আমাদের হাই স্কুলটি ছিল বাড়ী হতে প্রায় ২ কি.মি দূরে।পাড়ার সকলে দলবেঁধে পায়ে পায়ে তাল মিলিয়ে গল্প গুজবে এক সাথে যে এতদূর পথ যেতাম কই কখনো তো কোন ক্লান্তি অনুভব করতাম না। আর এখনকার ছেলে মেয়েরা তো বাহন ছাড়া চলতেই পারে না। তাদের জীবন তো অচল পয়সার মত। বিরতি সময বাড়ী আসতে পারতাম না বলে ৫টাকা করে খরচ পেতাম। তখন ১টা পেটিস-২/-, ১টা বাটার বন-২/ ১টা ডেনিস-৩/ সিঙগারা-১/ তাছাড়া ১/-দিয়ে অনেক গুলো লাল বিস্কিট, বাহার বিস্কিট, হাতি-ঘোড়া বিস্কিট, পাখির ডিম, ২৫ পয়সা দামের লজেন্স, নারকেল দেয়া আইসক্রীম, এ রকম আর কত কিছুই না সহজ লভ্য ছিল। যা আমাদের কাছে ছিল অমৃত সমান। আর এখন এ সব কল্পনাতীত। ১০টা-৪টা পর্যন্ত ৭/৮টা ক্লাস করতাম, কতই আনন্দের ছিল। কই কখনো তো হাপিয়ে উঠতাম না। এখন তো ডিজিটাল টাইম ডিজিটাল ক্লাস। গ্রীষ্মের প্রচন্ড তাপদাহে ওষ্ঠাগত প্রাণে কচিকাঁচাদের নিয়ে পুকুরের কাকচক্ষু জলে সাঁতার কাটা কিংবা দাপাদাপি করার মজাই আলাদা। ফিরে যাওয়া সেই পিছনে ফেলে আসা আবহমান বাংলার ক্ল্যাসিকাল শৈশব, কৈশোরের অন্তত কিছুটা সময়ে। গাঁও গ্রামে বেড়ে ওঠার সময় গুলো ছিল বড়ই অলৌকিক, নিষ্পাপ, মানবিক। একই পাড়ার সব ছেলেমেয়ে যেন সবাই নিজেদেরই ভাই-বোন। হৈ হুল্লোড়, পুকুরে দাপাদাপি, গ্রীষ্মেরর ভর দুপুরে পায়ে পায়ে ঘোরা, আমচুরি, তরমুজ চুরি, রূপকথার আসর এক অদ্ভুত সরলতায় জড়িয়ে ছিল আমাদের শৈশব। কোটি টাকার সুখ, আনন্দ, স্বপ্ন। এখনকার ছেলেরা যেমন ছবিতে সর্বোচ্চ লাইক গুনে, আমরা মাপতাম ঘুড়ির সর্বোচ্চ উচ্চতা। আনন্দ মনে হয় আমাদের টাই বেশী ছিল। বর্ষন মুখর দিনে ঘরের দাবায় শীতল পাটি বিছিয়ে প্লেইট ভর্তি বিনি চালের খরাই, চনা,মটর,তিল, বাতাম,শীমের বীচি, মিষ্টি কুমড়ার বীচি, কাঁঠাল বীচির( উনুনে পোঁড়া/শুকনোভাজা/ভাঙগা) মিশ্রণ কুটর কাটুর করে খাওয়ার স্বাদ যেন এখনো জিহ্বায় লেগে আছে।টিনের চালে বৃষ্টি পড়ার রিনিঝিনি ছন্দ এখনো মনে শিহরণ জাগায়। বৃষ্টিজলে কাগজের নৌকা ভাসানোর আনন্দ যে কি রকম! তা বলে বোঝানো কি আদৌ সম্ভব! বৃষ্টিতে কাক ভেজা ভিজতাম কই জ্বর সর্দিকাশি তেমন একটা কাছেও ঘেঁষত না। আর এখন ভিজতে মন চাইলেও শরীর সায় দেয় না। ছোট পাতিলে বালি দিয়ে ভাত, ঘাস দিয়ে তরকারী, বৈঁচি ফুলের মালায় রাজা,রাজপুত্র, মন্ত্রী,সেপাই সাজতাম কাশবনে লুকিয়ে, মায়ের ডাকে পাড়া তোলপাড় আর আমরা লুকিয়ে দিতাম পুতুলের বিয়ে। নারকেল পাতার ঘড়ি, চশমা, কাঁঠাল পাতার টাকায় বিক্রি হত খেলনা। মতের মিল না হলে সব ভেঙেগ দিয়ে দিতাম দৌড়। এখন কোটি টাকার ফ্ল্যাটের আতুর ঘরে আটতে থাকা ডিজিটাল শৈশব কিইবা দিতে পারে??? তোমাদের অনলাইনে আটকা থাকা বাল্যকাল! কোচিং আর স্যারের বাসায় আটকে থাকা তারুণ্য কি আর শেখাবে??? আনন্দ মনে হয় আমাদের হায়েস্ট ছিল। আমাদের সময় কুতকুত, কানামাছি,বৌ চুরি,হা-ডু-ডু,দাঁড়িয়ে বান্ধার মত খেলা গুলোর সাথে,তোরা তোদের অনলাইন গেইমের তুলনা করলে বোকামিই করবি। কারণ আমাদের খেলায় বডি এস্ট্র্যাকসার হত মজবুত। আর তোদের খেলায় চশমার ফ্রেম হয় মজবুত। যতই ক্ল্যাশ অফ ক্ল্যান তোমরা খেলো,বাড়ীর আঙিগনায় কিংবা স্কুল মাঠে কুতকুত কিংবা বৌচুরি খেলার সময় করা চিটিংবাজি ধরার ব্রেইন তোদের কখনোই হবে না। তোরা দিস অনলাইন এট্যাক,আমরা দিতাম পিঠের মাঝখানে সামা কিল। এক কিলেই ২মিনিট দমবন্ধ। আর চিটিংবাজি করবি? তোরা খেলিস একা একা, আমরা ছিলাম সসমাজবদ্ধ।সমষ্টিগত আনন্দই। তারপরেও গুলতি,মার্বেল,পাঁচ গুটি,খেজুর বীচির ৪/১৬,লুকোচুরি,বাবু-পুলিশ-চোর-ডকাত,রাম-সাম-যদু-মধু খেলা ছাড়াও আরো অনেক খেলা আজ বিলুপ্তির পথে। একই আকাশ তোমার মাথার উপর যেমনটি,আমার শৈশবেও তেমনটি ছিল। তারপরে যানজটের এই দুনিয়ায় তোরা কতটা বন্দী!আর আমার আকাশ কতটা বিশাল ছিল। আমার শৈশবের এক ছিটে ফোটাও যদি তোদের হাতে দিতে পারতাম,হয়ত সমাজ সংসারের কাছে আমার দায়বদ্ধতা কমত। স্মৃতি নামক কাব্যের মলাটে এখন ধুলোর আস্তরণ। পাতা গুলো নানা ঘাত-প্রতিঘাতে ক্ষত-বিক্ষত।তাই সবটা বুঝা না গেলেও কিছু কিছু স্মৃতির স্পষ্ট চিহ্ন দিবালোকের মত ভেসে উঠে হৃদয়ের প্রিয় আরশিতে। তাই কখনও হই ভাবুক, কখনও হই শিহরিত।পিছনে ফেলা আসা দিন গুলোর ঘটনাবলী হৃদয়ের মানসপটে কেবল স্মৃতি হয়ে রয়,আর স্মৃতি বিজরিত মানুষ গুলোই সময়ের আবর্তে আস্তে আস্তে বদলে যায়। শৈশবের ফেলে আসা ঢেউ ;সব কি আর মনে রাখা যায়! নাকি গুনে রাখা যায়! তবু কিছু কিছু ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার চিহ্ন মন নদীর কিনারায় স্পষ্ট আঁকা থাকে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে সেই সব সরল প্রাণে অতিবাহিত দিনগুলোর পদচিহ্ন মানুষকে মোহাবিষ্ট করে রাখে। আহা!যদি ফিরে যেতে পারতাম সেই দিনগুলোতে !

আবু জাফর শিহাব (এল এল বি)

