অ্যাডভোকেট আনসার খান :সিরিয়ার আসাদ শাসনের অবসানের জন্য গড়ে ওঠা গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও গৃহযুদ্ধে সম্ভবত বিদ্রোহী জনতার পরাজয় হয়েছে-একমাত্র উত্তর-পশ্চিমাঞ্জলীয় ইদলিব প্রদেশে এখনো আসাদ শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলছে এবং হায়াত তাহরির আল-শাম জঙ্গিগোষ্ঠীর আধিপত্য রয়েছে ইদলিবে।দেশের অবশিষ্ট সব অঞ্চলে আসাদ সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।এর ফলে জনগণের দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন অধরাই থেকে গেলো বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
একদশক আগে ২০১১-সালে আরব বসন্ত নামের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ঢেউয়ের প্রভাবে সিরিয়ার কর্তৃত্ববাদী শাসক আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূচনা হয়েছিলো মার্চ-২০১১-সালে।আসাদের কর্তৃত্ববাদী শাসনে জনগণের কোনোধরণের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার এবং বাক্-ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার ছিলো না।মিডিয়াগুলোর ওপর সরকারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং সিরিয়ান রাষ্ট্র ও সমাজ অত্যন্ত দমন-পীড়নমূলক ছিলো।অর্থনৈতিক ব্যবস্হাপনায়, সম্পদ ও বিশেষাধিকারের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট বৈষম্য বিদ্যমান ছিলো।এমন অবস্থা থেকে উত্তরণ ও গণতান্ত্রিক শাসনের আকাঙ্ক্ষা সিরিয়ান জনগণকে আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলো আরব বসন্ত নামক গণতান্ত্রিক আন্দোলন।
সিরিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্জলীয় শহর দারার পনেরজন স্কুল ছেলে একটা স্কুলের দেয়ালে স্প্রে-রঙে-“জনগণ শাসনের পরিবর্তন চায়”শ্লোগান লিপিবদ্ধ করে আসাদ শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম আন্দোলনের সূচনা করেছিলো।পুলিশ ছাত্রদের বাঁধা দেয় এবং ওই পনেরজন ছাত্রকে গ্রেফতার ও নির্যাতন করে।এ-সময় ছাত্র-জনতা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।এখান থেকেই আসাদ শাসনের পদত্যাগ,রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি,অর্ধশতাব্দী পুরানো জরুরি অবস্থার প্রত্যাহার,বৃহত্তর রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক ও মানবাধিকার নিশ্চিত করা এবং দূর্নীতির অবসানের দাবিসহ গণতান্ত্রিক শাসন কায়েমের দাবি উপস্থাপন করা হয় এবং দরিদ্র খরা-পীড়িত গ্রামীন প্রদেশ দারার ক্ষুব্ধ জনগণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলনে নেমে আসে এবং ওই আন্দোলনের জোয়ার সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে- জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র গণ-আন্দোলন গড়ে তোলে এবং সরকার ওই আন্দোলন দমনের নামে প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র দমন-পীড়ন চালাতে থাকে।জনগণও সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ জোরদার করে।ফলে সরকারের বিরুদ্ধে নাগরিক বিদ্রোহ দীর্ঘস্হায়ী গৃহযুদ্ধের দিকে মোড় নেয়।পরবর্তীতে গৃহযুদ্ধ-তীব্র যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়-যেখানে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর কোনো কোনো দেশ আসাদ শাসনের পক্ষে এবং কোনো কোনো দেশ বিদ্রোহী প্রতিবাদকারীদের পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলো।মূলত গৃহযুদ্ধের গভীরতা সরকারপন্হী ও বিরোধী পক্ষ-উভয় শক্তিকেই বহিরাগত পৃষ্ঠপোষকদের ওপর নির্ভরশীল করে তোলেছিলো,বিদেশি সেনা সিরিয়ায় প্রবেশ করেছিলো এবং এ-কারণেই যুদ্ধটা দীর্ঘায়িত হয়েছিলো বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সিরিয়ার ওই গৃহযুদ্ধে শত শত জঙ্গি ও বিদ্রোহীগোষ্ঠীর জন্ম হয়েছিলো।এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- সিরিয়ার সরকারী বাহিনী,যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি, সরকার বিরোধী ফ্রি সিরিয়ান আর্মি,কুর্দিশ ফোর্স,তার্কিস সমর্থিত সিরিয়ান বিদ্রোহী,রাশিয়ান ফোর্স,তুর্কী সেনা,ইরানি সেনা,বিভিন্ন জিহাদী ফোর্স,হিজবুল্লাহ ফোর্স,ইসরাইলী সেনা,ইসলামিক স্টেট জঙ্গীগোষ্ঠী,সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্স প্রভৃতি গোষ্ঠী কোনো না কোনো পক্ষে যুদ্ধের অংশীদার হয়েছিলো যার-যার নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ- কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনায়।সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নিলেও সৌদি আরব,কাতারসহ উপসাগরীয় কিছু দেশ সিরিয়ার বিদ্রোহীদের আর্থিক ও নৈতিক সহযোগিতা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ইসরায়েলী রাষ্ট্রদূত ইতামার রাবিনোভিচ-সিরিয়ার দশকব্যাপী গৃহযুদ্ধকে তিনটি স্তরে সংঘটিত একটা ইন্টারপ্লে হিসেবে বর্ণনা করেছেন।যেমন:-১.সিরিয়ার সমাজের বিভিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় উপদলের মধ্যে একটা সাম্প্রদায়িক সংঘাত,-২.তুরস্ক,ইরান,ইসরায়েল ও আরব উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটা আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা এবং ৩.মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যতের ওপর প্রভাব বিস্তার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা।তবে-“সিরিয়ার সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁকগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো-বিদ্রোহীদের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের এবং আসাদ সরকারের পক্ষে রাশিয়ার সরাসরি হস্তক্ষেপ ও অংশগ্রহণ।”এটা সত্য যে রাশিয়ার সম্পৃক্ততা প্রেসিডেন্ট আসাদের অবস্থানকে সুরক্ষিত এবং আসাদের বিজয় নিশ্চিত করতে ভূমিকা রেখেছে।
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে বিভীষিকাময় সামরিক সংঘাত এবং একুশ শতকের সবচেয়ে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ-যা দেশটার জনগণের ভবিষ্যত-“ক্রমবর্ধমান অন্দ্ধকারের” দিকে নিয়ে গেছে-যেখান থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে কয়েকদশক সময় লেগে যেতে পারে।জাতিসংঘ এক মন্তব্যে সিরিয়ান যুদ্ধকে-“দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে খারাপ মানবসৃষ্ট বিপর্যয়”বলে অভিহিত করেছে।
দীর্ঘ একদশকের গৃহযুদ্ধ আসাদ শাসনের পতন নিশ্চিত করতে পারেনি-এটাই বাস্তবতা।সিরিয়ায় গণতান্ত্রিক শাসন কায়েমের স্বপ্ন-স্বপ্নই রয়ে গেছে এবং আসাদ শাসনে সিরিয়ায় আরও কঠোর সর্বাত্মকবাদী শাসন কায়েমের পথ সুগম হলো বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।অথচ একদশকে যে মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে, এতো-এতো মানুষ নিহত-আহত হয়েছেন তার কোনো সমাধান নেই।দেশটার অনেক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংস হয়ে গেছে-সে সব আর ফিরে পাওয়া যাবে না।
প্রকৃতপক্ষে-যুদ্ধ সিরিয়ার সবকিছুকে প্রভাবিত করেছে।বলতে গেলে দেশের প্রত্যেক সেক্টর ধ্বংস করেছে সর্বনাশা যুদ্ধ।মানবিক,অর্থনৈতিক,সাংস্কৃতিক, শিক্ষা,অবকাঠামো ও সামাজিক পরিস্থিতি বিপর্যয়কর অবস্থায় পতিত হয়েছে।বেসামরিক মানুষ এখন মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকটে ভূগছে।দশ বছরের সংঘাতে আর্থিক মন্দা দেখা দিয়েছে।নাগরিকদের মৌলিক পরিষেবা প্রদানের সিরিয়ান রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে পঙ্গু করে দিয়েছে।বলা হচ্ছে-সিরিয়ানরা এখন ক্ষুধার্ত এবং দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকই খাদ্য নিরাপত্তাহীনএবং ৪৩-শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে বাস করছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি।
সিরিয়ার সার্বিক অবস্হা সম্পর্কে যুক্তরাজ্যভিত্তিক”সিরিয়ান অবজারভেটরি অব হিউম্যান রাইটস”-দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে-যেখানে সিরিয়ার ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠেছে।প্রতিবেদন অনুযায়ী-দশবছরের যুদ্ধে নিহত হয়েছে প্রায় ছয়লাখ মানুষ।নিহত শিশুর সংখ্যা ৫৫-হাজার।বন্দী অবস্থায় নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে একলাখের অধিক মানুষকে।যুদ্ধের কারণে আহত ও পঙ্গু হয়েছে প্রায় তিন মিলিয়ন মানুষ।যুদ্ধ শিশু হিসেবে পরিচিত প্রায় ৪.৮ মিলিয়ন শিশু যুদ্ধকালে জন্ম গ্রহণ করেছে এবং এক মিলিয়ন শিশু প্রবাসে আশ্রয় শিবিরে জন্ম নিয়েছে।যুদ্ধের কারণে ২.৪৫ মিলিয়ন স্কুল শিশু শিক্ষা বঞ্চিত হয়েছে এবং ২.৫ মিলিয়ন শিশু পরিবারের সাথে বিদেশে শরণার্থী শিবিরে জীবন অতিবাহিত করছে।১.৬ মিলিয়ন শিশু শিক্ষা জীবন থেকে ঝরে পড়েছে-যাদের আর শিক্ষাজীবনে ফিরে আসার সূযোগ নেই
ওই রিপোর্ট অনুযায়ী-৫.৬ মিলিয়ন মানুষ দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে।দেশের ভেতরে স্থানান্তরিত ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬.৭ মিলিয়ন
দেশের অর্থনৈতিক,যোগাযোগ ও যাতায়াত ব্যবস্হাসহ অবকাঠামোর ব্যাপক অংশ এবং প্রতি তিনটি স্কুলের মধ্যে একটি স্কুল সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে এবং বিদ্যুৎ পরিকাঠামোর ৭০-শতাংশ ক্ষতিগ্রস্হ হয়েছে যুদ্ধের ধ্বংসলিলায়।৪৮-শতাংশ চিকিৎসা ব্যবস্হা ধ্বংস হয়েছে এবং ৭০-শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে।আর যুদ্ধে নিহত হয়েছেন ৯২৩ জন চিকিৎসক
ভীতিকর ওই পরিসংখ্যান বিদ্রোহের শুরু থেকে সিরিয়ার জনগণের দূর্দশাকে প্রতিফলিত করেছে
জনগণের শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সামরিকীকরণ করায় এবং এতে বিদেশি শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও ভয়ানক অবস্থায় নিয়ে যায়-যার শিকার হয়েছে সিরিয়ার সাধারণ জনগণ
যুদ্ধের ক্ষতি অত্যন্ত ব্যাপক-যার দ্বারা গণমানুষের জীবনে নেমে এসেছে অমানিশা।দেশটাতে সৃষ্টি করেছে ভয়াবহ মানবিক সংকট।সিরিয়ার অভ্যন্তরে বা প্রবাসের শরণার্থী শিবিরগুলোতে বেঁচে থাকা সিরিয়ান জনগণের জন্য দশবছর ধরে চলমান যুদ্ধ-“জীবন্ত দুঃস্বপ্ন”হিসেবে প্রতিভাত হয়ে আছে।কীভাবে উত্তরণ হবে দেশের সংকট তা এখনই বলা অসম্ভব।
লেখক: আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

