সত্য ইতিহাস সব সময় কঠিন এবং আঘাত করে, এটা প্রমাণিত । তারপরেও সার্বিক বিবেচনায় সত্য সব সময় ভালো। এতে ঝামেলা কম হয়, শিক্ষা নেওয়া যায়, সঠিক চর্চা করা যায় । শিক্ষা কোনো না কোনো সময় নিতেই হয় এবং চর্চাও করতে একটি জাতি বাধ্য হয়। যত দ্রুতর জাতি শিক্ষা নেয় এবং চর্চা করে ততই জাতির মঙ্গল তাড়াতাড়ি হয়।
আগামী বছরই আমাদের স্বাধীনতার অর্ধশতক বছরের জন্মদিন আসবে এবং সাথে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর শতবছরের জন্মদিন । সত্যি বলতে এরকমটি একটি জাতির জন্য কমই ঘটে। এখন সামনে দেখার বিষয় এই দুইয়ের কম্বিনেশনটা আমরা কেমন করতে পারি। আমিতো মনে করি এই দুটো বিষয়কে সামনে রেখে জাতি একটি মাইলফলকে পৌঁছাতে পারে। যদিও তির লক্ষ্যণ দেখা যাচ্ছে না। তবে এখনও অনেক সময় আছে। শুধু আশা থাকবে ক্ষমতাসীনরা এটার মূল্যায়ন অনুধাবন করতে পারবেন। অন্যরা কে কিভাবে ভাববে জানিনা , তবে আমি আশাবাদী হতে চাই এবং জাতির এই মূহুর্তে এটা ভীষণ প্রয়োজন অনুভব করি।
ধারণা করি , শতবছর আর অর্ধশতাব্দী পালনের সময় সরকার নিশ্চয়ই দেশের ইতিহাস নিয়ে নানান কর্মসূচি গ্রহণ করবে এবং নিশ্চয়ই ইতিহাসের বিবরণ থাকবে। শুধু কামনা করি সেই ইতিহাস চর্চায় যেন ইতিহাসের অংশের সকলের প্রাপ্যটুকু সম্মানের সাথে প্রদান করা হয়। কাউকে ছোটো করে কাউকে বড় করা বা কাউকে অবহেলিত যেন করা না হয়। ইতিহাসের স্বার্থে ভবিষ্যত প্রজন্মের স্বার্থে এবং স্বাধীন দেশের স্বার্থটাকেই বিবেচনায় নেওয়া হয়। নিশ্চয়ই কেউ না কেউ ইতিমধ্যেই সেই ইতিহাস চর্চার কাজটি শুরু করেছেন। বিতর্কিত ইতিহাস যেন কোনো ভাবেই স্থান না পায়, সেই দিকটা এখনই বিবেচনায় নেওয়া জরুরি বলেই মনে করি।
ইতিহাস চর্চার কথা কেন বললাম ? লক্ষ্যণীয় যে, স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ বর্তমানে ক্ষমতায় এবং তাদের কমতাকালেই অর্ধ ও শতবার্ষিকী হতে যাচ্ছে। রাজনৈতিক ভাবে দেখলে এটা একটা বিরাট সুযোগ হবে আওয়ামী লীগের জন্য । আবার ভিন্নভাবে বলা যায়, যেহেতু রাজনৈতিক দন্দ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চরমে আছে, সেটাকে প্রশমিত না করে অভিজ্ঞ দল হিসেবে আওয়ামী লীগের সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হতে পারে দেশের জন্য কল্যাণকর । জানিনা সবাই একমত হবেন কিনা, তবে এর বাহিরে গেলে এই দেশকে আরো পস্তাতে হবে। যা ইতিমধ্যেই ঘটেছে, সেটার সমাধানের চুড়ান্ত সুযোগ আগামীর অর্ধ ও শতবার্ষিকীই হতে পারে। শুধু প্রয়োজন একটু সহনশীলতা আর সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ।
গতকালই পত্রিকায় দেখলাম আইনমন্ত্রী জনাব আনিসুল হক সাহেব নতুন করে তর্ক তুলেছেন। জিয়া স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিন নাম্বার ঘোষক। মানে জিয়ার পূর্বেই আরো দুজন স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন । তিন না তেত্রিশ নাম্বার সেটা আমার বিষয় না। সেটা ইতিহাসের বিষয় । যে যত কথাই বলুক, ময় মুরুব্বি, নিজের আত্বিয়সজন, খোদ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট শোনা, সত্য হলো সেই সময়ে জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা সমগ্র বাংলাদেশের মানুষকে উজ্জীবিত করেছিলো। সেই পরিস্থিতিতে একজন বাঙালি মেজরের ঘোষণা ছিলো মানুষের মনোবলকে চাঙা করার জন্য উপযুক্ত ঘোষণা । মানুষের মনের দূর্বলতাকে কাটিয়ে উঠার জন্য ছিলো টনিকের মত কার্যকর ঘোষণা, সবলতা ফিরে পাওয়ার জন্য ছিলো সময়ের ঘোষণা । কথা গুলো কোনো কল্পনার কথা নয়, কোনো চাটুকারিতার কথা নয়, কোনো আবেগি কথা নয়, কোনো কাব্যিক কথা নয়, এমনকি কোনো দালালির কথা নয়। কথাগুলো দশজনের কাছে শোনা কথা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, দ্বিতীয়বারের ঘোষণায় প্রথমবারের ত্রুটিগুলো কাটিয়ে বঙ্গবন্ধুর নামে ঘোষণা । সেই সময়ের কথা অনুধাবন করলে বুঝাই যায়, প্রথম ঘোষণার ভুলটি অনিচ্ছাকৃত ছিলো। তবে সেই পরিস্থিতিতেও ভুলকে দ্রুতর শোধরানো এবং বঙ্গবন্ধুর নামে ঘোষণা দেওয়া ছিলো সত্যি বলতে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় । কেননা সেই পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর নামে একজন বাঙালি মেজর স্বাধীনতার ঘোষণা দিচ্ছে, সেটা মানুষ মনকে উৎসাহীত করিছিলো বলেই ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। ইতিহাস থেকেই জানা যায় চট্টগ্রামে হান্নান সাহেব অনেক পূর্বেই ঘোষণা দিয়েছিলেন । তবে সেটা সেই সময়ে মানুষের কানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি, এটাই সত্য । হতে পারে আরো অনেকেই জিয়ার পূর্বেই ঘোষণা দিয়েছেন। তবে কেউ কি বুকে হাত রেখে বলতে পারবেন, চট্টগ্রাম কালুরঘাট থেকে দেওয়া জিয়ার ঘোষনা আর অন্যান্যদের ঘোষণায় সমান কার্যকারিতা ছিলো। উত্তর সরাসরি ইতিহাস থেকেই বলছি ” না ” । কেউ দ্বিমত করলেও করতে পারেন, তবে ইতিহাস তার নিজের কক্ষপথেই ঘুরে।
একবার ভাবুনতো , জিরা কোনো দল গঠন করেননি । এমনকি জিয়ার দল বিএনপি তেমন কোনো শক্তিশালী দল হয়ে উঠতে পারেনি। তাহলেও কি ঘোষণা নিয়ে এত কথা হতো ?এখানেও উত্তর সরাসরি ” না “। তাহলে কেন এত ঝঞ্ঝাট বা ঝামেলা। ? ঝামেলার কারণ হলো জিয়ার রাজনৈতিক দলই স্বাধীনতার পরে সর্বোচ্চ বৃহত্ দল , যে দল কিনা আওয়ামী লীগের সাথে টেক্কা দিতে পেরেছে। এমনকি ৯০ এর এরশাদ পতনের পরে এই দলটিই আবার নতুন গণতন্ত্র (!) এর মাঠে প্রথম ক্ষমতায়ন হয়। এই সকল কারণেই এত দন্দ, ইতিহাসে ইহাই প্রমাণিত সত্য ।
আবার অন্যদিকে বিএনপি আছে আরেক জগতে। তাদের কার্যক্রম বা কথাবার্তা শুনলে মনে হয় এই দলটির প্রধানের ঘোষনা ছাড়া এই দেশ স্বাধীন হতে পারতো না ! তাদের ভাবসাব দেখলে মনে হয় জিয়া সম্ভবত বঙ্গবন্ধুর চেয়েও বড় মাপের নেতা ছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধে । নিজের দলের প্রতিষ্ঠাতাকে বড় করে রাখুন, সেটা ঠিক আছে । তাই বলে বিতর্কিত ইতিহাসের যোগান দিয়ে দলের প্রতিষ্ঠাতাকে বড় করতেই হবে! সেই রাজনীতিতে এই দেশের মানুষের হৃদয় গলবে বলে মনে হয় না। এমনকি যতই বিতর্কিত ইতিহাসের উপর নির্ভর করবেন ততই চোরাবালিতে পা আঁটাকানোর সম্ভাবনাই বেশি।
সবার মনে থাকার কথা বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন সংসদে এমন একটি প্রস্তাব গ্রহণে প্রচেষ্টা চালিয়েছিলো। তাদের প্রস্তাবে জাতীয় নেতাদের সম্মানের কথা বলে জিয়া আর বঙ্গবন্ধুকে সমান উঁচুতে বসাবার একটা বালখিল্য চেষ্টা ছিলো। আওয়ামী লীগ সেটা ভালোই অনুধাবন করেছিলো বলেই এমনটি ঘটে নি। বিএনপি আরো অনেক বড়দলে পরিণত হতে পারে , আরো শতবার এই দেশে ক্ষমতাসীন হতে পারে। তাই বলে জিয়া আর বঙ্গবন্ধু সমান হয়ে যাবেন , এমনটি কখনোই হবার নয়। সুতরাং বিষয়টিকে বিএনপির ভালোভাবেই বিবেচনায় নিয়ে ভাবা দরকার । তাহলে সেটা হবে সকলের জন্যই মঙ্গল ।
এবার জিয়া তিন না তেত্রিশ সেটা ছোট্ট করে বলেই শেষ করবো। এই দেশের সর্বোচ্চ আদালত হুকুম জারি করেছিলো , জিয়া স্বাধীনতার ঘোষক নয়। আদালত তার হুকুমত জারি করলো, বেশ ভালো। তবে এর ফলাফল কি হয়েছে? এখানেও উত্তর সরাসরি হলো ” কাঁচকলা” । কেননা জিয়ার দলের আদর্শে যারা বিশ্বাস রাখেন, অনুসরণ করেন এবং এই দলটিকে যারা দেশের কল্যাণকর বলে মনে করেন, তারা সেই বিচার কে বিন্দুমাত্র মূল্য দেয়নি এবং দেবার কথাও নয়। কেননা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য অবশ্যই এই উপমহাদেশের রাজনৈতিক আবহাওয়ায় নেতাকে বড় ভাবেন, সুতরাং আদালতের রায় তাদের জন্য কেবলি ধাপ্পাবাজি।
বাংলাদেশের অর্ধ এবং বঙ্গবন্ধুর শতবার্ষিকী স্বাধীন রাষ্ট্রর জন্য একটি সমাধানের পথ হোক, আমরা আমজনতা সেটাই কেবল কামনা করি। আরো কামনা করি , কেউ যেন চাটুকারিতা করে ইতিহাসকে নতুন করে দালালির মাত্রা দিয়ে লিখে স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী দলকে প্রচারের জন্য প্রফুল্ল না করেন । এতে করে এই দলটির ক্ষতিই বেশি সাধন হবে। আর অপরদিকে এত অভিজ্ঞতা সম্পন্ন দলেরও ভালো করে ভাবা উচিত, কিভাবে এবং কেমন করে দেশের কল্যাণে সত্যর সাথে থাকা যায় ।
আমাদের আদালত এমন একটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, যা কিনা আদালতে সমাধান হবার বিষয় না। স্পষ্টতই বলে রাখি, ” রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কখনোই আদালতে হবার নয় , রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ভাবেই হওয়া শ্রেয় এবং সঠিক। তাই বলছিলাম শত প্যাঁচাল পেরেও, শতবার নাম্বারিং করলেও, সেগুলো হবে রাজনীতির অযথা প্যাঁচাল । সমাধান টেবিলে করুন, টিভি/রেডিও/ রাজনৈতিক মাঠে বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে নয় এবং হবার নয়। কে শোনে কার কথা ? হু কেয়ার ?

বুলবুল তালুকদার
সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

