ফ্রাঙ্কফুর্ট, ৬ অক্টোবর ২০২৬
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও প্রভাবশালী বই ও প্রকাশনা আয়োজন ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার ৭৮তম আসর আজ মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হচ্ছে। মূল বইমেলা চলবে ৭ থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রকাশক, লেখক, সাহিত্যিক, অনুবাদক, বই বিক্রেতা, এজেন্ট, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের অংশগ্রহণে ফ্রাঙ্কফুর্ট আবারও পরিণত হবে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা জগতের অন্যতম প্রধান মিলনকেন্দ্রে। এই মেলায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশও অংশ নিচ্ছে , বার্লিনের বাংলাদেশ দূতাবাসের পরিচালনায় বাংলাদেশের স্টল পরিচালিত হবে । আজ বিকেলে বাংলাদেশের পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্সের ম্যানেজিং ডিরেক্টর কামরুল ইসলাম শায়ক এবং অংকুর প্রকাশনীর মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ মেলায় অংশ নেয়ার জন্য ফ্রাঙ্কফুর্ট পোঁছাবেন ।
উদ্বোধনে কারা থাকছেন?
আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আজ বিকেল ৫টায় মেসে ফ্রাঙ্কফুর্টের Congress Center-এ অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেবেন ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার পরিচালক জুর্গেন বোস। এরপর বক্তব্য দেবেন ইউরোপীয় কমিশনের কমিশনার গ্লেন মিকালেফ, ফ্রাঙ্কফুর্টের মেয়র মাইক জোসেফ, হেসেনের বিজ্ঞান, গবেষণা, শিল্প ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী টিমন গ্রেমেলস, জার্মানির সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমবিষয়ক মন্ত্রী ড. ভলফরাম ওয়েইমার এবং চেক প্রজাতন্ত্রের সংস্কৃতিমন্ত্রী ওতো ক্লেম্পির।
অনুষ্ঠানে চেক সাহিত্যের দুই লেখক মারি ইলিয়াশেনকো ও রাদকা দেনেমারকোভা পাঠে অংশ নেবেন। জার্মান প্রকাশক ও বই বিক্রেতা সমিতির সভাপতি সেবাস্টিয়ান গুগোলৎসও বক্তব্য রাখবেন। শেষে থাকবে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার আনুষ্ঠানিক প্রতীকী উদ্বোধন এবং সংগীত পরিবেশনা।
উল্লেখ্য, আজ সকাল ১১টায় অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখবেন জুর্গেন বোস, সেবাস্টিয়ান গুগোলৎস এবং মার্কিন ইতিহাসবিদ ও লেখক জিল লেপোর।
এবারের সম্মানিত অতিথি চেক প্রজাতন্ত্র
২০২৬ সালের ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার Guest of Honour বা সম্মানিত অতিথি দেশ চেক প্রজাতন্ত্র। দেশটির এবারের মূল প্রতিপাদ্য—“Czechia: A Country on the Coast” বা “চেকিয়া: উপকূলের একটি দেশ”।
ভূগোলের দিক থেকে চেক প্রজাতন্ত্র স্থলবেষ্টিত দেশ হলেও এই অভিনব প্রতিপাদ্যের মধ্য দিয়ে কল্পনা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির নতুন দিগন্তের দিকে যাত্রার প্রতীকী বার্তা দেওয়া হয়েছে।
এবার প্রায় ৭৫ জন চেক লেখক ফ্রাঙ্কফুর্টে অংশ নিচ্ছেন। কথাসাহিত্য, কবিতা, কমিকস, শিশু-কিশোর সাহিত্য, নন-ফিকশন ও নাট্যসাহিত্য—বিভিন্ন ধারার লেখকদের অংশগ্রহণে চেক সাহিত্যের একটি বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরা হবে।
চেক প্রজাতন্ত্রের জন্য নির্মিত Guest of Honour Pavilion-এর আয়তন প্রায় ২,৩০০ বর্গমিটার। এর নাম “Imagination Interface”। সেখানে সাহিত্য, শিল্প, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে দর্শকদের জন্য বিশেষ আয়োজন রাখা হয়েছে।
ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার গুরুত্ব
ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা শুধু বই প্রদর্শনের স্থান নয়; এটি আন্তর্জাতিক প্রকাশনা ব্যবসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানে প্রকাশক ও সাহিত্যিকদের পাশাপাশি সাহিত্য-এজেন্ট, অনুবাদক, চলচ্চিত্র ও গেমস শিল্পের প্রতিনিধিরাও মিলিত হন। বইয়ের কপিরাইট, অনুবাদ-স্বত্ব, চলচ্চিত্রে রূপান্তরের অধিকার এবং নতুন প্রকাশনা উদ্যোগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও আলোচনা হয়।
গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের বইমেলায় ৪,৩৫০ জন প্রদর্শক, ২ লাখ ৩৮ হাজার দর্শনার্থী, ১ লাখ ১৮ হাজার পেশাদার দর্শক এবং ৭,৮০০ জন গণমাধ্যমকর্মী অংশ নিয়েছিলেন। আয়োজকদের হিসাবে সেখানে প্রায় ৩,৫০০টি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
বই, সাহিত্য ও মুক্তচিন্তার বিশ্বমঞ্চ
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের যুগে বইয়ের ভবিষ্যৎ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব, অনুবাদ, প্রকাশনার স্বাধীনতা, পাঠাভ্যাস এবং সাহিত্য ও সমাজের সম্পর্ক—এবারের বইমেলায় এসব বিষয়ও গুরুত্ব পাবে। ফলে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা কেবল প্রকাশনা শিল্পের বাণিজ্যিক আয়োজন নয়, বরং বিশ্বজুড়ে চিন্তা, মতপ্রকাশ ও সংস্কৃতির পারস্পরিক বিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।
বিশেষ করে বর্তমান সময়ে যখন বিশ্ব নানা রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভাজনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন বই ও সাহিত্য বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে সংলাপ ও বোঝাপড়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার আন্তর্জাতিক চরিত্র সেই বার্তাকেই আরও শক্তিশালী করে।
এবারের বইমেলায় চেক প্রজাতন্ত্রের উপস্থিতিও সেই সাংস্কৃতিক বিনিময়কে নতুন মাত্রা দেবে। পাঁচ দিনের এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে ফ্রাঙ্কফুর্ট আবারও প্রমাণ করবে—বই কেবল কাগজে মুদ্রিত শব্দ নয়; বই মানুষের কল্পনা, জ্ঞান, ইতিহাস ও ভবিষ্যতের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে।
লেখক : বিলকিস সুলতানা , সাহিত্য সম্পাদক , শুদ্ধস্বর ডটকম ।

