[বি এল এফ – মুজিব বাহিনী ও জাসদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নানা মুখী বিতর্কের উৎস। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রায় পাঁচ দশক পরে এই বিতর্কের শেষ হয়নি। মুক্তি যুদ্ধের ইতিহাস চর্চায় এই বিতর্ক বারবার ফিরে আসছে। স্বাধীন দেশে বিদ্রোহী যুবকদের সমতা ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্টার প্রতীক হিসেবে জাসদের প্রকাশ ঘটে ৩১ অক্টোবর ১৯৭২। খুব কম সময়ের মধ্যে জাসদ রাজনীতির আকর্ষণ ফিকে হয়ে আসে। রাজনৈতিক শত্রু মিত্র নির্ধারণে এযাবৎ কালে জাসদীয় ধারা ডজন খানেক বার ভেঙেছে। জাসদ রাজনীতির উৎপত্তি নিয়ে অপু সারোয়ার এর ধারাবাহিক লেখার প্রথম পর্ব। ]
প্রথম পর্ব
মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১: বহুমাত্রিক যুদ্ধ ইতিহাসের ইতিকথা
“মানুষকে ধ্বংস করার সর্বাধিক কার্যকর উপায় নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে তাদের নিজস্ব উপলব্ধি বিপথে নিয়ে যাওয়া, অস্বীকার করা, এবং বিলুপ্ত করা।” – জর্জ অরওয়েল
১৯৭১ সালের ৯ মাসের যুদ্ধ ছিল বাংলাদেশের অভুদ্বয়ের যুদ্ধ। এই যুদ্ধ স্বাধীনতা যুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ নামে পরিচিতি লাভ করেছে বাংলাদেশের মানুষের কাছে । ১৯৭১ এর বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের যুদ্ধ শেখ মুজিরব রহমানের নামে পরিচালিত হয়েছে। ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র বিজয়ের কারণে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিষয়টি নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। শেখ মুজিরব রহমান যুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানে আটক থাকলেও যুদ্ধরত মানুষের জন্য তিনিই ছিলেন সব অনুপ্রেরণার উৎস।
বাংলাদেশের অভুদ্বয়ের যুদ্ধের ইতিহাস ও ফলাফল বহুমাত্রিক। আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত। উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালে যুদ্ধে সরাসরি সামরিক সংঘাতে ভারতীয় বাহিনীর অংশ গ্রহণ ছিল মাত্র দুই সপ্তাহের। ভারতীয় বাহিনীর অংশ গ্রহণ পাকিস্তানের পরাজয়কে দ্রুত নিশ্চত করেছে। ভারতীয় বাহিনীর অংশ গ্রহণ যুদ্ধের রাজনীতিকে পিছনে ঠেলে দেয়। যুদ্ধে পাকিস্থান বাহিনীর পরাজয় ঘটেছে পাকিস্থান রাষ্ট্রের প্রতি মোহমুক্তি থেকে জেগে উঠা সারাদেশে মানুষের অসহযোগিতার কারণে। ভারতের অংশ গ্রহণ ও উন্নত সামরিক শক্তিই পাকিস্থানের পরাজয়ের প্রভাবক মাত্র , নিয়ামক ছিল না।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্থানী বাহিনীর আত্মসমর্পণ এর দলিল ভারত ও পাকিস্থান এর মধ্যে স্বাক্ষরিত হওয়ায় জাতিগত নিপীড়ন বিরোধী লড়াইকে যুদ্ধমান দুই প্রতিবেশীর যুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা ও দেখার সুযোগ করে দেয়। আন্তর্জাতিক ভাবে ইতিহাসের এই পাঠ প্রাধান্য পেয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদশের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ‘ ষড়যন্ত্র ‘ রয়েছে। উল্লেখ্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ইউরোপ ও আমেরিকায় বাংলাদেশের সপক্ষে হাজার হাজার মানুষ প্রতিবাদ সমাবেশ করছে। বাংলাদেশের পক্ষ অবশ্য আত্মসমর্পণ এর দলিল মিত্র পক্ষ -ভারত ও বাংলাদেশের সাথে পাকিস্থানের চুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে স্বছন্দ বোধ করে।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্থানী সেনা বাহিনীর আত্ম সমর্পন অনুষ্ঠানে যুদ্ধ কালীন বাংলাদেশ সরকারের কোন প্রথম সারির কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন না। যুদ্ধকালীন সেনা প্রধান জেনারেল এম এ জি ওসমানী এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি । বা উপস্থিত থাকার অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে কমতি ছিল। জেনারেল ওসমানী ভারত থেকে হেলিকপ্টর যোগে ঢাকায় আসার পথে ‘যান্ত্রিক’ গোলযোগের কারণে যাত্রা ভঙ্গ হয়। জেনারেল ওসমানীর বিমান উদ্দেশ্য করে গোলা বর্ষণের কথোপোকথন বহুল আলোচিত। উল্লেখ, সেই সময় আকাশে নিক্ষেপ যোগ্য সমরাস্ত্র শুধু মাত্র ভারতীয় বাহিনীর হাতেই ছিল।
জেনারেল ওসমানী ও প্রবাসী সরকারের প্রথম সারির সকল কর্মকর্তা -রাজনৈতিক নেতাদের অবস্থান ছিল ভারতের তিন প্রাদেশিক রাজধানী কলিকাতা – পশ্চিম বঙ্গ , আগরতলা -ত্রিপুরা , গোহাটি – আসাম, অথবা এই শহর গুলির নিকটবর্তী এলাকায়। ভারত সীমান্ত থেকে ঢাকার দুরুত্ব তেমন কিছু নয় । সড়ক পথে কয়েক ঘন্টার ব্যবধান আকাশ পথে এই এলাকা গুলির দুরুত্ব মাত্র এক ঘণ্টার কম সময়ের। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ অতি অল্প সময়ের মধ্যে জেনারেল ওসমানীর জন্য বিকল্প হেলিকপ্টর এর ব্যবস্থা করতে পারতেন। ভারতীয় প্রশাসন এই পথে না গিয়ে আত্ম সমর্পনের অনুষ্ঠানকে জেনারেল নিয়াজী ও জেনারেল অরোরার প্রতিনিধিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। ভূগোলিক ভাবে স্বাধীন দেশের জন্মের প্রতীকী দলিলে বাংলাদেশ পক্ষের অনুপস্থিত পরবর্তী দশক গুলিতে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের ভবিষ্যৎ আচরণের পদ চিহ্ন ছিল মাত্র।
১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত ভারত – পাকিস্তান বড় ধরণের তিনটি যুদ্ধে জড়িয়ে ছিল। এর বাইরে হর-হামেশাই কাশ্মীর ও পশ্চিম পাকিস্থানের সীমান্তে সামরিক হাঙ্গামা চলে আসছিল। পাকিস্থান সেনাবাহিনীকে সামরিক ভাবে পরাজিত করার পর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর মননে পরাজয়ের স্থায়ী প্রভাব ফেলতেই ভারতীয় বাহিনী আত্ম সমর্পন অনুষ্ঠান থেকে জেনারেল ওসমানীকে দূরে রাখা হয়েছিল এমন মতামত বাংলাদেশ সমাজে বিরাজমান ।
আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে এই অঞ্চলের, এই সময় নিয়ে লিখিত বই -পুস্তকের বড় অংশই ভারতীয় সমরবিদ ও ইতিহাসবিদদের কলমে উঠে উঠে এসেছে। এই সমস্ত লেখা ভারতীয় বাহিনীর বীরত্ব গাথা প্রতিধ্বনিত হয়েছে। ভারতীয় পক্ষের ইতিহাস বর্ণনা দৃশ্যতঃ পৃথক উদ্যোগে লিখিত। তবে সম্মিলিত ভাবে এই প্রকাশনা গুলির দক্ষ কৌশলী কলমে অনাক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে ইতিহাস ও যুদ্ধবিদ্যা বর্ণনায় উঠে এসেছে ভারতীয় প্রচারণা।
১৯৭১ সালের যুদ্ধ যে বিগত প্রায় সিকি শতাব্দীর জুড়ে ভাষা আন্দোলন, কৃষকের তেভাগা আন্দোলন, শিক্ষা নীতি বিরোধী আন্দোলনের মত অনেক আন্দোলনের সমষ্টিগত পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশের উল্লেখ ভারতীয় ইতিহাসবিদদের কলমে উঠে আসতে পারেনি। পূর্ব বাংলার মত ভারতের একাধিক প্রদেশে জাতিগত নিপীড়ন বিরোধী সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম চলছিল ১৯৭১ সালের আগে পরের সময় গুলোতে। বাংলাদেশ অঞ্চলের জাতিগত নিপীড়ণের সাথে ভারতীয় বিভিন্ন জাতিগত নিপীড়ণের অনেক মিল রয়েছে। ভারতীয় প্রকাশনা গুলি ভারতীয় সমরতন্ত্র ও পুঁজিবাদ এর শক্তিশীল ও বিকশিত রূপের সরব জানান দেয়।
যুদ্ধকালীন সময়ে ভারতে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশ অঞ্চলের মানুষ উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় ও ভারতীয় জনগণের সমর্থন লাভ করেছিল। বাংলাদেশের উদ্বাস্তু আশ্রয় নেওয়া এলাকা গুলি বাংলা ভাষাভাষী হাওয়ায় এত ব্যাপক সংখক উদ্বাস্তুর সাময়িক মাথা গোঁজার ঠাঁই পেতে সমস্যা হয়নি। ভারতের বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর কিছু অংশ ছিল ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত পাকিস্থান রাষ্ট্রের ইসলামীকরণ ও শত্রু সম্পত্তির মত নিপীড়ন ও সম্প্রদায়িক আইনের কারণে দেশান্তরী হতে বাধ্য হওয়া জনগোষ্ঠী ।
ভারত বাংলাদেশের প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সকল প্রকার সামরিক সহযোগিতা করেছে যুদ্ধকালীন সময়ে। ভারতের পৃষ্ট পোষকতায় বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার আন্তর্জাতিক ভাবে সমর্থন পেতে সহযোগিতা করেছিল। তবে পাকিস্থানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অসহযোগিতা ও পৃথক রাষ্ট্র গঠনের শেষ অনুপ্রেরণা ছিল আওয়ামীলীগ এর ছয় দফা ও এই দাবী গুলির সর্মথনে ১৯৭০ এর পাকিস্থানের জাতীয় নির্বাচন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রভাবক হিসেবে কাজ করে এশীয় পরাশক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে ভারত । ১৯৭১ সালের যুদ্ধের বহুমাত্রিক ফলাফল গুলির অন্যতম হচ্ছে (১) ভারত সীমান্তের একদিকে ১৯৭১ যুদ্ধপূর্ব অবস্থার তুলনায় দূর্বল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ খণ্ডিত পাকিস্তান ও অন্যদিকে একটি নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ যার তিনদিক দিয়ে ভারত সীমান্ত দ্বারা প্রতিস্থাপিত (২ ) পাকিস্তান এর ভাঙ্গনের মধ্য দিয়ে ‘ দ্বিজাতি’ তত্বের ব্যার্থতাকে সামনে আনতে সক্ষম হওয়া (৩) বাংলাদেশে ভারতের বাজারের সম্প্রসারণ (৪) উত্তর পূর্ব ভারতের জাতি সুমুহের আত্ম নিয়ন্ত্রনের রাজনৈতিক সংগ্রামকে সামরিক শক্তি দিয়ে ধ্বংস করতে সক্ষম হওয়া । তবে বাংলাদেশ সৃষ্টি ভারত ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশে দেশে ভাষা ভিত্তিক স্বাধীন রাষ্ট্র বা প্রদেশ সৃষ্টির সম্ভবনাকে তুষের আগুনের মত জ্বালিয়ে রেখেছে।
পাকিস্তানের প্ৰধানতঃ প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তার ১৯৭১ সালের যুদ্ধ নিয়ে কিছু বই লিখেছেন। কোন কোন বইয়ে নিপীড়ণের কিছু চিত্র উঠে এসেছে। তবে যুদ্ধের কারণ যে জাতিগত নিপীড়ন ও পাকিস্থানের দুই অংশের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য তা অনুধাবন করতে বহুলাংশেই ব্যর্থ হয়েছেন পাকিস্থানী লেখকেরা । এই যুদ্ধকে পাকিস্থান ও ভারতের যুদ্ধ বা ভারতের ষড়যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন চেষ্টা রয়েছে। একটি অসংগঠিত জনগোষ্ঠীর গেরিলা বাহিনী বা রাজনৈতিক শক্তির কাছে পরাজয়ের চেয়ে জন্মগত শত্রু ভারতের কাছে আত্ম সম্পর্পন ‘ মর্যদাবান’ হিসেবে দেখে আসছে পাকিস্তানের লেখক অনেকেই।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের গণহত্যার সাথে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের কোন সম্পর্ক নেই। পাকিস্তানী সেনা প্রশাসনের সংবাদ প্রকাশের কড়াকড়ির কারণে অখণ্ড পাকিস্থানের পূর্বাঞ্চলে কি ঘটেছিল সে সম্পর্কে পাকিস্থানের পশ্চিম অংশের সাধারণ মানুষ প্রায় অন্ধকারেই থেকেছে পুরো যুদ্ধ কালীন সময়ে। সিন্ধু ও বেলুচিস্থান জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধিক-ধিক করে জ্বলছে। এই আন্দোলন গুলিকে সামরিক শক্তি দিয়েই পাকিস্থান রাষ্ট্র দমন করার কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সৃষ্টির রাজনৈতিক কারণ জাতিগত নিপীড়ন ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথা বলা বা লেখার রাজনৈতিক পরিবেশ খুব একটা নেই।
বাংলদেশে বেশ কিছু যুদ্ধপূর্ব ও যুদ্ধকালীন ইতিহাস ও যুদ্ধ স্মৃতি লেখা হয়েছে। নতুন নতুন প্রকাশনা আলোর মুখ দেখছে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার ‘জাতীয় স্বাধীনতার ইতিহাস রচনা পরিষদ’ গঠন করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ ও রচনা উদ্যোগ নিয়েছিল। ১৯৭৫ সালের সামরিক শাসন আসার পর এই প্রকল্পের কোন হদিস পাওয়া যায় নাই।
১৯৭৭ সালে সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্প চালু করেন । কবি ও সাংবাদিক হাসান হাফিজুর রহমান ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখন ও মুদ্রণ প্রকল্প’র ভারপ্রাপ্ত অফিসার হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হয়েছিলেন। কবি ও সম্পাদক হিসাবে হাসান হাফিজুর রহমান খ্যাতিমান ছিলেন। তবে ইতিহাস চর্চা ও রচনার পুর্ব কোন অভিজ্ঞতা ছিল না হাসান হাফিজুর রহমানের। এই প্রকল্প ১৫ খন্ডে মুক্তিযুদ্ধের সরকারী ইতিহাস গ্রন্থিত করেন। এই প্রকাশনা এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধের দলিল ও ইতিহাস নিয়ে বড় কাজ।
১৯৭৭ সালের জেনারেল জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাস প্রকল্প ১৯৭৩ সালের সংগৃহিত তথ্য উপাত্তের উপর দাঁড়িয়ে ১৫ খন্ডের ইতিহাস রচনা করেছে। এই কথা ১৫ খন্ডের ইতিহাস বইয়ে উদার ভাবে উল্লেখ আছে । কেনইবা ১৯৭৩ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্পকে হিমাগারে পাঠিয়ে দিয়ে নতুন প্রকল্প নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা জেনারেল জিয়াউর রহমান অনুভব করলেন তা স্পষ্ট নয়। ১৯৭৭ সনের জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধের প্রকল্পের সাথে যাঁরা যুক্ত ছিলেন তাঁদের মধ্যে ১৯৭৩ সনের ইতিহাস প্রকল্পের প্রধান গবেষকদের কাতারে কেউ ঠাঁই পাননি।
১৯৭১ সালের যুদ্ধ নিয়ে জেনারেল জিয়াউর রহমানের নিজেস্ব ভাবনা নতুন কিছু নয়। জেনারেল জিয়াউর রহমান সামরিক সামরিক শাসন জারির পর থেকেই স্বাধীনতার ঘোষক হিসাবে উপস্থাপনের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চলে আসছে। জেনারেল জিয়াউর রহমানের এই প্রচেষ্টার একমাত্র জ্বলানী হচ্ছে চট্টগ্রাম বেতার থেকে ২৬ মার্চ ১৯৭১ এর ঘোষণা পাঠ। জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভাবনা গুলি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সংবিধানের সংশোধনী ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতাদের রাষ্ট্র ও জিয়াউর রহমানের দলের উপর পর্যায়ের জায়গা দেওয়ার মধ্য দিয়ে। সংবিধানের সংশোধনীর মাধ্যমে জেনারেল জিয়াউর রহমান -১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে ১৯৭৯ সালের ৫ই এপ্রিল পর্যন্ত সামরিক সরকারের যাবতীয় কর্মকান্ডকে বৈধতা দান, ও “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” সংযোজন করেন। বিসমিল্লাহ এর সংযোজন ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার বড় উদ্যোগ ছিল।
যুদ্ধকালীন সময়ে মেজর জিয়াউর রহমান প্রবাসী সরকারের সামরিক প্রশাসনের সমান্তরালে / বাইরে গিয়ে জেড ফোর্স ( জিয়া বাহিনী ) গঠন করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর সাথে জিয়াউর রহমানের মত বিরোধের জের ধরে জেড ফোর্সের তৈরী হয়েছিল । ওসমানীর – জিয়া বিরোধকে প্রশমিত করা ও সামনে না আনার উপায় হিসাবে কে ফোর্স ( খালেদ বাহিনী ) ও এস ফোর্স ( শফিউল্ল্লাহ ) ফোর্স গঠিত হয়েছিল জেড ফোর্স গঠনের সাথে সাথেই । ওসমানীর – জিয়া কিংবা যুদ্ধকালীন সময়ে এই জাতীয় বিরোধ গুলি সামরিক আমলাতন্ত্র অভন্তরীন দ্বন্দ্ব , মৌলিক কোন দ্বন্দ্ব ছিল না। জেনারেল জিয়ার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্পকে বুঝতে হলে জেনারেল জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শকে পর্যালোচনা যথেষ্ট।
১৯৭৭ সালের ইতিহাস প্ৰকল্প থেকে মুক্তিযুদ্ধে বিএলএফ এর ভূমিকা প্রায় দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময়ে প্রবাসী সরকারের সামরিক আমলাতন্ত্রের সাথে বিএলএফ এর বিরোধ বহুল আলোচিত ও লিখিত – প্রকাশিত। বিএলএফ এর ভূমিকাকে ছোট করে দেখার ক্ষেত্রে যুদ্ধকালীন অন্যতম সামরিক আমলা কর্তৃক হাসান হাফিজুর রহমান নিয়োগ প্রাপ্তি ও কমিউনিস্ট মতাদর্শের প্রতি সহনাভুতিশীলতা কতটুক প্রভাব বিস্তার করেছে বিবেচনায় আনা দরকার। ব্যাক্তিগত ভাবে হাসান হাফিজুর রহমান কমিউনিস্ট মতবাদ বা পার্টির সাথে যুক্ত ছিলেন – এমনটি পত্রিকান্তরে প্রকাশিত।
বাংলাদেশের সকল ঘরনার কমিউনিস্টদের ধারণা বিএলএফ কোথায় যুদ্ধ করেনি। আর চীনপন্থী কমিউনিস্টরা মনে করে বিএলএফ এর তৈরী হয়েছিল কমিউনিস্ট নিধনের ভারতীয় প্রকল্প হিসেবে। যুদ্ধ পূর্ব বিএলএফ – ছাত্র বুদ্বিজীবীদের উদ্যোগেই বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার নকশা প্রণয়ন , পতাকা উত্তোলন , স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন, স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ, জয় বাংলা বাহিনীর তৈরী হয়েছিল। যুদ্ধকালীন বিএলএফ এর ইতিহাস যুদ্ধ পূর্ব সময়ের রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় লিখলে ১৯৭১ এর যুদ্ধের রাজনৈতিক দিক স্পষ্ট হয়ে উঠে , সামরিক -বেসামরিক আমলাতন্ত্রের যুদ্ধকালীন অবস্থান নড়বড়ে দেখায়।

অপু সারোয়ার

