প্রসঙ্গঃ গণতন্ত্র-নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংস্কার

অ্যাডভোকেট আনসার খান :গণতন্ত্র”-জনগণের শাসন হিসেবে অভিহিত হয়ে আসছে-শাসনব্যবস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশের সময় থেকেই। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় দেশে-দেশে গণতন্ত্রের প্রয়োগ ও চর্চার ক্ষেত্রে ভিন্নতর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হয়ে আসছে। দেশগুলো নিজেদের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও পরিবেশের প্রেক্ষিত বিবেচনায় নিয়ে গণতন্ত্রের প্রয়োগ করেছে-এটাও সত্য। কিন্তু কোনোভাবেই গনতন্ত্রের মূল সূত্র-“জনগণই রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক”-তত্ত্ব অস্বীকার করেনি প্রকৃত গণতন্ত্রপ্রেমিরা।

 

গণতন্ত্রের বিশুদ্ধ তত্ত্ব অনুসারে-জনগণের বিঘোষিত সম্মতি হচ্ছে রাজনৈতিক ক্ষমতার মূলভিত্তি-সে অর্থে জনগণের সম্মতিই হলো সরকারের কার্য নির্বাহজনিত অধিকারের উৎস।কাজেই গণতন্ত্রের সরকার-“জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হয়ে জনগণের পক্ষে জনগণের প্রদত্ত ক্ষমতাই ব্যবহার করে থাকে।”

গণতন্ত্রে স্বীকৃত যে-রাষ্ট্রের অন্তর্গত প্রতিটি মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন এবং স্বাধীন মানুষের স্বেচ্ছায় নির্ভয়ে প্রদত্ত স্বাধীন সম্মতিই হলো-“সরকারের ন্যায়সম্মত ক্ষমতার নৈতিক ভিত্তি”-এবং এ-কারণে অবশ্যই সরকার তার দায়িত্ব পালনে জনগণের নিকট দায়বদ্ধ ও জবাবদিহি করতে বাধ্য।

প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের যুগ পেরিয়ে বর্তমানে গণতন্ত্রের প্রতিনিধিত্বের যুগ চলছে এবং প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের স্বাধীন সম্মতি ও স্বাধীন ইচ্ছে প্রকাশের একমাত্র বিশ্বস্বীকৃত মাধ্যম হলো-সর্বজনস্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্য অবাধ, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং ভয়মুক্ত পরিবেশে অনুষ্ঠিত কারচুপিমুক্ত ও প্রভাবমুক্ত সাধারণ নির্বাচন। কেবল এ-ধরনের সৎ, স্বচ্ছ ও অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচনে গোপন ব্যালটে ভোট প্রদান করার মাধ্যমেই স্বাধীন মানুষের-স্বাধীন সম্মতি ও জনগণের প্রকৃত আশা-আকাক্সক্ষার অভিব্যক্তি প্রকাশিত ও প্রতিফলিত হয়ে থাকে বলে রাজনৈতিক ও গণতন্ত্র সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত-কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যখন সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা হয় তখন ওই নির্বাচনের অর্থ দাঁড়ায় এ-ই যে-জনগণকে বলা হচ্ছে- তারা ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে কাকে বা কাদেরকে নেতৃত্ব দানের জন্য বেছে নিতে চায় সেটা ঘোষণা করার জন্য। অর্থাৎ স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের ওই ক্ষমতা বলেই জনগণ নিজেদেরকে আইন প্রণেতা ও নির্বাচিত শাসকগোষ্ঠীর প্রভূরূপে প্রতিষ্ঠিত করে থাকে।তাই বলা হয়ে থাকে-মূলত জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার প্রকাশই হলো গ্রহণযোগ্য অবাধ নির্বাচন।

একটা বিষয় মনে রাখা দরকার যে-গণতন্ত্র এবং জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার অনেক কিছুই নির্ভর করে-‘নির্বাচন’ কিভাবে পরিচালনা করা হয়েছে তার ওপর। নির্বাচন পরিচালনা প্রক্রিয়ায় যদি অস্বচ্ছতা এবং অসততার আশ্রয় নেওয়া হয় এবং এ-কারণে গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়া যদি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়ে থাকে-তবে ওই ব্যর্থতার কারণে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে-তেমনি গোটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থারই বিনাশ ঘটে। কাজেই গণতন্ত্র এবং জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার সুরক্ষার জন্য সর্বাগ্রে দরকার স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিশ্চয়তা বিধান করা-যেখানে ভোটার-সাধারণ স্বীয় পছন্দের রাজনৈতিক দল ও পছন্দের প্রার্থীকে প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্যে স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে। মোটকথা হলো-ভোটার যাতে স্বচ্ছতার সাথে ভয়মুক্ত পরিবেশে নিজের ভোট নিজের পছন্দের প্রার্থীকেপ্রতিনিধি নির্বাচনের জন্যে স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে। মোটকথা হলো-ভোটার যাতে স্বচ্ছতার সাথে ভয়মুক্ত পরিবেশে নিজের ভোট নিজের পছন্দের প্রার্থীকে দিতে পারে এবং ভোটারদের স্বাধীন ইচ্ছেতে প্রদত্ত ভোটের হিসেব যাতে অবিকৃত অবস্থায় প্রকাশিত হতে পারে তার নিশ্চয়তা বিধানের জন্যই আবশ্যক একটা শক্তিশালী নির্বাচন পদ্ধতি ও নির্বাচনী কাঠামোর। এটার নিশ্চয়তা থাকার মাধ্যমেই মানুষের রাজনৈতিক ইচ্ছে-শক্তির প্রকাশ ঘটবে। রাজনীতিতে জনগণের অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা ও কর্তব্য পালনের পরিধি বৃদ্ধি পাবে এবং এ-ভাবেই মানুষের সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতিফলন ঘটবে এবং অন্যদিকে গণতান্ত্রিক শাসন আরও বিকশিত হয়ে ওঠবে।

বাংলাদেশের সংবিধানে-“জনগণকে প্রজাতন্ত্রের মালিক” বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তবে মালিকানার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রাজনৈতিক ক্ষমতা চর্চায় জনগণের অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়েছে-ভোটাধিকার প্রয়োগের স্বাধীন ইচ্ছে প্রকাশের ক্ষেত্রও সংকুচিত হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ফলে রাষ্ট্রের ওপর জনগণের-সংবিধান স্বীকৃত মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এতে করে রাজনীতিতে একটা অস্থিতিশীল আবহ সার্বক্ষণিক বিরাজমান দেখতে পাওয়া যায়

দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে সন্দেহ আছে-এর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন আছে এবং রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। বলা হয়ে থাকে-পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থায় এবং এর কাঠামোতে বড়ধরণের গলদ রয়েছে বিধায় সরকারি ও শক্তিধরদের হস্তক্ষেপ ও প্রভাব- নিরপেক্ষ, অবাধ ও স্বচ্ছ-গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি জনগণ তাই আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন-এতে করে রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে জনগণের ক্ষমতায়ন ও অংশীদারত্বের বিষয়টাও দূর্বল হয়ে পড়েছে। গণতান্ত্রিক শাসনের কথামালা শুধু কাগজে-কলমে এবং বক্তৃতা-বিবৃতিতেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকছে

নির্বাচন প্রক্রিয়ার দুর্বলতার কারণে ক্ষমতাসীন দল জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগে এবং প্রদত্ত ভোটের গণনায় হস্তক্ষেপ করে ভোটের ফলাফল পাল্টে দিয়ে থাকে এমন অভিযোগ দশকের পর দশক ধরেই করে আসছে ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো এবং এমনকি দেশের সুশীল সমাজের একটা অংশও অনুরূপ অভিযোগের সাথে একমত পোষণ করেন। এ-ধরণের অভিযোগ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনকে অস্থিতিশীল করে তোলে-রাজনৈতিক সংঘাত-সংঘর্ষের মতো ঘটনাও ঘটতে দেখা গেছে।আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়েও এখন থেকেই একটা গোলমেলে অবস্থা উদ্ভবের আলামত অনুভূত হচ্ছে

কেন দেশে একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী ব্যবস্থা ও কাঠামো তৈরি করা যায়নি সেটা খুঁজে দেখা দরকার এবং আমার বিশ্বাস উৎসমূলের ত্রুটি-দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে তার সমাধান না করা পর্যন্ত দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা-জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার নিশ্চয়তা বিধান করা-সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করা এবং গণতন্ত্রের নির্ভরযোগ্যতার প্রশ্নটার স্থায়ী সমাধান কোনো অভিনব কৌশল গ্রহণের দ্বারাই সম্ভব হবে না

দেশে গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত করে জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য মূলত দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটা ঐকমত্যের ক্ষেত্র তৈরি করা দরকার। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরাজিত পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং আস্থাহীনতার মনোভাব দূর করে পারস্পরিক বিশ্বাসবোধ সৃষ্টি করা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশ্বাসবোধ সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব প্রায়। পারস্পরিক বিশ্বাস তৈরি হলে রাজনৈতিক পদ্ধতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সর্ম্পকে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠাকল্পে চলমান রাজনৈতিক-শাসনতান্ত্রিক ও নির্বাচন সম্পর্কিত বিষয়গুলোর জন-উপযোগী সংস্কার সাধন করেই কেবল রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সংকটের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে সিদ্ধান্তে আসা যাবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
একটা বিষয় অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে যে-দেশে এ-পর্যন্ত যত রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে তার সবই ক্ষমতাকেন্দ্রিক। নির্বাচন অনুষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা-ভোটের ফলাফল প্রকাশের গ্রহণযোগ্যতা ইত্যাকার বিষয়গুলোই মূখ্য হয়ে ওঠেছে প্রতিটা রাজনৈতিক সংকটে। তাই রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পর্কিত কাঠামো সম্পর্কে একটা গ্রহণযোগ্য ঐকমত্যে ও সিদ্ধান্তে উপনীত না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধানের পথ পরিস্কার হবে না। তাই দেশ-জাতি ও জনগণের স্বার্থে শক্তিশালী গণতন্ত্রের বিকাশ সাধন ও জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা নিশ্চিতকল্পে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচনী ব্যবস্থা ও নির্বাচনী কাঠামো গড়ে তোলার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। রাজনৈতিক সংকটের সমাধান কৃত্রিম উপায়ে বা জোরজবরদস্তিমূলক ভাবে নয়-জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টি করে রাজনৈতিক ভাবেই সমাধান করতে হবে।

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.