করোনা এখনও ইতিহাস নয়, বরং এটা কেবল শুরু এবং এর প্রাদুর্ভাব সামনে আরো বাড়বে। সামনে এর ফলাফল কি হয় ? সেটাই সবাইকে বেশি ভাবাচ্ছে । যেহেতু অনেক কর্ম প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়েছে, আমরা শুধু আশা ও কামনা করতে পারি, যেন কম ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে দিয়ে আমরা এই মহামারি থেকে বাঁচতে পারি। তবে এটাও সত্য যে, এই করোনা সামনেই ইতিহাস হয়ে যাবে। তখনই হয়তো ভেজাল লেগে যাবে । কেন ভেজাল হবে ? সেটাই প্রথমে বলি।
আমরা একটা কথা প্রায়শই বলি, ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ কর । বেশ, বলা পর্যন্তই শেষ । কাজের কাজ কাঁচকলা । ইতিহাস থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়ার ইতিহাস বরং বেশ বিরল বা নাই বলা যায় । হোক সেটা সাধারণ জনগণ, সরকার, রাজনৈতিক দল বা বজুর্গজন । ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া মনে হয় বেশ কঠিন বিষয় । তা না হলে কেন আমরা সেটা করতে পারি না ? কেননা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেবার অভিজ্ঞতাই আমরা অর্জন করি না । সাথে ইচ্ছা এবং আকাঙ্খাও নাই । আমাদের ইতিহাস এই সাক্ষ্য স্পষ্ট দেয়। শত উদাহরণ আছে। সেখান থেকে কেবলমাত্র একটি রাজনৈতিক উদাহরণের কথা স্মরণ করিয়ে দেই । সেটা হলো ১/১১ এর তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। যে সরকার আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের কি অপমান আর অত্যাচার ( ভিন্ন ভাষায় বলা যায়, পেদানি ) টাই না দিয়েছিলো। তবে মহা সত্য হলো, আমাদের বীরত্বগাথা রাজনীতিকরা সেই ইতিহাস থেকে কিছুই শিক্ষা নেন নি।
রাজনৈতিক উদহারণটি বলছি, কেননা সব শেষে রাজনীতিকরাই দেশ পরিচালনা করে থাকেন। সেই ভাবনা থেকেই, করোনা ইতিহাস হবার আগেই, বর্তমানের করোনা থেকে কি কি শিক্ষা নেবার থাকতে পারে ? মোটামুটি কিছুটা বলার প্রয়াস থাকবে। তবে প্রথমেই একটি সত্য কাহিনী বলি। যা আমার নিজের ক্ষেত্রেই ঘটেছিলো।
সালটি সম্ভবত ২০০০ সাল। দেশে এসেছিলাম। এক প্রিয় অগ্রজ ভাইয়ের সাথে এক সন্ধ্যায় দেখা। বড় ভাইটিকে পাশের কনফেকশনারি দোকান থেকে একটি ঠান্ডা স্প্রাইট এনে পান করতে দিলাম আর গল্প করছিলাম । উনি সেটা পান্ন করলেন , গল্প করলেন এবং আমার টাকায় খরিদ করা স্প্রাইটের একটি ঢেঁকুর আমার মুখ বরাবর ছাড়লেন। সাথে এলো কতগুলো আলগা দুর্গন্ধ ! আমি অনেকটা হতভম্ব হয়ে গেলাম। মানুষ এভাবে ঢেঁকুর আরেকজনের মুখ বরাবর ছাড়তে পারে কি করে ? কাহিনীটি বললাম, আমাদের অভ্যাসের কথা বলতে গিয়ে ।
এই করোনা ভাইরাস আমাদের শিশুদের থেকে শুরু করে বড়দের পর্যন্ত, অন্তত একটি শিক্ষা দিচ্ছে। হাঁচি/ কাশী দেবার সময় মুখে হাত দেওয়া । রুমাল বা টিসু পেপার ব্যবহার কর । যেখানে সেখানে থুতু না ফেলা। বাহির থেকে বাসায় ফিরে হাত পরিষ্কার করে বাকি কাজ করা। আমাদের দেশে এমনিতেই যেখানে সেখানে ময়লা, ধুলো- বালি একটু বেশি। ইতিপূর্বে আমরা বাহির থেকে বাসায় ফিরে কেউ হাত ধোয়ার প্রয়োজন বোধ করতাম না। এই শিক্ষাটি সব সময়ের জন্য চালু থাকলে সবার জন্যেই উপকারে আসবে।
করোনার কারণে আমাদের দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি রূপ সবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো, কেমন অবস্থায় আছে ? যেখানে এত কথা মুখে বলা হয়, বাস্তবতার সাথে যার সত্যি অনেক অমিল । সরকার গুলো মুখে অনেক বলে, সেগুলো যে কেবল বলার জন্যই বলা ! এটা মনে হয় আর বলার প্রয়োজন নেই। এখন সরকার বরং আগামীর বাজেটে স্বাস্থ্যখাতকে নিয়ে একটু ভিন্ন বিবেচনা করতে পারে। জীবন মান কেবলমাত্র কংক্রিটের উপরই নির্ভর হয় না। জীবন মানের মূল মাত্রাস্কেলে হলো স্বাস্থ্য/ শিক্ষা । এটা হয়তো সরকার অনুধাবন করবে। মূল বাজেটের শূন্য পয়েন্ট সামথিং কিছু বাজেট দিয়ে, আর যাই হুক ১৮ কোটি মানুষের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা স্বাস্থ্যকর হতে পারে না । সুতরাং সরকার এই করোনা ইতিহাস হবার পূর্বেই না হয় কিছু একটা শিক্ষা নিক। তাতে জনমানুষের মঙ্গল হবে। আবার বলি, কেননা করোনা ইতিহাস হয়ে গেলে, সব শেষ। সরকারও সব ভুলে পূর্বের অবস্থানেই ফিরে যাবে , এটা নিশ্চিত ।
করোনা থেকে প্রকৃতির কিছু শিক্ষা নেওয়া যায় । মানুষ বড়ই নিষ্ঠুর । প্রকৃতি থেকে কেবল চুষে নেয় । কিন্তু প্রকৃতিকে কিছুই ফিরত দেয় না ! এমতাবস্থায় প্রকৃতি বদলা নিতেই পারে বা নিবে। আজকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও টিভির পর্দায় দেখলাম, কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে ভেলফিনরা প্রায় পাড় ঘেঁষে সাঁতার কাঁটছে, লম্ফ- জম্ফ করছে। যেখানে মানুষের ভীর নাই প্রকৃতি সেখানে নিজের রূপে ফিরে আসে। আর প্রকৃতির সৌন্দর্য, বলার অপেক্ষা রাখে না।
করোনায় ঢাকা শহর খালি । জেলা উপজেলার রাস্তা- ঘাট খালি। নেই কোনো গাড়ীর অযথা ভ্যা-পুঁ । অসহনীয় সেই জ্যাম হঠাৎ উধাও। বলাই যায় ঢাকা সহ অন্যান্য শহরেও বায়ুদুষন থেকে মুক্ত থাকবে, বাড়বে না বাতাসে শীসার ওজন , হবে না শব্দদূষণ । শহরের হালচাল দেখে সম্ভবত প্রকৃতি নিজেই লজ্জায় হাসে। সরকার এখান থেকেও ভাবতে পারে, আগামীতে এই ঢাকাকে কিভাবে এবং কেমনে নিরিবিলি রাখা যায় ? বলছিলাম, জেলা /উপজেলায় কিভাবে ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রীকরণ করণের পদ্ধতি করার কথা। ঘন জনবসতে ঢাকা কেন্দ্রীক সব কিছুকে কোনো এক সময় দুর করতেই হবে। শোনা যায় ঢাকায় যত মানুষ বসবাস করে , তার অর্ধসম পরিমাণ প্রতিদিন ঢাকায় যাতায়াত করে। কেননা এর ছাড়া ভিন্ন কোনো উপায় নাই। ঢাকায় এমন কিছু মন্ত্রনালয় আছে , যার কোনো প্রয়োজন আছে কিনা ভেবে দেখা প্রয়োজন । ধরুন মৎস মন্ত্রনালয়, বন বিভাগ এগুলো ঢাকায় বড় বড় বিল্ডিংয়ে বসে কি করে ? আমার বুঝে আসে না । তাছাড়া এখন ডিজিটআলের যূগ । অনেক কিছুই ঢাকার বাহিরেই নিশ্চয়ই সম্ভব। সরকার বিষয়টিকেই বিশেষভাবে দ্রুত বিবেচনায় নিলে দেশ উপকৃত হবে।
করোনা ভাইরাস ধনী/ গরিবের পার্থক্য করে না। এটা একটা ইকুয়িলিটির নমুনা। করোনা বুঝিয়ে দিয়েছে, মানুষ মাত্রই সমান। অথচ আমরা ভেদাভেদ তৈরি করে রেখেছি। হ্যাঁ অর্থনৈতিক ভাবে দ্রুত সমতা আসবে না, তবে সব কাজের মূল্যায়ন হলে কোনো এক সময় ধনীকশ্রেনী আর নিজেদেরকে বড় করে জাহির করতে পারবে না । কাজের মূল্যায়নের কথা বললাম, লক্ষ্য করুন, এই মূহুর্তে একটি হসপিটালে ডাক্তারদের যেমন মূল্যায়ন করতে হচ্ছে, সেই হসপিটালের একজন পরিচ্ছন্ন কর্মীকেও সেই মূল্যায়ন করতে হচ্ছে। কেননা একজন ক্লিনারের কাজটি এই মূহুর্তে ভীষণ জরুরী । বড় বিল্ডিং এর হসপিটাল আছে, ইকুয়িপম্যান্ট আছে, ডাক্তার আছে, কিন্তু ক্লিনার নাই । বিষয়টি একটু গভীর ভাবে ভাবলেই সব পরিষ্কার হবে।
শেষে বরবো আইন শৃঙ্খলার কথা বলে । এই ভয়াবহতার মাঝেও জনগণকে বাধ্য করে আইন মান্য করানো প্রয়োজন হচ্ছে। ভাবুনতো আমরা নিজেরাই আইনকে মেনে চলি, তাহলে বিষয়টি কেমন হতো ? সব কিছুকেই আমরা হেলায় ফেলায় নেই, এটা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে ! যদি আমরা জনমানুষেরা একটু সিরিয়াস হই, তাহলে সরকার যেমন সহজভাবে কর্ম পরিচালনা করতে পারে, আমরাও ঠিক তেমন নিরাপদ থাকতে পারি। মনে রাখা ভালো হবে, এই করোনাই শেষ কিছু না । শোনা যাচ্ছে ইতিমধ্যেই চীনে নতুন এক হন্তা নামক ভাইরাসের আক্রমণ হচ্ছে। এমন কিছু যেন আবার আমাদের ঘাড়ে এসে না পরে।
লেখার শেষে বলবো, এই ভয়াবহ করোনা ইতিহাস হবার পূর্বেই আমরা এখান থেকে কিছুটা শিক্ষা নিলে, ভবিষ্যতে সরকার ও জনমানুষের কল্যাণকর হবে। আসুন করোনা ইতিহাস হবার পূর্বেই বিষয়টি সবাই বিবেচনা করি। অর্থনৈতিক বিষয়টি বড় আলোচনা বলে এখানে আর করলাম না । দেশ অতি দ্রুত করোনা মুক্ত হোক এটাই এই মূহুর্তের সর্বোচ্চ কামনা ।

বুলবুল তালুকদার
যুগ্ম সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম ।

