বাড়ি থেকে বেরোতেই টুম্পা দেখল, সামনের পুকুরপাড়ে কয়েক জন লোক একটা জটলা পাকিয়ে কী যেন দেখছে। সেই জটলায় যেমন বয়স্ক লোকেরা আছেন। আছে কচিকাঁচা ছেলেপুলেরাও। টুম্পার মনে হল, তা হলে কি মিহিরবাবু আবার দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে রাস্তায় পড়ে গেছেন! এর আগেও বারকতক মিহিরবাবুর নাকের কাছে টুম্পা তার পায়ের চামড়ার চটি ধরায় তাঁর খিঁচুনি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মৃগী রোগের ক্ষেত্রে হাতের কাছে চটজলদি মোক্ষম ওষুধ বলতে এই একটাই— চামড়ার চটি।
তার পায়ে তো চামড়ার চটি আছে। বয়স্ক মানুষ হলেও কিছু করার নেই। সুস্থ করার জন্য এটুকু করতেই হয়। পাপ হলে হবে। কী আর করা যাবে! অবশ্য চামড়ার চটি নাকের কাছে ধরলেই যে তিনি সঙ্গে সঙ্গে সুস্থ হয়ে যাবেন, তা কিন্তু নয়। অনেক সময় খিঁচুনি থেমে গেলেও, দাঁতে দাঁত লেগে থাকে। তখন চামচ বা ওই জাতীয় কিছু দিয়ে দু’পাটি দাঁতের মধ্যে ঢুকিয়ে সেটা ছাড়াতে হয়। এ ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে না। আজও নিশ্চয়ই তা-ই হয়েছে।
এই ভেবে টুম্পা যখন বড় বড় পা ফেলে ওই জটলার কাছে যাচ্ছিল, তখন সেই জটলার একটু আগেই ভিড়ের ফাঁকফোকর থেকে টুম্পা দেখতে পেল, মিহিরবাবু নন। দুটো বড় বড় সাপ একটা আরেকটাকে পেঁচিয়ে ধরেছে। মাঝে মাঝে ফণা তুলে তেড়ে গিয়ে মুখোমুখি হচ্ছে। ও বুঝতে পারল শঙ্খ লেগেছে।
এই অঞ্চলটা এক সময় প্রায় জঙ্গলই ছিল। সে রকম ভয়ানক কোনও জন্তুজানোয়ার না থাকলেও খুব সাপ ছিল। চারিদিকে একেবারে কিলবিল করত। শুধু ঢোঁড়া, দাঁড়াশ বা বড় বড় হেলে নয়, বিষধর সাপও ছিল প্রচুর। সেই জঙ্গল কেটে মানুষ যখন বসত গড়তে শুরু করল, সাপেরাও মানুষের ভয়ে সরে যেতে লাগল আরও দূরে। তার পরেও যে ক’টা সাপ লোকের সামনে পড়ত, লোকে দেখলেই বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলত। তার পর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিত।
কিন্তু শ্রাবণ মাস পড়লেই সাপের উৎপাত হঠাৎ করে খুব বেড়ে যেত। কেবল রাস্তাঘাটে নয়, লোকের বাড়িতেও, এমনকী একেবারে ঘরের ভিতরেও ঢুকে যেত। বয়স্ক লোকেরা বলত, ওরা নাকি ইঁদুর খাওয়ার জন্য ঘরে ঢোকে।
কিন্তু শুধুই কি ইঁদুর খাওয়ার জন্য! তা হলে গরমকালে রাত্রিবেলায় যারা দাওয়ায় বিছানা করে শোয়, তাদের দংশন করে কেন? মশারির তলা দিয়ে ঢুকে পায়ের কাছে শুয়ে থাকে কেন! একটু নড়লেই ছোবল কষিয়ে দেয় কেন? কোনও কোনও সাপ তো এমন নিঁখুত ভাবে কাটে যে, দাঁত ফোটানোর দাগও খুঁজে পাওয়া যায় না। তেমন কোনও যন্ত্রণাও টের পাওয়া যায় না। কিন্তু তার বিষ এত মারাত্মক যে, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার অনেক আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সেই লোক।
এই সাপেদের উৎপাত বন্ধ করার জন্যই শুরু হয়েছিল মনসা পুজো। লোকেরা মনে করে, এই মনসাই হল সাপেদের দেবী। তাঁকে তুষ্ট করতে পারলেই সাপের কামড়ের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। তাই বাড়ি বাড়ি শুরু হয়েছিল মনসাপুজো। এখনও লক্ষ্মী, সরস্বতী, দুর্গা, কালী, রাধা-কৃষ্ণের ছবির পাশেই ঠাকুরের আসনে অতি যত্ন করে রাখা হয় মা মনসার ছবিও। বছরে অন্তত একবার মহা ধুমধাম করে রয়ানি দিয়ে পুজো হয়। রয়ানি মানে মা মনসার পালাগান।
শিবভক্ত চাঁদ সওদাগর কিছুতেই মা মনসার পুজো দেবেন না বলে পণ করেছিলেন। তাই মা মনসা রুষ্ট হয়ে এক-এক করে তাঁর ছ-ছ’টা ছেলেকেই পৃথিবী থেকে তুলে নিয়েছিলেন। তাই ছোট ছেলে লখিন্দরকে বিয়ে দেওয়ার সময় মনসার হাত থেকে ছেলেকে বাঁচানোর জন্য বিশ্বকর্মাকে দিয়ে একটা লোহার বাসরঘর বানিয়েছিলেন চাঁদ সওদাগর। তবু শেষ রক্ষা হয়নি। বাসরঘর তৈরি হওয়ার আগেই বিশ্বকর্মার ছেলেকে বোবা-কালা বানিয়ে বিশ্বকর্মাকে দিয়ে সেই লোহার বাসরঘরে একটি ছিদ্র বানাতে বাধ্য করেছিলেন। এবং তাঁরই সবচেয়ে প্রিয় বাহন কালনাগিনী সাপকে সেই ছিদ্র দিয়ে পাঠিয়ে লখিন্দরকে দংশন করিয়েছিলেন।
বাসর রাতে স্বামীকে খুইয়ে সেই স্বামীর মৃতদেহ কলার ভেলায় নিয়ে নদীতে ভেসে পড়েছিলেন বেহুলা। তার পর নানান কাণ্ডের পরে স্বামীকে জীবিত করে ফিরে এসেছিলেন চম্পক নগরে। এবং শ্বশুরমশাই, মানে চাঁদ সওদাগরকে বলেছিলেন, আমি মা মনসাকে কথা দিয়ে এসেছি, আপনি তাঁকে পুজো দেবেন।
ফলে চাঁদ সওদাগর বাধ্য হয়ে পুজো দিয়েছিলেন। তবে, যেহেতু ডান হাতে তিনি শিবের পুজো করতেন, তাই সে হাতে নয়, শেষ পর্যন্ত বাঁ হাত দিয়ে পেছন ফিরে মা মনসাকে তিনি ফুল ছুড়ে দিয়েছিলেন। এবং সঙ্গে সঙ্গে ফেরত পেয়েছিলেন শুধু লখিন্দরকেই নয়, আগের ছ’-ছ’টি ছেলেকেও। পেয়েছিলেন মা মনসার রোষে ডুবে যাওয়া সাত-সাতটি পশরা বোঝাই জাহাজও। ওই ঘটনার পরেই মর্তে প্রবর্তন হয়েছিল মা মনসার পুজো।
মা মনসা তুষ্ট হলে আর ভয় নেই। তাই আরও অনেক জায়গার মতো এখানেও শুরু হয়েছিল মা মনসার পুজো। কিন্তু পুজো করলেই যে সাপেরা মুখে কুলুপ এঁটে থাকবে, এর কোনও মানে নেই। এই তো কয়েক বছর আগেই জ্যান্ত একটা সাপ নিয়ে পালাগান করতে এসে সেই সাপের ছোবলেই ইহলীলা সাঙ্গ হয়েছিল বেহুলার অভিনয় করতে আসা ক্যানিংয়ের এক মহিলার।
না। তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়নি। এখানকার লোকদের ঝাড়ফুঁকে এতই বিশ্বাস যে, ডাক্তার নয়, পাশের গ্রাম থেকে আগাম টাকা দিয়ে গুনিন ডেকে নিয়ে এসেছিল। সে অনেকক্ষণ নানা রকম কেরামতি করেছিল। লোকেরা ভেবেছিল, তার তন্ত্রমন্ত্রে দংশন করা সাপ এখানে এসে ওই মহিলার শরীরে ঢালা তার সবটুকু বিষ আবার শুষে নিয়ে তাকে সুস্থ করে দেবে।
কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও সেই গুনিন কাজের কাজ কিচ্ছু করতে পারেনি। ওই মহিলা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল। তখন সেই দেহ ক্যানিংয়ে নিয়ে গিয়ে কলার ভেলায় করে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল মাতলা নদীতে।
এটা শুনে টুম্পা বলেছিল, গুনিন না ডেকে ওই মহিলাকে যদি স্থানীয় কোনও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হত, আমার বিশ্বাস, তিনি নিশ্চয়ই বেঁচে যেতেন। কিন্তু তার কথায় কেউই যে খুব একটা কর্ণপাত করেনি, তা বোঝা গিয়েছিল তার পরেও সাপে কাটা লোককে গুনিনের কাছে নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় দেখেই।
টুম্পা যখন জটলার একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল, দেখল, ও-দিক থেকে এক মাঝারি বয়সের ভদ্রমহিলা একেবারে ছুটতে ছুটতে আসছেন। তাঁর হাতে একটা আনকোড়া নতুন শাড়ি। ওটা দেখেই টুম্পা বুঝতে পারল, তিনি কেন ও-ভাবে ছুটে আসছেন। এখানকার অনেকেই মনে করে, সাপের যখন শঙ্খ লাগে তখন যদি তাদের গায়ে নতুন বস্ত্র ছুড়ে ফেলা যায়, তা হলে সেই বস্ত্র যাণর কাছে থাকবে, তিনিই রাতারাতি রাজা হয়ে যাবেন।
টুম্পা তাঁদের কিছুতেই বোঝাতে পারে না, তাই যদি হত, তা হলে পৃথিবীর সমস্ত লোকই সব কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে নতুন একটা শাড়ি বা ধুতি নিয়ে কখন সাপের শঙ্খ লাগবে, তার জন্য বনবাদাড়ে গিয়ে, দরকার হলে সারা জীবন ধরে অপেক্ষা করত। কারণ, যতই পড়াশোনা করো, যতই চাকরিবাকরি করো, যতই ব্যবসাবাণিজ্য করো, যতই পরিশ্রম করো, এ জীবনে কখনও কেউই রাতারাতি রাজা হতে পারবে না। যদি ওতে হত, তা হলে সবাই তা-ই করত। আর খোঁজ নিয়ে একবার দ্যাখো তো, যারা রাজা হয়েছে তারা কেউ সাপের শঙ্খ লাগার সময় নতুন কাপড় ফেলে সেই কাপড় নিজের হেফাজতে রেখে রাজা হয়েছে কি না। যত্তসব বাজে চিন্তাভাবনা।
ভদ্রমহিলাকে ছুটে এসে শাড়ির ভাঁজ খুলতে দেখেই রে রে করে উঠল টুম্পা। টুম্পা জানে, এ সময় সাপ দুটিকে বিরক্ত করা মানেই কেলেঙ্কারি কাণ্ড। ওদের তখন বিরক্ত করলে ওরা মরিয়া হয়ে ওঠে। যে কোনও সময় যে কোনও দিকে ছুটে গিয়ে যাকে সামনে পাবে, তাকেই ছোবল মারতে পারে।
কিন্তু কে শোনে কার কথা! ও দিক থেকে ভদ্রমহিলা সাপ দুটির ওপরে শাড়িটা ছুড়ে দিতেই সাপ দুটো ছিটকে দু’দিকে চলে গেল। যে সব বাচ্চা ভিড় করে শঙ্খ লাগা দেখছিল, বড়রা যাদের বারবার করে বলছিল, এই, এখানে কী দেখছিস রে, বাড়ি যা, না গেলে তোর বাবাকে বলে দেব— তবুও যারা একচুলও সরছিল না— সেই সব বাচ্চা তো বটেই, ব়ড়রাও পিছন ফিরে যে যে দিকে পারল পড়ি কি মড়ি করে ছুট লাগাল। শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল টুম্পা।
এ-দিক ও-দিক থেকে সবাই চেঁচাতে লাগল, ও টুম্পাদা সাপ সাপ সাপ, সরে যাও সরে যাও! তোমার দিকে সাপ যাচ্ছে। সরে যাও। কিন্তু টুম্পা যে ভাবে দাঁড়িয়ে ছিল ঠিক সে ভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। সাপটা তিরবেগে ওর একদম পায়ের কাছে এসে এক মুহূর্ত থমকে চোখের নিমেষে ফণা তুলে দাঁড়াল। এই ছোবল মারল বলে… তখনও সবাই চেঁচিয়ে যাচ্ছে— সরো সরো সরো…
কয়েক সেকেন্ড মাত্র। সাপটা ফণা নামিয়ে যত দ্রুত এসেছিল ঠিক ততটাই ধীর গতিতে হেলতে-দুলতে হেলতে-দুলতে বর্ষার জল যাওয়ার জন্য কাটা বড় নালাটার মধ্যে নেমে গেল। তাকে আর দেখা গেল না। চোখে না দেখলেও কারও কারও মনে হল, সাপটা নিশ্চয়ই ওর পায়ে ছোবল মেরেছে, না হলে সাপটা ও ভাবে যাচ্ছে কেন! একমাত্র বিষ ঢাললেই তো সাপেরা এ ভাবে নেতিয়ে পড়ে! আর যারা নিজের চোখকে বিশ্বাস করে, তারা বলল, যাক বাবা, টুম্পা আজ বড় বাঁচা বেঁচে গেছে। ছেলেটার কপাল আছে বলতে হবে…
সবাই যখন এ সব বলাবলি করছে, টুম্পার মনে হল, এটা কোনও কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটা আসলে সেই মন্ত্রের ফল। সেই ওঁ ঝাং ঝাং ঝাং হাং হাং হাং হেং হেং… যে মন্ত্র পাঁচশো বার জপ করলেই কেবল মানুষ নয়, অসুর, দেবতা, রাক্ষস, স্থাবর, জঙ্গম, যক্ষ এবং নাগ—সবাই, সবাই বশীভূত হয়ে যায়। এর আগে মামি হয়েছে। মামা হয়েছে। নাগ, মানে সাপও যে এখন তার বশীভূত, এটা তার কাছে আজ জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। টুম্পা চোখ বন্ধ করে একবার সেই সাধুবাবাকে মনে মনে প্রণাম করল। একবার, না একশো বার, না কি শত কোটি বার— ও নিজেও বুঝতে পারল না।
১২
ক’দিন ধরে সমীরণকে গুম মেরে থাকতে দেখে ওদের অফিসেরই সহকর্মী, যে টুম্পাদের সঙ্গে দল বেঁধে অন্নপূর্ণা পুজোর দিন ওদের বাড়িতে গিয়েছিল, সেই রঞ্জিত ওকে বলল, তোর কী হয়েছে রে?
সমীরণ বলল, কোথায়? কিছু হয়নি তো!
— কিছু হয়নি বললে হবে? কিছু তো একটা হয়েছে। না হলে হঠাৎ করে তুই এত চুপচাপ হয়ে গেলি কেন? মা-বাবার শরীর ঠিক আছে তো?
— হ্যাঁ, ঠিক আছে।
রঞ্জিত জিজ্ঞেস করল, তা হলে?
সমীরণ বলল, না না, সব ঠিক আছে।
— সব ঠিক আছে বললে তো হবে না। বলতে না চাইলে বলিস না। আমি জোর করব না। কিন্তু মিথ্যে কথা বলিস না।
— আমি মিথ্যে বলি না।
রঞ্জিত বলল, তবে?
একটু থেমে ছলছল চোখে সমীরণ বলল, আমার কি মনে হয় জানিস তো… এই পৃথিবীতে একান্নবর্তী পরিবার বলে আর কিছু থাকবে না।
— কেন? কী হয়েছে?
— আর বলিস না। আমি আর পারছি না।
রঞ্জিত বলল, কী হয়েছে কী, বল না…
— আমাদের বৃদ্ধ প্রপিতামহ যে নির্দেশিকা জারি করে গিয়েছিলেন, এত বছর ধরে আমরা বংশ পরম্পরায় যেটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে আসছিলাম, এ বার বুঝি তাতে ছেদ পড়ল।
— কেন?
সমীরণ বলল, আমার বড় জেঠুর ছেলে এ বার আমাদের বাৎসরিক অন্নপূর্ণা পুজোর দিন টি-শার্ট আর জিনসের প্যান্ট পরেই ঘুরেছে। এক মিনিটের জন্যও ধুতি-পাঞ্জাবি পরেনি।
— তাতে কী হয়েছে?
— তাতে হয়তো কোনও মহাভারত অশুদ্ধ হয়নি। কিন্তু ওঁর সেই নির্দেশকে অমান্য করা হয়েছে।
রঞ্জিত জানতে চাইল, কোন নির্দেশ?
— যে নির্দেশে তিনি বলেছিলেন, আমাদের এই পরিবারের প্রত্যেকটা ছেলেকে বছরে অন্তত দু’বার ধুতি-পাঞ্জাবি পরতেই হবে। এক পয়লা বৈশাখে আর দ্বিতীয় হল, অন্নপূর্ণা পুজোর দিন।
— তা হলে সে পরল না কেন?
সমীরণ বলল, এই প্রশ্ন নাকি তাকে তার বাবাও করেছিল।
— ও কী বলেছে?
— ও বলেছে, ধুতি-পাঞ্জাবি পরতে আমার ভাল লাগে না। পায়ে বেঁধে বেঁধে যায়। মনে হয় এই বুঝি এক্ষুনি হোঁচট খেয়ে পড়ে যাব।
রঞ্জিত বলল, ও এর আগে কোনও দিন পরেনি?
— পরবে না কেন? ওই নির্দেশ মেনে আমাদের পরিবারের বাকি সব ছেলেদের মতো ও-ও ছোটবেলা থেকে ধুতি-পাঞ্জাবি পরেছে।
— তা হলে?
সমীরণ বলল, ওর নাকি এখন অসুবিধে হচ্ছে।
— এত বছর পরে হঠাৎ করে অসুবিধে!
— আসলে ওর সব বন্ধুবান্ধব তো প্যান্টশার্ট পরে। গত পয়লা বৈশাখে ধুতি-পাঞ্জাবি পরে বেরিয়েছিল দেখে ওর বন্ধুরা নাকি ওর পেছনে লেগেছিল। ‘জামাইবাবু, জামাইবাবু’ বলে খুব খেপিয়েছিল। কে নাকি মজা করে রাস্তার মধ্যে পেছন থেকে আচমকা টান মেরে ওর কোঁচাও খুলে দিয়েছিল।
রঞ্জিত বলল, যারা এ রকম করে, ও তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে গেছে কেন?
সমীরণ বলল, আমিও তো সেটাই বলেছি।
— ও কী বলল?
— ও বলল, কবে কোন পূর্বপুরুষ কী নিয়ম চালু করে গেছে, সেটা কি বংশ পরম্পরায় অনন্তকাল ধরে মেনে চলতে হবে নাকি? দিনকাল পাল্টাচ্ছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমরাও যদি না পাল্টাই, তা হলে আমরা পিছিয়েই থাকব। পড়ে থাকব সেই একশো তিরিশ বছর আগেকার পুরনো জমানায়।
— বাড়ির আর কেউ কিছু বলেনি?
— বলেছে, তবে যারা বলেছে, তারাও তো বৃদ্ধ প্রপিতামহর কিছু না কিছু নির্দেশিকা অমান্য করছে। ও সেগুলোর দিকে আঙুল তুলছে।
রঞ্জিত প্রশ্ন করল, যেমন?
— যেমন, তিনি লিখে গিয়েছিলেন, এক উনুনে রান্না করবে হবে। কিন্তু ইদানীং দেখা যাচ্ছে, আমাদের বাড়ির বউরা ঘরের মধ্যে ইনডাকশন বা স্টোভ জ্বালিয়ে তাদের ছেলেমেয়েদের জন্য রান্না করছে। রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার কিনে আনাচ্ছে।
— বউরা না হয় অন্য বাড়ি থেকে এসেছে। অত কিছু জানে না। কিন্তু স্বামীগুলো তো এই বংশেরই। তারা তো সব জানে। তারা কেউ কিছু বলছে না কেন?
— কে বলতে যাবে? বললেই তো অশান্তি। কথা কাটাকাটি। ঝগড়া। কে শুধু শুধু অশান্তি চায় বল?
— এ ছাড়া আর কিছু?
সমীরণ বলল, তিনি এক জায়গায় কঠোর ভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন, এই পরিবারের কারও সঙ্গে যদি কারও কোনও সমস্যা দেখা দেয়, তা হলে সাত দিনের মধ্যে পরিবারের অন্তত দু’জন বয়োজ্যেষ্ঠকে কার কোন ব্যবহারে সে কষ্ট পেয়েছে, সেটা বলতে হবে এবং পরিবারের কারও কোনও ব্যাপার অপছন্দ হলে সেটা পরিবারের মধ্যেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আলাপ-আলোচনা করে মিটিয়ে নিতে হবে। কোনও অবস্থাতেই বাইরের কাউকে সেটা বলা যাবে না। তাতে নাকি বাইরের লোকেরা সুযোগ নেবে।
রঞ্জিত বলল, এটা তো ভাল কথাই বলেছেন।
— তিনি ভাল কথাই বলেছেন। কিন্তু এখন আর সেটা মানা হচ্ছে না। এ ওর নামে তার কাছে গিয়ে বলছে। সে তার নামে ওর কাছে গিয়ে বলছে। এবং সমস্যা দানা বাঁধার আগেই বাইরের লোকেরা জেনে যাচ্ছে।
— তা হলে তোরা স্টেপ নে।
সমীরণ জানতে চাইল, কী স্টেপ নেব?
— তোর বৃদ্ধ প্রপিতামহ লিখেছিলেন না… যে বা যারা এই নিয়ম লঙ্ঘন করবে, তাকে ওই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে। সম্পত্তির এক কানাকড়িও পাবে না?
— লিখেছিলেন।
রঞ্জিত বলল, তা হলে তোরা সবাই মিলে সেটা প্রয়োগ করা শুরু কর। দেখবি, দু’দিনের মধ্যেই সব টাইট হয়ে যাবে। আবার সবাই নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য হবে।
— না রে, তা আর হবে না।
— কেন?
সমীরণ বলল, কেউই তো ঠিক নেই। যারা মিলে সিদ্ধান্ত নেবে, দেখা যাবে তাদেরও কোনও না কোনও গলদ আছে।
— সবার মধ্যেই গলদ আছে?
— সবার মধ্যে নেই ঠিকই, তবে যার মধ্যে নেই, হয়তো দেখা যাবে তার ছেলের মধ্যে আছে। অথচ ছেলেকে তিনি সংযত করতে পারছেন না। ফলে ছেলের দোষটা অংশত হলেও বাবার ঘাড়ে গিয়েই পড়বে। তিনি সেই দোষে দুষ্ট হবেন।
রঞ্জিত জিজ্ঞেস করল, তা হলে উপায়?
— এটাই তো এখন কোটি টাকার প্রশ্ন। কেউ কেউ ইতিমধ্যেই বলতে শুরু করেছে, এই বাড়ি বেচে দিয়ে যে টাকা পাওয়া যাবে, সেটা থেকে যে যার নিজের ভাগের টাকা বুঝে নিয়ে যার যেখানে খুশি সেখানে গিয়ে বসবাস করুক। এতে নাকি সম্পর্ক অনেক ভাল থাকবে। অন্তত এখনকার থেকে ভাল।
— কিন্তু তিনি নাকি লিখেছিলেন, এই বাড়ি বিক্রি করা যাবে না…
সমীরণ বলল, তিনি লিখেছিলেন… কিন্তু এখনকার সবার বক্তব্য হল, যে পরিস্থিতিতে তিনি এটা লিখেছিলেন, এখন তো আর সেই পরিস্থিতি নেই। তা ছাড়া তিনিই তো লিখেছিলেন, তেমন কোনও সমস্যা হলে বাড়ির সবাই মিলে যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটাই হবে।
— ও… তার মানে তোর বৃদ্ধ প্রপিতামহর যাবতীয় নির্দেশিকা তাঁরই অন্য নির্দেশ দিয়ে কেউ কেউ অপব্যাখ্যা করছে। নিজেদের কাজ হাসিল করার জন্য। তাই তো?
— তা ছাড়া আর কী!
রঞ্জিত বলল, এতে তোর মত কী?
— দ্যাখ, এত দিন তো আমরা এক ছাদের তলায় একসঙ্গে মিলেমিশে ছিলাম। একটা একান্নবর্তী পরিবার হয়েই ছিলাম। সত্যি বলতে কী, একান্নবর্তী পরিবারে থাকার যে কত সুবিধে, যারা থাকে বা থেকেছে, তারাই কেবল জানে। হয়তো প্রাইভেসি একটু কম। কিন্তু আনন্দ এত বেশি যে, সেই প্রাইভেসির খামতিটা ধর্তব্যের মধ্যেই পড়ে না। এখন যখন সেই আনন্দটাই মাটি হতে বসেছে, সম্পর্ক শিথিল হতে চলেছে, তখন আমার মনে হয়, সবাই যেটা চাইছে, সেটাই করা ভাল।
— কী?
সমীরণ বলল, বাড়ি বিক্রি করে যার ভাগে যত টাকা পড়বে, সেটা নিয়ে খোদ শহরে না হোক, শহরতলিতে না হোক, একটু গ্রামের দিকে দু’-চার কাঠা জমি কিনে ছোটখাটো একটা বাড়ি বানিয়ে নিজের মতো করে তো থাকতে পারবে। কোনও ঝুট ঝামেলা থাকবে না।
— তুই বলছিস এ কথা!
— বলছি। কারণ, তিনি এই নির্দেশিকা দিয়েছিলেন আমাদের ভাল থাকার জন্য। পরম্পরা বজায় রাখার জন্য। কিন্তু সেই নির্দেশিকাই যখন আমাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তখন আমার মনে হয়, আমাদের ভাল থাকার জন্যই সেই কাঁটা উপড়ে ফেলা উচিত।
রঞ্জিত বলল, তুই এটা টুম্পাকে বলেছিস?
— নাঃ। এখনও বলিনি। বাড়ির এ রকম একটা কথা হুট করে বলি কী করে বল তো!
— কিন্তু না বললে তো তুইও হালকা হতে পারবি না। গুমরে গুমরে মরবি।
সমীরণ বলল, সে জন্যই তো তোকে বললাম। দেখি, শেষ পর্যন্ত কী হয়! বড় জেঠু তো বলেছেন, এর মধ্যেই একদিন বৃদ্ধ প্রপিতামহর সেই নির্দেশিকা বের করে সবাইকে নিয়ে বসবেন।
রঞ্জিত জিজ্ঞেস করল, সেই নির্দেশিকা কি তোর বড় জেঠুর কাছে থাকে?
— হ্যাঁ।
—কেন?
সমীরণ বলল, কারণ, ওঁর এটাই নির্দেশ ছিল। তিনি নাকি নির্দেশিকাটা বের করতে পারবে। এবং কাজ মিটে যাওয়ার পরে সবার সামনেই আবার ওটা সিন্দুকে ঢুকিয়ে ফের তালা লাগিয়ে দেবে।
রঞ্জিত জানতে চাইল, কোনও দিন খোলা হয়েছিল ওটা?
— না।
— কেন?
— কারণ দরকার হয়নি।
— একশো তিরিশ বছরের মধ্যে এক দিনের জন্যও ওই নির্দেশিকা নিয়ে কারও মনে কোনও সন্দেহ জাগেনি?
সমীরণ বলল, না।
— ওটার ডুপ্লিকেট চাবি কার কাছে থাকে?
— না। ওটার কোনও ডুপ্লিকেট চাবি নেই। একটাই চাবি।
রঞ্জিত জিজ্ঞেস করল, যদি হারিয়ে যায়?
— এত বছরেও যখন হারায়নি, আমার মনে হয় না আর হারাবে।
— এত দিনে তো ওই তালাচাবি জং পড়ে নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা।
— না, হবে না। সে ভাবেই তৈরি। পুরোটাই পেতলের। এবং ওটা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।
— কবে খুলবে?
সমীরণ বলল, দেখি, বলেছে তো এর মধ্যে। এর মধ্যে মানে কবে, কে জানে!
রঞ্জিতের মনে হল, সমীরণ খুব ভেঙে পড়েছে। ভেঙে পড়েছে শুধু তাদের একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যাওয়ার মুখে বলেই নয়, ভেঙে পড়েছে অন্যান্য একান্নবর্তী পরিবারগুলোও বর্তমান পরিস্থিতির সামনে একেবারে কোণঠাসা, দিশেহারা হয়ে পড়েছে দেখে। এই পরিবারগুলোকে টিকিয়ে রাখার কি কোনও উপায় নেই! টুম্পা এলে ওকে একবার বলতে হবে সমীরণদের এই সমস্যার কথা। বলতেই হবে।
চলবে……….

