দুই
’৪৭-এ বাংলা এক ছিলো। আজকের বাংলাদেশ বা তখনকার পুর্ববঙ্গ এবং আজকের পশ্চিমবঙ্গ মিলে এক দেশ। যুক্ত বাংলা। এই অখন্ড বাংলা খন্ডিত হয়েছিলো একবার ১৯০৫ সালে। ’৪৭-এই বাংলাদেশ স্বাধীন না হতে পারার কারনগুলো বুঝতে হলে ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষিত, আর্থ সামাজিক অবস্থা এবং তৎকালীন জনগোষ্ঠীর চিন্তা চেতনার স্তরকে বুঝতে হবে। বাংলার ইতিহাস অনেক পুরনো। এই অঞ্চলের অনেকগুলো রাজ্য মিলেই এক সময় গঠিত হয়েছিলো বাংলা রাজ্য। হোসেন শাহী আমলের ‘শাহী বাংলা’ মোঘল আমলে সংহত হয়ে নামকরন পায় ‘সুবে বাংলা’। ১৬৯৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী সুতানটি কলকাতা গোবিন্দপুর নামের তিনটি গ্রামের জমিদারি ইজারা নিয়ে বাংলায় ব্যবসা শুরু করে উনষাট বছরে সারা বাংলায় এমন প্রভাব বিস্তার করে ফেলে যে, এক পর্যায়ে মুর্শিদাবাদের নবাবী প্রাসাদে ঢুকে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কলকাঠি নাড়তেও সক্ষম হয় এবং ১৭৫৭-এর ২৩শে জুলাই নবাব সিরাজকে পরাস্ত করে বাংলার মসনদের কার্যকরি মালিক হয়ে যায়। এরপর পুতুল নবাবদের মাধ্যমে এই কোম্পানী একের পরে এক এলাকা অধিগ্রহন করে চলে। এই বিশাল এলাকার নামকরন করা হয় ‘বেঙ্গল ফোর্ট উইলিয়াম প্রেসিডেন্সি।’ মাত্র ষোল বছরের মাথায় ১৭৭৩ সাল নাগাদ এ প্রেসিডেন্সির সীমানা মধ্য ভারতের একাংশ থেকে হিমালয়ের পাদদেশ, পূর্বে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। ১৮০৩ সাল পর্যন্ত আজকের উত্তর প্রদেশের প্রায় পুরো এলাকা কোম্পানীর দখলে চলে যায়। এ প্রদেশের নামকরন করা হয় ‘উত্তর পশ্চিম প্রদেশ।’ ১৮১০ সালের মধ্যে দিল্লী ও শিখ সীমান্ত পর্যন্ত ইংরেজ দখলে চলে আসে। ১৮১৬ সালে নেপাল এবং ছোট নাগপুর এবং পরের বছর মধ্য ভারতের মারাঠা অধিকৃত এলাকাও নিয়ে নেয় তারা। এই পুরো এলাকাকে আনা হয় বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অধীনে। ১৮২৪ সালে আসাম, কাছার, জয়ন্তিয়া ও মনিপুর এবং বিশাল বর্মী এলাকা দখল করে বেঙ্গল ফোর্ট উইলিয়াম প্রেসিডেন্সির অধীনে ন্যস্ত করা হয়। ১৮৩৯-৪০ সাল নাগাদ পাঞ্জাব সিন্ধু সীমান্ত প্রদেশ দখলে নেয়ার মাধ্যমে ইংরেজ সাম্রাজ্য বিশাল আকার ধারন করে। ১৮৫২ সালে শুধুমাত্র ‘বেঙ্গল ফোর্ট উইলিয়াম প্রেসিডেন্সি’র আয়তনই দাড়ায় ২ লাখ ৪৬ হাজার ৭৮৬ বর্গ মাইল। পুর্ব থেকে পশ্চিম সীমানার দুরত্ব ছিলো প্রায় ৮০০ মাইল।
এই বিশাল এলাকা শাসন করতে গিয়ে ইংরেজ সরকারকে হিমশিম অবস্থায় পরতে হয়। ১৮৬৬ সালে উড়িষ্যার ৬টি জেলা, বিহারের একটি অংশ এবং উত্তরবঙ্গে দূর্ভিক্ষে কয়েক লাখ লোক মারা যায়। এই দূর্ভিক্ষের জন্য দূর্বল প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে দায়ী করা হয়। এ প্রেক্ষিতে স্যার স্ট্যাফোর্ড নর্থকোট এই বিশাল প্রেসিডেন্সির আয়তন কমানোর প্রয়োজন অনুভব করেন। ১৮৬৭ থেকে ১৮৭১ সালের মধ্যে আসামে নাগা উপজাতির লোকেরা কয়েক দফা হামলা চালিয়ে ইংরেজ প্রশাসনকে নাস্তানাবুদ করে তোলে। পরের বছর স্যার ক্যাম্পবেল অভিযোগ করেন এত বড় প্রদেশ মাত্র একজন শাসকের পক্ষে চালানো সম্ভব নয়। ১৮৭৪ সালের ১২ই অক্টোবর বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে কেটে কামরূপ, দারাং, নওগাঁ, শিবসাগর, লক্ষীপুর, গারো হিলস, খাসিয়া ও জয়ন্তিয়া হিলস, নাগা হিলস, কাছাড় এবং গোয়ালপাড়া জেলাগুলো সমন্বয়ে পৃথক আসাম প্রদেশ গঠন করা হয়। এর কিছুদিন পর সিলেটকে বাংলা থেকে আলাদা করে এবং ১৮৮২ সাল নাগাদ লুসাই পার্বত্য অঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করে আসাম প্রদেশের অধীনে দেওয়া হয়। তারপরও ১৯০৫ সালে বাংলা ভাগের সময় বেঙ্গল ফোর্ট উইলিয়াম প্রেসিডেন্সির আয়তন ছিলো ১ লক্ষ ৮৯ হাজার বর্গ মাইল।
বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি ভেঙে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের সমন্বয়ে নতুন প্রশাসনিক ইউনিট গঠনের সিদ্ধান্ত নিতে হয় ইংরেজকে তাদের শাসন কাজের সুবিধার লক্ষ্যে। এছাড়াও কিছু আর্থ সামাজিক অবস্থা তাদের বিবেচনায় ছিলো। অনুন্নত এলাকার উন্নয়ন বিশেষ করে পূর্ব বঙ্গের অবহেলিত জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের কিছুটা পরিবর্ত্তনও এই পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিলো বলে ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন । এ প্রসঙ্গে বিমলানন্দ শাসমল তার ‘ভারত কি করে ভাগ হলো’ বইতে লিখেছেন: ‘ইংরেজ প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার পর হিন্দু-মুসলমানের পার্থক্য বাড়লো বই কমলো না। তার তিনটি কারনের প্রথমটি হোল, হিন্দু বিশেষ করে বাঙ্গালী হিন্দু ইংরেজি ভাষার সাহিত্য, দর্শনে পারদর্শিতা লাভ করে ইংরেজী সভ্যতা ও জীবন-দর্শনকে পাথেয় হিসেবে গ্রহন করলেন; কিন্তু মুসলমানরা বিধর্মী শত্রুর ভাষা, সাহিত্য, দর্শনকে পরিত্যাগ করলেন ও মাদ্রাসাগুলিতে ইংরেজী শিক্ষা নিষিদ্ধ করে নির্দেশ জারী করলেন অনেকে। দ্বিতীয়টি হলো, ১৮৪৪ সালে ভারতের ইংরেজ শাসকরা সরকারী দপ্তরে আদালতে এতদিনের প্রচলিত ফার্সী ভাষা তুলে দিয়ে ইংরেজীর প্রচলন করলেন এবং তাতে বহু মুসলমানের জীবিকা নির্বাহের পথ চিরদিনের জন্য রুদ্ধ হোল, কিন্তু ইংরেজি নবিশ হিন্দুদের বরাত খুলে গেলো। তৃতীয়টি হচ্ছে, ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্ণওয়ালিশকৃত পার্মানেন্ট সেটেলমেন্ট বা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে ইংরেজের প্রিয়পাত্র হিন্দুরাই বেশীরভাগ জমিদারির মালিক হয়ে বসলেন এবং মুসলমানের বেশিরভাগ-বিশেষত: পূর্ব ভারতে- চাষী ও প্রজা হয়ে জমিদারের অত্যাচারের বোঝা বইতে বাধ্য হলেন। ১৮৭৫ সালে স্যার সৈয়দ আহমদ এই অবস্থা দূরীকরনের জন্য আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন বটে, কিন্তু সেটা বেশির ভাগই সীমাবদ্ধ থাকলো উত্তর ভারতের মুসলমানদের মাঝে। পূর্ব ভারতের মুসলমানদের সঙ্গে হিন্দুদের সামাজিক ও শিক্ষাগত পার্থক্য বেড়েই চললো। এইরূপ একটা উপায়হীন নিরাশার অবস্থা মুসলমানদের হিন্দু সাধারনের প্রতি ধীরেধীরে নিরতিশয় উষ্ণ করে তুলতে লাগলো।’
শাসমল আরো লিখেছেন, ‘১৮৯৯ সালে ভারতের বড়লাট হয়ে লর্ড কার্জন ভারতীয় সমাজের এই বিষ্ফোরণোন্মুখ অবস্থাটির কথা সম্যকরূপে উপলব্ধি করে তার প্রতিবিধানের চেষ্টা করলেন। ইংরেজি শিক্ষা ও সভ্যতার সংষ্পর্শে হিন্দুরা যেভাবে সামাজিক অগ্রগতির পথে এগিয়ে চলেছিলেন, ইংরেজি শিক্ষার বিরোধীতা করার জন্য মুসলমান ঠিক সেইভাবে পিছিয়ে পড়ছিলেন। হিন্দু ও মুসলমানের শিক্ষা ও সং®কৃতিগত এই বিরাট পার্থক্যটি যতদুর সম্ভব দুর না করতে পারলে, এদের মধ্যে প্রতিনিয়ত সংঘর্ষ অনিবার্য ছিলো এবং সেটাই ভারতবর্ষের জন্য একটি সুষ্ঠু ও সম্মিলিত রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। বিশেষ করে পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এই ঘটনার তীব্রতা অনুভুত হয়েছিলো সবচেয়ে বেশী। লর্ড কার্জন সেটা বুঝতে পেরে বাংলা প্রদেশকে দু’টি ভাগে ভাগ করবার ব্যবস্থা করলেন। তখন বাংলা বিহার উড়িষ্যা একটি প্রদেশ ছিলো। তিনি পশ্চিম বাংলা, বিহার-উড়িষ্যা এবং পূর্ব বাংলার আসামের অংশ বিশেষ নিয়ে দু’টি প্রদেশ সৃষ্টি করলেন এবং এইভাবে মুসলমানপ্রধান পূর্ব বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলমানদের শিল্প-সং®কৃতির পূর্ণ বিকাশের ক্ষেত্র তৈরী করে দিলেন। লর্ড কার্জনের এই বিধান তাঁর পক্ষে এমন কি ইংরেজ শাসন ব্যবস্থার পক্ষে কাল হয়ে উঠলো। সকলেই স্বীকার করেন যে, লর্ড কার্জন ভারতের যোগ্যতম বড়লাটদের মধ্যে প্রধান ছিলেন। আমাদের দেশের শিক্ষা-সং®কৃতির উন্নতিসাধনের জন্য তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা আমাদের পক্ষে আশীর্বাদ ছাড়া আর কিছু ছিল না। কিন্তু বঙ্গ-ভঙ্গ প্রস্তাব সারা দেশের হিন্দু সমাজকে আলোড়িত করে তুললো। এই আন্দোলন বাংলা থেকে শুরু হয়ে ক্রমে সমস্ত ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েছিলো।’ (বিমলানন্দ শাসমল : ভারত কী করে ভাগ হলো, হিন্দুস্তান বুক সার্ভিস, কলকাতা, ১৯৯১, পৃষ্ঠা ১৮-১৯)।
গভর্নর জেনারেলের দায়িত্ব নিয়ে জর্জ ন্যথনিয়ান কার্জন ভারতে এসেছিলেন ১৮৯৯ সালে। কিন্তু বঙ্গভঙ্গ আইডিয়া প্রকৃত অর্থে তার উদ্ভাবিত নয়। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে উড়িষ্যাকে আলাদা করে মধ্য প্রদেশের সাথে যুক্ত করা এবং বাংলা ও মধ্য প্রদেশের সীমানা অদল বদল করার প্রস্তাব সম্বলিত একটি চিঠি লর্ড কার্জনের কাছে পাঠিয়েছিলেন মধ্য প্রদেশের কমিশনার এন্ড্রু ফ্রেজার। লর্ড কার্জন এ চিঠি থেকে বাংলা ভাগের ধারনাটি পান। এর ভিত্তিতে ১৯০২ সালের ২৪ মে লন্ডনে ভারত সচিব লর্ড হ্যামিল্টনের কাছে প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি ভাগ করার স্বপক্ষে যুক্তি দেখিয়ে একটি চিঠি লেখেন। এই চিঠির জের ধরে ভারতের স্বরাষ্ট্র সচিব হার্বার্ট রিসলে ১৯০৩ সালের ৩ ডিসেম্বর বেঙ্গল মাদ্রাজ ও বোম্বের প্রাদেশিক সরকারগুলোর কাছে চিঠি পাঠান। এতে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা বিভাগের কথা উল্লেখ করা হয়। এর পরপরই ঢাকা ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামকে নিয়ে একটি আলাদা প্রদেশ গঠনের পরিকল্পনা সম্বলিত একটি খসড়া প্রস্তাব সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়।
নতুন প্রদেশ গঠনের এই প্রস্তাবনা প্রকাশের সঙ্গেসঙ্গে ওই দিনই ঢাকায় এক শ্রেণীর অধিবাসী বাকল্যান্ড বাঁধের ওপর ‘জন সাধারন সভা’ নাম দিয়ে একটি প্রতিবাদ সভা করে। একই সাথে কোলকাতাকেন্দ্রিক কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীটি এ প্রস্তাবের বিরোধীতায় নেমে পরে। ১৯০৪ সালের ১১ জানুয়ারি এ প্রস্তাবকে সামনে রেখে ঢাকায় নবাব সলিমুল্লাহর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত একটি মত বিনিময় সভায় নতুন প্রদেশ গঠনের প্রস্তাবকে স্বাগত জানানো হয়। লর্ড কার্জন এই প্রস্তাবের ব্যপারে জনমত যাচাইয়ের লক্ষ্যে ১৯০৪ সালের ১৬ থেকে ২০শে ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম ঢাকা ও ময়মনসিংহ সফর করেন। ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ‘কার্জন হলে’ এক সভায় বাংলা বিভাগের পক্ষে তার যুক্তি উপস্থাপন করেন। ঢাকার নবাব এবং পূর্ব বঙ্গের অভিজাত শ্রেণীর প্রতিনিধিরা তার প্রস্তাবকে সমর্থন করেন। সলিমুল্লাহ এদিন সন্ধ্যায় তার প্রাসাদে কার্জনকে আপ্যায়িত করেন এবং তাকে কয়েকটি মানপত্রও দেওয়া হয়।
এ সময় থেকেই চলতে থাকে বাংলা ভাগের পক্ষে বিপক্ষে মতামত। বিগত শতকের প্রথম অর্দ্ধাংশজুড়ে উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে ধর্মীয় চেতনা ও মূল্যবোধ ছিলো একটা বড় ফ্যাক্টর। অনেক বড় বড় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে মানুষের ধর্মীয় চিন্তা চেতনা এবং ধ্যানধারনার আলোকে। আর মানুষের মাঝে ধর্মীয় ভিত্তিতে এই বিভক্তি এনেছে কায়েমী স্বার্থবাদীরা। তারাই তাদের শ্রেণী এবং গোষ্ঠীস্বার্থ ধরে রাখতে মানুষের ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট নিয়ে খেলেছে, সাম্প্রদায়িকতা উষ্কে দিয়েছে। ১৯০৫ সালের বঙ্গ-ভঙ্গ রদ আন্দোলনেও সাধারন মানুষকে সম্পৃক্ত করতে ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট ব্যবহার করা হয়। ‘ভারত মাতার অঙ্গচ্ছেদ’ বলে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে খোঁচা দেওয়া হয়।
নতুন প্রদেশের বিরুদ্ধবাদীদের সম্পর্কে ড: অরবিন্দ পোদ্দার লিখেছেন: ‘বিচিত্র উপাদান এবং নানাবিধ বৈষয়িক স্বার্থ বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে গতি সঞ্চার করে।…… জমিদার শ্রেণী- যাদের পুরাতন এবং নতুন উভয় প্রদেশেই জমিদারি ছিল- এই ভাবনায় চিন্তামগ্ন হয়ে পড়েছিলেন যে রাজস্বের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ব্যবস্থায় তাঁরা এ পর্যন্ত যেভাবে লাভবান হয়ে আসছিলেন বাঙলা বিভাগের ফলে তাঁদের আর্থিক ক্ষতির প্রবল আশংকা। কারন, আসামে সাময়িক ভিত্তিতে রাজস্ব নির্ধারিত হতো এবং ত্রিশ বছর মেয়াদে এর পুনর্বিন্যাস করার ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। সুতরাং আসামের সঙ্গে পূর্ববাংলা সংযুক্ত হলে পূর্ব বাংলার জমিদারদের রাজস্ব খাতে আয় হ্রাস নিশ্চিত। তার উপর বাংলা বিভক্ত হলে ইংরেজী শিক্ষিত হিন্দু বুদ্ধিজীবিদের চাকুরীর সম্ভাবনা ও পরিধি সংকুচিত হবে, এইরূপ বাস্তব আশংকায়ও অনেকেই বিচলিত ছিলেন। এ আশংকা অমূলক ছিল না। কারন আইন ব্যবসায়, সরকারী চাকুরী, শিক্ষাক্ষেত্র ইত্যাদী ইতিমধ্যেই জনাকীর্ন হয়ে উঠেছিল। …… সুতরাং বেকারীর ভয় বাস্তব।’ (রবীন্দ্রনাথ-রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, পৃষ্ঠা ১২১-১২৩, উচ্চারণ, কলকাতা, ১৯৮২)।
ঐতিহাসিক বি বি মিশ্র তার ‘দি ইন্ডিয়ান মিড্ল ক্লাশ’ বইতে লিখেছেন: ‘…..এই বিভাগের ফলে শিক্ষিত সম্প্রদায়ের দারুণ ক্ষতি হলো এবং তারা প্রায় সবাই বর্ণহিন্দু। তাদের স্বার্থভোগের ক্ষেত্রভূমি বিভাগের ফলে আরও সংকুচিত হয়ে গেল; বিশেষত তখন বিধান সভাগুলির সম্প্রসারনের বিষয়ে আলোচনা চলছিল। তারা স্বাভাবিকভাবেই ভীতচক্ষে দেখলো, উভয় বাংলার বিধান সভায় তারা একেবারেই সংখ্যালঘু হয়ে যাচ্ছে- পূর্ব বাংলায় অসমীয়া ও মুসলমানদের দ্বারা এবং পশ্চিম বাংলায় বিহারী ও উড়িয়াদের দ্বারা- এজন্য তারা ক্রোধে পাগল হয়ে উঠলো।’
বর্ণহিন্দু রাজনীতিক, জমিদার শ্রেণী এবং কায়েমী স্বার্থবাদীদের সংগঠন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস গোড়া থেকেই বাংলা ভাগ পরিকল্পনার বিরোধীতায় নামে। কংগ্রেসের এককালীন সভাপতি ময়মনসিংহের আনন্দমোহন বসু নতুন প্রদেশ বানচালের প্রকাশ্য ঘোষনা দেন। এ সময় কংগ্রেস নেতা সুরেন্দ্রনাথ বানার্জীর নেতৃত্বে বিভিন্ন স্থানে নতুন প্রদেশ বিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে পরে। ৬ই জুলাই বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভায় ভূপেন্দ্রনাথ বসু নতুন প্রদেশ গঠনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। সুরেন্দ্রনাথ ব্যনার্জী সম্পাদিত ‘বেঙ্গলী’ পত্রিকায় বঙ্গভঙ্গকে ‘একটি গুরুতর জাতীয় বিপর্যয়রূপে চিহ্নিত করা হয়। একই গোষ্ঠীর ‘হিতবাদী’ পত্রিকা লেখে: ‘গত ১৫০ বছরের মধ্যে বাঙালী জাতি এই রকম দুর্দিনের সম্মুখিন হয়নি।’
কলকাতার প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও কলামিষ্ট পশ্চিমবঙ্গের সাবেক অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র এক সাম্প্রতিক প্রবন্ধে লিখেছেন: ‘কার্জনের বাংলাভাগের এই ঘোষণায় শোরগোল শুরু হলো। সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর নেতৃত্বে বাঙালী রাজনীতিবিদরা বাংলাভাগের ‘সেটেল্ড ফ্যাক্ট’কে ‘আন সেটেল্ড’ করার জন্য শপথ করলেন, ‘ওই ঘোষণাকে তারা বানচাল করবেনই।’ এই রাজনীতিবিদদের সাথে যোগ দিলেন জমিদাররা। তাদের ভয় ছিল, নতুন প্রদেশে জমির ওপর তাদের অবাধ অধিকার বা মালিকানা স্বত্বের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদ আন্দোলনকে ঔজ্জল্য দিয়ে প্রভাববিশিষ্ট করে তুলছিলো এর আবেগপ্রবণ দিক। এমন প্রচারণা চলে যে, মাতৃহত্যার প্রতিবাদ জানাতে বাঙালিদের আমন্ত্রন জানানো হচ্ছে। বিশাল এক সাহিত্য-বন্যা শুরু হয়। এর মধ্যে ছিল স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত ডজনখানেক দেশাত্ববোধক কবিতা ও স্ত্রোত্র।’ (অশোক মিত্র : বঙ্গভঙ্গ রদ:বাঙালী হিন্দুর গর্বকথা, না সর্বনাশের পাঁচালী?)।
ধীরেধীরে ‘বঙ্গভঙ্গ রদ’ আন্দোলন তীব্র হতে থাকে। ‘আধুনিক ভারত’ প্রথম খন্ডে প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন: ‘১৯০৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯০৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত অন্তত: তিন হাজার জনসভায় নতুন প্রদেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়। এসব সভা আয়োজনে ছাত্রদের ভূমিকা ছিলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।’ এতসব প্রতিবাদ সত্বেও ১৯০৫ সালের ১০ই জুলাই ভারতসচিব ব্রডারিক ঢাকাকে রাজধানী করে পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ সমন্বয়ে একটি নতুন প্রদেশ গঠনের প্রস্তাব অনুমোদন করেন। প্রতিবাদে ৭ আগষ্ট কলকাতা টাউন হলে কাশিমবাজারের জমিদার মহেন্দ্রচন্দ্র নন্দীর সভাপতিত্বে কলকাতার নেতৃস্থানীয় বুদ্ধিজীবিদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতি তার বক্তৃতায় বলেন: ‘নতুন প্রদেশে মুসলমানদের প্রাধান্য স্থাপিত হবে। বাঙালী হিন্দুগন সংখ্যালঘিষ্টে পরিনত হবে। আমাদেরকে নিজেদের দেশে আগন্তুকের মত থাকতে হবে। আমাদের জাতির ভাগ্যে যে কি কি হবে তা চিন্তা করে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছি।’
এই সমস্ত বুদ্ধিজীবির অন্যতম ছিলেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাদের পারিবারিক জমিদারী ছিলো পূর্ববঙ্গে। নতুন প্রদেশ গঠনের ফলে জমিদারীর আয় সংকুচিত হবার আশংকা তারও দেখা দেয়। ফলে তিনিও নতুন প্রদেশ ঠেকানোর আন্দোলনে শরীক হন। পূর্ববঙ্গের (আমাদের আজকের বাংলাদেশ) শোষিত বঞ্চিত মানুষগুলোর ভাগ্যোন্নয়নের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা সে আন্দোলনকে বেগবান করতে এবং আন্দোলনকারীদেরকে উৎসাহ যোগাতে লেখেন তার বিখ্যাত গান ‘আমার সোনার বাংলা, অমি তোমায় ভালবাসি।’ (আমাদের আজকের বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত)। এই গানটি প্রথমবার গাওয়া হয় ১৯০৫ সালের ৭ই আগষ্ট কলকাতার টাউন হলে আয়োজিত জনসভায়। কবি এ সময় এ ধরনের বেশ কয়েকটি জনসভায় সভাপতিত্বও করেন।
১লা সেপ্টেম্বর নতুন প্রদেশ গঠনের সরকারি ঘোষণা প্রকাশিত হয়। ২৮ সেপ্টেম্বর ‘মহামায়ার’ দিনে কলকাতার কালিঘাটের বিখ্যাত কালী মন্দিরে বাংলাকে ভাগ করার অপরাধে বৃটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ‘রক্ত শপথ’ নেওয়া হয়। এভাবেই কায়েমী স্বার্থবাদীরা তাদের উদ্দেশ্য হাসিলে ধর্মীয় সেন্টিমেন্টকে ব্যবহার করতে থাকে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আহ্বানে ১৬ই অক্টোবরকে ‘রাখী বন্ধন দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বলা হয় সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ না করা পর্যন্ত প্রতি বছর এইদিনে ‘রাখীবন্ধন দিবস’ পালন করা হবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক সরল চট্টোপাধ্যায় ‘ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্রমবিকাশ’ গ্রন্থে লিখেছেন: ‘১৬ই অক্টোবর রাখীবন্ধন দিবসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে শোভাযাত্রা শুরু হয় এবং পথের দু’ধারে সবার হাতে রাখী পরিয়ে দেয়া হয়। রাখীবন্ধন উৎসব বাংলাভাগ বিরোধী রাজনৈতিক উৎসবে পরিনত হয়। শুধু তাই নয়, ১৯০৫-এর ২৫ আগষ্ট বঙ্গভঙ্গ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে টাউন হলে (কলকাতা) এক বিরাট জনসভায় রবীন্দ্রনাথ তার বিখ্যাত ‘অবস্থা ব্যবস্থা’ প্রবন্ধটি পাঠ করেন।’
কায়েমী স্বার্থবাদী এবং সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীটির প্রবল বিরোধীতা সত্বেও ১৬ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ’ জন্মলাভ করে। অবিভক্ত বাংলার ১৪টি জেলা ও ২টি দেশীয় রাজ্য এই নতুন প্রদেশে অন্তর্ভূক্ত হয়। এগুলো ছিলো: চট্টগ্রাম নোয়াখালি বাকেরগঞ্জ ফরিদপুর ত্রিপুরা ঢাকা ময়মনসিংহ পাবনা বগুড়া রাজশাহি মালদহ দিনাজপুর রংপুর জলপাইগুড়ি কুচবিহার ও পার্বত্য ত্রিপুরা। নতুন প্রদেশের আয়তন দাঁড়ায় ১লক্ষ ৬ হাজার ৫শত ৪০ বর্গমাইল। লোকসংখ্যা ৩ কোটী ১০ লাখ। এর মধ্যে মুসলমান ১ কোটী ৮০ লক্ষ, হিন্দু ধর্ম বিশ্বাসী ১ কোটী ২০ লক্ষ, বাকিরা বৌদ্ধ খ্রীস্টান ও অন্যান্ন ধর্মাবলম্বী। ওদিকে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে থাকে পূর্ব দিকের বিভাগগুলো, ছোট নাগপুরের পাঁচটি হিন্দি রাজ্য বাদে বাকি অংশ, সম্বলপুর ও পাঁচটি উড়িয়া রাজ্য। বাংলা বিভাগের পরও বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির আয়তন ছিলো ১লাখ ৪১ হাজার ৫৮০ বর্গ মাইল। লোক সংখ্যা ৫ কোটী ৮০ লাখ। এর মধ্যে হিন্দু ধর্ম বিশ্বাসী ৪ কোটী ২০ লাখ এবং মুসলিম ৬০ লাখ।
চলবে……….

