অভিযোগের কথার বাক্স

মেয়েটির নাম টুম্পা, ওর গানের গলাটা দারুন। কিন্তু মেয়েটি মোটেও বিশ্বাস করতে রাজি নয় সে ভালো গান গায়। এমনটার কারণ মেয়েটার লো কনফিডেন্স, এইরকম মানুষেরা সবসময় নিজেকে ছোট ভাবে। এদের এই রকম স্বভাবের কারণে খুব সহজেই অন্য মানুষগুলো তাদের উইকনেস ধরতে পারে। টুম্পা ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে :– যেহেতু কলেজে পড়ে সেহেতু বন্ধুদের আড্ডায় তাকে তো দু’একটা গান গাইতেই হয়। সবসময় এমনটা হয় টুম্পার গান শেষ হলে বন্ধুরা যখন বলে দোস্ত দারুন গাস, ভবিষ্যতে ভালো করবি, তোর গানের গলা অসাধারণ । তখন টুম্পা থার্ড ক্লাস মেন্টালিটির মানুষের মত জবাব দেয়, – “ধূর! তোরা আর মজা নিস না তো ।” এরই মধ্যে নীল নামের ছেলেটি খুব সহজেই বুঝে নিল মেয়েটা একটু লাজুক স্বভাবের। এরপর থেকে নীল সত্যি সত্যিই মজা নেওয়া শুরু করে। তবে নীলও টুম্পার গানের গলার খুব ভক্ত, নীল এটাও জানে পড়ালেখা তো সবাই করে আর এর মধ্যে যার এক্সট্রা গুন আছে সে একটা এক্সট্রা অর্ডিনারি। তবুও ক্লাসমেট বন্ধু এমনটার কারণেই নীল মজা নেয়।

91212012_2887643017978289_5867575386816118784_n

প্রতি আড্ডার মতোই টুম্পা গান গাইছে ,সবাই চোখ বন্ধ করে ভালোই উপভোগ করছে।গান শেষ করার সাথে সাথেই নীল সবার আগে কমপ্লিমেন্ট করলো “দোস্ত তুই যখন গান গাচ্ছিলি, তখন মনে হলো আমার কানের পাশ দিয়ে আধমরা ভটভট টেম্পু যাচ্ছিল”……. অমনিই মেয়েটির সুন্দর মুখটা কালো হয়ে গেল ,টুম্পা তখন নিজেকে সব দোষের দোষী করে বলল,”বললামই তো আমি গান গাইবো না তোরা কেনো যে বলিস ? জানিনা!…… ছেলেটা খুবই স্মার্ট তাৎক্ষণিক অ্যান্টিবায়োটিকের মতো দু’একটা কথার জালে বন্দি করে মেয়েটাকে হাসালো। টুম্পাও বুঝলো ও এমনই। তবে টুম্পা এ ব্যাপারটা বুঝতেছিল না , নীল প্রতিদিন রাত্রে মেসেঞ্জারে ফোন দিয়ে টুম্পাকে বলবে আমার একটা ঘুমানোর ঔষধ লাগবে। ঘুমানোর ঔষধ মানে টুম্পার গলার একটা গান। টুম্পা যখন প্রথম প্রথম” ইয়ে মানে” করতো তখন নীল বলতো আর্টিস্টের আর্ট কিন্তু তার ভক্তের জন্যই, এর উপর আর কথা হয়? এভাবে প্রতিদিনই গান শুনে ঘুমাতো। তবে ছেলেটি সামনাসামনি এমন আচরণ করে কেনো, তা কিন্তু মেয়েটা কখনই জিজ্ঞেস করেনি। একদিন সকাল বেলায় টুম্পা কলেজে যাওয়ার জন্য বের হচ্ছিলো। বাড়ির দারোয়ান পেছন থেকে ডাক দিলো আপামনি আপামনি “অভিযোগ বাক্স থেকে এই কাগজটি পেলাম” টুম্পা কাগজটি খুলে দেখে এ তো কোনো অভিযোগ নয়; লেখা ছিলো “আপনার গানের গলা আসলেই দারুণ, তবে কনফিডেন্সটা আরেকটু বাড়ালে ভালো হতো” চোখে মুখে হাসি নিয়ে হাসতে হাসতে টুম্পা কলেজে গেলো, বিষয়টা টুম্পা তার বেস্ট ফ্রেন্ড নিশাকে বললো, নিশা তখনই নীলকে ইঙ্গিত করলো, কিরে, তুই নাকি? নীল মাথা নাড়িয়ে বললো “না” নিশা জানে নীল টুম্পাকে খুবই ভালোবাসে সেটা নীল নিশাকে জানিয়েছিল। নীল মনে মনে খুবই কষ্ট পেলো। মনে মনে খুঁজতে লাগলো কে হতে পারে? তখন এমনই একটা ভাব তার মুখে ফুটে উঠলো টুম্পার সামনে। এভাবে প্রতিদিনই অভিযোগ বাক্সে টুম্পা প্রায়ই চিঠি পায় তা নিয়ে টুম্পা আলোচনা করে তাতে নীল একটু জেলাস ফিল করে কেননা সত্যিই তো ভালোবাসে। ইদানিং নীল আর টুম্পাকে ফোন দেয় না। ছেলেটা অনেক সিগারেট খায়, নিশা বিষয়টা লক্ষ্য করে। নীলকে নিশা বারবার বলেছে দোস্ত তোর হয়ে আমি টুম্পাকে বলি? ওর একটাই কথা — ভয় লাগে…….. কোনো এক পৌষে টুম্পার জন্মদিন। প্রেজেন্টস সারপ্রাইজ দিলো নীল; সব ভয় ডিঙিয়ে প্রপোজ করল কিন্তু টুম্পার তখনকার মানসিকতার সাথে এটা অমিলই ছিলো। কেননা, তার মায়ের শরীরের কন্ডিশন তেমন ভালোনা ঐদিন। সকাল বেলায়ও ডাক্তার দেখাতে হয়েছিল। বাবা নেই, মারা গেছেন অনেক আগেই। পুরো সাততলা বাড়িটির সব ভার কিন্তু টুম্পার কাঁধেই। টুম্পা নীলের প্রস্তাবের জন্য প্রস্তুত ছিলো না। কিছু বুঝে উঠবার আগেই তখন কাউকে কিছু না বলেই বাসায় ফিরে টুম্পা, বাসায় ঢুকার সময় দারোয়ান একটা চিঠি একটা ফুল আর একটা রেপিংপেপারে মুড়ানো গিফট দিলো। তখনই চিঠিটি পড়লো টুম্পা ” কাব্যিক ভাষায় প্রেম নিবেদন”, যা টুম্পার ভালো লেগেছিলো। ওই মুহূর্তেই চিঠির উল্টো পাশে “কে আপনি দেখা করতে পারবেন “? লিখে অভিযোগের কথার বাক্সে রেখে দিলো। পরের দিন সকালবেলায় টুম্পা নিজেই অভিযোগ বাক্স থেকে চিঠিটা নিলো, বড় করে লেখা ছিলো, “এভাবেই চলুক না আরও কিছুদিন” টুম্পা চিঠিটা ওখানেই রেখে দিয়ে চলে আসে। তিন চার দিন ফোন অফ, কলেজ অফ করে বাসায় ঘাপটি মেরে বসেছিল টুম্পা। আজ ভাবছে কলেজ যাবে, বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় নজর পড়লো অভিযোগ বাক্সের দিকে হাঁ একটা চিঠি লেখা ছিল — “জোছনা করেছে আঁড়ি” কলেজ যাওয়ার পর টুম্পা দেখলো সবাই বসে আড্ডা দিচ্ছে নীলকে দেখলনা। এক ফাঁকে নিশা টুম্পাকে ডাক দিলো। এইদিকে আয়, বস এখানে। একটু পরেই নীল একটা গিটার নিয়ে আড্ডার কেন্দ্রে হাজির আজ টুম্পাকে কিছু বলছে না। টুম্পা একটু অবাক নীলের কাঁধে গিটার দেখে,আর যখন গান গাওয়া শুরু করলো আরও বেশি অবাক গানটার প্রথম দু’ লাইন হলো — “” জোছনা করেছে আঁড়ি আসেনা আমার বাড়ি “”

91069773_697276397747044_6626230167939317760_n

নুসরাত বিনতে আলম

একাদশ শ্রেণী,বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ কলেজ

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.