পাকিস্তানের শোষন থেকে মুক্তির আকাঙ্খা নিয়ে জেগে উঠেছিল পূর্ব বাংলার বাঙালিরা। স্বপ্ন দেখেছিল একটি সুন্দর দেশ গড়ার। এ সময়েই হামলে পড়ে পাকহানাদার বাহিনী ও তার দোসরেরা। শুরু হয় সাধারণ বাঙালিদের দুঃসহ জীবন। এ দুঃসহ জীবনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী শহিদ শ্যামাপদ দত্তর স্ত্রী বেলারাণী দত্ত। এ পরিবারে শহিদ হন বেলা দত্তর স¦ামী শ্যামাপদ দত্ত, তার শশুর শহীদ কালীপদ দত্ত, ভাসুর হরিপদ দত্ত এবং ননদের স্বামী তারাপদ দত্ত। ২০২১ সালের ১৮ জুন হরিণা বাগবাটী গ্রামের মন্দিরের সামনে দূর্গা-গোপাল প্রাঙ্গণে কথা বেলা রাণী দত্ত’ (৭১)র সঙ্গে। তার বাবার বাড়ি সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার সয়দাবাদ ইউনিয়নের মাইঝাইল গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধের প্রায় সাত বছর আগে বিয়ে হয় হরিণা বাগবাটী গ্রামের কালীপদ দত্তর ছেলে শ্যামাপদ দত্তর সঙ্গে। স্বামী পেশায় ব্যবসায়ী। বাগবাটী হাটখোলা (কুড়াগাছার হাট হিসেবে তখন পরিচিত) মনোহারী দোকান ছিল তার। কতই বা বয়স তখন তাঁর, বড় জোর ১৫/১৬ বছর। বছর দুই পরেই কোল জুড়ে এক ছেলে আসে, নাম রাখা হয় শংকর দত্ত। মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন শংকরের বয়স মাত্র পাঁচ বছর। এ ছাড়াও তিনি তখন অন্তঃসত্ত¦া। শহিদের স্ত্রী বেলা রাণী দত্ত জানান, হরিণা বাগবাটি গ্রামটি হিন্দু প্রধান গ্রাম হিসেবে পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই বিভিন্ন এলাকা থেকে নিরাপত্তায় আশায় আত্মীয়-স্বজন এসে আশ্রয় নেয় এ গ্রামে। আগতরা প্রধাণত হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। তাদের বাড়িতেও আসে ননদ আর তার স্বামীসহ কিছু আত্মীয়-স্বজন। সিরাজগঞ্জ শহরে পাকসেনা আসার পর এলাকায় গঠন করা হয় শান্তি কমিটি। তারা এসে বাড়িতে বাড়িতে বলে যায় যে সাধারণের কোনও অসুবিধা নেই। তবুও সাবধানে থাকে সবাই। বিভিন্ন বাড়ির কিশোর তরুণেরা মিলে গ্রাম পাহারা দেয় যাতে গ্রামে ডাকাত না পড়ে অথবা পাকসেনা এলে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া যায়। জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ। এক রাতে সবাই গ্রাম পাহারা শেষে বাড়ি ফিরেছে। সে সময়েই শোরগোল শোনা যায়, ‘মিলিটারি এসে গেছে।’ তখন হরিণা বাগবাটী গ্রামটি ছিল আড়া-জঙ্গলে ভরা। বেলা দত্ত, কোলের সন্তান শংকর, শাশুড়ি, ননদ আর ১২/১৩ বছরের দেবর রামাপদ দত্তকে নিয়ে বাড়ির পাশের আড়ার মধ্যে ঢুকে পড়েন। গ্রামে অন্যান্যরাও আশ্রয় নেয় বিভিন্ন আড়া-জঙ্গলে। হঠাৎ জমদূতের মতো তাদের আশ্রয় নেওয়া আড়ার মধ্যে ঢুকে পড়ে দুই রাজাকার। তারা ঢুকেই পুরুষদের ধরার চেষ্টা করে, শুরু হয় পুরুষদের সঙ্গে পাছড়াপাছড়ি। তখন আরো কিছু রাজাকার আর পাকসেনা ওই আড়ার মধ্যে ঢুকে পড়ে, গুলি চালায় এলোপাথারি। এ সময় লুটিয়ে পড়ে কেউ কেউ। পরে অনেককে ধরে ফেলে দাঁড় করায় এ সারিতে। ওই পরিস্থিতিতের বেলারাণী, তার শাশুরি, ননদ, শিশু সন্তান শংকর আর দেবর রামাপদকে নিয়ে কোনও রকমে আড়ার মধ্যে থেকে বেড়িয়ে যান, আশ্রয় নেন পাশ্ববর্তী মুসলিম পাড়ায়। হিন্দু মুসলিম ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে তারাও আশ্রয় দেয় বিপদগ্রস্থ মানুষকে। পরে বেলারাণী দত্তরা খবর পান যে, তার শশুর কালীপদ দত্ত, ভাসুর হরিপদ দত্ত, ননদের স্বামী তারাপদ দত্ত এবং স্বামী শ্যামাপদ দত্তকে লাইনে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয়েছে। বাগবাটী হাই স্কুলে আশ্রয় নেওয়া হরিজনদের আটক করে তাদের দিয়ে সঙ্গে তার স্বামী, শশুর, ভাসুর ও ননদের স্বামীকে মাটি চাপা দেওয়া হয় ওই আড়ার মধ্যেই অনেকের।শহিদ শ্যামাপদ দত্তর স্ত্রী বেলা রাণী দত্ত জানান, এ পরিস্থিতি দিশেহারা হয়ে পড়ে পরিবারটি। ওই যুদ্ধ-পরিস্থিতিতে একজন কিশোরকে অবলম্বন করে টিকে থাকতে হয়েছে তাদের। ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে আশপাশের শ্যামপুর, চরহাসনা, সূবর্ণগাঁতীসহ বিভিন্ন গ্রামে আশ্রয় নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেন। এ সময় দুএকটি পরিবার ছাড়া সাধারণ মানুষের সহযোগিতা কোনও দিনও ভোলার নয়। তারা থাকতে দিয়েছেন, সম্ভব হলে খাবার জোগার করে দিয়েছেন। কখনই হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ বলে অযতœ করেন নি। দেবর রামাপদ দত্তকে পাঠাতেন বাড়ি দেখাশোনা করার জন্য। পাকসেনা ও তার সহযোগিরা তাদের বাড়ি পোড়ায়নি, কিন্তু লুট করেছে নির্বিচারে। পরে দেবর রামাপদ আশপাশের দুএক জনকে দায়িত্ব দেন বাড়িটি দেখাশোনা করার জন্য যেন কেউ দখল করে না নেয়, সে নিজেও মাঝেমধ্যে বাড়িতে থেকেছে। এ পরিস্থিতিতেই জন্ম নেয় বেলা রাণীর দত্তর দ্বিতীয় সন্তান বিপ্লব দত্ত। এ কিছুদিন পরই স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। ফিরে আসেন শশুর, স্বামীর ভিটেতে। শুরু হয় নতুন সংগ্রাম। শহিদ শ্যামাপদ দত্তর স্ত্রী বেলা রাণী দত্ত বলেন, স্বাধীনতার পর শুনেছেন, মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের জন্য নানা সাহায্য সহযোগিতা এসেছে, কিন্তু তাদের পরিবার কোন সহযোগিত পেয়েছে বলে মনে করতে পারেন না তিনি । সম্প্রতি তার নামে একটি বৃদ্ধ ভাতার কার্ড বরাদ্দ হয়েছে, তা শহিদ পরিবারের সদস্য হিসেবে নয়, বয়সে প্রবীণ বলেই হয়তো পেয়েছেন। তাদের পরিবারের এতোগুলো মানুষ মুক্তিযুদ্ধে, স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিলো অথচ কেউ মনেও রাখেনি এ জন্য কষ্ট হয় শহিদের স্ত্রী বেলা রাণী দত্তর।

প্রতিবেদক- সাইফুল ইসলাম
মুক্তিযোদ্ধা, লেখক, সিরাজগঞ্জের গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটির আহ্বায়ক। সাক্ষাৎকার গ্রহণ- হরিণা বাগবাটী দূর্গা গোপাল মন্দির প্রাঙ্গণ। ১৮ জুন ২০২১ সাল, বিকেলে।

