প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা বলেছেন, নির্বাচনকে ঘিরে কয়েকটি স্থানে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তার কোনোটাই প্রত্যাশিত ও কাম্য নয়। ঘটনাগুলোর ওপর বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, এর পেছনে ছিল নির্বাচনকে সামনে রেখে আধিপত্য বিস্তার, বংশীয় প্রভাব, ব্যক্তিগত শত্রুতা, রাজনৈতিক কোন্দল ইত্যাদি।
সোমবার (১৫ নভেম্বর) রাজধানীর নির্বাচন ভবনের মিডিয়া সেন্টারে প্রেস ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন তিনি। এসময় নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার অনুপস্থিত ছিলেন।
সিইসি বলেন, গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী সারাদেশে নির্বাচনী সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব প্রাণহানির ঘটনার সবগুলো নির্বাচনী সংঘর্ষের কারণে হয়েছে কি না তা অনুসন্ধানের দাবি রাখে। এর মধ্যে মাত্র কয়েকটি ঘটনা ভোটকেন্দ্রে বা ভোটের দিন ঘটেছে। কোনো ঘটনা নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগেই ঘটেছে আবার কোনোটা রাতের আধারে ঘটেছে- এসব হত্যার মোটিভ কী তা তত্ত্বের বিষয়।
‘নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি প্রতিবেদন’ শিরোনামে লিখিত বক্তব্যে কে এম নূরুল হুদা বলেন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যমে বিভিন্ন খবর প্রকাশিত হচ্ছে। কোনো কোনো খবরে জনমানুষের মধ্যে বিভ্রান্তির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলে নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। আপনাদের মাধ্যমে কমিশনের বক্তব্য এবং অবস্থান দেশবাসীর কাছে তুলে ধরতে চাই।
সিইসি বলেন, ২০২১ সালে দেশব্যাপী ইউনিয়ন পরিষদ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রথম ধাপে ২১ জুন ও ২০ সেপ্টেম্বর ৩৬৯টি এবং ১১ নভেম্বর দ্বিতীয় ধাপের ৮৩৩টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তৃতীয় ধাপে ২৮ নভেম্বর ২ হাজার সাতটি এবং চতুর্থ ধাপে ২৩ ডিসেম্বর ৮৪০টি ইউপিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া শিগগির পঞ্চম ধাপে আরও প্রায় ১ হাজার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। এবছরের মধ্যেই মেয়াদ উত্তীর্ণ সব ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, উল্লেখ করা তথ্যাদি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়- নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক এবং প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়েই অনুষ্ঠিত হয়েছে। টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচারে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং অবাধ নির্বাচনের খবর প্রচার করা হয়েছে। তাতে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দেওয়ার সচিত্র প্রতিবেদন প্রচারিত হয়েছে।
সিইসি দাবি করেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনাসহ আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের জন্য যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ করে। প্রশিক্ষণ, নির্বাচনী মালামাল বিতরণ, ভোটগ্রহণ, ভোট গণনা, ফলাফল প্রকাশ ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রেই সুচারুরূপে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। প্রতি ধাপেই ভোট গ্রহণের দিন, এর আগে ও পরে ভোটকেন্দ্র ও নির্বাচনী এলাকায় যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। পর্যাপ্ত পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সদস্য মোতায়েনসহ এলাকায় পুলিশ, র্যাব, কোস্টগার্ড ও বিজিবির মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স মোতায়েন করা হয়। এছাড়া আচরণবিধি ভঙ্গসহ নির্বাচনী অপরাধের বিচারের জন্য নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচনী ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়। নির্বাচনী এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়।
কে এম নূরুল হুদা বলেন, এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময়ে নরসিংদী জেলার রায়পুরের একটি দুর্গম চর এলাকায় হতাহতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। নরসিংদীর ঘটনার বর্ণনায় প্রথম আলো উল্লেখ করেছে- গত ১০ বছরে আধিপত্য বিস্তারের নামে নরসিংদী চরাঞ্চলগুলোতে দুই শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কয়েক হাজার। (১২ নভেম্বর, ২০১১)। নরসিংদীতে এবারের প্রথম ঘটনাটি ঘটে ৪ নভেম্বর যা নির্বাচনের পাঁচদিন আগে। দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে নির্বাচনের দিন ভোরে নির্বাচন শুরু হবার পূর্বে।
‘সম্প্রতি মাগুরার যে হতাহত হয়েছে তা নির্বাচনী প্রতীক বরাদ্দের পূর্বে ঘটেছে। যা ছিল নিতান্তই এলাকার প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে। একইভাবে মেহেরপুরের গাংনির ঘটনার পেছনে বংশগত আধিপত্য বিস্তারই মূল কারণ বলে গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। মেহেরপুরের ঘটনা ঘটেছে নির্বাচনের দিন ভোর রাতে। সংঘর্ষ চলাকালে উচ্ছৃঙ্খল লোকজনকে দেশি অস্ত্রসহ মহড়া দিতে দেখা গেছে। তাদের চিহ্নিত করে বিচারের সম্মুখীন করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
প্রধান নির্বাচন কমিশনার আরও বলেন, ইতোমধ্যে দুই ধাপের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। আরও দুই ধাপের নির্বাচনী কার্যক্রম চলছে। এরপর একাধিক ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সবগুলো নির্বাচন সঠিকভাবে সম্পন্ন করার জন্য মাঠ পর্যায়ের নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই সুযোগে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী সব প্রার্থী, তাদের সমর্থক, সামাজিক নেতৃবৃন্দ এবং সর্বোপরি সব রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রতি অনুরোধ থাকবে তারা যেন সবাই আচরণবিধি মেনে চলেন, সহনশীল আচরণ করেন। এসব ব্যাপারে নির্বাচনী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সহযোগিতা কামনা করছি।

