মহান লুৎফর রহমান সরকার অমর হোন

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর, সোনালী ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক এমডি, প্রাইম ব্যাংকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও এমডি, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের অন্যতম প্রতিষ্ঠা ও প্রধান উপদেষ্টা, ইসলামি ব্যাংকের প্রধান উপদেষ্টা, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের অন্যতম ট্রাস্টি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং ডিপার্টমেন্টের খন্ডকালিন শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় কর্মসংস্থান প্রকল্প (বিকল্প)-এর প্রতিষ্ঠাতা, জাতীয় কবিতা পরিষদের প্রতিষ্ঠাকালিন সহসভাপতি, আদমজী পুরস্কাররপ্রাপ্ত লেখক, শিল্প-সাহিত্যের অনন্য পৃষ্ঠপোষক, দেশের কিংবদন্তি-সৃজনশীল, গণমুখি ব্যাংকার, ব্যাংকসমুহের আধুনিকায়ন ও প্রশংসিত জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোর উদ্ভাবক, সর্বজন শ্রদ্ধেয় লুৎফর রহমান সরকার-এর আজ ৮ম মৃত্যুবার্ষিকী।
লুৎফর রহমান সরকার। একটি নাম। একটি আদর্শ। যেমন দর্শনদারী তেমন গুণবিচারী। বাহ্যিক এবং আত্মিক সৌন্দর্যের এমন অপূর্ব সমন্বয় আমার জীবনে আমি আর দ্বিতীয়জনকে দেখিনি! গ্রীক বীরদের মতন লম্বা চওড়া সুদর্শন গৌরজ্জ্বল চেহারা। বলিষ্ঠ গড়ন। সে শুধু বহিরঙ্গে নয়। মানসিকভাবেও আকাশের মতন মহানুভব। উদার। বিশাল হৃদয়ের অধিকারী। প্রশস্ত বক্ষের সবটুকু জুড়ে যেন কল্যাণ- কলিজা! মানব-প্রেমের মহাত্মা! নৈতিকতার মহিরুহ! পাহাড়-প্রমাণ অটল অবিচল আদর্শবান! তেজোদৃপ্ত সূর্যের মতন সচ্ছ উজ্জ্বল চরিত্রাধিকারী! হিমালয়ের মতন সুউচ্চ সুদৃঢ় মনোবল। ফেরেশতার মতন সৎ, নির্লোভ, নিরহংকার। চকচকে সোনার মতন খাঁটি নির্ভেজাল অকৃত্রিম মানুষ। দুরন্ত মুক্তিযোদ্ধার মতন সাহসী। দেশপ্রেমিক। উদ্দাম ঢেউয়ের মতন গতিময় কর্মমুখী উদ্যোগী। কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য না হয়েও একজন স্বপ্নবান দৃঢ়চেতা বিপ্লবীর মতন অন্যভাাবে পাল্টে দিতে চেয়েছিলেন সমাজ এবং রাষ্ট্র। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন- “বিশ্ববিদ্যালয় কর্মসংস্থান প্রকল্প (বিকল্প)।” যার মাধ্যমে দেশের বেকারত্বের অবসান, সমাজে শ্রমের মর্যাদা আর ব্যবসা-বানিজ্যে শিক্ষিত শ্রেণির নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। ছাত্ররা শিক্ষিত হয়ে চাকরির জন্যে দ্বারে, দ্বারে হন্যে হয়ে না ঘুরে স্বউদ্যোগে, স্বমেধাশ্রমে কর্মসংস্থান করার জন্য-মিনিবাস, ট্যাক্সি, ক্লিনিক, টেক্সটাইল, গার্মেন্টস, ফার্মাসিউটিক্যালস, পিপিক্যাপ, ইন্জিনিয়ারিং, প্রিন্টিং, ফুড প্রসেস, ফটোস্ট্যাটসহ শিল্প, কৃষি, ও অন্যান্য বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠায় বিনা জামানতে শুধু শিক্ষার সার্টিফিকেট জমা রেখে ব্যাংক লোনের ব্যবস্থা করেছিলেন। ছাত্রদের শিক্ষা জীবন সুগম এবং সুরক্ষিত করতে শিক্ষা ঋণের ব্যবস্থা করেছিলেন।
তাঁর এই মহৎ উদ্যোগ সর্বমহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল। সমাজে-রাষ্ট্রে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল! অসম্ভব জনপ্রিয় এই প্রকল্প কুক্ষিগত করে অবৈধ ক্ষমতাদখলকারী, গণধিকৃত স্বৈরাচারী এরশাদ তার ছাত্র সংগঠন “নতুন বাংলা ছাত্র সমাজ” গঠনের জন্য সে সময় ছাত্র সমাজ ও ছাত্র আন্দোলনের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতাকারী, ছাত্রসমাজের কলংক, ডাকসু জিএস জিয়াউদ্দিন বাবলুকে সিলেকশন কমিটির প্রধান করার প্রস্তাব দিলে আজীবন আপসহীন, অকুতোভয়, সাহসী, লুৎফর রহমান সরকার সামরিক জান্তার সে প্রস্তাব প্রত্যখ্যান করায় তাঁকেসহ “বিকল্প” প্রতিষ্ঠায় তাঁর সহযোগী সোনালী ব্যাংকের তৎকালিন জিএম এবং পরবর্তিতে এমডি, দেশের আরেক প্রথিতযশা ব্যাংকার, প্রখ্যাত কবি এবং শিক্ষাবিদ, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর ছোট ভাই এ, কিউ সিদ্দিকী এবং সোনালী ব্যাংকের ডিজিএম আব্দুল কাইয়ুম ও এজিএম মোঃ রফিকুল্লাহকে মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার এবং সামরিক আদালতে বিচার করে দুই বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়। বিক্ষোভে ফেটে পড়ে ছাত্র সমাজ, সারাদেশে সর্বত্র নিন্দা এবং প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ক্লাস বর্জন ক’রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা রাস্তায় নেমে আসে। সাধারণ ছাত্র ও বিকল্প সদস্যরা মিছিল নিয়ে সোনালী ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও এবং টিএসসির সড়ক দ্বীপে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন ধর্মঘট শুরু করে। সর্বস্তরের চাপে অবশেষে স্বৈরশাহী তাঁদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। কোনো ব্যাংকারের জন্য এমন আন্দোলনের ইতিহাস পৃথিবীতে আর নাই। এই ত্যাগের পুরস্কার এল,আর সরকার এবং সিদ্দিকী সাহেব পরবর্তীতে পান যথাক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর এবং সোনালী ব্যাংকের এম.ডি হয়ে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ভাস্বর অতুলনীয় এই দেশপ্রেমিক, মানব দরদী, সৃজনশীল, ব্যাতিক্রমী ব্যাংকার- শুধু মুনাফার জন্য নয়, মানব কল্যাণে ব্যাংক-ধারণার এবং বাংলাদেশের আধুনিক ব্যাংকের জনক এবং ব্যাংকিং ক্ষেত্রে সচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার পথিকৃৎ, বিশিষ্ট লেখক, সোনার মানুষ লুৎফর রহমান সরকার-এর প্রয়াণ দিবসে হৃদয়-মন-চেতনার সবটুকু শ্রদ্ধা, ভালবাসার অর্ঘ উজাড় করে ঢেলে দিলাম মহাত্মার পূজনীয় চরণতলে। আর তাঁর মহাদর্শের আলোয় আলোকিত বেদনাতুর পরিবারের প্রতি বিকল্প পরিবার, বিকল্প ফাউন্ডেশন, সাওল হার্ট সেন্টার, বাংলাদেশ এবং ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে জানাই গভীর সমবেদনা ও অনিঃশেষ ভালবাসা।
মহান লুৎফর রহমান সরকার অমর হোন।
মোহন রায়হান, কবি এবং সাবেক ছাত্রনেতা ।
২৪.০৬.২০২১, ঢাকা।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.