করোনা ও প্রবাসী শ্রমিকের দীর্ঘশ্বাস

 

করোনা কত বিষয়কে যে আমাদের সামনে নতুন করে তুলে ধরল তার ইয়ত্তা নেই। আমরা অনেক কাজ করি, অনেক কিছু দেখি যার কার্যকারণ খেয়াল করি না। যেমন, সিডনি বিশ্ববিদ্যালয় ২৬ জন হবু ডাক্তারের উপর ভিডিও জরিপ চালিয়ে দেখেছে যে গড়ে প্রতি ঘণ্টায় ২৩ বার মানুষ মুখমণ্ডলে হাত দেয়। অভ্যাসে এবং অজান্তেই যে মানুষ এ কাজ করে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। করোনা সংক্রমণের ক্ষেত্রে এই মুখে হাত দেয়ার অভ্যাস মানুষকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে ফলে সতর্কতা বেড়েছে মানুষের। তেমনি মানুষ দিনে কতবার মুখ দেখে তা নিয়ে জরিপ চালালেও কিছু চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে আসবে। অথচ মানুষ দাড়িয়ে থাকে যে পায়ের উপর ভর করে সেই পা ঘণ্টায় তো দুরের কথা দিনেও কতবার দেখে তা বলা মুস্কিল। মুখের দিকে যত তাকাই, মুখের যত যত্ন নেই পায়ের প্রতি ঠিক ততটাই যেন অবহেলা। কিন্তু যদি পা ভাঙ্গে বা মচকায় তাহলে বুঝতে অসুবিধা হয় না এর গুরুত্ব কতখানি। মানুষের ক্ষেত্রে যেমন, রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও এটা তেমনি ব্যাপার। উন্নয়নের গল্পে এবং জৌলুসে যতখানি মুগ্ধ হই, উন্নয়নটা দাড়িয়ে আছে কিসের উপর ভর করে তা খেয়াল করি না এবং কখনো তার মুল্য দিতেও চাই না। কিন্তু যখন উন্নয়নের পা খোঁড়া হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে তখন সম্বিৎ ফিরে আসে। ততক্ষণে দেরি হয়ে যায় অনেক আর তার ফলে মাসুল দিতে হয় প্রচুর।

বাংলাদেশকে একটি ঘরের সাথে তুলনা করলে তার চারটি প্রধান খুঁটি হল কৃষি, ক্ষুদ্র পুঁজির অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত, বৈদেশিক মুদ্রা আনয়নকারী প্রবাসী শ্রমিক আর গার্মেন্টস খাত। এই চার খাতের সঙ্গেই যুক্ত শ্রমজীবী মানুষ। তাদের প্রতি অবহেলা, অপমান ও তাচ্ছিল্যের কোন সীমা পরিসীমা নেই। কর্মসংস্থান এবং আয়ের ক্ষেত্রে তাদের প্রধান ভুমিকা কিন্তু সন্মান কোথাও নেই। খাদ্যের যোগান দেয়া, আভ্যন্তরীণ বাজারকে সচল রাখা, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করার ক্ষেত্রে এই খাতগুলো সর্বাধিক ভুমিকা পালন করে অথচ রাষ্ট্রের কাছে সর্বনিম্ন সহায়তা পেয়ে আসছে এ যাবতকাল। যে পায়ের উপর দাড়িয়ে থাকা তাঁকেই অবজ্ঞা করার নীতি চলে আসছে। তার ফল যা হবার তাই হয়েছে এবং এই করোনাকালে দাঁড়াতে হলে আবার সেই পায়ের দিকেই তাকাতে হচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চার খুঁটির একটি হচ্ছে প্রবাসী শ্রমিক। পৃথিবীর ১৬৯ টি দেশে ১ কোটি ২২ লক্ষ প্রবাসী আছে। প্রায় প্রতি ১৬ জনে একজন বাংলাদেশী দেশের বাইরে জীবিকার জন্যে অবস্থান এবং কাজ করছেন। গত বছরও তারা বৈধ পথেই ১৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন তারা দেশে। হুন্ডি এবং অন্যান্য পথে পাঠানো টাকাকে হিসেবে ধরলে এর পরিমাণ আরও ৪/৫ বিলিয়ন ডলার বেড়ে যাবে। গার্মেন্টস খাতে ৩৪ বিলিয়ন রপ্তানি আয় হয়েছে গত বছর। কাঁচামাল আমদানি, যন্ত্রপাতি কেনার খরচ বাদ দিলে গার্মেন্টস খাতে যা আয় হয় তার চেয়ে দ্বিগুণ বৈদেশিক মুদ্রা আসে প্রবাসীদের মাধ্যমে। দেশে প্রতিবছর ২২ লাখ কর্ম প্রত্যাশী আসে শ্রমের বাজারে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় মাত্র দেড় লাখের মত কর্মসংস্থান হয়। বিপুল বেকারের কিছু কর্মসংস্থান হয় বেসরকারি খাতে ও স্বকর্ম সংস্থানের মাধ্যমে এবং গড়ে ৭ লাখের মত কাজের সন্ধানে পাড়ি জমায় দেশের বাইরে। মধ্যপ্রাচ্য এক্ষেত্রে অদক্ষ শ্রমিকদের প্রধান কাজের অঞ্চল। একক দেশ হিসেবে সউদি আরবে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী শ্রমিক কাজ করে। এ সংখ্যাটা প্রায় ২০ লাখ ৮৪ হাজার। সংযুক্ত আরব আমিরাতে আছেন ১৩ লাখ ৭০ হাজার, ওমান মালয়েশিয়ায় আছে ১০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশী। এরপর কাতার, কুয়েত, সিঙ্গাপুর ও বাহরাইনে বাংলাদেশী শ্রমিক কাজ করেন। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ইতালিতে সবচেয়ে বেশি প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজারের মত বৈধ এবং প্রায় লাখ খানেক বৈধ কাগজ ছাড়া প্রবাসী শ্রমিক আছে বলে ধারণা করা হয়। এছাড়া জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডে বেশ ভাল সংখ্যক প্রবাসী আছেন। আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াতে যেমন প্রবাসী আছেন তেমনি আইস ল্যান্ড, সাইপ্রাস বা মালদ্বীপ এবং এরকম যাওয়ার সুযোগ যেখানে আছে সেখানেই বাংলাদেশী পাওয়া যাবে। তারা দেশ ছেড়েছেন কাজের আশায় বা উন্নত জীবনের আকর্ষণে। কিন্তু যেখানেই তাঁরা যান না কেন শিকড় তো তাদের দেশেই। তাই দেশের ভাল খবরে যেমন উল্লসিত হন খারাপ কিছুতে তাদের প্রাণটাও তেমনি কাঁদে। করোনা যখন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বিশাল ধাক্কা দিয়েছে তখন প্রবাসীরাও প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কি হবে তাদের এবং তাদের পাঠানো টাকার উপর নির্ভরশীল পরিবারের?

কাজের সন্ধানে নিজের খরচ ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিয়ে যারা বিদেশে গিয়ে কাজ করেন তাঁরা তাদের কষ্টের রোজগারের টাকার একটা বড় অংশ পাঠাতেন দেশে যা শুধু তাদের পরিবারের প্রয়োজন মেটাত তাই নয় তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতো, আমদানি রপ্তানির ঘাটতি মেটাতে সহায়তা করতো। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশের আমদানি ব্যয় ছিল ৫৫৪৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার আর রপ্তানি আয় ৪ হাজার ৫৩ কোটি ডলার। পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি ছিল ১৪৯০ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এই ঘাটতি মেটাতে রেমিটেন্সের একটা বড় প্রভাব আছে। করোনা সংক্রমণ এড়াতে বিশ্বের দেশে দেশে লক ডাউন থাকায় তেলের ব্যবহার কমেছে আর এর প্রভাব তেলের দামের উপর পড়েছে ফলে তেলের দাম কমে এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। যুক্তরাজ্যে প্রতি ব্যরেল তেলের দাম ২৩ ডলারে নেমে এসেছে। তেলের দাম কমে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের তেল নির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে মারাত্মক ধস নেমেছে। ফলে সেসব দেশে কর্মরত শ্রমিকদের চাকুরী, মজুরির উপর এর প্রভাব পড়বে ভীষণভাবে।

বাংলাদেশের রেমিটেন্স আসার ক্ষেত্রে শীর্ষ ১৫ টি দেশ হল- সউদি আরব, আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, কুয়েত, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, ওমান, কাতার, ইতালি, বাহরাইন, সিঙ্গাপুর, দক্ষিন আফ্রিকা, ফ্রান্স, দক্ষিন কোরিয়া, ও জর্ডান। এর মধ্যে রেমিটেন্সের ৬০ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ভুক্ত দেশগুলো থেকে ১২.৫ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্র , কানাডা থেকে ১১ শতাংশ, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশ অস্ট্রেলিয়া, জাপান, মালয়েসিয়া,সিঙ্গাপুর থেকে আসে ১১ শতাংশ। এ সব অঞ্চল ও দেশে করোনার প্রভাবে অর্থনীতিতে সংকটের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। যার অবধারিত প্রভাব পড়বে বাংলাদেশী প্রবাসী শ্রমিকদের জীবনে এবং দেশের অর্থনীতিতে। ইতিমধ্যে কুয়েত, বাহরাইন, মালদ্বীপ সহ বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশী কর্মী ফেরত আনার জন্য সে দেশগুলো তাগিদ দিয়েছে বলে জানা গেছে। প্রবাসী আয়ও কমছে এবং ক্রমাগত বাড়ছে আশংকা। এ বছরের মার্চ মাসে প্রবাসী আয় এসেছে ১২৮.৮৬ কোটি ডলার যা গত ২০১৯ সালের মার্চ মাসে ছিল ১৪৫ কোটি ডলার। আয় কমে যাওয়ার প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে ইতিমধ্যেই।

প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে বিভিন্ন ধরণের ভুমিকা পালন করে এসেছে । রাষ্ট্র কাজের ব্যবস্থা করতে পারে নাই, তাঁরা কাজ জুটিয়ে নিয়ে দেশের বাইরে চলে গেছেন। বেকারত্বের চাপ কমিয়েছেন, পরিবারের দায় বহন করেছেন, তাদের উপর নির্ভরশীলদের লেখাপড়া করানোর দায়িত্ব নিয়েছেন, বৃদ্ধ বাবা- মা’র আর্থিক দায়িত্ব পালন করেছেন, কৃষিতে পুঁজি এবং প্রযুক্তির সরবরাহ করেছেন, দেশের আভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করেছেন আর আমদানি রপ্তানির ঘাটতি মোকাবিলায় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ করে অর্থনীতিতে রক্ত সঞ্চালন করেছেন। কিন্তু আজ তাঁরাই রক্ত শূন্যতার ঝুঁকিতে পড়ে গিয়েছেন। প্রায় পাঁচ ধরণের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে প্রবাসী শ্রমিক এবং রেমিটেন্স খাতে। বিদেশে যারা আছেন তাদের চাকুরির অনিশ্চয়তা, নতুন কাজের ক্ষেত্র সংকোচন, দেশে ফিরে আসা শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ, গত তিন মাসে প্রায় ২ লাখ সম্ভাব্য প্রবাসীর বিদেশ যাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং প্রবাসী আয় কমে যাওয়া এই ঝুঁকিগুলো মোকাবিলা করতে হবে। করোনা পরবর্তীতে দেশে বেকারত্বের চাপ বাড়বে ফলে বিদেশে যাওয়ার জন্য একটা বেপরোয়া মনোভাব তৈরি হবে। এর সুযোগ নেবে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো। প্রায় ৮ লক্ষ নারী শ্রমিক বিভিন্ন দেশে কাজ করে। মধ্যপ্রাচ্যে এমনিতেই তাদের জীবন ও কাজ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল এখন সে ঝুঁকি আরও বাড়বে।

প্রবাসী শ্রমিকদের ঘাম ও অশ্রু মেশানো রেমিটেন্স আমরা গুনেছি, গুমরে উঠা কান্না শুনিনি। প্রতিদিন গড়ে ১০ জন প্রবাসী শ্রমিকের লাশ এসেছিল সে খবরও রাখিনি। কতজন শ্রমিক বিদেশে যায় আর কতজন ফিরে আসে, এসে তাঁরা কি করে তার কোন ডাটা বা সঠিক তথ্য নেই। এখন তাঁরা দেশে ফিরে এসে কি করবে সেটাও খুব ভাল ভাবে ভাবা হচ্ছে না। একজন শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার সময় ৩ হাজার টাকা প্রবাসী কল্যাণ তহবিলে জমা দিয়ে যায়। বছরে প্রায় ২২৫ কোটি টাকা জমা হয় সেখানে। এই করোনা দুর্যোগে সে টাকা ফিরে আসা শ্রমিকদের কল্যানে যথাযথভাবে ব্যয় করা দরকার। করোনার দুঃসময় কেটে গেলে আবার যখন বিদেশে শ্রমিক হিসেবে তাঁরা যাবেন তখন অন্তত নেপালের মত জিরো মাইগ্রেশন কষ্ট নীতি যেন নেয়া যায় সে ব্যাপারে এখন থেকেই ভাবতে হবে। বিশ্বের অবকাঠামো গড়ে তোলা, সেবা খাতে শ্রম দেয়া আর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভুমিকা পালনকারী প্রবাসী শ্রমিকদের কথা যেন নীতি নির্ধারকরা ভুলে না যান। প্রবাসে শ্রম দিয়ে ন্যায্য মজুরী ও মর্যাদা পান না যারা আর দেশের অর্থনীতিতে ভুমিকা পালন করে স্বীকৃতি পায় না যে প্রবাসী শ্রমিক এই করোনা দুর্যোগে তাদের দীর্ঘশ্বাস যেন ভারী হয়ে না উঠে।

রাজেকুজ্জামান রতন, বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ।

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.