মেয়েটা মনে করেছিল ওভাবে কান ধরিয়ে উঠবোস করালে তার কর্মদক্ষতা প্রমান হবে। উপরিমহল প্রশংসা করবে। ছবি তুলে ফেসবুকে দিয়েছিল এই আশায় যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য সবাই তাকে ধন্য ধন্য করবে। মনস্তত্বটা দেখুন! ওর বিবেচনায় এটা নাই যে এভাবে কোন নাগরিককে নাজেহাল করার অধিকার তার নাই। সাধারন জনগনের সাথে কি আচড়ন করতে হবে কিভাবে কথা বলতে হবে সেই বোধটুকুও লুপ্ত। এই হচ্ছে আমাদের সিভিল প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক শ্রেনীর কর্মকর্তার মন মানসিকতা।
কয়েক বছর আগে কোন এক কাজে আমাকে একবার এক ডিসি মহোদয়ের কাছে যেতে হয়েছিল। দশ পনের মিনিটের মত ছিলাম তার রুমে। একজন সিনিয়র সিটিজেনকে ন্যুনতম বসতে বলার মত সৌজন্যতাবোধও তিনি দেখাতে পারেন নাই। কথা বলছিলেন যথেষ্ঠ বিরক্তি সহকারে। মনে হচ্ছিল থাপড়ে চেয়ার থেকে তুলে দিয়ে সেখানে গিয়ে বসি, তারপর আমার সামনে দাঁড় করিয়ে বলি আমি তোমার মনিব। আমার দেয়া ট্যাক্সের টাকায় তুমি ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবারন কর। তোমার পড়নের এই দামী পোষাক দেশের খেটেখাওয়া মানুষের ঘামের দামে কেনা। বছরে দুই একবার ঢাকা ডিসি অফিসে যেতে হয় কিছু কাজে। কাজগুলো থাকে অল্পবয়সী কিছু ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে। কিন্তু ওদের ভাবভঙ্গি চলন বলনে যতক্ষন থাকি ভয়ে কুকরে থাকতে হয় কখন না কোন বেআদপী করে বসে অপমান করে! কাজের জন্য আসা বয়ষ্ক অসুস্থ লোকগুলোকে দেখি ঘন্টার পর ঘন্টা বারান্দায় ঘোরাঘুরি করছেন। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব রুমে নাই। এই এলেন তো এই চলে গেলেন। কোথায় গেলেন জানতে চাইলে জবাব, এজলাশে। হয়তো এসে ব্যস্ত হয়ে গেলেন নিয়মিত কাজে। দুই থেকে তিন ঘন্টা অপেক্ষার পর হয়তো সময় হলো আমাদের কাজ করে দেবার। কাজ হচ্ছে একটা সই করে দেয়া। তার জন্য এন্তার জেরা পরীক্ষা নেয়া চোখ রাঙানী। কিছু করার নাই, এই বিড়ম্বনা অপমান সহ্য করেই নীরবে কাজ সেড়ে আসতে হয়।
সিস্টেমটাই এমন হয়ে গেছে। প্রশাসনে পেশাদারিত্বের বালাই উঠে গেছে অনেক আগে। বিসিএস পাশ করে যারা সিভিল প্রশাসনে বিভিন্ন দায়িত্ব পান তাদের কি মোটিভেশনাল ট্রেনিং দেয়া হয় জানিনা তবে দেখা যায় দায়িত্ব পেয়েই এক একজন ক্ষুদে লাট হয়ে গেছেন। যেন সাধারন মানুষ তার রায়ত প্রজা, তিনি তাদের দন্ডমুন্ডের মালিক! মোঘল আমলে এ দেশে বিচারকাজ পরিচালনার জন্য কাজীপ্রথা চালু হয়। এসব কাজীরা হতেন বিজ্ঞ প্রাজ্ঞ। জ্ঞানী গুনী সমাজের শ্রদ্ধেয় পাত্র। কারন বিচার মানেই হচ্ছে ন্যায়বিচার। ন্যায়বিচার করা তার পক্ষেই সম্ভব যার সে জ্ঞান গড়িমা আছে। বৃটিশ আমল থেকে অনেকদিন পর্যন্ত দেখা যেতো বিচারকরা নিজেদেরকে বিজ্ঞ প্রাজ্ঞ দেখানোর জন্য মাথায় বিশেষ ধরনের সাদা পরচুলা পরিধান করে এজলাশে বসতেন। যাতে বিচারপ্রার্থীর মনে এই আস্থা জন্মে যে সে ন্যায়বিচার পাবে। ন্যায়বিচার সভ্যতারই অঙ্গ। আমাদের দেশে বিচারালয় বিশেষ করে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টগুলোর দৃশ্য দেখুন, আজ বিসিএস পাশ করে কালই চেয়ারে বসে গেছে! এরপর বিচারের নামে সেসব জায়গায় কি হয় তা আর উল্লেখ নাই করলাম।
স্বাধীনতার পর থেকেই দেশে মূল্যবোধের এই অবক্ষয়। তারপরও বঙ্গবন্ধু প্রশাসনে পেশাদারিত্বকে গুরুত্ব দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধকালে হানাদার প্রশাসনের সাথে কাজ করলেও সিভিল প্রশাসনের প্রায় সবাইকেই মাফ করে দিয়েছিলেন এই জন্য যে তাদের পেশাদারিত্ব যোগ্যতা অভিজ্ঞতাকে তিনি কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন। পরবর্তীতে সামরিক সরকারগুলোও প্রশাসনকে দলবাজীমুক্ত রেখেছিল। ’৯১এ দেশে তথাকথিত গনতন্ত্র আসার পর থেকে ধীরে ধীরে দলীয় লোক দিয়ে প্রশাসনকে করায়ত্ব করার প্রবণতা শুরু হয়। তারপরও কিছুটা পেশাদারিত্ব ছিল। কিন্তু ’৯৬এর আন্দোলনে মখা আলমগীরের নেতৃত্বে প্রশাসনের কিছু লোক আওয়ামী লীগ পরিচালিত ‘জনতার মঞ্চে’ যোগ দিয়ে সরকার পতনের আন্দোলনকে বেগবান করায় এবং সে আন্দোলনে সরকারের পতন হওয়ায় পরবর্তীকালের সরকারগুলো দলীয় লোক দিয়ে প্রশাসন কব্জা করার প্রতিযোগীতায় নামে। চলে যায় পেশাদারিত্ব। আর গত এক দশকে তো ‘বিএনপি-জামাত’ তকমা দিয়ে ভিন্ন মতাবলম্বি এমনকি নিরুপেক্ষদেরকেও ঝেঁটিয়ে বিদায় করে একচ্ছত্র দলীয় আধিপত্য কায়েম করা হয়েছে! আমি আগেও বলেছি, প্রশাসনে এইযে স্বেচ্ছাচারিতা জবাবদিহিহীনতা লুটপাট- এ সবই হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে দলীয়করনের কুফল। এই প্রশাসনে কিভাবে পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনা যাবে, আল্লাহ মাবুদ জানেন।
সাঈদ তারেক, লেখক এবং সাংবাদিক ।
শুদ্ধস্বর/এইচ বি

