণীর বন্ধু নয়। এরা স্বীকার করেছে এই হত্যাকাণ্ডের পিছনে আমেরিকা রয়েছে।

 

ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি শ্রেণী সমন্বয়য়ের কর্মসূচী ছিল মেনশেভিক/স্টালিনবাদী মতবাদের উপর ভিত্তি করে “দুই-পর্যায়ের বিপ্লব”  এর তত্ব। ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি  “জাতীয় বুর্জোয়াদের সাথে  যুক্তফ্রন্ট” গঠন করে “সমাজতান্ত্রিক নয়, গণতান্ত্রিক সংস্কার” করার পক্ষে ছিল। এই বিপর্যয়টি মূলে ছিল ইন্দোনেশিয়ান কমিউনিস্ট পার্টি (PKI),  সুকার্নোর পুঁজিবাদী সরকার এবং ইন্দোনেশিয়ান জাতীয়তাবাদী পার্টি (PNI)- রাজনৈতিক আঁতাত। এই তত্বের প্রয়োগের  ১৯২৫-১৯২৭  সালের দ্বিতীয় চীনা বিপ্লবের রক্তক্ষয়ী পরাজয়ের ডেকে এনেছিল।

 

ইন্দোনেশিয়ার ১৯৬৫ সালের শিক্ষা হচ্ছে ধনিক শ্রেণীর দল গুলির সাথে জোট বা ঐক্য শ্রমিক শ্রেণীর যে কোন ধরণের ঐক্য হচ্ছে অধীনতা মূলক ঐক্য। বাংলা কংগ্রেস – অজয় মুখোপাধ্যায় বা তৃণমূল কংগ্রেস – মমতা ব্যানার্জীর ঐক্য শ্রমিক শ্রেণীর জন্য কোন সুফল বয়ে আনতে পারে না। পপুলার ফ্রন্ট হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা মূলক কর্মসূচি। ইন্দোনেশিয়ার মতো বিলম্বিত পুঁজিবাদী উন্নয়নের দেশে শ্রমিক ও নিপীড়িত জনগণের মুক্তির জন্য নিরন্তন বিপ্লবের কর্মসূচি ভিত্তিক লড়াই সংগ্রামের ।. নিরন্তন বিপ্লবের কর্মসূচী হচ্ছে নয়া উপনিবেশিক / আধা-ঔপনিবেশিক দেশগুলিতে, যেখানে পুঁজিবাদী শাসকরা আধিপত্যবাদী বিশ্বশক্তির সাথে অষ্টে-পৃষ্ঠে বাধা।  শুধুমাত্র সর্বহারা শ্রেণী স্বাধীনভাবে সংঘবদ্ধ এবং নিপীড়িত জনসাধারণের নেতৃত্ব দিয়ে স্থানীয় বুর্জোয়াদের উৎখাত করতে এবং সাম্রাজ্যবাদী জোয়াল ছিন্ন করতে পারে।

 

ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট নিধনের প্রথম  কারণ হিসেবে শিবদাস ঘোষ লিখছেন ” পুঁজিবাদী বা সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র ব্যাবস্থার সাথে মিলেমিশে এবং প্রশাসন যন্ত্রকে ব্যবহার করে যারা বিপ্লব করতে যায় -তারা বিপ্লবের নামে যা করে তা হচ্ছে , তারা সমস্ত পার্টিকেই শোষণমূলক রাষ্ট্র যন্ত্রের কাছে expose ( উদ্ঘাটিত ) করে দেয়। ইন্দোনেশিয়াতে সেই কাজটি ঘটে ছিল।  -( পৃষ্ঠা ২৬) । শিবদাস ঘোষ সীমাবদ্ধতা সঠিক ভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। সীমাবদ্ধতা হচ্ছে  ‘ পুঁজিবাদী বা সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র ব্যাবস্থার সাথে মিলেমিশে ‘ রাজনীতি হিসেবে যা উল্ল্যেখ করেছেন তাই হচ্ছে পপুলার ফ্রন্ট রাজনীতি।  ১৯২৪ সালের লেনিন পরবর্তী সময়ে স্টালিনের নীতি হচ্ছে  ‘ পুঁজিবাদী বা সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র ব্যাবস্থার সাথে মিলেমিশে ‘ কাজ করা।  ঐতিহাসিক এরিক হবসবম লিখেছেন কমিন্টার্নের সপ্তম কংগ্রেসের (১৯৩৫) আগে থেকেই  সোভিয়েত ইউনিয়ন পন্থি দেশে কমিউনিস্ট  ফ্যাসিবাদকে আটকানোর প্রতাশাতে  বুর্জোয়া সরকারগুলিতে ঢুকে পড়ে বা নিজের দেশের বুর্জোয়া সরকারগুলিকে সমর্থন করতে শুরু করে। Forty Years of Popular Front Government” by Eric Hobsbawm, ১৯৭৭। এরিক হবসবম এর অপর পরিচয় হচ্ছে ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। শিবদাস ঘোষ বিষয় গুলি জানতেন । এই জানার ভিত্তিতেই RSP তে যুক্ত হয়েছিলেন  শিবদাস ঘোষ ১৯৪০ এর দশকে। শিবদাস ঘোষ স্টালিনবাদের দিকে ঝুকে পড়েন। ১৯৪৮ সালের পর থেকে শিবদাস ঘোষ – এসইউসি আই প্রথমে মস্কো ও পরবর্তীতে পিকিং এর অনুমোদন পাওয়ার প্রচেষ্টায় অপরাপর   ভারতীয় রাষ্ট্রের অপরাপর  স্তালিনবাদী  সামান্য হেরফের / রংচঙ করে  উপস্থাপন করে আসছিল।

 

মিছিলে কোমর দুলিয়ে স্লোগন: শিবদাস ঘোষের উন্নত রুচির ছবক

 

পুস্তিকার বেশ কিছু অংশ জুড়ে ভারতের অন্য বামদের প্রতক্ষ্য ও পরোক্ষ সমালোচনা করে নিজেদের মহত্ব জাহির করেছেন শিবদাস ঘোষ। ভারতের অপরাপর বামদের সমালোচনায় শিবদাস ঘোষ পথ হারিয়ে মিছিলে “কোমর দুলিয়ে ” স্লোগান দেওয়ায় উম্মা প্রকাশ করেছেন ( পৃষ্ঠা ২৭) । উন্নত সংস্কৃতি অর্জন করতে না পারার জন্য ভারতীয় অপরাপর বামপন্থী দল গুলিকে ” তথাকথিত ” গালি ছুড়ে দিয়েছেন। সচরাচর দেশে ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠী ধর্মীয় মানুষের পোশাক , হাঁটা চলা ফেরা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এই নিয়ন্ত্রণ স্থাপনের জন্য ধর্মীয় অনুশাসন পন্থীরা প্রচার প্রোপাগান্ডা থেকে শুরু করে বল প্রয়োগ করে থাকে। বাংলাদেশ – ভারত – পাকিস্তানে ধর্মীয় অনুশাসন মানতে বাধ্য করার জন্য জোর জবর দোস্তির ভুরিভুরি নজর রয়েছে। পোশাক , হাঁটাচলা ফেরা নিয়ন্ত্রণ কিংবা কে কোন ভঙ্গিতে স্লোগান দিল এই সব নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা চিন্তার স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের বহু পুরানো কৌশল।

সোজা হয়ে কিংবা শরীর বাকিয়ে স্লোগান দেওয়ার মধ্য দিয়ে বক্তব্যের কোন হেরফের হয় না। নানান কিছিমের অপ্রয়োজনীয় নিয়ম নীতি চালুর প্রচেষ্টা গুরুবাদী প্রভাব বিস্তারে চেষ্টা ছাড়া অন্য কিছু নয়। যৌবনের প্রথম দিন গুলিতে শিবদাস ঘোষ ধর্মীয় অনুশীলন ভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন অনুশীলন সমিতির মাধ্যমে রাজনীতিতে এসেছিলেন। ১৯৩০ এর দশকের শেষের দিকে অনুশীলন সমিতির জাতীয়তাবাদীদের বড় অংশ মার্ক্সবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে অতীতের ধর্মীয় অনুশীলন ভিত্তিক রাজনীতির সাথে আনুষ্ঠানিক ছেদ ঘটান। শিবদাস ঘোষ এই প্রক্রিয়ায় বিপ্লবী সমাজবাদী দল – আরএসপি হয়ে এসইউসিআই গঠন করেছিলেন। ১৯৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে শিবদাস ঘোষের বক্তব্য শুনে মনে হয় তিনি অনুশিলীন জাতীয়তাবাদীদের কিছু অনুশাসন ঘোর পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেন নাই।

শিবদাস ঘোষ এই পুস্তিকাতে নকশাল আন্দোলনকে তথাকথিত বিপ্লবী , ইত্যাদি নামে অভিহিত করেছেন। শিবদাস ঘোষ পন্থীদের কেউ বলতে পারেন এই পুস্তিকা নকশাল শব্দ ব্যাবহার করেন নাই বিধায় শিবদাস ঘোষের কথা গুলি অন্যদের সম্পর্কে হতে পারে। ১৯৬৭-১৯৭১ সালের জুন পর্যন্ত নকশাল ছাড়া অন্য সকল বামপন্থী দল যুক্তফ্রন্ট সরকারে এসইউসিআই এর সহযাত্রী ছিল। ১৯৬৭-১৯৭১ সালের শিবদাস ঘোষের রাজনীতিতে ছিল এক চিলতে মার্ক্সবাদ আর এক চিলতে বাংলা কংগ্রেস। হাল আমলে – শিবদাস ঘোষ উত্তর কালে এক চিলতে মার্ক্সবাদ আর এক চিলতে মমতা ব্যানার্জী – তৃণমূল কংগ্রেস।

 

শিবদাস ঘোষের বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাবনা প্রসঙ্গ উপলব্ধির জন্য সমসাময়িক সময়ের ভারতের রাজনীতি বিশেষ করে পশ্চিম বাংলার রাজনীতি ও ক্ষমতার দিকে দৃশ্যপটের দিকে তাকান দরকার। সংক্ষিপ্ত ভাবে ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১ সালের জুন পর্যন্ত এসইউসিআই পশ্চিমবঙ্গে অকংগ্রেসি যুক্তফ্রন্ট সরকারের অংশীদার ছিল । ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১ সাল ছিল নকশাল আন্দোলনের বিকাশের যুগ। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ক্ষমতাসীন কংগ্রেস ও পশ্চিম বাংলার যুক্তফ্রন্ট সরকার সমানতালে নকশালদের উপর দমন পীড়ন চালাচ্ছিল। অকংগ্রেসী যুক্ত ফ্রন্টের শরিক দল ছিল , বাংলা কংগ্রেস , সিপিআই , সিপিএম , আরএসপি , এসইউসিআই। যুক্তফ্রন্ট এর মুখ্যমন্ত্রী হন বাংলা কংগ্রেসের অজয় মুখোপাধ্যায়, উপ-মুখ্যমন্ত্রী সিপিআইএম দলের জ্যোতি বসু, শ্রমমন্ত্রী হন এসইউসিআই-এর সুবোধ বন্দ্যোপাধ্যায়। নকশাল দমন পীড়ন , হত্যার সিংহভাগ কাজ এই যুক্তফ্রন্টের আমলেই হয়। যুক্তফ্রন্টের অংশ হিসেবে এসইউসিআই একদিকে রাজনৈতিক দমন পীড়নের ভূমিকা রাখে। অপর দিকে শিবদাস ঘোষরা মাঠে ময়দানে নকশাল আন্দোলন দমন -পীড়নের ভাবাদর্শে তৈরির জন্য ঢোল- মাদল নিয়ে মাঠে নেমে ছিলেন।

 

১৯৬৭-১৯৭১ সাল পর্যন্ত এসইউসিআই ছিল এক চিলতে বাংলা কংগ্রেস আর এক চিলতে মার্ক্সবাদ। ২০০৯ সালে শিবদাস ঘোষ পরবর্তী এসইউসিআই এক চিলতে মমতা ব্যানার্জী – তৃনমুল কংগ্রেস আর একচিলতে মার্ক্সবাদ। প্রসঙ্গত ২০০৯ সালে পশ্চিম বাংলার নির্বাচনে এসইউসিআই তৃনমুল কংগ্রেস এর সাথে জোট বেঁধেছিল। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি লোকসভা আসনের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ১৯টি আসনে জয়লাভ করে। তৃণমূলের জোটসঙ্গী জাতীয় কংগ্রেস ৬টি আসনে ও এসইউসিআই(সি) ১ আসনে জয়লাভ করে। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস- এসইউসিআই(সি ) জোট রাজ্যের ৩৩ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের অবসানের পথ তৈরী করে । মমতা ব্যানার্জী -তৃণমূল কংগ্রেস এর সাথে বিজেপি –  হিন্দুত্ববাদীদের রাজনৈতিক অভিসারের ইতিহাস অনেক । ১৯৯৯ সালে মমতা বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট সরকারের কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী ছিলেন।

 

 

ভারতীয় বামপন্থীদের সরাসরি নাম উল্ল্যেখ করা থেকে শিবদাস ঘোষ বিরত থেকেছেন। যাঁদের সমালোচনা করছিলেন তাঁদেরকে ” তথাকথিত বিপ্লবী ” হিসেবে উল্ল্যেখ করে আক্রোশ প্রশমিত – অবদমিত করার কসরৎ করেছেন শিবদাস ঘোষ। এই আক্রোশ নকশালবাদীদের বিরুদ্ধে ছিল। কারণ ১৯৬৭- ১৯৭১ সাল জুন পর্যন্ত এসইউসিআই অন্য প্রধান বামপন্থী দল গুলির সাথে জোটবদ্ধ ভাবে রাজ্য সরকারে ক্ষমতায় ছিল।

 

নকশাল আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা  ন্যায্য সমালোচনার দাবী রাখে। নকশাল আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবী ছিল ভূমি সংস্কার। সামাজিক ন্যায়বিচার কায়েমের লক্ষ্যে যুব সমাজ এই আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েছিল। নকশাল আন্দোলনের ভূমি সংস্কার এর দাবী শিবদাস ঘোষের ভারত সাম্রাজ্যবাদী দেশ – একচেটিয়া পুঁজির দেশ এই অর্থনৈতিক তত্ত্বের গালে ছিল সামান্য চপোটাঘাত। ভুমি সংকারের মত অতি প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন না করে ভারত  কিভাবে সাম্রাজ্যবাদের উপনীত হয়ে পড়ল তা আলোচনার দাবী রাখে। শিবদাস ঘোষ এই পুস্তিকায় দাবী করছেন ভারত সাম্রাজ্যবাদী দেশ প্রমানের জন্য পর্যাপ্ত পরিসংখ্যন ( পৃষ্টা ২০) আছে। তবে এই পুস্তিকায় শিবদাস ঘোষ কোন পরিসংখ্যন যোগ করেন নাই।

 

ভারতের সীমাবদ্ধ সম্প্রসারণবাদী মনোভাব

 

ভারতের  সামাজ্যবাদী আখাঙ্খাকে যথাসম্ভব গ্রহণ যোগ্য করার জন্য শিবদাস ঘোষ বলছেন ” পশ্চিমা দেশ গুলোর imperialist design – এর ( সাম্রাজ্যবাদী অভিসন্ধি ) মত অতো ব্যাপকতা তার [ ভারত ] না থাকতে পারে , কিন্তু limited expansionist desire ( সীমাবদ্ধ সম্প্রসারণবাদী মনোভাব ) ভারতীয় একচেটে পুঁজিবাদের নেই একথা আমি স্বীকার করি না। “- ( পৃষ্ঠা ২০) । সম্প্রসারণবাদ  পররাজ্য দখল। পররাজ্য দখলের  অভিসন্ধিকে কি ভাবে সীমাবদ্ধ পরিসরে রাখা সম্ভব তা শিবদাস ঘোষের জবানীতে পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের সুন্দর বন অঞ্চলের প্রচলিত প্রবাদ বাঘ একবার নর মাংসের স্বাদ পেলে সেই বাঘকে আর ঠকিয়ে রাখা যায় না।

 

 

ভারতবর্ষ একদেশ, এক জাতি

ভারতবর্ষ একদেশ , একজাতি ( পৃষ্ঠা ৩) এর তত্ব শিবদাস ঘোষ দিয়েছেন। ভারত কখনই এক দেশ ছিল না। ভারত হিসেবে পরিচিতি অঞ্চল একাধিক দেশ ও ভিন্ন জাতি ও ভাষাভাষী মানুষের বাস। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে বিদেশী উপনিবেশিক শক্তি এই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ দখল করে ভারত নামে শাসন করেছে। এই ধারায় মোগল ও সর্বশেষ ছিল ব্রিটিশ ভারতকে একত্রিত করে শাসন করেছে। ১৭৫৭ সালে বাংলায় বসতি স্থাপনকারী সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শক্তির যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী ১০০ বছর সময় ব্যাপী ব্রিটিশ উপনিবেশিক শক্তি প্রধানত সামরিক শক্তি দিয়ে বাংলাদেশ -ভারত -পাকিস্তনের বিভিন্ন অঞ্চল দখল করে শাসন ১৯৪৭ সালের অগাস্ট পর্যন্ত শাসন করে। ব্রিটিশ উপনিবেশিক শক্তির শাসনামলে এই অঞ্চলে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ৩০০ করদ রাজ্য ছিল। ভারতবর্ষ যদি একই দেশ হত তবে সিরাজউদ্দৌলার পতনের সাথে শিবদাস ঘোষের বর্ণিত ভারতবর্ষে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শক্তির কর্তৃত্ব প্রতিষ্টিত হয়ে যেত।

 

আজকের ভারতের মধ্যে গোয়া – পর্তুগীজ উপনিবেশ, পন্ডেচেরি – ফরাসী উপনিবেশ ছিল। ১৪৯৮ সালে ভাস্কো ডা গামার ভারতে আগমনের মধ্য দিয়ে গোয়াতে পর্তুগিজ শাসনের শুরু হয়। ১৯৬১ সালের ১৮ ডিসেম্বর ৩৬ ঘণ্টার সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে ভারতে পর্তুগালের ৪৫১ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। দেশীয় রাজ্য হায়দারাবাদ দখল করতে ভারতকে সেনা প্রেরণ করে হয়েছিল। অসম যুদ্ধ হয়েছিল ১৯৪৮ সালে। ভারতীয় রাষ্ট্র শুধু হায়দারাবাদ দখল করেই ক্ষান্ত হয় নাই। এই অঞ্চলে গড়ে উঠা তেলেঙ্গা কৃষক বিদ্রোহকে দমন করেছিল। ।

১৯৭৫ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে ভারত সিকিম দখল করে নেয়। ১৯৭৫ সালের ২২ এপ্রিল ভারতীয় সংবিধানের ৩৬ সংশোধনীর মাধ্যমে সিকিম ভারতের ২২তম রাজ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। সিকিম দখলের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা কামী মানুষের মধ্যে সম্প্রসারণবাদী ভারত আতংকের সৃষ্টি হয়েছিল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্লোগান উঠেছিল ” ভুটান না, সিকিম না রক্তে রাঙা বাংলাদেশ ”

 

ভারত একদেশ এক জাতি হিন্দুবাদীদের স্লোগান। ১৯৭১ সালে India – ভারতকে শিবদাস ঘোষ ভারত বর্ষ হিসেবে এই পুস্তিকাতে ডজনখানেক বার উল্লেখ করেছেন। ১৯৭১ সালে ভারত বর্ষ ছিল না , ছিল ভারত -পাকিস্তান। আর পাকিস্থান ভেঙে বাংলাদেশে সৃষ্টির যুদ্ধ চলছিল সেই সময়। ভারত -Indiaকে ভারত বর্ষ হিসাবে হিন্দুত্ববাদীরা ব্যবহার করে থাকে। ভারত – পাকিস্থান সৃষ্টির সময়কার হানাহানি জাগিয়ে সাধারণ মানুষকে শোষণ বঞ্চনা থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরানোর সহজতম পথ ‘ভারতবর্ষ ‘এর জিকির তোলা।

 

পাঞ্জাবী মুসলমান উপজাতি

 

ভারতবর্ষ একদেশ , এক জাতি তত্বকে পরিপুষ্ট করার জন্য পাকিস্তানের পাঞ্জাবী জাতিকে ”  পাঞ্জাবী মুসলমান উপজাতি ” ( পৃষ্টা ৪) হিসাবে উল্ল্যেখ করেছেন শিবদাস ঘোষ। বাংলা ভাষায় উপজাতি শব্দ ক্ষুদ্র ও তাচ্ছিল্যের সাথে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। শিবদাস ঘোষের পুস্তিকা বাংলায় প্রকাশিত তাই অনুবাদ বা ভাষান্তরে  বক্তব্যের হেরফেরে কোন সমস্যা নেই। রাষ্ট্রীয় সীমানা পরিবর্তনের সাথে জাতির আত্ম পরিচয়ের কোন পরিবর্তন হন না। ১৯৪৭ সালের ভারত -পাকিস্থান সৃষ্টির ফলে বাঙালী ও পাঞ্জাবী জাতির যে ভৌগোলিক অবস্থানে ছিল সেই অঞ্চল গুলি ভাগ হয়ে পৃথক রাষ্ট্রের সাথে যুক্ত হওয়ার কারণে বাঙালী কিংবা  পাঞ্জাবী জাতির আত্ম কোন পরিবর্তন হয় না। বাঙালী বা পাঞ্জাবী হিন্দু -মুসলিম সকলেই বাঙালী বা পাঞ্জাবী। বাঙালী – মুসলমান উপজাতি  বা পাঞ্জাবী মুসলমান উপজাতি বা বাঙালী হিন্দু  উপজাতি নামে জাতি বা উপজাতি অতীতেও ছিল না এখন নেই। ১৯০৫ এর দিকে হিন্দু মৌলবাদীরা প্রথমে হিন্দু – মুসলিম দুই জাতি এই তত্বের  উপস্থাপন করেছিল পাঞ্জাবে। পরের বছর ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ এই তত্ব লুফে নিয়েছি। ১৯৭১ সালে পাঞ্জাবী মুসলমান উপজাতি এর তত্ব নিয়ে আসলেন লাল পতাকা হাতে শিবদাস ঘোষ !

 

Do something and do it courageously –কিছু কর এবং তা সাহসের সাথে কর

 

২৫এ মার্চের কালো রাত্রিতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ঢাকায় হত্যাযজ্ঞ চালায়। এক মাস পরে এসইউসিআই ও শিবদাস ঘোষ ২৪ সে এপ্রিল ১৯৭১ সালে এসইউসিআই এর প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর জন সভায় বলেন ” আমরা ভারত সরকাররের উপর চাপ সৃষ্টি করছি যে, এক্ষুনি কিছু করা দরকার – do something and do it courageously ( কিছু কর এবং তা সাহসের সাথে কর ) -পৃষ্টা ২০। এসইউসিআই নিজেদেরকে ভারতের একমাত্র কমিউনিস্ট বিপ্লবী দল হিসেবে দাবী করে আসছে ১৯৪৮ সাল থেকে। এসইউসিআই ১৯৫০ এর দশক থেকেই ভারতে একচেটিয়া পুঁজির প্রভাব ও ভারত কে সাম্রাজ্যবাদী দেশ হিসেবে মনে করে। শিবদাস ঘোষ ১৯৭১ সালের ভারত সম্পর্কে লিখছেন ” ভারতীয় পুঁজিবাদ পশ্চিমী পুঁজিবাদী দেশগুলোর তুলনায় অনুন্নত হলেও ইতিমধ্যেই একচেটে পুঁজিবাদের রূপান্তরিত হয়েছে ও নিজেই সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র অর্জন করেছে। ( পৃষ্ঠা ২০ ) । ১৯৭১ সালে ভারতের রাষ্ট্রীয় চরিত্র সাম্রাজ্যবাদী ছিল কিনা তা এই আলোচনার অংশ নয়। এসইউসিআই ১৯৭০ এর দশকে ভারতকে সাম্রাজ্যবাদী দেশ মনে করত। সেই আলোকেই এই আলোচনা।

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহায্যের আকুতি ১৯৭১ সালের যুদ্ধের দিন গুলিতে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ছিল। এই আকুতি হচ্ছে ডুবন্ত মানুষ খড় -কুট ধরে বাঁচার চেষ্টা। জনসাধারণের সাহায্যের আকুতি আর বিপ্লবী দলের দাবীদারদের ” do something and do it courageously” পুরোপুরি পৃথক বিষয়। শিবদাস ঘোষদের মতে ভারত সাম্রাজ্যবাদী দেশ। যুদ্ধ দিনে সাম্রাজ্যবাদী দেশকে ” কিছু কর এবং তা সাহসের সাথে কর ” দাবীতে জন সমাবেশ থেকে আহ্বানে জানানের হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে সমর্থন করা। একটি সাম্রাজ্যবাদী দেশেকে অন্যদেশে সেনা পাঠানের আকুতি। দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদী সেনা সেই দেশে ” জনগণের বন্ধু ও মুক্তি দাতার ” স্লোগান নিয়ে অগ্রসর হয়। সাম্রাজ্যবাদী সেনাদের ‘ মহৎ ‘ ইতিহাস জানার জন্য ইরাক -আফগানিস্থানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে তাকলে অনেক কিছু স্পষ্ট হয়ে যাবে।

 

শিবদাস ঘোষের ” do something and do it courageously” কে সামান্য দূরের ঘটনার সাথে তুলনা করলে বিষয়টি নৈবক্তিক ভাবে সামনে আসবে। আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদী দেশ। চীন অপর একটি সাম্রাজ্যবাদী দেশ। চীনের জাতিগত নিপীড়ন ১৯৪৯ সালের পরে শেষ হয় নাই। নতুন আঙ্গিকে এই নিপীড়ন শুরু হয়েছিল। তিব্বত ও উইঘর মুসলিমদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার , ভাষার অধিকার মাও সেতুং এর আমল থেকেই অবদমিত। অপর দিকে তিব্বত ও উইঘর মুসলিমদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ব্যাপারে সরব আমেরিকা। আমেরিকার এই সরব প্রতিবাদ হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী নীতির কলা-কৌশল, প্রতিদ্বন্দ্বীকে চাপে রাখার কৌশল। জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সাথে কোন সম্পর্ক নেই।  আমেরিকার কোন বামপন্থী দল যদি জনসভা করে দাবী তোলে ” do something and do it courageously তবে এই জাতীয় দাবীকে জাত্যাভিমানী ও নিজদেশের শাসক শ্রেণীর যুদ্ধ যাত্রাকে উৎসাহিত করা হিসেবে দেখবে বিবেকবান মানুষ।

১৯৭১ সালের যুদ্ধ দিনের ভারতীয় জনগণ প্রায় এক কোটি বাঙালী শরণাথী আশ্রয় দিয়েছিল। বাংলাদেশের চারদিকে ভারতীয় রাজ্য /এলাকা গুলি বাংলা ভাষী হওয়ায় এই কাজটি সহজ হয়েছিল। ভারত সরকার মুক্তিবাহিনীদের সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যাবস্থা করেছিল। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে ভারতীয় জনগণের নিঃশর্ত সমর্থন ও ভারতীয় সরকারের সর্মথন বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের সাথে একাকার হয়েছে আছে। ভারতীয় পক্ষের সকল সহযোগিতার পরেও কেন শিবদাস ঘোষ – এসইউসিআই ভারতীয় সরকার কে ” কিছু কর এবং তা সাহসের সাথে কর ” এর দাবী জানাচ্ছেন ? প্রায় এক কোটি প্রাণ ভয়ে পালিয়ে আসা বাঙালীকে আশ্রয় ও মুক্তিবাহিনী দের প্রশিক্ষণের বাইরে সাহসের সাথে কিছু করা ছিল বাংলাদেশে ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদী সেনা পাঠানো। শিবদাস ঘোষ লাল পতাকা হাতে নিয়ে এই দাবী করছেন এপ্রিল ১৯৭১ সালে।

 

আশ্চার্য্যজনক ভাবে একই সময়ে ভারতীয় রাষ্ট্র যন্ত্র বাংলাদেশে সেনা প্রেরণের কথা ভাবছিল। ভারতীয় সেনা সেনা বাহিনীরপূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফটট্যান্ট জেনারেল জ্যাকব Surrender at Dacca: Birth of a Nation বইয়ে লিখছেন ” At the beginning of April , Gen, S. H F J Manekshaw the army chief called on the telephone to say that the government required Eastern Command to move immediately into East Pakistan .” (P ৩৫-৩৬) “এপ্রিলের [ ১৯৭১ ] শুরুতে, সেনাপ্রধান জেনারেল এস এইচ এফ জে মানেকশ আমাকে টেলিফোন করে বললেন সরকার [ ভারত ] অবিলম্বে ইস্টার্ন কমান্ডকে [ ভারতীয় সেনা বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড ] পূর্ব পাকিস্তানে ঢুকে যাওয়ার কথা বলছে। (পৃষ্ঠা ৩৫-৩৬ , অনুবাদ নিজেস্ব ) । পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার জেনারেল জ্যাকব ভারতীয় সেনা প্রধান জেনারেল মানেকশকে এপ্রিল ১৯৭১ সালে ভারতীয় সেনাদের বাংলাদেশে ঢুকে না যওয়ার পক্ষে বেশ কিছু যুক্তি দেন। প্রধান দুটি কারণ ছিল ভারতীয় সেনা বাহিনীর প্রস্তুতির জন্য সময় প্রয়োজন। আর দ্বিতীয় কারণ ছিল আন্তর্জাতিক জনমত এই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত নয়। ( পৃষ্ঠা ৩৬) ।

 

সাম্রাজ্যবাদী সরাসরি প্রচার, নামিদামি পত্রপত্রিকায় সাম্রাজ্যবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত প্রতিবেদন – প্রবন্ধ নানান কিছিমের তথ্যবহুল লেখালেখি সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে ব্যাবহৃত হয়ে থাকে। নামিদামি পত্রপত্রিকায় সাম্রাজ্যবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গির লেখা গুলি নানা তথ্য , পরিসংখানে ভরপুর থাকে। তথ্য ও পরিসংখ্যন গত ভাবে এই লেখা গুলির গুরুত্ব আছে। এই এই সব তথ্য ও পরিসংখ্যন ব্যাবহার করে যে সিদ্ধান্ত টানা হয়ে থাকে তা প্রায়শঃই নিপীড়িত শ্রেণীর পক্ষে নয়। একটা বড় সময় তথ্য ও পরিসংখ্যন দুমড়িয়ে এমন ভাবে ব্যবহৃত হয় যা থেকে সঠিক তথ্য বের করা অতি কষ্টকর হয়ে পড়ে। এই সব প্রতিফলিত প্রতিবেদন জনমত গড়তে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। জেনারেল জ্যাকব এপ্রিল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ অঞ্চলে ভারতীয় সেনা আগ্রাসনের বিপক্ষে থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে যুদ্ধের পক্ষে জনমত না থাকার কথা বলেছিলেন এপ্রিলের প্রথম দিকে । এপ্রিলের শেষ নাগাদ শিবদাস ঘোষ – এসইউসিআই ” do something and do it courageously” এর আহব্বান কি জেনারেল জ্যাকব দের ইচ্ছেকেই পূরণ করছে না ?

 

লেখক অপু সারোয়ার

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.