শুধু তার মুখটা একবার দেখতে চাই

 

মা’রে মা তুই কোথায় চলে গেলি। আমার বুকটা খালি হয়ে গেল। আমি এখন কি নিয়ে বাঁচবো। আমার মেয়েটা আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আমারে আর মা বলে ডাকবে না। মেয়েটারে একবার আমার সামনে এনে দাও। আমি আর কিচ্ছু চাই না। শুধু তার মুখটা একবার দেখতে চাই।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কারখানার অগ্নিকাণ্ডে নিহত পমপা বর্মনের মা সোমা রানী বর্মন মেয়ের ছবি নিয়ে এভাবেই আহাজারি করছিলেন। পাশে দাঁড়িয়ে তাকে সান্ত্ব্তনা দিচ্ছিলেন স্বজনরা। কিন্তু কিছুতেই তার আহাজারি থামছিল না।

নিহত পমপা বর্মনের ভাই দুর্জয় বর্মন মানবজমিনকে বলেন, গত মাসের ২৫ তারিখ মৌলভীবাজার মনুমুখের বাড়ি থেকে আমি আর পমপা ঢাকায় এসেছি। আমার বোন সজীব গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ফুডস ফ্যাক্টরিতে চলতি মাসের ১ তারিখে ৪ হাজার ৮০০ টাকা বেতনে যোগ দেন। আর আমি পাশের আরেকটি কারখানায় চাকরি নিয়েছি। ৮ দিন ধরে আমার বোন সেখানেই ডিউটি করছিল। যে ভবনে আগুন লেগেছে তার চারতলায় সে ডিউটি করতো। তৈরি করা চকলেট কৌটার মধ্যে ভর্তি করাই তার কাজ ছিল। পমপা যে কারখানায় কাজ করতো সেখানে আমাদের গ্রামের আরও কয়েকজন কাজ করে। তারা ১ম ও ২য় তলায় কাজ করে। আগুন লাগার পর তারা ফোন করে জানিয়েছে কারাখানায় আগুন লেগেছে। তারা বের হয়ে গেছে। কিন্তু পমপা চার তলায় কাজ করে। সেখানে আরও অনেকেই আটকা পড়েছে। তাদের সঙ্গে পমপাও আছে। এরপর বৃহস্পতিবার সারা রাত, শুক্রবার দুপুর ২টা পর্যন্ত তার কোনো খোঁজ পাইনি। পরে জানতে পারলাম চারতলা থেকে ৪৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ খবর পেয়ে মর্গে যাই বোনের মরদেহ খুঁজতে। পমপার মা সোমা রানী বর্মন বলেন, আমার মেয়েটাকে আর ফিরে পাবো না। শুনেছি আগুনে পুড়ে সবাই কয়লা হয়ে গেছে। মৌলভীবাজারের চাঁনপুরের মনুমুখের মেয়ে পমপার বাবা পরবা চন্দ্র বর্মন মাছের ব্যবসা করেন। পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে পমপা তৃতীয়।
শুধু পমপার স্বজনরা নন, রূপগঞ্জের কারখানায় আগুনে পুড়ে নিহত হওয়া স্বজনদের কান্নায় ভারী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ এলাকা। ঘটনাস্থল থেকে গতকাল বিকাল ৩টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের ৫টি এম্বুলেন্সে করে আনা হয়েছে ৪৯টি মরদেহ। মর্গ সহকারীরা এম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে ট্রলিতে করে মরদেহের সারি করেন। মরদেহগুলো থেকে বের হচ্ছিল পোড়া গন্ধ। মরদেহগুলো পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। ১টি মরদেহও শনাক্ত করার অবস্থা নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমেই শনাক্ত করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। তবে স্বজনদের মরদেহের আশেপাশে ভিড়তে দেয়া হয়নি। মর্গের অদূরে চোখে জল আর হাতে ছবি নিয়ে স্বজনরা অপেক্ষা করছিলেন। প্রিয়জনের মর্মান্তিক মৃত্যু সংবাদ পেয়ে তারা ছুটে এসেছেন সেখানে। তাদের কান্নাকাটিতে গতকাল ঢামেক মর্গে অন্যরকম পরিবেশ তৈরি হয়। প্রিয় মানুষটির এমন মর্মান্তিক মৃত্যু হবে এমনটি কেউ ভাবেননি।
দুই ভাইয়ের ছবি হাতে নিয়ে মর্গে মরদেহ খুঁজতে এসেছেন তানিয়া বেগম। চোখে জল নিয়ে চারদিকে ছোটাছুটি করছিলেন। মরদেহের সারিতে গিয়ে ভাইদের খোঁজার চেষ্টা করেন। কিন্তু পুলিশি বাধার কারণে সেটি সম্ভব হচ্ছিল না। তানিয়া মানবজমিনকে বলেন, আমার আপন ভাই হাসনাইন (১৪)। ভোলার চরফ্যাশনে আমাদের বাড়ি। বেশিদূর লেখাপড়া করেনি আমার ভাই। আমাদের এলাকার মোতালেব চাচা ওই কারখানায় আগে থেকে চাকরি করতেন। তাই তিনি গত মাসে বাড়ি গিয়ে আমার দুই ভাইসহ গ্রামের আরও ১০ জনকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। আমার মা-বাবা হাসনাইনকে এত দূরে কাজে দিতে চাননি। কিন্তু মোতালেব চাচা অনেকটা জোর করে তাকে নিয়ে এসেছেন। বলেছেন, কোনো সমস্যা হবে না। দুই মাস কাজ করে আবার বাড়ি চলে যাবে। সেই হিসাবে অল্প বেতনে দুই মাস ধরে ওই কারখানায় কাজ করছিল। গত বৃহস্পতিবার বিকালে কারখানায় আগুন লেগেছে এই খবর পেয়ে আমরা কারখানায় গিয়ে খোঁজ করি। সারা রাত অপেক্ষা করে ভাইয়ের সন্ধান পাইনি। হাসনাইন ছাড়াও আমার চাচাত ভাই রাকিব (১৭) একই কারখানার চার তলায় কাজ করে। ঘটনার পর থেকে তারা দুজনই নিখোঁজ। আমার দুই ভাই ছাড়া ওই কারখানাতে কাজ করা আমাদের গ্রামের ১০ জনের খোঁজও পাওয়া যাচ্ছে না। ধারণা করছি অগ্নিকাণ্ডে তারাও নিহত হয়েছে। তানিয়া বলেন, বাড়িতে আমার বাবা ফজলু মিয়া ও মা নাজমা বেগম কান্নাকাটি করছেন। অনেক আদরের ভাই আমাদের। তাকে হারিয়ে আমাদের পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এলো। নিহত রাকিব তিন বছর ধরে ওই কারখানায় কাজ করে বলে জানিয়েছেন তানিয়া।  রাকিব একই এলাকার কবির হোসেন ও শাহিনুর বেগমের ছেলে।
ভাগ্নে সাজ্জাদ হোসেন সজীবের (২২) ছবি নিয়ে নির্বাক দাঁড়িয়ে ছিলেন মাহফুজুর রহমান। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বারবার বলছিলেন আল্লাহ আমার ভাগ্নেটারে বাঁচাইয়া দিও। আমার বোনের বুকটা খালি করো না। বড় আদরের ভাগ্নে। তার কিছু হয়ে গেলে আমার বোনরে সান্ত্ব্তনা দেয়ার ভাষা নাই। এই ৪৯টি মরদেহের মধ্যে যেন আমার ভাগ্নে না থাকে। মানবজমিনকে মাহফুজুর রহমান বলেন, আমার ভাগ্নে সাজ্জাদ হোসেন সজীব (২২) এবং আমার ভাই মঞ্জুরুল ইসলাম ফ্যাক্টরির ৪ তলায় কাজ করতো। বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টার দিকে তারা একসঙ্গে ভবনের চার তলায় ছিল। ভাগ্নে সাজ্জাদ নাশতা খেতে বাইরে যাওয়ার জন্য রুম থেকে বের হয়। ভাই থেকে যায়। এরপরই হঠাৎ চারদিক থেকে আসা কালো ধোঁয়ায় জ্ঞান হারায় মঞ্জুরুল। এরপর জানালার কাছ থেকে মঞ্জুরুলকে উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। কিন্তু ভাগ্নে সাজ্জাদের কোনো খোঁজ মেলেনি। তার ব্যবহৃত মোবাইলটাও বন্ধ। সজীবের বাড়ি দিনাজপুরের পার্বতীপুরে।
ছবি হাতে নিয়ে বউ জাহানারা বেগমকে (৩৪) খুঁজতে এসেছেন খোকন মিয়া। কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ থানা এলাকার বাসিন্দা খোকন রূপগঞ্জের গাউছিয়া এলাকায় ডিমের ব্যবসা করেন। আর স্ত্রী ওই কারখানায় কাজ করতেন। তিন বছর ধরে জাহানারা ওই কারখানায় ৬ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করছেন। কারখানায় আগুন লাগার পর জাহানারা তার স্বামীকে ফোন দিয়ে জানিয়েছেন তারা বের হতে পারছেন না। একটা বড় রুমে তাদের আটকে রাখা হয়েছে। রাত ৮টা পর্যন্ত স্ত্রীর সঙ্গে খোকন মিয়ার শেষ কথা হয়। এরপর থেকে আর কোনো খবর পাননি। মানবজমিনকে খোকন মিয়া বলেন, আমার স্ত্রী রাত ৮টা পর্যন্ত আমাকে বারবার ফোন দিয়ে বাঁচার আকুতি জানিয়েছে। কিন্তু আমি কিশোরগঞ্জ ছিলাম তাকে কোনোভাবে বাঁচাতে পারিনি। আমার স্ত্রীর সঙ্গে ভাতিজা কাইয়ুমের স্ত্রী পাকিমা বেগমও কাজ করতো। তারা দুজন একই স্থানে ছিল। তাকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এখানে অনেক মরদেহ আনা হয়েছে। তাই খুঁজতে এসেছি। যদি মরদেহটা অন্তত পাই। খোকন মিয়া বলেন, আমার স্ত্রী আমাকে বলেছে তারা বোতল, পায়ের জুতায় চিঠি লিখে বাইরে ফেলেছে। তাদেরকে যেন বাঁচানো হয়। কিন্তু কেউ তাদেরকে বাঁচায়নি। আমাদের তিন সন্তান ও ভাতিজা কাইয়ুমেরও তিন সন্তান। স্ত্রীকে হারিয়ে আমি নিঃস্ব হয়ে গেলাম। বাড়িতে ছোট ছোট সন্তানরা মায়ের জন্য অনেক কান্নাকাটি করছে।
শান্তা মনি আক্তার অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছে সেটি এখনো তার মাকে জানানো হয়নি। আদরের মেয়ে আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে সেটি তার মা সীমা আক্তার সহ্য করতে পারবেন না। মোবাইল ফোনে বোন সীমাকে বারবার ভাই আমিরুল ইসলাম বলছিলেন শান্তা মনির কিছু হয়নি। তুমি চিন্তা করোনা। ১৫ বছর বয়সী শান্তা মনির বাড়ি মোহনগঞ্জের শেখপুরে। সে ছাড়া তার আরও তিন ভাই আছে। চলতি মাসেই সে ওই কারখানায় চাকরি নিয়েছিল। তার কাছে কোনো মোবাইলও ছিল না। আগুন লাগার খবর পেয়ে তার মামারা সন্ধান করছিলেন। কিন্তু কোথাও খোঁজ না পেয়ে তারা মর্গে এসেছেন শান্তা মনিকে খুঁজতে।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুবাস চন্দ্র সাহা গতকাল ঢামেক মর্গে বলেন, আমরা ৪৯ জনের মরদেহ নিয়ে মর্গে এসেছি। এর বাইরে বৃহস্পতিবার আরেকজনের মৃত্যু এখানেই হয়েছে। এখন আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা। কারণ সব মরদেহ পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। এখন ডিএনএ টেস্ট ছাড়া মরদেহ শনাক্ত করা যাবে না। শনাক্ত করার পর যথাযথ প্রক্রিয়ায় স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শামীম ব্যাপারী বলেন, মরদেহ হস্তান্তরের সময় স্বজনদেরকে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার টাকা ও আহতদেরকে ১০ হাজার টাকা করে দেয়া হবে। একই সঙ্গে আমাকে আহ্বায়ক করে ৭ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাতদিনের ভেতরে আমরা তদন্ত প্রতিবেদন দেবো। আর অগ্নিকাণ্ডের কারণ ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে আমাদেরকে জানানো হবে। সুত্র, মানবজমিন ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.