ঢাকার ’ভি আই পি’ রোড। নগরীর ব্যস্ততম সড়কটি কাকরাইল হয়ে একটু এঁকেবেঁকে মতিঝিলের দিকে এগিয়ে গেছে। ডানে বামে অসংখ্য সুউচ্চ অট্টালিকা। অগুনিত মানুষ আর হাজারো গাড়ি ঘোড়ার ভীড়ে মুখরিত সারাটি বছর।
আজ ভর দুপুরে সড়কটি নিরব নিথর। সুনসান নীরবতা। যেন কেউ কোথাও নেই। যানবাহনের কোলাহল নেই, মানুষের কলরব নেই। নিস্তব্ধতার চাঁদরে ঢেকে আছে রাজপথ। অদৃশ্য সূতোর টানে কোথায় হারিয়ে গেছে নগরবাসীর চিরচেনা ছুটোছুটি ব্যস্ততা। দুদিন আগেও যে মানুষগুলোর দম ফেলবার ফুরসুত ছিল না আজ তারাই স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি। শুধু ঢাকার ভি আই পি রোড কেন, থমকে গেছে ঢাকাসহ তাবৎ দুনিয়ার শত কোটি মানুষের জীবনযুদ্ধ। আজানা আতঙ্ক যেন তাড়া করে ফিরছে প্রতিটি মানুষের ¯œায়ুতন্ত্রে। প্রতিটি প্রহর যেন এক একটি মহাকাল।
করোণা ভইরাসের সর্বশেষ সংস্করন কোভিড-১৯ এর জন্মকাল খুব বেশীদিন আগে নয়। দু’হাজার উনিশের নভেম্বরে এর আবির্ভাব ঘটে চীনের উহান শহরে। তারপর থেকে প্রতিদিনই একের পর এক জনপদে হামলা করে চলেছে প্রাণঘাতি এ জীবানু। প্রান্তিক জনগোষ্ঠি থেকে শুরু করে রাণী এলিজাবেথ ছাড়ছে না কাউকেই। বাদ পড়ছে না কোভিডের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত চিকিৎসকেরাও। আক্রান্ত দেশের সংখ্যা ইতোমধ্যে দু’শ ছাড়িয়েছে। বিশ^জুড়ে রোগীর সংখ্যা সরকারী হিসেব মতে আজ অবদি সাত লাখের মতো। প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ত্রিশ হাজার। রোগীরা চিকিৎসা পাচ্ছে না। এত রোগী জায়গা দেবে কোথায়? ইউরোপ আমেরিকার হাসপাতালগুলোর সাফ জবাব, ”আমরা খুবই দু:খিত, ঘরে বসে ওষুধ গেলো- নয়তো মরো।”। আগামী সাত দিন বা এক মাস পর অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা কেবল ভবিতব্যই বলতে পারে। আমাদের দেশেও রোগী ও মৃতের সংখ্যা দিনকে দিন বাড়ছে। আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে মানুষ।
কোভিড প্রতিরোধে আমাদের প্রস্তুতি কেমন ছিল, কি কি আমরা করতে পারতাম কিংবা কি কি করা আমাদের মোটেই উচিৎ হয়নি সে আলোচনায় আমি যেতে চাইনা। তবে নানা আয়োজন সত্ব্ওে প্রতিরোধ ব্যবস্থা যে বিশ^ব্যাপী অসহায়ত্বের মুখোমুখি সেটি স্পষ্ট। মানুষ তাই দু’পাতা প্যারাসিটামল কিনে রাখছে ভবিষ্যতের ভরসা হিসেবে। বাজারে জিনিষপত্রের দাম বেড়ে চলেছে, কিছু পণ্য টাকা দিয়েও মিলছে না।
কোভিড কোথায় গিয়ে কবে থামবে বলা যাচ্ছে না। বাংলাদেশে এর বিস্তার তৃতীয় পর্যায়ে উপনীত। সীমীত আকারে হলেও কমিউনিটি সংক্রমনের বিষয়টি বলা হয়েছে সরকারী প্রেস ব্রিফিংয়ে। কাজেই পরিস্থিতি যে আশঙ্কাজনক তা বলাই বাহুল্য। লক ডাউন বা হোম কোয়ারেন্টাইন কার্যকরে সেনা মোতায়েন করতে হয়েছে। তারপরও পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে তা বোঝার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরো অন্তত দু’তিন সপ্তাহ।
কোভিডের প্রভাবে বিশ^ব্যাপী বিপন্ন জনপদ। মানুষ আতঙ্কিত, ভীত সন্ত্রস্ত। প্রাণঘাতি এ ভাইরাস কিভাবে যে মানবদেহে ঢুকে পড়ে বোঝা দায়। দ্রæত সংক্রমনে এ রোগের তুলনা নেই। গলাগলি কোলাকুলির দেশে এর ভয়াবহতা কি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।
দূর্ধর্ষ কোভিডের ক্ষমতা কতটুকু তা বোঝাতে দু’চারটা উদাহরন দেয়া যেতে পারে। এক হুঙ্কারে কোভিড বন্ধ করে দিয়েছে গোটা বিশে^র তাবৎ পানশালাগুলো। তাজমহলের প্রধান ফটক তালাবদ্ধ। প্যারিসের আইফেল ট্ওায়ার, নায়াগ্রা জলপ্রপাত, স্ট্যাচু অব লিবার্টি, ভ্যাটিকান সিটি জনশুন্য। টিভিতে কা’বা ঘরের দিকে তাকালে মনটা হু হু করে উঠে। সবই আজ সত্য, কঠিন সত্য।
মানুষের অভ্যাসেও আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে কোভিড-১৯। জীবনাচরন বদলে গেছে। হাতে হাত মেলানো এখন আর সৌজন্যতা নয় বরং অভদ্রতা। সাবান দিয়ে ধূতে ধূতে মানুষের হাত ক্ষয়ে যাচ্ছে। মোবাইলে যারা শুধু কল রিসিভ আর সেন্ড করতে জানতো তারাই এখন অনলাইনে চাল- ডাল আর তেলের অর্ডার দিচ্ছে। এই প্রথম চাকরীজিবীরা লম্বা ছুটি পেয়েও খুশী হতে পারেনি। এই প্রথম রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ দলবল ছাড়া হাটে মাঠে একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং পরিবারে বেশ কিছুটা সময় দিচ্ছেন। এই প্রথম ডাক্তার সাহেবরা রোগী দেখে প্রথমেই জিজ্ঞেস করছেন- ” হাচি- কাশি নেইতো”? আঙ্গুর বেদানার দাম পড়ে গেছে, কারণ অতি আপন আতœীয়রাও রোগী দেখতে আজকাল কারো বাসায় বা হাসপাতালে যাচ্ছেন না। এমন উদাহরন আরো হাজারটা দেয়া যাবে।
বৈশি^ক অর্থনীতিতে সর্বগ্রাসী এ রোগের প্রভাব আপাতত: তেমন দৃশ্যমান না হলেও অদূর ভবিষ্যতে তা প্রকট হতে বাধ্য। বিশেষ করে উৎপাদন ও সেবাখাতে এর পরিণতি ভয়াবহ। গার্মেন্টস শিল্প হুমকির মুখে। বৈশি^ক বাণিজ্যে স্থবিরতা ও প্রবাসী আয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সহজেই অনুমেয়। জিডিপি ও রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির আশঙ্কা এখন আর শুধু অনুমানে সীমাবদ্ধ নয় বরং বাস্তবতা। জাতীয় সঞ্চয় কমে গেলে মূলধন ঘাটতি কিভাবে মোকাবিলা করা হবে সে বিষয়ে অর্থনীতিবিদদের নতুন করে মাথা ঘামাতে হবে। বৈদেশিক দেনা কিংবা সাহায্যের উপর কতটা নির্ভর করা যাবে তাও ভেবে দেখা দরকার। আঠারো কোটি মানুষের দেশে ফরেন রিজার্ভ দিয়ে বেশীদিন চলার কথা নয়।
একবারও কি আমরা ভেবে দেখেছি কেন এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়? কোভিড -১৯ নামের বিভিষীকা কিভাবে এলো তা তো দূরের কথা কোথা থেকে এলো সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বিজ্ঞানীরা গলদঘর্ম হচ্ছেন। উত্তরনের পথ জানা নেই কারোও। প্রতিকার যা কিছু হয়েছে তার পুরোটাই হয়েছে মন্দ অভ্যাসগুলো পরিবর্তনের মাধ্যমে। এক লহমায় সবকিছু যেন ঠিকঠাক।
স্বেচ্ছাচারিতা নয়, চাই সুশৃঙ্খল জীবন। মানুষ যখনই সীমা অতিক্রম করেছে তখনই মহান আল্লাহ তাঁর অলৌকিক ও অদৃশ্য ক্ষমতাবলে হিদায়াত দান করেছেন। সূরা আল বাকারার ২৬ নং আয়াতে মহান আল্লাহ পাক বলেন, ” নিশ্চয়ই আল্লাহ মশা কিংবা এর চাইতেও তুচ্ছ কিছু (ভাইরাস বা জীবাণু) দিয়ে উদাহরন বা তাঁর নিদর্শন প্রকাশ করতে লজ্জাবোধ করেন না।” এজন্যই হয়তো যথেষ্ট শৌর্যবীর্যের অধিকারী হওয়া সত্বেও ইতালীর প্রধানমন্ত্রীকে এ বিপর্যয়ের মুখে আকাশের দিকে তাকিয়ে অসহায়ের মতো বলতে শোনা যায়, ”এ মহাবিপর্যয়ে একমাত্র আকাশ থেকেই সাহায্য আসতে পারে”। কারণ হিসেবে বলা যায়, যিনি বিপর্যয় দিয়েছেন একমাত্র তিনিই পরিত্রান দিতে পারেন। সাহায্য আসতে হবে তার কাছ থেকেই। বিষয়টি গভীরভাবে ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে বৈকি।
গোটা মানবজাতির এ মহাসংকটকালে আজ আতেœাপলব্ধির বড় প্রয়োজন। কোনটি ভাল আর কোনটি মন্দ তা আমরা সবাই বুঝি। কোনটি করণীয় আর কোনটি করা উচিৎ নয় তাও আমরা সবাই জানি। কিন্তু মেনে চলতে চাই না মোটেও। পার্থিব লোভ লালসা আমাদেরকে মোহগ্রস্ত করে রেখেছে। দেশের কর্তাব্যাক্তিদের দম্ভোক্তি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। অহংকার বিসর্জন দিতে হবে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষন ও মূল্যায়ন করতে হবে। রাজনৈতিক দল ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাথে নিয়ে সরকার দৃঢ় ও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে। একইসাথে জনসাধারনকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। আতঙ্কিত না হয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। সীমালঙ্ঘন করা চলবে না। বিপর্যয়ে অন্যকে ঠকিয়ে লাভবান হওয়ার চেষ্টা মোটেই কাম্য নয়। নিজেকে ক্ষমতাধর মনে করা উচিৎ নয়। আমাদের ক্ষমতা খুব সীমীত। করোণা আক্রান্ত ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর কথা একবার ভেবে দেখলে অনেক কিছুই ষ্পষ্ট হতে পারে। হতে পারে এটি আমাদের জন্য একটি বড় সুযোগ- নিজেকে শুধরে নেয়ার। ভাল কিছু কাজ করার। নিজের জন্য- মানবতার জন্য।

সাকিল আখতার চৌধুরী, মানব অধিকার কর্মী ।
শুদ্ধস্বর/আইপি

