অ্যাডভোকেট আনসার খান :রাশিয়া কী ইউক্রেনে সামরিক হামলা করবে এবং যদি সত্যি সত্যিই ইউক্রেনে হামলা করে তাহলে ইউরোপসহ বিশ্বব্যাপী এর প্রভাব কেমন হতে পারে এবং যদি এমনটি হয় তাহলে এখান থেকেই কী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত হওয়ার আশংকা রয়েছে তা-নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে গোটা বিশ্বপরিমন্ডলে।
“দেশ দুটির দ্বন্দ্ব-সংঘাত”কে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা পশ্চিমা শক্তি ও রাশিয়ার মধ্যে নতুন করে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্ধিতার অংশ হিসেবে দেখছেন এবং ওই শত্রুতামূলক প্রতিদ্বন্ধিতা সামনের সময়গুলোতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।এমনকি ওই বৈরিতামূলক প্রতিদ্বন্ধিতা শেষ পর্যন্ত বৃহৎ যুদ্ধের দিকে ধাবিত হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
ইতোমধ্যে রাশিয়া তার নিকট প্রতিবেশী দেশ ইউক্রেন সীমান্তে প্রায় এক লাখ সেনা জড়ো করেছে এবং সেনাবাহিনীর বড়ধরণের মোতায়েনের পটভূমিতে বলা যায় যে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে বিবাদ ও সংঘাতের আশংকা প্রতিদিন তীক্ষ্ণ থেকে তীক্ষ্ণতর হচ্ছে এবং মস্কো তার নিকট প্রতিবেশীকে বড় আকারের আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়েছে বলে আশংকা তৈরি হয়েছে-যদিও ক্রেমলিন এটি অস্বীকার করেছে।মস্কো অস্বীকার করলেও ওয়াশিংটন বিশ্বাস করে যে রাশিয়া আগামী বছরের শুরুতে ইউক্রেনে হামলা পরিচালনার বিষয়টি বিবেচনা করছে।মার্কিন গোয়েন্দারা অনুমান করছে যে মস্কো লক্ষাধিক সৈন্য এবং ভারী অস্ত্রশস্ত্র মোতায়েন করেছে-যা ইউক্রেনের ওপর দ্রুত বড় আকারের বহুমুখী হামলার সম্ভাব্যতাকে সমর্থন করে।এদিকে মস্কোকে একটি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্র।পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিনকেন ঘোষণা করেছেন-মস্কো যদি” সংঘাতের পথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়,তাহলে পরিণতি হবে গুরুতর।” ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি দৃঢ় সমর্থন ও অঙ্গীকারের প্রতি জোর দিয়েছেন মি: ব্লিনকেন।
রাশিয়া এবং ইউক্রেন-উভয়েই সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের দুটি রাজ্য ছিলো এবং গত শতকের নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে রাশিয়া ও ইউক্রেন পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলো।প্রাক্তন সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র হিসেবে উভয় দেশের মধ্যে গভীর রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক,ভাষাগত এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পারিবারিক বন্ধন রয়েছে।তাসত্ত্বেও দেশ দুটির মধ্যে দ্বন্দ্ব একেবারে গভীরে প্রোথিত এবং ইউক্রেনের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়।কেননা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ইউক্রেনের আত্মপ্রকাশকে ঠেকিয়ে রাখতে রাশিয়া বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো।কারণ রাশিয়া ইউক্রেনকে তার অংশ হিসেবে দেখে।তবে এর স্বাধীনতা ঠেকিয়ে রাখতে না পারলেও তার সার্বভৌমত্ব সীমিত করার জন্য চেষ্টা করেছিলো রাশিয়া।মস্কো এখনো তার হারানো ভূখণ্ড ইউক্রেন পুনরুদ্ধার করতে আগ্রহী বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
ইউক্রেনের স্বাধীনতা ঠেকিয়ে রাখতে না পারলেও ইউক্রেন যাতে রুশ বিরোধী না হয়ে ওঠে এবং ইউরোপ,ন্যাটো,যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা বিশ্বের সাথে আরও ঘনিষ্ট সম্পর্কে জড়িয়ে না পরে সেজন্য প্রথম থেকেই রাশিয়া বাধা দিয়ে আসতে থাকে।ন্যাটো বা ইইউ যাতে পূর্বমূখী না হয় এবং ইউক্রেন যাতে ন্যাটোসহ পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর সদস্য পদ গ্রহণ থেকে বিরত থাকে তার জন্য মস্কো সচেষ্ট ছিলো।এতোসব বাধা স্বত্বেও ইউক্রেন ন্যাটোর পর্যবেক্ষক সদস্য হয়েছে এবং দেশটি এখন ন্যাটোর সদস্য পদের জন্য প্রার্থী-বলেছেন ন্যাটো মহাসচিব জেনস স্টলটেনবার্গ।প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন স্পষ্ট করে বলেছেন তিনি কখনো ইউক্রেনকে “রুশ বিরোধী” হতে দেবেন না এবং ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্য পদ দেবার ন্যাটোর অভিপ্রায়কে রাশিয়া স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ন্যাটো একটি “রেডলাইন”অতিক্রম করেছে।পুতিন পশ্চিমাদের সতর্ক করেছিলেন যে ইউক্রেনকে জোটে টানার পদক্ষেপ”রাশিয়ার প্রতি শত্রুতামূলক আচরণ” হিসেবে বিবেচনা করা হবে।মস্কো ইউক্রেনে পশ্চিমা প্রভাব বিস্তারের বিরুদ্ধে পিছু হটবে না বলে সাফ জানিয়ে দেন পুতিন।কারণ এটি তার জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য বলে দাবি করে মস্কো।
অতি সম্প্রতি মি:পুতিন স্পষ্ট করে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তির উদ্দেশ্যে বলে দিয়েছেন যে রাশিয়া “আইনি গ্যারান্টি” দাবি করে যে ইউক্রেন ন্যাটো জোটে যোগদান করবে না।ইউক্রেনের জন্য জোটনিরপেক্ষ মর্যাদা ও পূনরায় অস্ত্র ও ন্যাটো সৈন্যদের ইউক্রেনে উপস্থিতি সীমাবদ্ধের বিষয়ে নিরাপত্তা গ্যারান্টি দিতে হবে পশ্চিমা বিশ্বকে।রাশিয়ান আন্তর্জাতিক বিষয়ক কাউন্সিলের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর ইভান টিমোফিভ বলেছেন যে ইউক্রেনে ন্যাটোর সৈন্যরা সামরিক ভারসাম্য ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করবে।”যদি এটি ইউক্রেনও হয়,তাহলে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাব্য থিয়েটার অনেক বড় হয়ে যাবে”-বলেন মি:টিমোফিভ।”সামনের লাইন যত দীর্ঘ হবে, আক্রমণ কোথা থেকে আসবে তা তত কম পরিষ্কার হবে”-যোগ করেন তিনি।
পুতিনের রাশিয়াকে একটি পূনর্গঠনবাদী শক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন বিশ্লেষকগণ যা তার পূর্বের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি পুনরুদ্ধার করতে আগ্রহী।”উত্তর ইউরেশিয়ায় রাশিয়াকে একটি মহান শক্তির মর্যাদায় পুনরুদ্ধার করা সর্বদা পুতিনের লক্ষ্য ছিলো এবং শেষ লক্ষ্য ছিলো সোভিয়েত ইউনিয়নকে নয়,বরং রাশিয়াকে আবার মহান করা”- ভার্জিনিয়ার আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ক প্রফেসার জেরার্ড টোল তার বই “নিয়ার অ্যাব্রোড”এ এই মন্তব্য করেছেন।রাশিয়া ইউক্রেনে এবং পুরো সোভিয়েত ইউনিয়নজুড়ে তার রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলো এবং পশ্চিমা বিশেষজ্ঞদের মতে ক্রিমিয়া দখলের মধ্যদিয়ে পুতিন ওই লক্ষ্য অর্জনের পথে পা বাড়িয়েছেন।
২০১৪-সালে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যেকার বৈরিতা সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়-যখন রাশিয়ান সশস্ত্র বাহিনী সামরিক অভিযান চালিয়ে ইউক্রেনের একটি ভূখণ্ড “ক্রিমিয়া” দখল করে রাশিয়ার ভূখণ্ডের সঙ্গে একীভূত করে নেয়।উল্লেখ্য যে সাবেক সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ ইউক্রেনীয়ান ও রাশিয়ান জনগণের মধ্যে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক শক্তিশালী করার জন্য ১৯৫৪ সালে ক্রিমিয়াকে রাশিয়া থেকে ইউক্রেনের নিকট স্থানান্তর করেছিলেন।ওখানকার সেভাস্তোপল শহরটি রাশিয়ার ব্ল্যাক সি ফ্লিটের হোম পোর্ট,ওই অঞ্চলের প্রভাবশালী সামুদ্রিক শক্তি।তাই নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে দাবী করে ক্রিমিয়াকে দখল করে রাশিয়া কৃষ্ণসাগরে একটি গুরুত্বপূর্ণ পা রাখার নিয়ন্ত্রণ শক্ত করেছে যা রাশিয়ার কৌশলগত স্বার্থে অতীব গুরুত্বপূর্ণ।সেখানে আরও একটি বৃহত্তর এবং আরও পরিশীলিত সামরিক উপস্থিতিসহ রাশিয়া ভূমধ্যসাগর,মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার গভীরে শক্তি প্রজেক্ট করতে সক্ষম হবে-যেখানে এটির ঐতিহ্যগতভাবে সীমিত প্রভাব ছিলো।ক্রিমিয়া দখলের পাশাপাশি মস্কো ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বের ডনবাস অঞ্চলে ইউক্রেন সরকার বিরোধী সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপকে সশস্ত্র মদদ দেওয়া শুরু করে।ডনবাসে রাশিয়ার কৌশলগত লাভ আরও ভঙ্গুর।বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন করায় অন্তত অস্হায়ী ভাবে ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়িয়েছে।তবে ওই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত অনিশ্চিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ক্রিমিয়া দখলের পর থেকে ইউক্রেন নিজেকে ক্রমাগত হুমকির মধ্যে বলে মনে করে।এর দরুন উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে গভীর দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে এবং তখন থেকেই দেশ দুটি শত্রুতামূলক অবস্থানে চলে গেছে।বিশ্লেষকদের মতে রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসন ও ক্রিমিয়া দখলে নেবার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র,ন্যাটো ও পশ্চিমা বিশ্বের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক দ্বন্দ্বমূলক অবস্থায় পৌঁছেছে।বিশেষকরে শীতল যুদ্ধ পরবর্তী ইউরোপে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সংকটের সূত্রপাত হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকগণ
বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এটি বলা যায় যে সংকট আরও গভীর এবং গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে।শান্তির জন্য রুশ,যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলো অব্যাহত চেষ্টা করে যাচ্ছে।তবে শান্তিপূর্ণ সমাধান এখনও অনিশ্চিত বলেই মনে করা হচ্ছে।কারণ ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তা বিবেচনায় রাশিয়া তার অবস্থান থেকে পিছু হটবে বলে মনে হয় না।তবে যুদ্ধের আশংকা এখনও অনেক দূরে।
লেখক:আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

