সিদ্ধার্থ সিংহের ধারাবাহিক উপন্যাস ‘পাতাদের ঘরবাড়ি’ (পঞ্চম পর্ব)

সোনারপুর স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে বারবার রিচিকে ফোন করছে অচিন। না। ও কিছুতেই ফোন ধরছে না। যদি স্নানে গিয়ে থাকে, যদি বাথরুমে গিয়ে থাকে, ভুল করে বাড়িতে ফোন রেখে যদি আশপাশে কোথাও গিয়েও থাকে, তাই বলে এতক্ষণ! আধঘণ্টার ওপর হয়ে গেছে সে ফোন করে যাচ্ছে। করেই যাচ্ছে। রিংও হচ্ছে। ও যদি ফোনের কাছাকাছি না-ও থেকে থাকে, বাড়ির কেউ কি শুনতে পাচ্ছে না! এত বার ফোন বাজছে, কেউ ধরবে না! না কি কোনও ভাবে সায়লেন্ট মোডে চলে গেছে! গেলেও, যে মেয়ে ফোন ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারে না, যে মেয়ে চার্জে বসিয়ে ড্যাবড্যাব করে ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে, হান্ড্রেড পারসেন্ট চার্জ না হলে ঘুমোতে যায় না, যে মেয়ে মুহুর্মুহু কিছু না কিছু ফেসবুকে পোস্ট করে— সে এতক্ষণের মধ্যে একবারও ফোনের দিকে তাকায়নি, এটা হতে পারে!

তা হলে কি কোনও কারণে ও তার ওপরে রাগ করেছে! কিন্তু রাগ করার মতো তো তেমন কিছু হয়নি! না কি ওরই কোনও বন্ধু তার সম্পর্কে উল্টোপাল্টা কিছু একটা বলে ওর কান ভাঙিয়েছে!

রিচির অনেক বন্ধুর সঙ্গেই তার আলাপ আছে। ঘনিষ্ঠতাও আছে কারও কারও সঙ্গে। তাদের অনেকের নম্বরও আছে তার কাছে। তার নম্বর দেখে ধরছে না দেখে অচিন তাদের দু’জনেরই কমন ফ্রেন্ড সুমনাকে ফোন করল। বলল, ও বোধহয় কোনও কারণে আমার উপরে রেগে আছে। অনেক বার ফোন করেছি। ধরছে না। একবার ফোন করে বল না, আমার ফোনটা ধরতে।

সুমনা বলল, একটা মেসেজ কর না।

— করেছি। কিন্তু ও মনে হয় পাচ্ছে না।

— তা হলে হোয়াসট অ্যাপ কর।

অচিন বলল, করেছি। পোস্টও হয়েছে। কিন্তু ও এখনও দেখেনি। দেখলে তো দুটো সবুজ দাগ দেখাত।

— ঠিক আছে, আমি ওকে ফোন করছি।

— কী হল আমাকে একটু জানাস।

— ঠিক আছে। বলেই, ফোনটা কেটে দিল সুমনা। এ রকম ভাবে সাধারণত কেউ হুট করে ফোন কাটে না। তা হলে কি সুমনাও তাকে এড়িয়ে যাচ্ছে! নাঃ, সুমনার ওপরে ভরসা করে লাভ নেই। আমি বরং একবার তানিয়াকে ফোন করে দেখি।

তানিয়া মূলত রিচিরই বন্ধু। এখন অবশ্য ওদের দু’জনের সঙ্গেই খুব ভাল সম্পর্ক। বহু দিন অনেক রাত অবধি তিন জনে মিলে কনফারেন্সে কথা বলে।

অচিন ফোন করল তানিয়াকে। সুমনাকে যা যা বলেছিল, সেই একই কথা একটু এ-দিক ও-দিক করে তানিয়াকেও বলল। তানিয়া বলল, তাই নাকি? কোথায়, কাল রাতেও তো আমার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা হল। সে রকম কিছু বুঝতে পারলাম না তো…

— সে তো আমার সঙ্গেও রাত দেড়টা পর্যন্ত কথা হয়েছে…

— তা হলে!

— সেটাই তো বুঝতে পারছি না।

— রিং হচ্ছে?

অচিন বলল, হ্যাঁ, রিং হচ্ছে।

— তা হলে বোধহয় পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছে।

— না না, এখন কি ঘুমোবে? ক’টা বাজে জানিস?

তানিয়া জিজ্ঞেস করল, ক’টা? আমি তো এখনও বিছানায়। তোর ফোন এল বলে উঠলাম।

— ওর সঙ্গে রাতে কথা হয়েছে। ও জানে এগারোটা নাগাদ আমি সোনারপুর স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের সামনে ওর জন্য দাঁড়িয়ে থাকব।

— সে কী! তুই কি সোনারপুরে?

অচিন বলল, হ্যাঁ। অনেকক্ষণ। ওকে আধঘণ্টা ধরে ফোন করে যাচ্ছি।

— ওর কখন আসার কথা?

অচিন বলল, আসলে… কথা ছিল আমি যাদবপুর থেকে ট্রেনে ওঠার সময় ওকে একটা ফোন করব। আমার ফোন পেলে ও বাড়ি থেকে বেরিয়ে অটো করে সোনারপুর স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের সামনে চলে আসবে। কিন্তু ও তো সেই থেকে আমার ফোনই ধরছে না।

— আচ্ছা ঠিক আছে, আমি দেখছি।

তানিয়া ফোন রাখতেই অচিনের ফোন বেজে উঠল। এতক্ষণে মেয়ের সময় হল! মনে মনে ভেবে ফোনটা ধরতেই ও প্রান্ত থেকে সুমনার গলা ভেসে এল, না। আমিও তো পেলাম না। অনেক বার করলাম। রিং হচ্ছে। কী হল বুঝতে পারছি না…

— কী করা যায় বল তো!

সুমনা বলল, ওদের বাড়িতে তো ল্যান্ড ফোন নেই, না?

— থাকলেও আমি তার নম্বর জানি না।

— আচ্ছা, ওর বাড়ির কাছাকাছি থাকে এমন কাউকে চিনিস?

— না রে…

— তা হলে… তা হলে… তা হলে…

বিপ বিপ বিপ… বিপ বিপ বিপ… অচিন বুঝতে পারল একটা কল তার ফোনে ঢোকার চেষ্টা করছে। সঙ্গে সঙ্গে অচিন বলল, একটা ফোন আসছে, রাখ, আমি তোকে পরে করছি।

সুমনা যখন ফোন ছাড়ল ততক্ষণে লাইনটা কেটে গেছে। কে করেছে! রিচি? না। এটা তো তানিয়ার নম্বর। সঙ্গে সঙ্গে কল ব্যাক করল তানিয়াকে। নিশ্চয়ই কোনও একটা খবর দিতে পারবে সে। কিন্তু ও যত বার ফোন করল, নট রিচেবল। নট রিচেবল আর নট রিচেবল।

আর সুস্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছে না অচিন। টিকিট কাউন্টারের সামনের একচিলতে জায়গায় পায়চারি করছে আর রিচিকে ফোন করে যাচ্ছে। রিং থামামাত্রই আবার ফোন, আবার ফোন, আবার ফোন। ফোন করতে করতেই অচিন টিকিট কাউন্টারে যাওয়ার বড় ফটকটার সামনে দাঁড়িয়ে চোখ রাখছে রিকশা আর অটোরিকশাগুলো দিকে। মন বলছে, ফোন না ধরলেও ও ঠিক আসবে। দেরি হলেও আসবে! ঠিক তখনই হঠাৎ অচিন দেখল, একটা টোটো একেবারে সিঁড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। আরও দু’-তিন জনের সঙ্গে সেই টোটো থেকে নামল রিচি। অচিন কয়েকটা ধাপের প্রশস্ত সিঁড়িটার দুটো ধাপ নামার আগেই হন্তদন্ত হয়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল সে, আমাকে ফোন করেছিলি?

অচিন দেখল রিচির হাতে ফোন। একটু বিরক্ত হয়েই মনে মনে বলল, জানিস না আমি করেছিলাম কি না… যত্ত সব ন্যাকামো। কিন্তু মুখে বলল, একবার? কত বার করেছি ঈশ্বরই জানেন। তোকে না পেয়ে তানিয়াকে করেছি। সুমনাকে করেছি। ওরাও তোকে করেছিল।রিং হচ্ছে। কী হল বুঝতে পারছি না…

— কী করা যায় বল তো!

সুমনা বলল, ওদের বাড়িতে তো ল্যান্ড ফোন নেই, না?

— থাকলেও আমি তার নম্বর জানি না।

— আচ্ছা, ওর বাড়ির কাছাকাছি থাকে এমন কাউকে চিনিস?

— না রে…

— তা হলে… তা হলে… তা হলে…

বিপ বিপ বিপ… বিপ বিপ বিপ… অচিন বুঝতে পারল একটা কল তার ফোনে ঢোকার চেষ্টা করছে। সঙ্গে সঙ্গে অচিন বলল, একটা ফোন আসছে, রাখ, আমি তোকে পরে করছি।

সুমনা যখন ফোন ছাড়ল ততক্ষণে লাইনটা কেটে গেছে। কে করেছে! রিচি? না। এটা তো তানিয়ার নম্বর। সঙ্গে সঙ্গে কল ব্যাক করল তানিয়াকে। নিশ্চয়ই কোনও একটা খবর দিতে পারবে সে। কিন্তু ও যত বার ফোন করল, নট রিচেবল। নট রিচেবল আর নট রিচেবল।

আর সুস্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছে না অচিন। টিকিট কাউন্টারের সামনের একচিলতে জায়গায় পায়চারি করছে আর রিচিকে ফোন করে যাচ্ছে। রিং থামামাত্রই আবার ফোন, আবার ফোন, আবার ফোন। ফোন করতে করতেই অচিন টিকিট কাউন্টারে যাওয়ার বড় ফটকটার সামনে দাঁড়িয়ে চোখ রাখছে রিকশা আর অটোরিকশাগুলো দিকে। মন বলছে, ফোন না ধরলেও ও ঠিক আসবে। দেরি হলেও আসবে! ঠিক তখনই হঠাৎ অচিন দেখল, একটা টোটো একেবারে সিঁড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। আরও দু’-তিন জনের সঙ্গে সেই টোটো থেকে নামল রিচি। অচিন কয়েকটা ধাপের প্রশস্ত সিঁড়িটার দুটো ধাপ নামার আগেই হন্তদন্ত হয়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল সে, আমাকে ফোন করেছিলি?

অচিন দেখল রিচির হাতে ফোন। একটু বিরক্ত হয়েই মনে মনে বলল, জানিস না আমি করেছিলাম কি না… যত্ত সব ন্যাকামো। কিন্তু মুখে বলল, একবার? কত বার করেছি ঈশ্বরই জানেন। তোকে না পেয়ে তানিয়াকে করেছি। সুমনাকে করেছি। ওরাও তোকে করেছিল। রিংও হচ্ছিল। কিন্তু কারও ফোনই তুই ধরিসনি।

— আরে বাবা, ফোনটা মনে হয় নষ্ট হয়ে গেছে।

— কী করে?

রিচি বলল, জলে পড়ে গেছে।

— জলে! সে কী! কী করে!

— আর বলিস না। স্নান করার সময় চৌবাচ্চার উপরে রেখেছিলাম। গা মোছার জন্য তোয়ালেটা নিতে গেছি, ব্যস, তোয়ালের কোনায় বেঁধে কী ভাবে যে চৌবাচ্চার মধ্যে পড়ে গেল!

অচিন বলল, তুই কি স্নান করতে যাওয়ার সময়ও মোবাইল নিয়ে যাস নাকি?

— আরে, না রে বাবা… তুই বলেছিলি না, ট্রেনে ওঠার আগে ফোন করবি। সে জন্যই তো ফোনটা সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলাম।

— তুই বলছিস চৌবাচ্চায় পড়ে গেছে। নষ্ট হয়ে গেছে। তা হলে তোকে ফোন করলে রিং হচ্ছে কী করে?

— তা আমি কী করে জানব? দ্যাখ, এই তো ফোন। বলেই, অচিনের দিকে ফোনটা এগিয়ে দিল রিচি।

— আমি নিয়ে কী করব? কিছু বুঝব? আমি কি মেকানিক?

রিচি বলল, রাগ করছিস কেন?

— করব না?

 

— আচ্ছা, যখন দেখলি তোর ফোনটা খরাপ হয়ে গেছে, তখন তো অন্য কারও ফোন থেকে, না হয় যে কোনও একটা পিসিও বুথ থেকে আমাকে একটা ফোন করতে পারতিস?

— আমি কি চেষ্টা করিনি?

অচিন বলল, তা হলে করিসনি কেন?

— করব কী করে? নম্বরটা তো ফোনের মধ্যে।

— এত বার ফোন করিস, আমার নম্বরটা তোর মনে নেই?

রিচি বলল, না রে, আসলে তোর নম্বরটা তো কোথাও লেখা নেই। ফোনের মধ্যে সেভ করা। ট্রিপল এ লিখলেই তোর নম্বরটা চলে আসে। ওটা টিপেই তো ফোন করি। যদি ল্যান্ড ফোন থেকে করতাম, নম্বর দেখে দেখে, তা হলে নিশ্চয়ই মনে থাকত। তোর নম্বরটা আজ লিখে দিস তো…

— তার আগে চল, আশপাশে কোনও মোবাইল সারানোর দোকান আছে কি না দেখি…

— দেখিয়ে লাভ নেই। আমাদের পাড়াতেই একটা দোকান আছে। খুব ভাল। আসার সময় ওখানে দেখিয়েছিলাম। ছেলেটা বলল, এটা সারিয়ে আর কোনও লাভ নেই। যা খরচ পড়বে, তার চেয়ে নতুন কিনে নেওয়া ভাল।

অচিন বলল, ঠিক আছে, ক’দিন পরে তোকে একটা কিনে দেব।

— না। তোকে কিনে দিতে হবে না। আমিই কিনে নেব।

— সে কী রে! আমি তো এই প্রথম শুনলাম, কোনও মেয়ে নিজের টাকায় মোবাইল কিনবে বলছে…

রিচি বলল, কেন, মেয়েরা কেনে না?

— যদি কোনও মেয়ে নিজের টাকায় মোবাইল কেনে— শুধু মোবাইল কেন, সেন্ট, লিপস্টিক, পার্স, এমনকী প্যাডও কেনে— তা হলে বুঝতে হবে, তার কোনও দামই নেই। তার পুকুরে ডুবে মরা উচিত।

— কেন?

— কারণ, সে মেয়ে। আর তার যদি ছাপাই বাঁধাই ভাল হয়, তা হলে তো কোনও কথাই নেই। তার সব কিছু ফ্রি।

— মানে?

অচিন বলল, নিজের দাম বুঝতে শেখ। নিজের দাম।

— আমাকে কিছু বুঝতে হবে না। আমি কালই একটা নতুন ফোন কিনে নেব।

— টিউশন করে প্রচুর টাকা জমিয়েছিস, না?

— একদম না।

— তা হলে?

রিচি বলল, দাদা আছে না?

— টুম্পা?

— হ্যাঁ।

অচিন জিজ্ঞেস করল, মামির কাছে যাচ্ছে এখনও?

— এই বাজে কথা রাখ তো… চল।

— কোথায়?

রিচি বলল, জাহান্নামে।

এ-ওর মুখের দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসল। তার পর… না। রিকশায় না। অটোয় না। এমনকী টোটোতেও না। দু’জনেই খুব ধীরে ধীরে গুটিগুটি পায়ে এগোতে লাগল কামালগাজির দিকে।

 

১০

মামার বাড়ি ঢুকেই টুম্পার যেন কেমন লাগল। মামা এখনও বাড়িতে! মামার তো আজ নাইট ডিউটি! ন’টার মধ্যে বেরিয়ে যাওয়ার কথা। এখন তো প্রায় এগারোটা বাজে! তা হলে কি এ সপ্তাহে নাইট ডিউটি নয়! আমি কি হিসেবে ভুল করেছি! ভুল করলেও ঢুকে যখন পড়েছি, তখন দেখা না করে যাওয়াটা ঠিক হবে না…

টুম্পা ঘরে ঢুকে দেখল মামা থম মেরে বসে আছে। মামিরও মুড তথৈবচ। ওকে দেখেও কেউ কিছু বলছে না দেখে টুম্পাই মুখ খুলল, কী গো মামা, তোমার শরীর খারাপ নাকি?

— নাঃ। দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে প্রতাপের মুখ থেকে বেরিয়ে এল শব্দটা।

টুম্পা বলল, আজ তোমার নাইট ডিউটি ছিল না?

— ছিল।

— তা হলে?

— আর যেতে হবে না।

— মানে?

ততক্ষণে শেফালি সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। শেফালিই বলল, কারখানায় তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে।

— হঠাৎ?

প্রতাপ তখনও চুপচাপ বসে আছে। চোখ-মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, মনের ওপরে এমন চাপ পড়েছে যে, কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। ফের শেফালিই বলল, হঠাৎ নয়। ক’দিন ধরেই নানা দাবিদাওয়া নিয়ে মালিকপক্ষের সঙ্গে ওদের ইউনিয়নের খুব ঝামেলা হচ্ছিল। গত তিন বছর ধরে তো একটা পয়সাও বাড়ায়নি। এ বছর বোনাসটা যাতে অন্তত কিছুটা বাড়ায় সে নিয়ে ওদের অফিসের সব ক’টা ইউনিয়ন, এমনকী যে ইউনিয়নটা মালিকের বলেই সবাই জানে, সেই ইউনিয়নও যখন ওদের সঙ্গে এক জোট হয়ে মালিকপক্ষকে চাপ দিচ্ছিল, তখন নিশ্চয়ই মালিকপক্ষ সত্যি সত্যিই কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। তাই…

টুম্পার মনে পড়ে গেল সাত বছর আগেও মামার কারখানা একবার বন্ধ হয়েছিল। এই কারখানার মাইনে এত কম যে দু’বেলা খেয়ে ছেলেমেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে টাকা জমানো তো দূরের কথা, মাসের শেষে এর-তার কাছে হাত পাততে হয়। কারখানা খোলা থাকলে তাও কেউ কেউ ধার দেয় ঠিকই, কিন্তু কারখানা বন্ধ থাকলে কোন ভরসায় লোকে ধার দেবে? সে সময় যত দিন কারখানা বন্ধ ছিল, যেহেতু রাত্রিবেলায় মামা বাড়িতেই থাকত, তাই টুম্পাকে আর মামার বাড়িতে শুতে যেতে হয়নি।

মামার তাও একটা সুবিধে ছিল, ছেলেমেয়ে নেই। কিছু টাকাপয়সাও সঞ্চয় করেছিল। কিন্তু তাতে কি আর অনন্তকাল বসে খাওয়া যায়! মামা ঠিক করেছিল কোনও একটা ব্যবসা করবে। কিন্তু কোন ব্যবসা!

এটা যেমন ভাবছিল, তেমনই ইউনিয়নের ডাকে প্রায়ই ছুটে যাচ্ছিল কারখানার গেটে। টানা তিন মাস ধরে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে মালিকপক্ষকে যখন কারখানা খোলার জন্য রাজি করানো হল, তখন তারা শর্ত দিয়েছিল, উৎপাদন বাড়াতে হবে এবং সেটা যদি তাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারে, তবেই ওদের দাবিদাওয়া নিয়ে তারা ভাবনাচিন্তা করবে এবং ইউনিয়নগুলির সঙ্গে বৈঠকে বসবে।

শেষ পর্যন্ত কারখানা খুলেছিল। আর কারখানা খুলতেই মামার মাথা থেকে নেমে গিয়েছিল ব্যবসা করার পরিকল্পনা। কিন্তু বছরখানেক যেতে না-যেতেই লক্ষ্যমাত্র তো বটেই, তার থেকেও অনেক অনেক অনেক বেশি উৎপাদন বাড়ানোর পরেও মালিকপক্ষ কোনও সাড়াশব্দ করছিল না। সেটা নিয়ে কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধছিল। মালিকপক্ষকে চিঠিচাপাটি দেওয়া হচ্ছিল। কোনও সদুত্তর না মেলায় কারখানার গেটের সামনে ধরনায় বসেছিল।

এই ভাবেই কেটে গিয়েছিল বেশ কয়েকটা বছর। এ বার অধৈর্য হয়ে সব ক’টা ইউনিয়ন একত্রিত হয়ে উঠেপড়ে লেগেছিল মালিককে উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য। উল্টে মালিকই ওদের শিক্ষা দিয়ে ছাড়ল। যারা সকাল ছ’টা থেকে বেলা দুটো অবধি ডিউটি করে, বেলা দুটো থেকে রাত দশটা অবধি, তারাও কিচ্ছু টের পায়নি। রাত দশটায় নাইট ডিউটি করার জন্য যারা কারখানার ভিতরে ঢুকতে যাচ্ছিল, তাদের আটকে দিয়েছিল নিরাপত্তারক্ষীরা। তাও যারা জোর করে ঢুকেছিল, আগে থেকে ভিতরে মজুত থাকা সাদা পোশাকের পুলিশ তাদের বের করে দিয়েছিল। এবং তাদের বের করে দিয়েই গেটের সামনে ঝুলিয়ে দিয়েছিল নোটিশ— লক আউট।

সকালের ডিউটির লোকেরা ছুটির পরে কেউ কেউ কারখানার গেটের সামনে চায়ের দোকানে এর-তার সঙ্গে গুলতানি মারলেও, ইউনিয়ন অফিসে গিয়ে সময় কাটালেও, ডে ডিউটির লোকেরা কিন্তু ছুটির পরে কারখানার গেট থেকে বেরোলে আর এক মিনিটও সেখানে দাঁড়ায় না। বাড়ি ফেরার জন্য বাস ধরতে ছোটে। কেউ কেউ বাস ধরে শিয়ালদা বা হাওড়া স্টেশনে যায়। সেখান থেকে শেষ কিংবা ভাগ্য ভাল থাকলে শেষের আগের ট্রেনটা কোনও মতে ধরে।

ফলে, ডে ডিউটির কেউ ছিল না। যারা নাইট ডিউটি করতে গিয়েছিল, তারাই খানিকক্ষণ গেটের সামনে জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সেখানেও থাকতে দেয়নি পুলিশ। তাদের বুঝিয়েসুঝিয়ে গেটের সামনে থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। গেট থেকে একশো মিটারেরও বেশি দূরে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে নানা আলোচনা করছিল। একে ফোন করছিল। তাকে ফোন করছিল। অবশেষে ঠিক করেছিল, এত রাতে তো আর কিছু করা যাবে না। বরং কাল সকাল সকাল সবাই আসব। তার পর দেখা যাক কী হয়।

হঠাৎ করে এ রকম হওয়ায় চোখে-মুখে অন্ধকার দেখতে লাগল প্রতাপ। ভেঙে পড়ল শেফালিও। টুম্পা বলল, তোমাদের অত চিন্তা করতে হবে না। আমি তো আছি। একটা না-একটা কোনও ব্যবস্থা ঠিকই হয়ে যাবে।

প্রতাপ বলল, আমি ভাবছিলাম, সামনের দিকে একটা ঘর তুলে যদি মুদিখানার দোকান দিই, কেমন হবে?

টুম্পা বলল, মুদিখানার দোকান! এই বয়সে পারবে?

শেফালি গলা চড়িয়ে বলল, না না না। তুমি পারবে না। তার পর দেখা যাবে যে ক’টা টাকা সম্বল আছে, সেটাও গেল।

— তা হলে কি দোকানঘর বানিয়ে ভাড়া দেব?

— কে কী রকম লোক তুমি চিনতে পারবে? তার পর দেখা যাবে সুচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরোল। একটা ঘর ভাড়া নিয়ে পুরো বাড়িটায় থাবা বসাল। তখন?

— তা হলে কী করব?

টুম্পা বলল, দাঁড়াও না, ভাবতে দাও। আজই সবে এই ঘটনা ঘটল। দুটো দিন সময় দাও। হুটহাট করে কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ো না। তোমাদের তো এমন অবস্থা নয় যে, কাল কী খাবে তার জন্য ভাবতে হবে। দাঁড়াও, দেখি কী করা যায়!

শেফালি বলল, আমি একটা কথা বলব? আমরা তো মোটে দু’জন মানুষ। আমাদের তিনটে ঘর। আমরা যদি একটা ঘরে সব মালপত্র এনে বাকি দুটো ঘরে শ্যামলীদের মতো পেয়িং গেস্ট রাখি, তা হলে কেমন হয়?

জায়গাটা সোনারপুর স্টেশন থেকে একটু দূরে হলেও, যেহেতু এটা জংশন, সব ট্রেন থামে, তাই যাদের বাড়ি ভিনরাজ্যে কিংবা শহর থেকে অনেক দূরে, অথচ খোদ কলকাতায় কিংবা কলকাতার আশপাশে পড়াশোনা করে বা চাকরিবাকরি করে, তারা একটু কম খরচে থাকা-খাওয়ার জন্য এই রকম নিরিবিলি জায়গাই বেছে নেয়। না হলে এই অঞ্চলে এত পেয়িং গেস্ট থাকবে কেন?

প্রতাপ বলেছিল, পেয়িং গেস্ট রাখার প্রচুর হ্যাপা। তাদের রান্নাবান্না করা, খাবার পছন্দ না হলে তাদের গোমড়া মুখ দেখা, এক-একজনের জন্য এক-এক রকম পদ করা। তার ওপর কে কেমন… না না না…

টুম্পা বলল, তা হলে পেয়িং গেস্ট রেখো না। একটা কাজ করো, ছোট কোনও পরিবার দেখে ভাড়া দিয়ে দাও।

প্রতাপ বলল, এটা মন্দ নয়। তবে এখন যা নিয়মকানুন হয়েছে, নতুন ভাড়াটে রাখতে গেলে তাদের ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, তাদের ছবি, আগে কোথায় থাকত, তার যাবতীয় নথিপত্র লোকাল থানায় জমা দিতে হয়। কোর্ট পেপারে এগ্রিমেন্ট করতে হবে।

—  এটা কি আর সবাই করে?

কিন্তু নিয়ম তো… পরে যদি কোনও সমস্যা হয়, তখন থানাপুলিশ…

শেফালি বলল, আচ্ছা, যদি কয়েকটা কলেজ স্টুডেন্টকে ভাড়া দিই, মানে তারা একসঙ্গে থাকল, নিজেদের মতো রান্নাবান্না করে খেল… আমাদের কোনও ঝামেলা রইল না।

টুম্পা বলল, হ্যাঁ, সেটাও করতে পারো। তবে তার জন্য একটা লিফলেট তৈরি করতে হবে। সেটা আশপাশের রেল স্টেশনগুলোর টিকিট কাউন্টারের সামনে লাগাতে হবে।

প্রতাপ বলল, যাদবপুর স্টেশনটা মাস্ট।

শেফালি বলল, কেন?

টুম্পা বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, মামা ঠিকই বলেছে। যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে তো অনেক দূর দূর থেকেও পড়তে আসে। আর যারা দূরদূরান্ত থেকে পড়তে আসে, তারা সাধারণত ট্রেনেই যাতায়াত করে।

প্রতাপ বলল, যারা রোজ রোজ ট্রেনে আসে, তারা কি আর প্রত্যেক দিন টিকিট কাউন্টারের সামনে যায়? তারা তো মান্থলি করে।

— করলেও… ওখানে লাগাতে হবে।

— ট্রেনের কামরায় লাগালে হয় না? মামি বলতেই, মামা বলল, তা হলে কত হ্যান্ডবিল ছাপাতে হবে জানো? ঢাকের দায়ে মনসা বিক্রি হয়ে যাবে।

— তা হলে?

মামিকে এই ব্যাপারটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে দেখে টুম্পা বলল, দেখিই না… টিকিট কাউন্টারগুলোর সামনে লিফলেট মারলেই যদি আমাদের কাজ মিটে যায়, তা হলে খামোকা ট্রেনের কামরায় মারতে যাব কেন? হ্যাঁ, ওই সব জায়গায় লিফলেট মারার পরেও যদি স্টুডেন্ট পাওয়া না যায়, তখন দেখা যাবে।

শেফালি বলল, তা হলে কবে থেকে শুরু করবে?

— আগে ওই ঘরগুলো খালি করো।

প্রতাপ বলল, হ্যান্ডবিল মারার সঙ্গে সঙ্গেই তো আর লোক আসবে না। সময় লাগবে। আগে লোক জোগাড় হোক। তার পর তো ঘর…

টুম্পা বলল, হয়ে যাবে। ঠিক জোগাড় হয়ে যাবে।

— কত করে বলবে?

মামির কথা শুনে টুম্পা বলল, তার আগে দেখতে হবে আশপাশে যারা পেয়িং গেস্ট রাখছে, তারা কত করে নেয়।

প্রতাপ বলল, সেই রেট রাখলে তো হবে না। ওরা খাওয়াদাওয়া দেয়। সেগুলো ধরে জনপ্রতি একটা টাকা নেয়। আমরা তো খাওয়াদাওয়া দেব না।

টুম্পা বলল, না। আমি সে কথা বলছি না। বলছি, ওই হিসেবটা পেলে আমরা একটা আন্দাজ পাব তো… তার পর না হয় একটা রেট ধার্য করব।

প্রতাপ বলল, ঠিক আছে। খোঁজখবর শুরু করো।

টুম্পা বলল, ঠিক আছে, আমি তা হলে আজ উঠি।

শেফালি বলল, কেন?

— মামা আছে তো…

— তাতে তোমার চলে যাওয়ার কী হল?

প্রতাপ বলল, হ্যাঁ, এসেছ যখন থেকে যাও। আবার বাড়ি যাবে কেন?

কাউকেই আর দ্বিতীয় বার বলতে হল না। এখানে থাকলে রাতে যে ঘরে টুম্পা শোয়, সে ঘরে সুড়সুড় করে গিয়ে জামাপ্যান্ট ছেড়ে লুঙ্গি পরে নিল।

শেফালি এসে বলল, কিছু খাবে?

— হ্যাঁ, একটু খেলে হত…

— কী খাবে?

জুলজুল চোখে শেফালির দিকে তাকিয়ে টুম্পা বলল, তোমাকে।

— এই, মামা আছে না… ধ্যাত! বলেই মুচকি হেসে ও ঘর থেকে তড়িঘড়ি বেরিয়ে গেল শেফালি। টুম্পা খাটের ধারে ধপাস করে বসে পড়ল।

 

চলবে………

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.