এই সুজলা-সুফলা বসুন্ধরা কোনো ঐন্দ্রজালিক শক্তিতে সম্পদশালী হয়ে ওঠেনি। এত খাদ্য, পোশাক, বাড়ি, গাড়ি, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন সব কিছুই কিন্তু মানুষের শ্রমে তৈরি হয়েছে। এখানে কোনো জাদুমন্ত্র নেই। আছে মানুষের পরিশ্রম, নিরবচ্ছিন্ন সাধনা, নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার আর সমাজের পরিবর্তন। সে কারণে প্রবাদবাক্য তৈরি হয়েছিল ‘পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি।’ কিন্তু কালের প্রবাহে বা কলকাঠির জোরে প্রবাদ তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছে। এখন শ্রমের পরিবর্তে পরের শ্রম আত্মসাৎ, বুদ্ধির পরিবর্তে কৌশল, চেষ্টার পরিবর্তে চুরি, লক্ষ্য অর্জনের জন্য লেগে থাকার পরিবর্তে দ্রুতগতিতে লুটপাট, সৌভাগ্য ও সাফল্য অর্জনের নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিশ্রম করে সৌভাগ্য অর্জন তো দূরের কথা শ্রমজীবীদের দুর্ভাগ্য কাটছেই না।
প্রাণান্ত পরিশ্রম করে বাংলাদেশের কৃষক। দেশের শ্রমশক্তির ৪৭ শতাংশ বা প্রায় ৩ কোটি কৃষক আর ১২ কোটির বেশি মানুষ কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। আর বাংলাদেশের কৃষি এখনো প্রধানত প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। বন্যায় ডুবে যায় মাঠ, খরায় ফেটে যায় মাটি, শীতে কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে থাকে জমি। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষাসহ প্রতিকূল সব পরিবেশে কৃষকরা কঠোর পরিশ্রম করে ফসল ফলায় মাঠে। বাংলাদেশের মাটির উর্বরাশক্তি বেশি এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। এক লাখ ৪৭ হাজার বর্গ কিলোমিটারের এত ছোট দেশে প্রায় ১৭ কোটি মানুষ। প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১৫৫০ জনের বেশি মানুষের বাস পৃথিবীর আর কোনো দেশে আছে কিনা জানা নেই। এই বিশালসংখ্যক মানুষের খাদ্য জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে মাটির উর্বরাশক্তি, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার আর কৃষকের কঠিন পরিশ্রমের ফলে। এত ফসল ফলিয়ে জমি যেমন হারাচ্ছে তার উর্বরতা, তেমনি বাড়ছে সার ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা। শুধু যে জমিই তার উর্বরতা হারাচ্ছে তা নয়, কৃষক হারাচ্ছে তার প্রাণশক্তি। প্রচুর ফসল ফলানো পুষ্টিহীন কৃষক আর অপুষ্ট সন্তান অন্য কোনো দেশে দেখা যাবে কিনা সন্দেহ। জমিতে কৃত্রিম বা রাসায়নিক সার দিয়ে ক্ষয় পূরণের চেষ্টা করা হলেও কৃষকের শরীরের বা সংসারের ক্ষয়পূরণ কীভাবে করা যাবে তা নিয়ে ভাবনা নেই নীতিনির্ধারকদের।
এ দেশের শ্রমিকের কর্মক্ষমতা এবং কাজ শিখে নেওয়ার ক্ষমতা অসাধারণ। চীন, ভিয়েতনাম, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার চেয়ে কম মজুরিতে কাজ করে বাংলাদেশকে তৈরি পোশাক শিল্পে বিশ্বে দ্বিতীয় বা তৃতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করেছে শ্রমিকরা। চা, চামড়া, জুতা শিল্প, জাহাজভাঙা, জাহাজ নির্মাণ শিল্প, ওষুধ, স্টিল, সড়ক পরিবহন, নৌপরিবহন, পাটশিল্পসহ উৎপাদন ও সেবা খাতের শ্রমিকদের পরিশ্রমে দেশের চাহিদা পূরণ ও রপ্তানি হচ্ছে। দেশের জিডিপি এবং মাথাপিছু আয় বাড়ছে। অর্থনীতির গতি আর উন্নয়নের চালিকাশক্তি এই শ্রমিকরা। কিন্তু কারও খুব একটা ভাবনা নেই যে তাদের জীবন চলে কীভাবে?
বাংলাদেশ এক অর্থে শোষিত ভূমি ও মানুষের দেশ। জমি শোষিত হয়ে হারায় তার খাদ্যপ্রাণ, নদী শোষিত হয়ে হারায় তার প্রবাহ, কৃষক-শ্রমিক শোষিত হয়ে হারায় তাদের জীবনীশক্তি। কিন্তু শুধু শোষণই তো একমাত্র কথা নয়। যারা শোষিত হয় তারা শুকিয়ে যায় আর তার বিপরীতে যারা শোষণ করে তারা স্ফীত হয় সব দিক থেকে। ফলে-ফসলে ভরে ওঠে এদের গোলা এবং ব্যাংক ব্যালেন্স। এই ব্যালেন্স ওয়ালারাই এখন সব। এরা রাষ্ট্রক্ষমতা ও লুটপাটের সক্ষমতার ব্যালেন্স করতে করতে ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ায়। এবং এটা বড় হতে হতে এত বড় হয় যে দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের ব্যাংকে গিয়ে ঠাঁই নেয়। ক্ষমতাসীনদের ছোঁয়ায় এরা জন্ম নেয়, ক্ষমতার ছায়ায় বড় হয় এবং ক্ষমতাসীনদের মায়ায় বিপদ আপদ থেকে রক্ষা পায়। এই তালিকায় কত নাম আমরা দেখছি। নতুন নতুন নামের ভিড়ে পুরনোরা চাপা পড়ে যাচ্ছে।
পি কে হালদার, পুরো নাম প্রশান্ত কুমার হালদার গত বেশ কিছুদিন ধরে পত্রিকার পাতা ‘আলো’ করে আছেন। শত শত মানুষকে অর্থনৈতিক সংকটের অন্ধকারে ডুবিয়ে দিয়ে তিনি এখন কানাডায়। কখনো বলা হচ্ছে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আবার কখনো বলা হচ্ছে দশ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন তিনি। তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন , পি কে হালদার ও তার সহযোগীদের মালিকানাধীন ৩০টি প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ হাজার ২০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা কানাডা, সিঙ্গাপুর ও ভারতে পাচার করেছেন। বর্তমানে কানাডায় অবস্থানকারী পি কে হালদার ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের কাছ থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা, ফাস ফাইনান্স থেকে দুই হাজার ২০০ কোটি টাকা, পিপলস লিজিং থেকে তিন হাজার কোটি টাকা এবং রিলায়েন্স ফাইনান্স থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎকরেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অবৈধ ক্যাসিনো মালিকদের সম্পদের তদন্ত শুরু করলে পি কে হালদারের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠে আসে। সে সময় দুদক যে ৪৩ জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছিল, পি কে হালদার ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। এ যেন কেঁচো খুঁড়তে অজগর বেরিয়ে আসার মতো ঘটনা!
শুরুতে যে ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে বা আলাদিনের চেরাগের কথা যা রূপকথার গল্প তাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে দেশের এই সব অর্থ সম্পত্তির মালিকদের জীবন উপাখ্যান। পিরোজপুর জেলার সরকারি প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষিকার সন্তান পি কে হালদার। ২০০৮ সাল থেকে ২০১৯ সাল কী বিস্ময়কর উত্থান! ২০০৯ সালে তিনি রিলায়েন্স ফাইনান্সের এমডি হয়ে যান, ২০১৪ সালে কানাডায় পি অ্যান্ড এল হাল হোল্ডিং ইনক. নামে কোম্পানি খোলেন। ২০১৫ সালে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের এমডি পদে যোগ দেন। ২০১৮ সালে হাল ট্রিপ টেকনোলজি নামে ভারতে কোম্পানি খোলেন, কলকাতার মহাজাতি সদনে তাদের অফিস। মা লীলাবতী হালদার, ভাই প্রিতিশকুমার হালদার আর ভাইয়ের স্ত্রী সুস্মিতা সাহা মিলে পারিবারিক অর্থনৈতিক লুণ্ঠন সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন পি কে হালদার। মা লীলাবতী হালদারের ৩টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছিল ১৬০ কোটি টাকা। একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রাথমিক স্কুল শিক্ষিকার ব্যাংকে এত টাকা কীভাবে জমা হতে পারে তা নিয়ে ব্যাংক কখনো প্রশ্ন তোলেনি কেন, এটাই এখন একটা কোটি টাকার প্রশ্ন।
২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে-পরে চারটি প্রতিষ্ঠান নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন পি কে হালদার। প্রতিষ্ঠান চারটি হলো ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসেস, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইনান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড এবং বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইনান্স কোম্পানি। আশ্চর্যের ব্যাপার ছিল এই যে, এসব প্রতিষ্ঠানের কোনোটিতেই পি কে হালদারের নিজের নামে কোনো শেয়ার নেই। এ যেন অদৃশ্য মালিকের দৃশ্যমান কারসাজি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা নামে যে একটি প্রতিষ্ঠানের কথা শোনা যায় তাদের তৎপরতাও তো দৃশ্যমান হয়নি। এতদিন ধরে এবং এত বড় ঘটনা ঘটে গেল দেশে সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের কি কোনো ভূমিকা ছিল না?
বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ রাষ্ট্রপতি থাকার সময় ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টে (বিআইবিএম) একটি স্মারক বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে ঋণখেলাপিরা মহাবিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। যে যত বেশি ঋণখেলাপি, সে তত বেশি প্রভাবশালী। ঋণখেলাপিরা প্রায় সব রাজনৈতিক দলেই ছড়িয়ে আছে। তাই তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। ব্যাংক থেকে যারা মোটা অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করেছে, এমনকি হাজার কোটি টাকার ওপরও ঋণ গ্রহণ করছে, তাদের রাজনৈতিক দলগুলো প্রশ্রয় দিচ্ছে। যেমন ছাত্র, মাস্তান ও সন্ত্রাসীরা ছাড়া আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো চলে না, তেমনি বড় বড় ঋণখেলাপি ছাড়াও রাজনৈতিক দল চলে না।’ একজন রাষ্ট্রপতি যখন এ ধরনের কথা বলেন তখন রাষ্ট্রের ভূমিকা ও ক্ষমতাসীন দলের দায় কোনোভাবেই এড়ানো যায় না। এরপর সময় যত গড়িয়ে গেছে, ঋণখেলাপির পরিমাণ ও সংখ্যা দুটোই বেড়েছে। বেড়েছে দেশ থেকে টাকা পাচার। গরিব দেশে দ্রুতগতিতে ধনী হওয়ার রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশে। ওয়ার্ল্ড ফিনান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির তথ্য মতে বাংলাদেশ থেকে ২০১৪ সালে ১ হাজার কোটি ডলার পাচার হয়ে গেছে। আমাদের বহু প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতুর মতো ৩টি সেতু নির্মাণের খরচ মেটানো যেত এই টাকা দিয়ে।
দুই অর্থনীতিবিদ মির্জা এম হাসান ও সেলিম রায়হান ‘নেভিগেটিং দ্য ডিলস ওয়ার্ল্ড : দ্য পলিটিকস অব ইকোনমিক গ্রোথ ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে একটি গবেষণায় বলেছিলেন ‘বাংলাদেশ আইনের শাসনের ভিত্তিতে চলে না। বাংলাদেশ চলে ডিলস বা নানা ধরনের লেনদেনের ওপর ভিত্তি করে।’ এরকম ডিলের মাধ্যমে জন্ম নেয়, বেড়ে ওঠে পি কে হালদারের মতো মানুষেরা। একজন যায় আর সে জায়গা পূরণ করতে এগিয়ে আসে নতুন নতুন মুখ। পি কে-দের প্রাণভোমরা হলো পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক লুণ্ঠন। এই ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপকরা বহাল থাকলে জনগণের ট্যাক্সের টাকা ও কষ্টের সম্পদ বেহাত হবে, বিদেশে পাচার হবে। কাগজে-কলমে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সঙ্গে বাস্তবে বাড়বে আয় বৈষম্য। তাই লুটপাটকারীদের সম্পদ দেখে চমকে উঠলে চলবে না, তাদের সম্পর্ক কাদের সঙ্গে তাদেরও চিহ্নিত করা দরকার। তা না হলে মুষ্টিমেয় কয়েকজনের স্বার্থে বিপুল সংখ্যক মানুষের সর্বনাশ ঠেকানো যাবে না। পি কে হালদার একটা নাম কিন্তু লুণ্ঠন একটি প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া বন্ধ না হলে বহু হালদার জন্ম নেবে, বাংলাদেশ লুণ্ঠিত হতে থাকবে।
লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট
rratan.spb@gmail.com

