জীবনের একটানা ২৭ বছর জেল খেটে এসে যে মানুষটির উপলব্ধি হলো আর নয় বিভাজন, এবার সমতার প্রয়োজন, যিনি আপন রংয়ের মানুষদের বুঝালেন বিভাজনে মুক্তি নাই, কেবলমাত্র সমতায় মুক্তি নিহিত আছে, অতঃপর কালো- সাদা মিলেমিশে একসাথে রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলনেন, সেই মানুষটি দক্ষিণ আফ্রিকা সহ আজকের সমগ্র বিশ্বের ব্ল্যাক ডায়মন্ড , ” নেলসন ম্যান্ডেলা “। বিশ্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গিয়েছিলেন, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ নয়, কি কালো বা কি সাদা, বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ডে শান্তির জন্য মানুষের শরীরে বাহিজ্যিক রংকে নয় মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন কর । সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই । নেলসন ম্যান্ডেলার দক্ষিণ আফ্রিকা আজকের বিশ্বে একটি উদাহরণ স্বরূপ রাষ্ট্র।
একটু নিজেদের ইতিহাসে আসি । ব্রিটিশরা ২০০ শত বছর এই এশিয়া কন্টিনেন্টালে শাসন করে গেছে। ব্রিটিশ শাসন বললেই মানুষমনে পরিষ্কার হয়ে উঠে কতটা রূঢ় ও বিবেকবর্জীত শাসন ছিলো । ওরা সাদা আর শাসন করতো এই অঞ্চলের কালোদের । অমানবিক শাসন ও পাশাপাশি ছিলো শোষণ। ওদের বিতাড়িত করা গেলো । অতঃপর দেশ ভাগ ( ভিন্ন চ্যাপ্টার ) । এই কন্টিনেন্টাল শিক্ষা গ্রহণ করলো না । একি রূঢ়তা চলালো পূর্বের সাথে পশ্চিমা পাকিরা । অতঃপর এই ভূখণ্ডে ৭১ একটি যুদ্ধ হলো। পশ্চিম পাকিস্তানিরা পূর্বের মানুষদের মানুষ ভাবতো না ! পশ্চিমা পাকিরা ভাবতো তারা গায়ে গতরে বড়/ফর্সা, মানে সাদার অধিকারী, আধুনিক সমাজের মানুষ (!), পাঠান / পশতু বলে আলাদা ভাবসাব। আর পূর্বের জনদের কালো/ খাটো/ বেটে বলে তিরস্কার করতো। অন্যায়- অবিচার আর পাসন্ডতার সীমা অতিক্রম করেই চলছিলো। অতঃপর যা হবার তাই হলো । বীর বাঙালি রুখে দিলো । স্বাধীন হলো আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি, স্বাধীন বাংলাদেশ। আজকের দিনে সেই পশ্চিমা পাকিস্তানিরাই বিশ্বের সব চাইতে ঘৃণিত রাষ্ট্রগুলোর একটি ।
অ্যালেক্স হ্যালির রচিত ” Roots” ( শিকড় ) একটি বিশ্ব বিখ্যাত উপন্যাস ( দ্যা সাগা অফ অ্যা আমেরিকান ফ্যামিলি) এর উপর ভিত্তি করে ১৯৭৭ সালে এই নামেই ইংরেজির একটি মিনি সিরিজ ছিলো নতুন সংস্করণ। গাম্বিয়া থেকে অপহরণ এবং ব্রিটিশ দাস ব্যবসায়ীদের দ্বারা নিউ ওয়ার্ল্ডে বিক্রি হয়েছিলো । তারপর তার সন্তান ও শিশুদের দাসত্বের কাহিনীটি পরবর্তীতে সাতটি প্রজন্মের মধ্যে অবসান ঘটে। এই সিরিজটি বিশ্বের প্রায় সব দেশেই বেশ প্রচারিত হয় । মনে পরে ৮০ দশকে দেশের বিটিভিতে রাতের দশটার খবরের পরে প্রচারিত হতো। গা শিহরিত হয়ে যাবার মতন রূঢ়তার কোনো ছবি বা সিরিয়াল, সেটাই জীবনের প্রথম দেখা আমার ।
হলিউডের কলম্বিয়া পিকচার্স সাম্প্রতিককালে ২০১২ সালে রেগিনাল্ড হভলিন, স্ট্যাসি শের এবং পিলার স্যাভোনের প্রয়োজনায়, পৃথিবী বিখ্যাত অভিনেতাদের মধ্যে জেমি ফক্স/ ক্রিস্টোফার ওয়াল্টজ/লিওনার্দো ডি ক্যাপরিও এবং স্যামুয়েল এল জ্যাকসন এর সমন্বয়ে কালোদের উপরে নির্যাতনের ফ্লিম নিয়ে আসে Django (জ্যাঙ্গো ) ২০১৩ সালে জ্যাঙ্গো ছবিটি অস্কারে ভূষিত হয় । জ্যাঙ্গো এমন একজন দাস যিনি ১৮৫৮ সালে আমেরিকার গভীর দক্ষিণে বাস করতেন এবং স্ত্রী ব্রুনহীল্ডের কাছ একে পৃথক হয়েছিলো । ছবিটিতে একজন জার্মানি দন্তচিকিৎসক ডাঃ শুল্টজ অপরাধীদের ব্রিটল ব্রাদার্সের দলকে হত্যা করার জন্য জ্যাঙ্গোর সহায়তা নেয়। বিনিময়ে ডাঃ শুল্টজ জ্যাঙ্গোকে স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং শেষ অব্দি ডাঃ শুল্টজ নিজের জীবনকে ঝুকির মধ্যে দিয়েই ( মৃত্যু বরণ করেন ) জ্যাঙ্গো ও তার স্ত্রী ব্রুনহীল্ডের মুক্ত জীবন লাভ করে ( ছোট্ট করে বলা )। কালোদের উপরে কেমন অত্যাচার/ অবিচার হতো , জ্যাঙ্গো ছবিটি একটি ইতিহাসের পটপর্ব। জ্যান্ত কালোদের কেমন করে তেজি কুকুর দিয়ে খাবলিয়ে খাওয়ানো হতো, কেমন করে পাশবিক অত্যাচার কালোদের করা হতো, এই ছবিটি তার জ্বলন্ত উদহারণ।
২৫ মে জর্জ ফ্লয়েড দোকান থেকে সিগারেট খরিদ করে ২০ ডলারের একটি নোট দোকানিকে দেয় । দোকানির মনে সন্দেহ হলো এটা জাল নোট । সঙ্গে সঙ্গেই ৯১১ তে জরুরি কল। ফ্লয়েড ইতিমধ্যেই তার গাড়িতে উঠে বসেছে। পুলিশ এলো দ্রুত গতিতে। পুলিশ ফ্লয়েড কে গাড়ি থেকে নামালো, হাতকড়া লাগালো, পুলিশের গাড়িতে তোলার চেষ্টা। ফ্লয়েড বিনা ওয়ারেন্টে পুলিশের গাড়িতে উঠতে নারাজ, এক পর্যায়ে ধস্তাধস্তি, ফ্লয়েড মাটিতে পড়ে গেলো। ডেরেক শ্যাভিন নামের সেই সাদা পুলিশ হাঁটু দিয়ে ফ্লয়েডের ঘাড় চেপে ধরে । ফ্লয়েড দম নিতে পারছে না , বারবার অনুরোধ করেও লাভ হলো না । শ্যাভিন হাঁটুচাপা দিয়েই রাখলো। আর হাঁটুর নিচে ফ্লয়েডের স্তিমিত কন্ঠ ” আই কান্ট ব্রিদ “- আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না । ফ্লয়েডের আঁকুতি সাদা পুলিশের কান পর্যন্ত পৌঁছালো না! অবশেষে যা হবার তাই হলো, কিছুক্ষণ আগের তরতাজা জ্যান্ত মানুষটি (ফ্লয়েড) লাশে পরিণত হলো । যা ঘটলো সবকিছুর জন্য দায়ী ” মানুষটি ছিলো কালো ” । কালো মানুষ ফ্লয়েডের বিদায় !!!
উপরে লেখায় নেলসন ম্যান্ডেলা , ব্রিটিশ শাসন, পাকিদের অত্যাচার এবং দুটো ছবির বর্ণনা দেবার কারণ একটাই, এই অব্দি বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ডে কোটি মানুষের রক্ত দেবার পরেও, এত শত বছর পরে এসেও, আমেরিকা চারশত বছর পরেও, কালো মানুষগুলো নিশ্বাস নিতে পারছে কি ? আজও ফ্লয়েডদের স্তিমিত কন্ঠে বলতে হয় , ” আই কান্ট ব্রিদ “।

বুলবুল তালুকদার
যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম

