ভোরে চোখ মেলতেই, ছোট মেয়ে বলল, আম্মু উঠে জানালার ধারে দেখেন কি সুন্দর। জানতে চাইলাম কি ? সে বলল, “লা নেভিকা” তুষার !
ভোরের তুষার আমার দেখা হয়নি। কাজে বের হলাম বৈরি আবহাওয়ায়।
করোনাভাইরাসের সংক্রামণ ঠেকাতে অনেক কিছু বন্ধ থাকলেও, গ্রোসারি শপ খোলা। আজ জলদি কাজ হতে ঘরে ফিরলাম। অনেক মানুষ সেচ্ছায় গৃহে আশ্রয় নিয়েছে। অনেকে আমার মত কাজ শেষে ঘরে ফিরছে। যাদের ঘর আছে ।
যাদের ঘর নেই, থাকার যায়গা নেই, ঘুমানোর ব্যবস্থা নেই তাদের দিন কাটবে পথে, স্টেশনে।
বছর কয়েক আগেও মাসে দু’ চার বার স্টেশনে লোক রেখে আসতাম। ভবঘুরের মত কেউ কেউ হাজির হত। কেউ বা নাম্বার পেয়ে খুঁজে বের করত। থাকার আশ্রয় নেই। বৈধ কাগজ নেই।
প্রতি সন্ধায় সেন্ট্রাল স্টেশন হতে পুলিশ কিংবা সেচ্ছাসেবীরা তাদের নিয়ে যেত, ডরমিটরিতে। আশ্রয় মিলত রাত টুকু থাকার।
গৃহহীন বহু মানুষ রাতে সেই আশ্রয়ে ঘুমিয়ে দিনে কারিতাসের ক্যান্টিনে খাবার খায়। দিনভর ঘুরে পার্কের বেঞ্চিতে সময় কাটিয়ে রাতে আবার আশ্রয় খুঁজে।এদের মধ্যে যেমন আছে ইতালিয়ান, তেমনি আছে অভিবাসী,উদ্বাস্তু। উদ্বাস্তুদের জায়গা মিলত ক্যাম্পগুলোতে।

২০১৮ সালের সাধারন নির্বাচনের আগেও পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক ছিল, গৃহহীন উদ্বাস্তুদের জন্য।
আগের বছরগুলতে পায়ে হেঁটে, ভুমধ্য সাগর পার হয়ে, ইতালিতে পারি জমায় প্রায় ছয় লক্ষ লোক। যাদের বেশীরভাগ মানুষ আফগানিস্থান, পাকিস্থান, মিসর, সিরিয়া, তুর্কি, ইরানের।
নির্বাচনী ইশতেহারে সে সময়কার বিরোধীদের প্রথম বিষয়, “বিদেশী হটাও”। নির্বাচনে জিতে, কোয়ালিশন সরকারের অন্যতম শরিক দল নর্দার্ন লীগের নেতা মাত্তিও সালভিনি সেই সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হন। বর্তমানে যিনি বিরোধী নেতা।
সকলের প্রতি ঘৃণার বীজ ছড়ানো সাল্ভিনি যেন, মোক্ষম অস্ত্র পেয়ে গেলো ক্ষমতার ভাগ পেয়ে। অভিবাসীদের জন্য কঠিন কঠিন আইন প্রনয়ন হল, উঠিয়ে নেয়া হল বেশীরভাগ সুযোগ সুবিধা। রিফিউজি ক্যাম্প, ডরমিটরি, ক্যান্টিন, শিক্ষা, চিকিৎসা, সব কিছুই কমিয়ে আনা হল।
গত দুই বছরে সরকারি আশ্রয় ব্যাবস্থা অর্ধেকের কমে নেমে এসেছে। যা তার আগের চার পাঁচ বছরে সকলের সহায়তা, মানবিক মুল্যবধে একটি গঠনমূলক অবকাঠামো পেয়েছিল।
সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী ইতালিতে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা পঞ্চাশ হাজার। আজ যখন করোনাভাইরাস মহামারী আকার নিয়েছে, নির্দেশনা আসছে ঘরে থাকতে। হোম কোয়ারান্টাইন মেনে চলতে। তখন প্রশ্ন আসছে, যাদের বাড়ি নেই, ঘর নেই তারা কই যাবে। যারা রাতে স্টেশনে/ডরমিটরিতে ঘুমায়, দিনে পথে/ক্যান্টিণে খবার খায় তারা কি করে হোম কোয়ারান্টাইন মানবে!

এখন বিগত সময়ের চাইতেও, বেশি মানুষের ঘর নেই। পর্যাপ্ত আশ্রয় নেই। সামাজিক নিরাপত্তা নেই। একটি ডরমিটরিতে যেখানে ৮০ জন মানুষ রাখা হত, মহামারীর সংক্রামণ হতে রক্ষা পেতে সেখানে ৫০ জনের বেশি রাখা নিরাপদ নয়। বাইরে বের হতে না পারায়, শুধু রাতে নয় দিনেও তাদের অনেকের সাথে একত্রেই থাকতে হবে।
কিন্তু, সকলের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা সম্ভব হচ্ছে না। হোম কোয়ারান্টাইনের প্রথম ১৪ দিন পাড় হলেও, মানুষ পথে। খাদ্য নেই, বিছানা নেই উল্টো আছে আবহাওয়ার বৈরিতা। সেইফ হোম কিছু থাকলেও সেখানে স্থান সংকুলান হচ্ছে না। আগে আসলে আগে পাবেন ভিত্তিতে কিছু মানুষের স্থান হলেও বাকিদের রাতের ঠাই হয় পথেই। মহামারীর এই সময় গৃহহীনদের জন্য সাময়িক আবাসন ব্যাবথা করার সরকারি নির্দেশনা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না অনেক যায়গায়। বিদেশীদের প্রতি বিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করা স্থানীয় প্রশাসন উল্টো বেসকারি সংগঠনের সহায়তাতেও বাঁধ সাধে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ, দারিদ্রতায় জর্জরিত মানুষ গুলো ঘর ছেড়ে পথে। সিরিয়া আফগানস্থান হতে আসা মানুষগুলো পথে কাটে তিন হতে চার সপ্তাহ। পায়ে হেঁটে আসে তারা। মিসর, লিবিয়া, অফ্রিকা হতে আসে পানি পথে, সাগর পারি দিয়ে। ইউরোপের অন্য দেশগুলো হতে অভাবি মানুষ গুলো আসে, সিজেনাল কাজের খোঁজে। আর, ইতালির নিজস্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যেও আছে গৃহহীন, দারিদ্র মানুষ। শুধু নেই তাদের জন্য পযাপ্ত সহায়তা।
আমাদের শহরে, এখনো মানুষ পথে। ইতালিয়ান, ইউরোপিয়ান, রিফুজি তাদের এখন আলাদা কোন পরিচয় নেই । সকলেই গৃহহীন। আজ বাইরে ঝড় হাওয়া । বাতাসের বেগ ঘণ্টায় ১২০ কি. মি.। রাতের তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। নুন্যতম, ১০০ জন মানুষের জানা নেই, কোথায় আশ্রয় মিলবে। কারিতাস সহ কিছু সংগঠন সহায়তা করছে। মাথার উপর ছাদহীন মানুষ গুলোকে, একবেলা খাবার দেয় “লিনিয়া দি ওমরা” নামক একটি লোকাল সংগঠন। সেচ্ছাসেবীরা নিজেরাই চাঁদা তুলে বাজার করে খাবার তৈরি ও প্যাকেট করে বণ্টন করেন। আরও থাকে সংগ্রহীত পোশাক, ঔষধ টয়লেট্রিজ সামগ্রী। দীর্ঘপথ হেঁটে আসা মানুষদের পা গুলো, কেটে ছিঁড়ে যায়, সেচ্ছাসেবীরা যত্ন করে পরিষ্কার করে, প্রয়োজনীয় ঔষধ দেন । এর বেশি কিছু করার সাধ্য এই মুহূর্তে এই সংগঠনের নেই।

অতি জরুরী কারণ ছাড়া বাইরে থাকলে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। আশ্রয়হীন মানুষ গুলোকে সেই বিধানে জরিমানার করা হচ্ছে।
দেশের এই ক্রান্তিকালে সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে, গৃহহীন মানুষগুলোর নিরাপত্তা সুরক্ষার বিষয়ে। ব্যবস্থা রাখতে হবে দুর্যোগকালীন সময়ের জন্য। অস্থায়ী হলেও ঘরহীন মানুষেকে আশ্রয়, খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে। মামলা বা জরিমানা নয়।
সকারের নির্দেশনা মত বাসায় থাকতে হবে, “আমি বাসায় থাকি” স্লোগানকে বাস্তবায়ন করতে হবে। ঘরহীন মানুষগুলোর হয়ে, মানবিক সংগঠন গুলো শ্লোগান তুলেছে, “আমিও বাসায় থাকতে চাই” ! #vorreistareacasa !
লেখা: আইরিন পারভিন খান,যুগ্ম সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম।
ছবি: Francesco Cibati

