‘জয় বাংলা’ শ্লোগানের জন্মদিন: ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়

 

১৫ সেপ্টেম্বর—‘জয় বাংলা’ শ্লোগানের জন্মদিন 

১৯৬৯ সালের শরৎকালের এই দিনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের আয়োজনে একটি কর্মীসভা চলছিল। স্থানটি ছিল মধুর ক্যান্টিন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগারের ঠিক মধ্যবর্তী জায়গা—যেখানে বর্তমানে সমাজবিজ্ঞান অনুষদ ভবনটি দাঁড়িয়ে আছে।

উদ্দেশ্য ছিল শহীদ ওয়াজিউল্লাহ, বাবুল ও মোস্তফার রক্তে রঞ্জিত ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বরের মহান শিক্ষা দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায়, সুন্দর, সফল ও ব্যাপকভাবে পালনের প্রস্তুতি নেওয়া।

অনুষ্ঠানটি চলছিল স্বাভাবিক গতিতেই। ঊনসত্তরের সফল গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্রলীগ তখন তরুণ ছাত্রকর্মীদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ঠিকানা। ফলে কর্মীসভাটির আকারও হয়ে উঠেছিল বিরাট। ছাত্রনেতাদের বক্তৃতার ফাঁকে ফাঁকে চলছিল নানা শ্লোগান। সেই শ্লোগানের ধ্বনিতে কেঁপে উঠছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও তার আশপাশ।

এরই একপর্যায়ে ছাত্রলীগের সিনিয়র সংগঠক আফতাব প্রায় সবাইকে চমকে দিয়ে উচ্চারণ করলেন—“জয় বাংলা!”

আমরা জনা সাতেক কর্মী সঙ্গে সঙ্গে প্রতিধ্বনি দিলাম—“জয় বাংলা!”

এরপর আফতাব আরও কয়েকবার এই নতুন শ্লোগানটি উচ্চারণ করলেন। সভার শেষদিকে উপস্থিত সংখ্যাগরিষ্ঠ ছাত্রকর্মীও সেই শ্লোগানের প্রতিধ্বনি দিতে শুরু করলেন।

যেহেতু এটি ছিল সম্পূর্ণ নতুন একটি শ্লোগান এবং একই সময়ে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে দুটি ধারার মধ্যে মতাদর্শিক সংগ্রাম চলমান ছিল, তাই সভাস্থলেই স্বাভাবিকভাবেই কথাকাটাকাটি, এমনকি কিছুটা ধস্তাধস্তিও হয়। তবে শেষ পর্যন্ত সভাটি মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হয়।

কিন্তু সভা শেষ হলেও থামেনি নতুন এই শ্লোগানকে ঘিরে আলোচনা। ‘জয় বাংলা’কে নিয়ে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ মহলে শুরু হয় জোর তর্ক-বিতর্ক। শেষ পর্যন্ত অবশ্য জয় হয় ‘জয় বাংলার’।

সে আরেক কাহিনি, আরেক অধ্যায়।

পূর্বকথা

ঊনসত্তরের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের ফলে জাতীয় নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের উজ্জ্বল উত্থান তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। বাঙলার জনগণমন-অধিনায়ক বঙ্গবন্ধু এর পরপরই সে সময়ের পশ্চিম পাকিস্তান সফরে যান বাইশ সদস্যের এক বিরাট দল নিয়ে।

সেই সময়ে তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি আবদুর রউফ। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে ছাত্রলীগকে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেন। বিশেষ করে সিন্ধু প্রদেশের রাজধানী করাচিতে ছাত্রদের নিয়ে ছাত্রলীগের একটি কমিটিও গঠন করেন। একই সঙ্গে নির্ধারণ করে দেন কয়েকটি শ্লোগান। তার মধ্যে অন্যতম ছিল—

“সিন্ধু, মেঘনা, যমুনা—তোমার আমার ঠিকানা।”

পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থানকালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বেশ কয়েকজন পশ্চিম পাকিস্তানি নেতার সাক্ষাৎ হয়। তবে তৎকালীন সিন্ধি নেতা জি. এম. সাঈদ-এর সঙ্গে পরিচয় ও আলোচনায় তিনি বিশেষভাবে উচ্ছ্বসিত হন। অত্যন্ত স্বাধীনচেতা সিন্ধি জনগণের সে সময়ের সবচেয়ে প্রিয় শ্লোগান ছিল—“জিয়ে সিন্ধ”।

ঢাকায় ফিরে এসে ছাত্রলীগ সভাপতি আবদুর রউফ একদিন মধুর ক্যান্টিনে নেতৃস্থানীয় ছাত্রলীগ কর্মীদের সামনে তাঁর পশ্চিম পাকিস্তান সফরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছিলেন। তিনি বলছিলেন, কীভাবে পশ্চিমাঞ্চলের—বিশেষ করে বেলুচিস্তান ও সিন্ধু প্রদেশের—মানুষ একাত্ম হয়ে সংগ্রাম করছে। বিশেষ করে সিন্ধি জনগণের প্রাণের শ্লোগান “জিয়ে সিন্ধ”-এর কথা তিনি অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে তুলে ধরেন।

মধুর ক্যান্টিনের সেই আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন সূর্যসেন হলের ছাত্র ও ছাত্রলীগের সংগঠক আফতাব। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই প্রস্তাব রাখার ভঙ্গিতে বলে উঠলেন—

“রউফ ভাই, সিন্ধিরা যদি ‘জিয়ে সিন্ধ’ শ্লোগান দিতে পারে, তাইলে আমরাও ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিতে পারি।”

সেদিন থেকেই আফতাবের শুরু হয় এক নতুন অভিযান—‘জয় বাংলা’ শ্লোগানকে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের মুখ্য শ্লোগান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার অভিযান।

তারই ফলশ্রুতিতে, যেন ইতিহাস-নির্ধারিত এক মুহূর্তে, আফতাবের কণ্ঠেই সর্বপ্রথম উচ্চারিত হয় “জয় বাংলা” শ্লোগান। দিনটি ছিল ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯। স্থান—ইতিহাসখ্যাত মধুর ক্যান্টিন ও বিশ্ববিদ্যালয় পাঠাগারের মাঝখানের সেই প্রাঙ্গণ, যেখানে বর্তমানে দাঁড়িয়ে আছে সমাজবিজ্ঞান অনুষদ ভবন।

তাই প্রকৃতপ্রস্তাবে, ছাত্রলীগ নেতা আফতাবই ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানের উদ্গাতা।

যারা ‘জয় বাংলা’কে মানুষের কণ্ঠে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন

আজ এই মহতী দিনে মনে পড়ে যায় তাঁদের কথা, যাঁরা সংগ্রাম, যুদ্ধ ও বিজয়ের এই মহাকাব্যিক শ্লোগানকে ছাত্র-জনতার মাঝে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তাঁদের নিরলস সৃজনশীল মেধা ও শ্রম নিয়োজিত করেছিলেন।

মনে পড়ে শহীদ স্বপন চৌধুরী, শহীদ চিশতি হেলালুর রহমান, আ ফ ম মাহবুবুল হক, শহীদ নজরুল, প্রকৌশলী ইউসুফ সালাউদ্দীন, গোলাম ফারুক, একরামসহ অগণিত সহযোদ্ধার কথা।

গত শতাব্দীর সত্তর-একাত্তরে যে একটি শ্লোগানে গোটা বাংলা উদ্বেল হয়ে উঠেছিল, যে শ্লোগান বাঙালির সংগ্রাম, মুক্তি, সাহস ও বিজয়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছিল—সেই অবিনাশী “জয় বাংলা” শ্লোগানের জন্মদিনে আজ তোমাকে অভিবাদন, বাংলাদেশ।

লেখক: রায়হান ফিরদাউস
স্বাধীনতার ইশতেহার প্রণেতা ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের অন্যতম সংগঠক 

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.