“আমি আর আসব না”
ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় শেষবার দেখা হওয়ার সময় কথাটা খুব স্বাভাবিকভাবেই বলেছিলেন বিমলদা। বিদায়ের মুহূর্তে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে কথাটার গভীরতা তখন বুঝিনি। ভেবেছিলাম, বয়স হয়েছে, হয়তো আর নিয়ম করে এত দূর আসা সম্ভব হবে না। বইমেলা শেষ হবে, আমরা যে যার কাজে ফিরে যাব, আবার কোনো একদিন দেখা হয়ে যাবে। কিন্তু সেই “কোনো একদিন” আর আসেনি। বিমলদা চলে গেলেন পরলোকে।
আজ প্রতি বছর ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা এলেই সেই বিদায়ের দৃশ্যটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মেলার ব্যস্ততা, নানা ভাষার বই, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা প্রকাশক-লেখক-পাঠকের ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ মনে হয়—বিমলদা কোথায়? তাঁর সেই পরিচিত মুখটি কোথাও দেখা যায় না। অথচ স্মৃতির মধ্যে তিনি ঠিকই ফিরে আসেন। মনে হয়, এই তো সেদিন তিনি ছিলেন, কথা বলেছিলেন, তারপর বলেছিলেন—“আমি আর আসব না।”
তিনি সত্যিই আর আসেননি। কিন্তু বইমেলা এলেই তিনি আমার কাছে ফিরে আসেন।
যতটুকু তথ্য ও স্মৃতি থেকে জেনেছি, বিমল ধর ছিলেন প্রথম বাঙালি, যিনি ১৯৬৯ সালে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় অংশ নিয়েছিলেন। আজকের দিনে আন্তর্জাতিক বইমেলায় বাঙালি প্রকাশকদের উপস্থিতি খুব স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু সত্তরের দশকের শেষ দিকে কলকাতা থেকে একজন প্রকাশকের ফ্রাঙ্কফুর্টে গিয়ে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা জগতের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা ছিল নিঃসন্দেহে এক সাহসী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ। বিমলদার সেই পথচলা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলা প্রকাশনার আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
বিমল ধরকে শুধু একজন প্রকাশক হিসেবে দেখলে তাঁর পরিচয় অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি ছিলেন স্বপ্নদ্রষ্টা, সংগঠক এবং শিল্পী। কলকাতার বইমেলার ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর নাম এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, বইমেলার শুরুর দিনগুলির কথা বলতে গেলে তাঁকে বাদ দিয়ে সেই ইতিহাস লেখা যায় না।
সত্তরের দশকের কলকাতা। প্রকাশনা জগৎ নানা সংকটে। কলেজ স্ট্রিটের আড্ডা, কফি হাউসের আলোচনা আর বইকে ঘিরে তরুণ প্রকাশকদের স্বপ্ন—এই আবহেই কলকাতায় একটি বড় বইমেলার ভাবনা জন্ম নেয়। জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা তাঁদের অনুপ্রাণিত করেছিল। বইকে শুধু দোকানের তাক বা প্রকাশকের গুদামে আটকে না রেখে পাঠকের কাছে নিয়ে যাওয়ার ভাবনা তখন নতুন ছিল। বিমল ধর ও তাঁর সহযাত্রীরা বুঝেছিলেন, কলকাতার পাঠকসমাজের সামনে যদি এক জায়গায় বিপুল সংখ্যক প্রকাশকের বই তুলে ধরা যায়, তবে তার সম্ভাবনা অসীম।
১৯৭৫ সালে বিমল ধরের উদ্যোগে কলকাতার ১৪টি অগ্রণী প্রকাশনা সংস্থাকে একত্র করে প্রতিষ্ঠিত হয় Publishers and Booksellers Guild। তাঁর সঙ্গে এই উদ্যোগে ছিলেন প্রবীর দাশগুপ্ত, সুপ্রিয় সরকার, দীপেন্দ্রনাথ মিত্র-সহ আরও কয়েকজন প্রকাশক। এই সংগঠনের মূল লক্ষ্যগুলির অন্যতম ছিল কলকাতায় একটি বার্ষিক বইমেলার আয়োজন।
পথটি অবশ্য মসৃণ ছিল না। সেই সময় অনেক প্রবীণ প্রকাশক মনে করতেন, বই কোনো মেলার পণ্য নয়, বইকে হাটের মতো করে বিক্রি করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু বিমলদারা তাঁদের সময়ের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে ছিলেন। তাঁরা জানতেন, বইমেলা মানে শুধু বই বিক্রি নয়; বইমেলা মানে পাঠক ও প্রকাশকের সরাসরি যোগাযোগ, বইকে ঘিরে একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করা।
অবশেষে ১৯৭৬ সালে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়। শুরু হয় কলকাতা বইমেলা। প্রথম মেলা ছিল আজকের তুলনায় একেবারেই ছোট। স্টল ছিল মাত্র ৩৪টি, প্রবেশমূল্য ৫০ পয়সা। কিন্তু সেই ছোট্ট আয়োজনের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল ভবিষ্যতের বিশাল সম্ভাবনা।
প্রথম বইমেলাতেই নানা প্রতিকূলতা এসেছিল। কালবৈশাখী ও শিলাবৃষ্টিতে মেলার মূল গেট ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু আয়োজকদের মনোবল ভাঙেনি। বিমল ধর ও তাঁর সহযোগীরা রাতারাতি আবার সেই কাঠামো দাঁড় করিয়েছিলেন। কারণ তাঁদের কাছে বইমেলা ছিল কোনো সাধারণ অনুষ্ঠান নয়; এটি ছিল একটি স্বপ্ন, যার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল কলকাতা এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়।
বিমলদার শিল্পীসত্তাও ছিল গভীর। কলকাতা বইমেলার সেই পরিচিত ঐতিহ্যবাহী লোগো—দুটি হাত দিয়ে বইকে আগলে রাখার প্রতীক—তৈরির সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িয়ে আছে। প্রবীর দাশগুপ্ত ও অতীন রায়ের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি সেই লোগোর সৃজনের কাজে যুক্ত ছিলেন। বইকে ভালোবাসার যে অনুভূতি তাঁর মধ্যে ছিল, সেই মমতাই যেন লোগোটির মধ্যেও ধরা পড়ে।
তিনি কলকাতার ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা সংস্থা Academic Publishers-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তাঁর কাজের পরিধি কোনো একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন কলকাতার প্রকাশনা জগতকে আরও সংগঠিত করতে, বইকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে এবং বাংলার প্রকাশনাকে আন্তর্জাতিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত করতে।
ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় তাঁর উপস্থিতি সেই বৃহত্তর স্বপ্নেরই অংশ ছিল। ১৯৭৯ সালে তিনি যখন সেখানে অংশ নেন, তখন সেটি নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। কলকাতা থেকে একজন বাঙালি প্রকাশক বিশ্বের অন্যতম প্রধান বইমেলায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন—এ দৃশ্য আজ সহজ মনে হলেও, সেই সময় তার তাৎপর্য ছিল অনেক বেশি।
সময়ের সঙ্গে কলকাতা বইমেলা বড় হয়েছে। ছোট্ট ৫০ পয়সার মেলা আজ পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও জনসমাগমপূর্ণ বই উৎসবে। দেশ-বিদেশের প্রকাশক, লেখক ও পাঠকের মিলনস্থল হয়ে উঠেছে কলকাতা বইমেলা। কিন্তু এই বিশালতার ভিতরে রয়েছে কিছু মানুষের স্বপ্ন, জেদ, পরিশ্রম এবং ভালোবাসা। বিমল ধর তাঁদের অন্যতম।
তাঁকে নিয়ে লিখতে বসে তাই শুধু ইতিহাসের তথ্য মনে পড়ে না; ব্যক্তিগত স্মৃতিও বারবার ফিরে আসে। বিশেষ করে সেই শেষ বিদায়।
“আমি আর আসব না।”
কত সাধারণ একটি বাক্য! অথচ মানুষ চলে যাওয়ার পর একটি সাধারণ বাক্যই কখনও কখনও সারাজীবনের স্মৃতি হয়ে থাকে।
বিমলদা আজ নেই। ফ্রাঙ্কফুর্টে তাঁর সঙ্গে আর দেখা হবে না। কোনো স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে বই নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা হবে না। মেলার ভিড়ে হঠাৎ পরিচিত মুখটি চোখে পড়বে না।
তবু ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা এলেই তিনি ফিরে আসেন। স্মৃতির পাতায়, কথার ফাঁকে, বইয়ের গন্ধে, মেলার ভিড়ের মধ্যে। মনে হয়, তিনি যেন এখনও কোথাও দাঁড়িয়ে আছেন—বাংলা বই ও বাঙালির প্রকাশনা জগতের সেই দীর্ঘ পথচলার দিকে তাকিয়ে।
তিনি বলেছিলেন, আর আসবেন না। সত্যিই আর আসেননি।
কিন্তু বইমেলা তাঁকে আসতে দেয়নি—তাঁকে ফিরিয়ে এনেছে প্রতি বছর, আমার স্মৃতিতে।
হাবিব বাবুল , প্রধান সম্পাদক , শুদ্ধস্বর ডটকম ।

