অনুমিতই ছিলো যে, সোনার কাঠি রুপোর কাঠি দিয়ে কোনো একদিন মামুনুলের তথাকথিত দ্বিতীয় স্ত্রী ঝর্ণা নামক ঘুমন্ত কুমারীর ঘুম ভাঙাবেই সরকার ।অতঃপর কিছুটা দিন দেরীতে হলেও এই ঘুম ভাঙতেই হয়েছে। শুধু ঘুমই ভাঙেনি, সাথে আবার অনেক জবান নিয়েই জেগেছে। সেই জবান আবার থানা পুলিশ পর্যন্ত ইতিমধ্যেই জমা করা হয়ে গেছে। স্পষ্ট করে বলি, এই ঘুম আজ হউক বা কাল হউক ভাঙতেই হতো।
আমি ধরেই নিচ্ছি, সরকার অনেক চেষ্টা করে, হুমকি- ধামকি দিয়ে, ভয়ভীতি দেখিয়ে কিংবা টাকা- পয়সা সহ নিরাপদ জীবন দেবার কথা বলে মামুনুল হকের তথাকথিত দ্বিতীয় স্ত্রী ঝর্ণাকে দিয়ে মামলা করিয়েছে। সুরঞ্জিত বাবুর (প্রয়াত ) সেই বচন ( বাঘে ছাড়ে শেখ হাসিনা নয় ) সুতরাং আইনগতভাবে ভালো করেই সাপের প্যাঁচ দিয়ে ধরলে ধীরে ধীরে সব ন্যস্ত হয়ে আসবে। সেই ভাবনা থেকেই হয়তো সরকার এই পথে হাঁটছে।
সরকারের এতদিন ভাবনা ছিলো সাপের মাথায় হয়তোবা সত্যি সত্যি মণি আছে। সেই মণিটা এই মামুনুলদের কাছ থেকে সময় মত নিয়ে নিতে পারবে। সেই জন্যই এত দুধ- কলা দেওয়া। সত্যিকার অর্থে সাপের মাথায় যে মণি থাকে না, সেটা সরকার সাপের ছোবল খেয়ে ভালোই টের পেয়েছে । যেহেতু মণির আশায় গুরেবালি, এখন সাপকে যেভাবেই হউক বশে আনতেই হবে এবং চলছে সেটা । তাই বলছিলাম তথাকথিত ঝর্ণা এখন হঠাৎ মামলার বাদী। শুধু কি মামলার বাদী ? না, একেবারে ধর্ষণের মামলা। যে মামলায় মামুনুল সহ হেফাজতিদের বারো হাত জিহ্বা সরকার তার নিজের হাতেই ধরে রাখবে।
রিসোর্ট কাহীনির পরে এই দেশের এমন কেউ বাদ নেই টেলিফোন কন্সপিরেসি শুনেনি । টেলিফোন কন্সপিরেসি বাজারে প্রকাশ নিয়ে নানান কথা আছে। ন্যায় বা অন্যায় এগুলো নিয়ে ইতিপূর্বেই অনেকবার স্পষ্ট করে লিখেছি, তাই ন্যায়- অন্যায় নিয়ে এখন লিখছি না । তবে টেলিফোন কলগুলো যে সত্যি ছিলো তা মামুনুলের স্বীকারোক্তির কল্যাণে স্পষ্টতই প্রমাণীত হয়েছে। মামুনুল নিজেই লাইভে এসে নতুন ফতোয়া দিয়ে ( প্রয়োজনে গোপন রাখা বা মিথ্যা বলা জায়েজ, ফতোয়া ) স্বীকার করেছে কথিত ঝর্ণা তার দ্বিতীয় স্ত্রী এবং কথিত মাদ্রাসার শিক্ষিকা তার তৃতীয় স্ত্রী, ইত্যাদি ইত্যাদি।
এবার আসুন একটু দেখি কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী ঝর্ণার কথায়। আজকে মামলা শেষে সাংবাদিকদের সামনে বেশ স্পষ্টতই বললেন, ওনার ( ঝর্ণা) ঘর সংসার ভাঙার পিছনে মামুনুল দায়ী এবং ওনার নানান দূর্বলতার অপব্যবহার মামুনুল দীর্ঘদিন যাবৎ করে আসছে এবং সেটাকে তিনি ধর্ষণের সামিল বলেই বললেন এবং সঠিক বিচার দাবী করলেন। ওনার স্পষ্ট কথা আমি সঠিক বিচার চাই।
এবার একটু মানস মনের মনোবিজ্ঞান কি বলে ? সেটা একটু দেখি। আজকে ঝর্ণার কথা বলা সাংবাদিকদের সাথে একটু লক্ষ্য করুন। কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় এক বিন্দুও নার্ভাস ছিলো না । কথা বলেছে বেশ সাবলিল ভাষায়। কথার মাঝে একটি শব্দও দ্বিতীয়বার উচ্চারণ নেই । কোনো প্রকার অ্যাঁ উঁ ছিলো না । কোনো প্রাকর জড়তা লক্ষ্য করা যায়নি । এমনকি কোনো কাগজে লেখাও পড়েননি । এতটা স্বচ্ছ ও পরিষ্কার করে বলা ( এত ঘটনা ঘটার পরে অথবা পুলিশের চাপে ) চাট্টিখানি কথা নয় । ঝর্ণা সেটা আজকে নিজের অজান্তেই হউক অথবা সত্যি সত্যি ক্ষোভ থেকেই হউক অথবা সরকারের চাপ থেকে বাঁচতেই হউক করে দেখিয়েছেন। ছোট্ট করে বললে, ঠিক এখানেই সেই মনোবিজ্ঞানের কথা চলে আসে।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এমন সব কাহিনী ঘটার পরে যা কিনা কোটি লোকে শুনেছেন, ঘৃণা জানাচ্ছেন, ঠিক এমন পরিস্থিতিতে একেবারেই বিনা সত্যে পাড় পাওয়া অসম্ভব তো বটেই, এমনকি টেনশন আর নার্ভাসন্যাস এর কারণে স্থির হয়ে কাঁপুনি ছাড়া দাঁড়িয়ে থাকাটাও অনেকটা অসম্ভব। কিন্তু ঝর্ণা সেই সময়ে ছিলো একেবারেই নির্বিকার, নিরীহ, শান্ত এবং পাথরসম মূর্তি ।ঠিক সেই সময়ে ইলেক্ট্রসেন্স মাপা হলে নার্ভে কোনো প্রকার কমতি নিশ্চিত মিলতো না, এটা অ্যাটিচ্যিউট দেখেই বলা যায়। কেউ আমার সাথে একমত নাও হতে পারেন, সেটা ভিন্ন বিষয়।
সরকারের বর্তমান চাওয় কি ? সেটা না বললেও সবার কাছেই পরিষ্কার। সরকারে যে কেউ থাকলেও এই মূহুর্তে একি আচরণ করতো বলেই আমাদের দেশের পরিস্থিতিতে বলাই বাহুল্য। সরকার নিশ্চয়ই চেষ্টায় ছিলো ঝর্ণাকে বাগে আনতে শায়েস্তার উদ্দেশ্যে। সময়টি হয়ে গেছে সরকারের জন্য উল্টোরথ। কেননা বসুন্ধরা সামনে এসে হুমরি খেয়ে পড়েছে যে।
স্বাভাবিক কারণেই সরকারকে এখন শুনতে হচ্ছে বসুন্ধরাকে বাঁচাতেই এই ঝর্ণাকে সামনে আনা । আমি স্পষ্টতই মনে করি সরকারের নিজের হিসেবেও এমনটা ছিলো না । ধরে নিন এই মুহূর্তে বসুন্ধরার ঘটনা ঘটেনি। তাই বলে কি সরকার ঝর্ণাকে দিয়ে মামলা কথাতো না ? অবশ্যই করাতো। সরকার ভালো করেই জানে এই বসুন্ধরারা হেফাজতিদের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর বা হুমকি স্বরূপ । এটা সব সরকারের জন্য এবং সব সময়ের জন্যই । বিশ্বের সব দেশেই বর্তমানে বসুন্ধরারা কলকাঠি নাড়ে । এই কর্পোরেটরা সব দেশের সরকারের জন্য ( এমনকি গণতান্ত্রিক দেশগুলোর জন্যেও ) এতটাই হুমকি স্বরূপ যে, এরা দিনকে রাত করে- রাতকে দিন করে, সরকার পরিবর্তন করতে পারদর্শী বটে।
মনে রাখা ভালো যে, হেফাজতিরা ( বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই এমন হেফাজত আছে ) মোটা মাথার বুদ্ধি দিয়ে যতটা ভয়ানক হয়ে উঠতে পারে সরকারের জন্য , তার চেয়েও এই কর্পোরেটরা সমগ্র বিশ্বে ধন- দৌলত আর তীব্র জ্ঞান বুদ্ধি দিয়ে শতভাগ বেশি ভয়ানক হয়ে উঠার ক্ষমতা রাখে এবং তেমনটাই চলছে। স্মরণ করুন ট্রাম্প এর মতন বদ্ধপাগল কিভাবে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়েছিলো । হেফাজতিদের কেবল আওয়াজ শোনা যায়, তবে কর্পোরেটদের আওয়াজ শোনা যায় না কিন্তু কর্ম টের পাওয়া যায়।
কথায় বলে না, যে মুরগী বেশি ডাকে ডিম কম পাড়ে । হেফাজতিরা সেই কক কক করা মুরগী সম। তবে কর্পোরেটরা কিন্তু কক কক করা মুরগী মোটেও নয় । আমিতো মনে করি বিশ্বের যে কোনো দেশের সরকার সুযোগ পেলে কর্পোরেটদের আগে শায়েস্তা করার চেষ্টা করবে, নিজেদের স্বার্থেই । সুতরাং আমাদের দেশের সরকারও সুযোগ পেলে বসুন্ধরাকে বাগে আনতে চাইবে। তবে এখানে অনেক কথা আছে। সব জায়গায় সরকার হাত বসিয়ে নিজেদের হাত নিশ্চয়ই ক্ষত করতে চাইবে না । কেননা আমাদের সরকার নিজেই যে বসুন্ধরা।
মামুনুলের জন্য মামুনুল ভক্ত কুলেরা চোখের জল নাকের জল একত্রিত করেই যাচ্ছেন। সেটা করুক এবং থামবারও নয়, সেটাও বেশ পরিষ্কার, ভক্তকুল বলে কথা । তবে হেফাজতিরা স্বীকার করুক আর নাইবা করুক, একটি কথা বারবার বলে আসছি এবং আগামীতেও বলবো, যে ২১ টি প্রাণ পুলিশের গুলিতে ঝরেছে, সেই লাশগুলোর জন্য শুধুমাত্র পুলিশ নয়, মামুনুলদেরও দায়িত্ব নিতেই হবে এবং বিচার আজ হউক বা কাল হউক দুই দিকেরই হতেই হবে।
শেষে ছোট্ট করে বলি, সোনার কাঠি রুপোর কাঠি সরকার কখন ব্যবহার করলো বা উল্টালো তার চেয়েও কঠিন সত্য হলো সরকারের প্রাণটি কিন্তু দিন শেষে সেই ভ্রমরের ভিতরেই আছে। সেই ভ্রমর কিন্তু রূপকথার গল্পের মতন একটি ভ্রমরের ভিতরে নয় । ১৮ কোটি ভ্রমরের ভিতরে । শো থিংক ট্যুয়াইস।

বুলবুল তালুকদার
যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম

