সাধের লাউয়ের ডুগডুগি, আর কত বাজাবেন ?

কে না জানে বিখ্যাত শিল্পী রুনা লায়লার কন্ঠে গাওয়া সাধের লাউ গানের কথা ! এই গানটির রচয়িতা, সুরকার, গাওয়া নিয়ে অনেক বড় ইতিহাস পাওয়া যায় এবং অনেকর সংশ্লিষ্টতাও পাওয়া যায় এই গানের সাথে । তবে সবকিছুকেই ছাড়িয়ে এই গানের এক কথায় পরিচিতি রুনা লায়লা । তুলনা করছি না এবং এটা তুলোনার বিষয়বস্তুও নয়। গানটির কথা হঠাৎ মনে হলো বলেই বলা। তবে একথা সত্য যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসটিও নির্মোহভাবে ঘাঁটলে, লাখো প্রাণ, লাখো শহীদের রক্ত, তারপরেও সবকিছুর মূলে পরিচিতি কিন্তু বঙ্গবন্ধু। বিনা বঙ্গবন্ধুতে স্বাধীনতা ভাবাটাও অন্যায় হবে এবং সম্ভব হতো কিনা, সেই প্রশ্ন করাটাই অবান্তর। অর্থাৎ স্বাধীনতা আর বঙ্গবন্ধু  একই  অর্থের দুইটি শব্দ মাত্র।

সাধের লাউয়ে ডুগডুগি বাজানোর কথা কেন বললাম। এত রক্তের বিনিময়ে এই স্বাধীন দেশ অথচ আজও এই দেশটিকে নিয়ে ডুগডুগি বাজানো হচ্ছে। কবে যে এর শেষ ? কোনো জ্যোতিষের পক্ষেই বলা সম্ভব হবে না । সেই যে স্বাধীনতর পর থেকে বাজানো হচ্ছে, আজও বাজাচ্ছে এবং চলছেই  !

লক্ষণীয় যে, দেশটি নিয়ে ডুগডুগি কিন্তু আমাদের পরিচালনাকারি রাজনৈতিক দলগুলোই বাজিয়ে  আসছে, ভিন্ন কেউ নয় । তিনবার সেনা শাসকদের আগমন ঘটেছিলো বটে, তবে শেষও হয়েছিলো। বাকি   সময় কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাই ডুগডুগি  বাজিয়েছেন এবং আজ অব্দি বাজিয়েই যাচ্ছেন !

বর্তমানে চলছে আগস্ট মাস। ইতিহাস ঘাঁটলে এই আগস্টে দুটো ডেটলাইন  সত্যি ন্যাক্কারজন ও জঘন্য শতভাগ। জাতির জন্য কলঙ্কের চরম সীমা। তারপরেও ইতিহাস ঘাঁটলে কি সব বিভৎসহ্ বিষয় সামনে চলে আসে ! এই দেশ স্বাধীন হলো, আবার স্বাধীন দেশে রক্ষীবাহিনীর বর্বরতা দেখা দিলো।  অন্যায়  অবিচার সব চললো। ফলাফল হাজার হাজার যুবক  তরুণদের রক্ত। কেউ স্বীকার করুক আর নাই বা করুক, তৈরি হলো ১৫ আগস্টের প্রেক্ষাপট। স্বাধীন দেশের  ইতিহাসের পাতায় কালো অধ্যায় ।

সেই কালো অধ্যায় মোছা তো দুরের কথা, দেশের সব বড় বড় রত্নরা ঝাপিয়ে   পড়লো ক্ষমতার সাধ গ্রহণে। তারা কারা? সেটা বলা আর প্রয়োজন দেখি না, কেননা আজকের দিনের প্রজন্মও সেটা জানে । সেই হীরা রুপার রত্নরাই আবার আজকের দিনে বুক ফুলিয়ে ক্ষমতার মধু সমান তালে গ্রহণ করে যাচ্ছে এবং বড় বড় বুলি আওড়ানো চলছে । জাতিকে জ্ঞান দান থেকে শুরু করে ধমকও দিচ্ছে। অথচ সেদিন তারাই বঙ্গবন্ধুর রক্ত শুকানোর আগেই  তারা   ক্ষমতার শপথ  নেয় ।  সেদিন যারা বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরি করলো, তারাও আজকে বঙ্গবন্ধুর দলের সাথে মিলেমিশে একাকার এবং ক্ষমতার ভাগীদার। স্বীকার করতেই হবে, বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধুর মতন বড় হৃদয়েরই বটে। সবাই মিলে দেশের ডুগডুগিও বেশ ভালোই বাজাচ্ছে ।

এখানেই শেষ নয় কিন্তু।  ডেডলাইনের দ্বিতীয় অংশটিতে দেশের ১৯ তম প্রেসিডেনটের সহধর্মিণী আওয়ামী নেতা আইভি রহমান সহ ২৪ জনের হত্যা, সাথে শ’তিনেক গুরুতর আহত, জীবন বিপন্ন । এবারের ডেডলাইনটির ভাবনা দেখলে শিহরিত হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না । যুদ্ধের গ্রেনেড দিয়ে প্রধান নেত্রীসহ পুরো দলকে চিরতরে পরিষ্কার করার পরিকল্পনা  !  এই দ্বিতীয় ডেডলাইন থেকেই চলছে দেশের রাজনীতি চরম ডুগডুগি বাজানো । এখান থেকেই রাজনীতির চরম বিভাজন, এটা হলফ করেই বলা যায়।  চলছে এবং কবে শেষ হবে, কেউ জানে না এবং শেষ হবার কোনো লক্ষণের ছোঁয়াও নাই ।

দ্বিতীয় ডেডলাইনকে একটু পাশে রেখে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে নজর রাখি । লক্ষণীয় যে, দ্বিতীয় ডেডলাইনে ২৪ টি জলজ্যান্ত তাজা লাশ ! ঠিক এমনিভাবে মাননীয় শেখ হাসিনার চট্টগ্রামের লালদিঘির ময়দানে সরাসরি গুলি করে ২৪টি তাজা প্রাণকে লাশ বানিয়েছিলো,  এরশাদ , পার্থক্য কেবল গ্রেনেডের জায়গায় বন্দুক ! ক্ষমতার কি লীলা খেলা! যে এরশাদের হাত ছিলো এই স্বাধীন দেশের তরুণ/যুবকদের রক্তে লাল, সেই   জাতীয়  পার্টিও এখন   বঙ্গবন্ধুর দলের অন্যতম সহযোগী ! এখনও বহাল তবিয়তেই ক্ষমতার সাধ গ্রহণে বেশ মজে আছে। বাজছে ক্ষমতার ডুগডুগি, বাজছে দেশের ডুগডুগি।

আসুন একটু (তথাকথিত) বিরোধী দলের  ভাষ্য বা তাদের অনুভূতি পড়ার চেষ্টা করি । তথাকথিত বললাম, কেননা বাস্তবিক অর্থে বর্তমানে কোনো বিরোধী দল দেশে নাই । কাজীর কিতাবের গরুর মতন আছে, বলা যায়।  গত এক যুগের উপরে বিরোধী দলের তথ্য মতে হাজার হাজার নেতাকর্মী পঙ্গুত্ব বরণ করেছে বর্তমানে ক্ষমতার আওয়ামী লীগের হাতে । শত শত ( বড় বড় নেতা সহ ) গুম/খুন/ক্রসফায়ার হয়েছে, সেটা দেশের জাতীয় পত্র- পত্রিকাতেও এসেছে, এমনকি প্রমাণও পাওয়া যায়। কথাগুলো কেন বললাম ?

১৫ আগস্ট/ ২১ আগস্ট এমন জঘন্য ঘটনাকে জাস্টিফাই করার জন্য কথাগুলো বলছি না । একটি জঘন্য ঘটনার সাথে আরেকটি জঘন্য ঘটনার কখনোই তুলোনা বা জাস্টিফাই হয় না এবং করাটাও অনৈতিক শতভাগ।  কেননা, হত্যা,  ,গুম এগুলো কখনোই জাস্টিফাই হতে পারে না, সেটা যেভাবেই হোক, আর রাষ্ট্রীয়ভাবে হলে তো চরম জঘন্য । যা হতে হয়, তা হলো শতভাগ দেশের প্রচলিত আইনে শতভাগ সঠিক বিচার।  আমরা আবার বিচার ব্যবস্থাতেও ডুগডুগি বাজাচ্ছি সেই অনেক পূর্ব থেকেই। ফলাফল দেশের আইন- আদালতেও জনমানুষের ভরসা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে গেছে বা নাই ।

মহাভারতের  মতন সত্য হলো আমাদের দেশের বেশিরভাগ সময়েই দেশের পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, বড় দুটি দল। এই বড় দুটি দল ছাড়া আগামীতেও ভিন্ন দলের ক্ষমতায় আসার কোনো লক্ষণ  নাই। তার কারণও আবার আন্তর্জাতিক সংযোগ।  এটা আবার বিরাট আলোচনা, যা সত্যি একটি স্বাধীন দেশের জন্য চরম লজ্জার , এটা আজকের বিষয় নয় । এই বড় দুটি দলের একে অপরের প্রতি সমান তালে অভিযোগ ছিলো, আছে, চলছে এবং অবস্থা দেখে মনে হয়, এর শেষ হবার নয়। এর অর্থ কি বহন করে ? এই বড় দুটি দল মূলত তাদের রাজনৈতিক স্বার্থের কারণেই মূলত দেশ নিয়ে ডুগডুগি বাজিয়ে চলছে ! এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে এই দেশ নিয়ে ডুগডুগি বাজানো আর শেষ হবার নয় ।

তাহলে করণী কি ? করণীয়র একটিই পথ খোলা আছে। আর সেটা হলো, দেশের প্রতি আপনাদের নিশ্চয়ই ভালবাসা আছে, সেই ভালবাসায় , জনগণের প্রতি একটু নমনীয় হয়ে, দেশের আগামীর ভবিষ্যত প্রজন্মের কথা ভেবে, সর্বোপরি দেশের বৃহৎ স্বার্থে,  আপনারা রাজনীতিতে একটু সহনশীল হন । আপনাদের সামান্য একটু রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং বৃহৎ হৃদয়ের কার্যকারিতা, দেশের ১৮ কোটি জনতাকে শান্তি ও সমৃদ্ধি করতে পারে । এমন শত উদাহরণ বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ডে আছে, যেখান থেকে আমাদের দেশের চেয়েও বড় বড় ডেডলাইনের ব্যারিকেড থেকে রাজনীতিকদের উদার ও মহানুভবতার কল্যাণেই জাতিকে রক্ষা করেছে। একটি উদাহরণই যথেষ্ট হতে পারে, আর সেটা হলো দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা। যেখানে কালো সাদার এমন তফাৎ থেকেও যদি ওরা শান্তি আনতে পারে, তবে আমরা একি জাতের হয়ে কেন পারবো না ?  পারা যায় না, এটা কোনো ফিলোসফিতেই  নেই । সবাই একবার নতুন করে দ্বিতীয়বার ভাবুন, সমাধান আপনাদের হাতের মুঠোতেই নিহিত আছে।

লেখার শেষে আব্দুল্লা আবু সাইদ স্যারের এটি কথা বলেই শেষ করবো। স্যার প্রায়শই একটি কথা উনার বক্তৃতায় বলেন , একজন সক্রেটিস ( Socretes) ছিলেন বলেই একজন প্লেটো ( Plato) এসেছিলো, একজন প্লেটো এসেছিলো বলেই একজন এরিস্টোটেল (Aristotle) জন্মে ছিলেন, একজন এরিস্টোটেলের কল্যাণেই একজন আলেকজান্ডার (Alexander) দি গ্রেট তৈরী হয়েছিলো। আফসোস আজকের এই বাংলায় বঙ্গবন্ধুর মতো  কেউ আসলো না ! কেননা আজকে যে একজন বঙ্গবন্ধুর মতন বড় হৃদয়ের মানুষের এই দেশটির ভীষণ প্রয়োজন। সাধের স্বাধীন দেশ নিয়ে আর ডুগডুগি বাজাবেন না, প্লিজ । অনেক হয়েছে, দেশের জনমানুষেরা আর নিতে পারছে না বলেই মনে হয়।

20190210_195317

বুলবুল তালুকদার 

যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.