ঈদ আরবি শব্দ, যার আক্ষরিক অর্থ আনন্দ বা খুশি। এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদুল ফিতর সমাগত, উদযাপিত হবে দেশের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। ঈদ আসে খুশির জোয়ার আর আনন্দের বান নিয়ে। খাওয়া-দাওয়া, নতুন জামা কাপড় আর ঘোরাঘুরি, ছোট বাচ্চা থেকে বয়স্করা সবাই ঈদের আনন্দকে বরণ করে নেওয়ার জন্য উদগ্রীব। যুগ যুগ ধরে এই সংস্কৃতি চলে আসছে। কিন্তু এবার তাতে আঘাত হেনেছে করোনাভাইরাস মহামারি। বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের জন্য এমন বিবর্ণ একটা ঈদ এসেছে, যা আগে কখনো আসেনি। করোনাভাইরাস এর কারনে ঈদের উচ্ছলতায় মানুষের জীবনকে ছুঁয়ে যায় অন্যভাবে। ঈদ সবার জীবনে খুশি, আনন্দ, উললাস হাজারো মানুষের মুখে হাসি এনে দেয়। এই কথা মনে হলে, মনে পড়ে যায় নতুন জামা, অনেক কেনা কাটা, সাঝগোজ একটা মাস সবাই আনন্দে উল্লাসে মেতে থাকে। আর এবার এক অদৃশ্য ভাইরাসের কারণে থমকে দাড়িঁয়েছে সব। বিশ্বজুড়ে মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে বিপর্যস্ত জনজীবন। যা থেকে বাদ যায়নি বাংলাদেশও। ঈদ এলে ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু সব মানুষ মেতে ওঠে উৎসবে। সব বৈষম্য ও ভেদাভেদ ভুলে মানুষে মানুষে সৃষ্টি হয় সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ। ধনী -গরিব নির্বিশেষে সব মানুষ একটি দিনের জন্য হলেও ভুলে যায় হিংসা-বিদ্বেষ। ঈদ আসলেই মনে পড়ে ছেলেবেলার ঈদের স্মৃতি। ছোট বেলার ঈদগুলো অন্যরকম ছিল। ঈদের দিনকয়েক আগে থেকেই শুরু হয়ে যেত ঈদের আনন্দ। ভাই বোন সবাই মিলে ঈদের চাঁদ দেখতাম। বিশেষ করে ২৯ রমজান এর ইফতারের পর সবাই মিলে আকাশে চাঁদ খোঁজতাম। সবাই চেষ্টা করতাম কে সবার আগে চাঁদ দেখবে। যখন আকাশে ঈদের চাঁদ দেখতে পেতাম তখন সবাই মিলে যে হৈ-চৈ করতাম তা স্মরণ করলে আজও অতীতে ফিরে যাই। আজ অনেক বছর হলো এখন আর আকাশে চাঁদ দেখতে হয় না। অনলাই মিডিয়া বা ডিশ এর বদৌলতে সব দেখতে পাই। আগের মত ঈদের সেই আনন্দটা পাচ্ছি না। আসলে ঈদের সব আনন্দ হচ্ছে ছোটবেলায়। হাতে মেহেদী দেওয়া, ওড়না সহ পাজ্ঞাবী পরা, ঈদের সালামির টাকা দিয়ে গুলি কিনা। খুব ইচ্ছে করে ছোটবেলার সেই মুহূর্তগুলোতে ফিরে যেতে। ঈদের জামা পেয়েই তাড়াতাড়ি এসে আলমারিতে ঈদের জামা লুকিয়ে রাখতাম আর ভাবতাম ইসস্ যদি কেউ দেখে ফেলে পুরনো হয়ে যাবে। কাউকে জামা দেখাতে চাইতাম না কিন্তু অন্যদের জামা লুকিয়ে লুকিয়ে দেখার চেষ্টা করতাম। জুতা পায়ে লাগছে কীনা তা পরখ করার জন্যে জুতা পরে বিছানায় এক-দুবার হেঁটে দেখতাম। ঈদের নতুন জুতা বালিশের তলে রাখতাম। নতুন জুতোর গন্ধ বেশ লাগতো। গভীর রাতে উঠে নতুন প্যান্ট ও শার্ট আছে কিনা দেখতাম। নামাজ শেষে আব্বু আম্মুকে সালাম করতাম আমরা ভাইয়ে ভাইয়ে কোলা কুলি করতাম। ছোটবেলার এরকম বহু স্মৃতিগুলো আজো স্পস্ট মনে পড়তেই কেবল হাসি পাচ্ছে। ছোটবেলার ঈদ মানেই ছিলো বন্ধুদের সাথে সারাদিন ঘুরে ঘুরে বড়দের কাছ থেকে সালামি কালেক্ট করা। তখনকার একটা ঈদের আনন্দ অনেক বেশি ছিল। সারাদিন টো টো করে ঘুরা ও আত্মীয়-স্বজন বাড়ীতে ঘুরা আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে দিনটিকে ইনজয় করতাম। সারাদিন ঘুরে ক্লান্ত হয়ে যখন ঘরে ফিরতাম, তখনও বাকি আছে যাদুর বাক্স মানে টেলিভিশন আনন্দ দেবার। ঈদ উপলক্ষ্যে বিটিভিতে বেশ কয়েকদিন ধরে প্রচার করত ঈদের বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। যদি আবার ফিরেপেতাম আগের সবকিছু!!! প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের কারণে ঈদগাহে এবার ঈদের নামাজ হচ্ছে না। স্বাস্থ্যগত বিধিনিষেধের কারণে কোলাকুলিও করা যাবে না। এরকম একটি নিরানন্দময় ভার্চুয়াল ঈদ আমাদের আরও দূরে সরিয়ে দিল যেন। করোনাভাইরাস কারনে ঈদের উৎসব নির্জীব করে দিয়েছে। মানুষের বিষণ্ন চেহারায় মিলিয়ে গেল উৎসবের আনন্দ। নিঃসীম শূন্যতায় ঈদের আনন্দ হারিয়ে গেল। এভাবে ঈদের ছন্দপতন ঘটাল করোনাভাইরাস। এমন সাদামাটা ও একঘেয়ে ঈদ আর কখনো পালন করছে কিনা জানা নেই। বৈশ্বিক এই মহামারি লন্ডভন্ড করেছে পুরো পৃথিবী। ফলে মুসলমানদের হাজার বছরের গড়া ঈদ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে দেখা দিয়েছে ছন্দপতন। সবশেষে যা না বললেই নয়, তাহলো পরিস্কার–পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন। আর একেবারেই জরুরি দরকার ছাড়া বাইরে যাবেন না। বিপদে একে অন্যর পাশে দূর থেকে হলেও দাঁড়ানোর চেষ্টা করুন। পরিবারের শিশু ও বয়স্কদের যত্ন করুন। সবাইকে ঈদের প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ও আন্তরিক অভিনন্দন। সবাই ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন, ঘরে থাকুন, নিরাপদে থাকুন।

আবু জাফর শিহাব(এল এল বি)

