সেজান জুস কারখানায় আগুনের ঘটনায় যা বলছে মালিক পক্ষ

রাজধানী ঢাকার কাছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ভোগ্যপণ্য প্রস্তুতকারী সেজান জুস কারাখানায় আগুনের ঘটনায় অন্তত ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছে অনেকে। তাদের খুঁজে বের করতে শুক্রবার সারা রাত ধরে তল্লাশি চালানো হবে বলে দমকল বাহিনীর প্রধান বলেছেন।

বৃহস্পতিবার বিকেলে ওই আগুনের সূত্রপাত হয়। শুক্রবার রাতেও চলছে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ। এখনো ভবনের বিভিন্ন তলা থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। দমকল বাহিনী এখনো তাদের তল্লাশি ও উদ্ধার কাজ অব্যাহত রেখেছে। শনিবার ভোরে ষষ্ঠ তলায় তল্লাশি করে দেখা হবে আর কোনো লাশ আছে কি না।

ওদিকে শ্রমিক ও তাদের স্বজন ছাড়াও দমকল বাহিনীর সূত্রে বলা হচ্ছে, কারখানা ভবনের চার তলায় ছাদে ওঠার সিঁড়ির মুখের দরজাটি তালা বন্ধ থাকায় অনেক মানুষ ছাদে উঠে প্রাণরক্ষা করতে পারেননি। তবে সজীব গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হাসেম বেভারেজ অ্যান্ড ফুড ফ্যাক্টরি বা সেজান জুস কারখানার একজন ব্যবস্থাপক এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

আগুন লাগার কারণ খুঁজতে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন তদন্তের ঘোষণা করেছে। ফায়ার সার্ভিসও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এছাড়া পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন- পিবিআই আগুনের কারণ অনুসন্ধান করছে।

সেজান কারখানাটিতে মাত্র পাঁচ দিন আগুনেও আগুন লেগেছিল। যদিও তখন ভয়াবহ রূপ নেয়ার আগেই নিভিয়ে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে ভয়াবহ আগুনে অনেক প্রাণহানির ঘটনার দায় কি কারখানার মালিকপক্ষ এড়াতে পারে? এমন প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

যা বলছে কারখানার মালিকপক্ষ
কারখানাটির ভবনের চার তলায় তালাবদ্ধ থাকায় ও অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র না থাকার যে অভিযোগ করেছে ফায়ার সার্ভিস এবং স্থানীয় প্রশাসন, এ ব্যাপারে সজীব গ্রুপের মালিক এম এ হাসেমের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মালিকপক্ষ আগুন লাগার পর আত্মগোপনে রয়েছেন বলেও অভিযোগ মিলেছে। তবে মালিকের পক্ষ থেকে সজীব গ্রুপের ম্যানেজার কাজী রফিকুল ইসলাম অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, ইকুইপমেন্ট (যন্ত্রপাতি) এনাফ (যথেষ্ট) ছিল। অ্যালার্ম দেয়ার জন্য সবকিছু ছিল। নিচ তলায় আগুন ধরার কারণে পুরো ভবনে ছড়িয়ে গেছে।

এই ঘটনার ক্ষেত্রে বড় অভিযোগ এসেছে যে ভবনে তালাবদ্ধ ছিল, এ কারণে শ্রমিকরা বের হতে পারেননি। ফায়ার সার্ভিস এই অভিযোগ করেছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কারখানাটির কাজী রফিকুল ইসলাম বলেছেন, এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

কিন্তু ফায়ার সার্ভিস বলেছে, আগুন নেভানোর পর তারা চার তলায় তালাবদ্ধ থাকায় একটি জায়গায় ৪৯ জনের লাশ পেয়েছেন। তাহলে এটিকে কিভাবে মিথ্যা কথা বলছেন?

এই প্রশ্ন করা হলে কাজী রফিকুল ইসলাম বলেছেন, যখন নিচ তলায় আগুনটা ধরেছে, তখন সবাই আতঙ্কে উপরে চলে গেছে।

এখন এত মানুষের মৃত্যু হলো-এর দায়িত্বটা কে নেবে? এই প্রশ্নে রফিকুল ইসলামের বক্তব্য হচ্ছে, ‘ডিসি মহোদয় ও ডিআইজির সাথে কথা বলা হয়েছে। এটা আমাদের মালিকপক্ষ দেখবে। এদের সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ ম্যানেজমেন্ট দেবে।’

কিন্তু ক্ষতিপূরণই শুধু বিষয় নয়। এই যে এতগুলো প্রাণহানি হলো, সেখানে একটা দায় দায়িত্বের প্রশ্ন আসে- এ ব্যাপারে কারখানাটির মালিকপক্ষের কাজী রফিকুল ইসলামের জবাব একই। ‘এটা অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’।

কারখানাটির মালিকের পক্ষ থেকে অসঙ্গতির অভিযোগগুলো অস্বীকার করা হলেও ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক দেবাশীষ বর্ধন বিবিসিকে বলেছেন, ভবনে চার তলায় সিঁড়ির গেট তালাবন্ধ থাকায় সেখানে আটকা প্রত্যেকেরই মৃত্যু হয়েছে। এক জায়গা থেকেই ৪৯ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

দেবাশীষ বর্ধন আরো বলেছেন, লাশগুলো আগুনে পুড়ে এমন অবস্থা হয়েছে যে নারী, পুরুষ কিংবা পরিচয়- তাদের পক্ষে কোনো কিছুই চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।

ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা কারখানার ভবনটি আগুন নেভানোর ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগও তুলেছেন। নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ বলেছেন, তাদের তদন্তে সব অভিযোগ খতিয়ে দেয়া হবে।

তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যারা ছিলেন, তারা আমাকে জানিয়েছেন যে তারা সন্দেহ করছেন, একটা শট সার্কিট থেকে আগুনের উৎপত্তি হতে পারে।

জেলা প্রশাসক বলেন, যথেষ্ট পরিমাণ অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র না থাকার কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া জুসের কারখানা কেমিক্যাল ও পলিথিন ছিল। এ কারণেও আগুন দ্রুত ছড়িছে বলে ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা জানিয়েছে।

কারখানাটিতে বৃহস্পতিবার বিকেলে আগুন লাগার পর রাত পর্যন্ত তিনজন নারী শ্রমিকের লাশ ও ২৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল। কিন্তু অনেক মানুষের প্রাণহানির ব্যাপারে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারাও বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ধারণা করতে পারেননি।

এরপর দুপুরে আগুনে বিধ্বস্ত ভবন থেকে একের পর এক ৪৯টি লাশ বের করে আনা হয়। এই লাশগুলো ভবনের চার তলায় পড়েছিল বলে ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা দেবাশীষ বর্মন জানিয়েছেন্

সূত্র : বিবিসি

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.