অ্যাডভোকেট আনসার খান :বাংলাদেশের সংবিধানে স্পষ্টতই পার্লামেন্টারী শাসনব্যবস্থার কথা বলা আছে।কিন্তু দেশের সংবিধান পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সংবিধানে এমন কিছু বিধান সংযোজন করা হয়েছে,যা প্রকৃত পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রের চর্চা ও বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে।বরং দেশে প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক একনায়কতন্ত্র কায়েম করা হয়েছে।
সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদগুলো পর্যালোচনা করলে এটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে,সংবিধানে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে সীমাহীন কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে-যা প্রকৃত পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রের প্রয়োগের পথে প্রধান বাধা হয়ে প্রাচীরের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে।সংবিধানের অধীনেই প্রধানমন্ত্রীর একক ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতা নিশ্চিত করা হয়েছে।এর ফলে দেশে প্রকৃত পার্লামেন্টারী গণতন্ত্র চর্চা ব্যাহত হয়েছে এবং দেশে পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান”যৌথ নেতৃত্ব ও যৌথ দায়িত্বশীল সরকারব্যবস্হা”গড়ে উঠতে পারেনি সংবিধান গ্রহণ পরবর্তী প্রায় পাঁচ দশকেও।বরং এই সময়কালে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করা হয়েছে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে।ফলে তার একক এবং অপ্রতিদ্বন্ধী ক্ষমতার বিকাশ ঘটেছে-যার পরিণতিতে দেশে “প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র” প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,গণতন্ত্রের সাধারণ বৈশিষ্ট্য এবং পার্লামেন্টারী সরকার ব্যবস্হার মৌলিক উপাদানগুলো উপেক্ষা করে দেশের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর পদকে ব্যাপকভাবে ক্ষমতায়িত করার জন্য তার হাতে রাষ্ট্রীয় সকল ক্ষমতা তোলে দেওয়া হয়েছে,যা প্রকৃত পার্লামেন্টারী গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্হার মৌলিক নীতিমালার সাথে সাংঘর্ষিক।পার্লামেন্টারী শাসনের নামে দেশে “প্রধানমন্ত্রীশাসিত” বা “এক ব্যক্তির কর্তৃত্বসম্পন্ন শাসনব্যবস্থা” কায়েমের সব ব্যবস্হা পাকাপোক্ত করা হয়েছে।
সংবিধান ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৫,৭০ এবং ৭২-অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে বলেছেন যে এসব অনুচ্ছেদগুলো সংবিধানে সন্নিবেশ করার কারণে প্রধানমন্ত্রী দেশের রাষ্ট্রশাসন ব্যবস্হায় একক এবং অবিসংবাদী ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন-রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতির শাসনব্যবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টও এমন ক্ষমতা ভোগ করেন না।আবার পার্লামেন্টারী গণতান্ত্রিক শাসনের দেশ-ভারত কিংবা জাপানের প্রধানমন্ত্রীরাও সাংবিধানিকভাবে এমন অসীম ক্ষমতা পাননি।
সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হলেন সরকারের শাসন বিভাগের প্রাণ ও কেন্দ্রবিন্দু।তার নেতৃত্বে মন্ত্রীসভা গঠিত হয় এবং তার কর্তৃত্বে দেশের সকল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও কার্যাদি পরিচালিত এবং নির্বাহিত হয়ে থাকে।যেমন-সংবিধানের ৫৫(১)অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে-“প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি মন্ত্রীসভা থাকবে এবং ৫৫(২)অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে-“প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বা তার কর্তৃত্বে এই সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রযুক্ত হবে।”দেখা যায়,এই দুটি অনুচ্ছেদ বলে একজনমাত্র ব্যক্তি তথা প্রধানমন্ত্রীর হাতে রাষ্ট্রের সকল নির্বাহী ক্ষমতা তোলে দেওয়া হয়েছে-যা ভারত বা জাপানের ক্ষেত্রে দেখা যায় না।
ভারতের সংবিধানের ৫৩(১)অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশটির সকল নির্বাহী ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের ওপর অর্পণ করা হয়েছে এবং ৭৪(১)অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে-প্রেসিডেন্টকে তার কার্য সম্পাদনে সাহায্য করার ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য একটি মন্ত্রীসভা থাকবে যার শীর্ষে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী এবং প্রেসিডেন্ট তার কর্ম সম্পাদনে মন্ত্রীসভার সেই পরামর্শ অনুসারে কাজ করবেন। তবে প্রেসিডেন্ট মন্ত্রীসভাকে সেই পরামর্শ সাধারণভাবে বা অন্যভাবে পূণর্বিবেচনা করার জন্য নির্দেশ দিতে পারেন এবং সেই পূণর্বিবেচনার পর মন্ত্রীসভা যে পরামর্শ প্রদান করবে সেই পরামর্শ অনুসারেই প্রেসিডেন্ট কাজ করবেন।অন্যদিকে,জাপানের সংবিধানের ৬৫-অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের সকল নির্বাহী ক্ষমতা মন্ত্রীসভার হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে।আর যুক্তরাজ্যে কোনো লিখিত সংবিধান নেই-তবে প্রচলিত প্রথা মতে ওখানকার সকল রাষ্ট্রীয় নির্বাহী ক্ষমতা ক্যাবিনেটের ওপর ন্যস্ত।দেশটির প্রধানমন্ত্রী-“মন্ত্রীসভার সদস্যদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি”হিসেবে গণ্য হন।অর্থাৎ সমমর্যাদাসম্পন্ন মন্ত্রীগণের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর স্থান এক নাম্বারে।নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগে প্রধানমন্ত্রী এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর হাতে সকল নির্বাহী ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে-তিনি নিজের নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানে অধীনস্থদের মাধ্যমে ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন।তবে কিভাবে তিনি সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন-সেটি তার একক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।যদিও সংবিধানে বলা হয়েছে-প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রীসভা থাকবে-কিন্তু কার্যত মন্ত্রীসভার হাতে কোনো ক্ষমতা নেই।রাষ্ট্র ক্ষমতা কীভাবে প্রযুক্ত হবে সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার কোনো ক্ষমতা মন্ত্রীসভার নেই।মন্ত্রীসভার সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর আজ্ঞাবহমাত্র।অথচ সংবিধানের ৫৫(৩)অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে-“মন্ত্রীসভা যৌথভাবে পার্লামেন্টের নিকট দায়ী থাকবেন।”অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তের দায় কিন্তু মন্ত্রীসভাকে নিতে হয় এবং পার্লামেন্টে জবাবদিহি করতে হয়।এটি একটি অগণতান্ত্রিক বিষয় যে-সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন একজন,কিন্তু দায় নিতে হবে পুরো মন্ত্রীসভাকে।
যুক্তরাজ্য,ভারত এবং জাপানে রাষ্ট্র ক্ষমতা প্রয়োগে প্রধানমন্ত্রী এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।মন্ত্রীসভাকে ঘিরেই সকল নির্বাহী ক্ষমতা আবর্তিত ও সঞ্চালিত হয়ে থাকে।ওই দেশগুলোতে মন্ত্রীসভা যৌথভাবে সকল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকে বলে মন্ত্রীসভা যৌথভাবে পার্লামেন্টের নিকট দায়বদ্ধ থাকে।কিন্তু বাংলাদেশের নির্বাহী ক্ষমতা যৌথভাবে মন্ত্রীসভার ওপর অর্পণ না করে কেবলমাত্র এককভাবে প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত হওয়ায় তিনি এককভাবে নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।অথচ অদ্ভুত ব্যাপার হলো যে ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তই কিন্তু আপনাআপনি মন্ত্রীসভার সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।অর্থাৎ একজনের সিদ্ধান্তের দায় বহন করতে হয় গোটা মন্ত্রীসভার সদস্যদের এবং এই জন্য সকল মন্ত্রীকেই পার্লামেন্টে জবাবদিহি করতে হয় সাংবিধানিক কারণে।অর্থাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা একজনের,কিন্তু দায় পুরো মন্ত্রীসভার।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা একক ও নিরংকুশ করার জন্য সংবিধানে যথাসম্ভব সকল বিধি-বিধান সংযোজন করা হয়েছে এবং পক্ষান্তরে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদবীধারী রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা হ্রাস করা হয়েছে অস্বাভাবিকভাবে।যেমন-দেশের মূল সংবিধানের ৭২(১)অনুচ্ছেদ বলে পার্লামেন্টের অধিবেশন আহবান,স্থগিত ও ভঙ্গ করার ক্ষমতা ছিলো রাষ্ট্রপতির এবং তা তিনি প্রয়োগ করতেন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে।পরবর্তীতে সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রপতির ওই ক্ষমতা আরও সংকোচন করে সংশোধিত ধারায় সন্নিবেশিত করা হয়-৭২(১)অনুচ্ছেদের ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ অনুযায়ী কার্য সম্পাদন করবেন।এই সংশোধনীর দ্বারা এখানেও প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
দেশের সর্বোচ্চ আদালত,নির্বাচন কমিশন ইত্যাদি সাংবিধানিক পদগুলোতে নিয়োগের একক ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে।যদিও সংবিধানে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আইন তৈরি করার বিষয়টি বলা হয়েছে,কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা নিরংকুশ রাখার জন্য বিগত পাঁচ দশকেও আইন তৈরি করা হয়নি।ফলে রাষ্ট্রপতি এসকল পদে নিয়োগ প্রদানের সাংবিধানিক ক্ষমতাপ্রাপ্ত হলেও প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ব্যতীত তিনি ওইসব পদে নিয়োগ দিতে পারেন না।কারণ সংবিধানের ৪৮(৩)অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে,সংবিধানের ৫৬-অনুচ্ছেদের (৩)দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী এবং ৯২-(১)অনুচ্ছেদ মতে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তার দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করবেন।এভাবেই যতটা সম্ভব রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা হ্রাস করে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা বৃদ্ধি করে তাকে সাংবিধানিক একনায়ক হিসেবে অধিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে দেশের প্রধান নির্বাহী,পার্লামেন্টের নেতা,আবার একটি রাজনৈতিক দলেরও প্রধান নেতা।এতোসব পদাধিকারী থাকায় প্রধানমন্ত্রী অসীম ক্ষমতা ভোগ করেন-যা ভারত,জাপান বা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীগণের নেই।
সংবিধানে ৭০-অনুচ্ছেদ যুক্ত থাকায় নিজ দলের সংসদ সদস্যদের ওপর প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা অসীম।শুধু এই অনুচ্ছেদের কারণে সাংসদগণ প্রায় শৃঙ্খলিত,সংসদে দায়িত্ব পালনকালে সাংসদগণ তাদের দলীয় এবং সংসদীয় নেতা তথা প্রধানমন্ত্রীর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকেন।দেশের সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা আইনসভার হলেও বাস্তবে সংসদনেতা তথা প্রধানমন্ত্রীর মতামত ও সম্মতি ব্যতীত সংবিধানের সংশোধন করা অসম্ভব।
রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভ -নির্বাহী,আইন ও বিচার বিভাগের ওপর প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা সাংবিধানিকভাবে নিরংকুশ করা হয়েছে এবং সকলক্ষেত্রে,প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতা স্বীকৃত হয়েছে সাংবিধানিকভাবে।আর এইসব কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাই প্রধানমন্ত্রীকে সাংবিধানিক একনায়কে পরিণত করেছে-যেকারণে দেশে সত্যিকার পার্লামেন্টারী গণতান্ত্রিক শাসন বিকাশের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে।

