একটি পর্যালোচনা এবং ইতিহাসের সত্যতা

“পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত হওয়ার পর ২ মার্চ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মঞ্চ থেকে আ স ম আবদুর রবের স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন, যা ছিল অনানুষ্ঠানিক। ৩ মার্চ পল্টনে ইশতেহার উত্থাপন স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদকে গৌরব দান করেছে। সব কাজের উদ্যোগ ছিল নিউক্লিয়াস নেতৃবৃন্দের; তবে সবকিছু করার সম্মতি সিরাজ-রাজ্জাক আগেই নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে। ২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসকে প্রতিরোধ দিবস ঘোষণা করে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে সারাদেশে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ানো ছিল ঐতিহাসিক ঘটনা। বাস্তবে ২৩ তারিখেই পাকিস্তানের কফিনে এ দেশের যুবসমাজ শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়। ওই দিন নিউক্লিয়াসের সিদ্ধান্ত মোতাবেক জয়বাংলা বাহিনীর কুচকাওয়াজ প্রদর্শন ও বঙ্গবন্ধু ভবনে গমন দেশবাসীকে আলোড়িত করেছিল। এসব বিষয়ে কাজী আরেফ ও আবদুর রাজ্জাক বিস্তারিত বলেছেন। সিরাজ ভাই নতুন কিছু বলেননি। সিরাজ ভাই তার বইতে বঙ্গবন্ধুকে সামান্যতম খাটো করেননি। আমার বিবেচনায় সিরাজুল আলম খান ছিলেন স্বাধীনতা-পূর্ব বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সিরাজুল আলম খানকে আক্রমণ করে জাসদের বিরুদ্ধে আমু ভাই ও তোফায়েল ভাই যা বলেছেন তা আওয়ামী লীগের নানাজন আগেও বলেছেন। এই সময়ে কার কী ভুল হয়েছে, তার বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা হতেই পারে। কোনো মানুষ ত্রুটিমুক্ত নয়। বঙ্গবন্ধু এ দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান; কিন্তু ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নন। জাসদ নেতৃত্বও ত্রুটিমুক্ত নয়। দেশের স্বার্থে, মুজিব বর্ষ পালনের আগে, আক্রমণাত্মক প্রচার-প্রচারণা নয়, বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা এ দেশের অসাম্প্রদায়িক মানুষ স্বাগত জানাবে বলেই আমার বিশ্বাস।”
*শরীফ নুরুল আম্বিয়া।
*সভাপতি, বাংলাদেশ জাসদ।

আমি সাংবাদিক শামসুদ্দিন পেয়ারার অনুলিখন “আমি সিরাজুল আলম খান” নামক জীবনালেখ্য গ্রন্থ, তার সমালোচনায় আওয়ামীলীগ নেতা জনাব তোফায়েল আহমেদ জনাব আমির হোসেন আমু ও সাবেক ছাত্রনেতা জনাব নুরে আলম সিদ্দিকির বয়ান এবং তার জবাবে জাসদের নেতা,আসম রব,হাসানুল হক ইনু ও শরীফ নুরুল আম্বিয়ার পত্রিকায় প্রকাশিত বক্তব্য পুঙ্খানুপুঙ্খ পাঠ করেছি।

এই সমস্ত লিখনি পাঠন্তে আমার মনে হয়েছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে ১৯৭১ সালের ১লা মার্চের পুর্ব পর্যন্ত একটি ধাপ এবং ১লা মার্চ ‘৭১ পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খান কর্তৃক জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতাদেশ ঘোষনা পরবর্তী আরেক ধাপ।আর এ ক্ষেত্রে আ স ম রব কর্তৃক ২রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম মহান স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন, শাহজাহান সিরাজ কর্তৃক বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে ৩রা মার্চ পল্টন ময়দানে মহান স্বাধীনতার ইস্তেহার পাঠ,বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম ঘোষণা ও ২৩শে মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসকে প্রতিরোধ দিবস ঘোষণা করে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে সারাদেশে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেওয়া হয়।এই চারটি দিবস আমাদের পাকিস্তানের সাথের সমস্ত আলোচনা পাকিস্তানি ক্ষমতার আস্বাদনকে ভেস্তে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাকে অনিবার্য করে তোলে।এখান থেকে পিছিয়ে আসার সব পরিকল্পনা হারিয়ে যায়।ফলে যারাই তখনো পাকিস্তানের ক্ষমতায় বসার সপ্ন দেখছিলেন তারাও মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাকে অনিবার্য মেনে নিতে বাধ্য হন।আমরা যারা সেই দিনের ঘটনাপঞ্জির সাক্ষী আমাদের স্পষ্টত মনে আছে ১লা মার্চের পরেই থেকেই বাঙ্গালি জাতি বিশ্বাস করতে শুরু করে লড়াই ছাড়া পাকিস্তানি উপনিবেশ থেকে মুক্তির ভিন্ন পথ নেই।।

আজকে এই চারটি দিবস আর এর কুশিলব বা পিছনের নায়কদের অস্বীকার বা দুরে রেখে বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাস রচনা করা যাবে না।।কিছু কিছু ছবি আর ভারতীয় বিভিন্ন নেতাদের সাথে কি আলোচনা হয়েছে সেটা একটি অংশ হতে পারে তবে সেটাই ইতিহাস নয়।জনাব তোফায়েল আহমেদ ৬৯সালকে কেন্দ্র করেই চলতে চেয়েছেন। তিনি ৬২সালে গঠিত নিউক্লিয়াসকে অস্বীকার করেছেন যদিও তার অন্য একটি সাক্ষাতকারে দেখেছি তিনি নিজেই ১৯৬২ সালে বিএম কলেজের ছাত্র থাকাকালীন নিউক্লিয়াসের লিপলেট বিলি করেছেন।যদিও নিউক্লিয়াস সদস্য আব্দুর রাজ্জাক তার একটি সাক্ষাতকারে নিজেই স্বীকার করেছেন জনাব তোফায়েল আহমেদ রাজনৈতিকভাবে অপরিপক্ব থাকায় তাকে নিউক্লিয়াসের বিষয় কিছুই অবহিত করা হয় নি।কিন্তু জনাব সিরাজুল আলম খান তার বয়ানে ও জনাব শরীফ নুরুল আম্বিয়া তার সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত বক্তব্যে জনাব তোফায়েল আহমেদের যথাযথ মুল্যায়ন করেছেন।এটাই ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠতা।যা প্রকাশ করতে উদার মানসিকতা থাকতে হয়।।জনাব আম্বিয়া জনাব আমুর যেহেতু নিউক্লিয়াসের সাথে কোন ভুমিকা নেই তার কোন আলোচনা না করলেও ৭৫পরবর্তী রাজনীতিতে তার ভুমিকাকে অস্বীকার করেন নি।কিন্তু এই উদারতা জনাব তোফায়েল আহমেদ ও জনাব আমির হোসেন আমু দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন।কাল্পনিক ও ফরমায়েশি ইতিহাস বর্ণানা করতে গিয়ে সিরাজুল আলম খান ও কাজি আরেফকে ব্যক্তি আক্রমণ করেছেন।অর্বাচীন ও অচেনা বলে আখ্যায়িত করেছেন যা এককথায় শিষ্টাচার বহির্ভূত শুধু নয় অশালীন ও অনভিপ্রেত।।

আওয়ামীলীগ তাদের চেতনায় যে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ বিবেচনা করে তার ইতিহাস যা আমরা ১৯৭২-৭৫ এদেশে দেখেছি সেটাই যদি হয়, তবে আওয়ামীলীগ এর সাথে স্বাধীনতার চেতনাগতভাবেই ভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক।। আর আওয়ামীলীগ যে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বের দাবী করে সেই স্বাধীনতায় সিরাজুল আলম খান,কাজি আরেফরা অর্বাচীন ও অচেনা হওয়াটাও বিচিত্র নয়।

কেন এমনটা হয়েছে কেন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া সমর নায়কদের আওয়ামীলীগ ধারন করতে পারলো না এর মুল কারন কি ছিলো?? আওয়ামীলীগ চেয়েছিল পাকিস্তানি রাষ্ট্র ক্ষমতা সেটা না পেয়ে তারা সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশকে শুধুমাত্র স্বাধীন পুর্বপাকিস্তান বিবেচনা করেছিল। শুধুমাত্র পাকিস্তান এর জায়গায় বাংলাদেশ বসিয়ে দিয়ে তারা পাকিস্তানি কাঠামোয় পাকিস্তানি আমলা,পাকিস্তানি আইন, পাকিস্তানি প্রশাসন দিয়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল যে কারনে নব বাংলাদেশ সৃষ্টির চেতনার মুক্তিযোদ্ধারা কেউ আওয়ামীলীগের পাশে দাড়ায় নি।তারা আওয়ামীলীগের স্বাধীনতাত্তোর ব্যাপক লুটপাট, রিলিপচুরি,কম্বল চুরি দখলবাজি,চোরাচালানকে মেনে নিতে পারে নাই।।

আর এ কারনেই আজকে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পুর্তিকে সামনে রেখে আওয়ামীলীগ স্বাধীনতার নুতন ইতিহাস রচনা করতে চাইছে।তারা আজ সবাইকে অস্বীকার করার একটা মানসিকতায় ভুগছে।আজকে সিরাজুল আলম খান বা কাজি আরেফ নয় তারা সমগ্র স্বাধীনতার ইতিহাসকেই অস্বীকার করছে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা আফতাব আহমেদকে অস্বীকার করা মানে জয়বাংলা স্লোগানকে অস্বীকার, কাজি আরেফকে অস্বীকার মানে স্বাধীনতার পতাকাকে অস্বীকার।
সিরাজুল আলম খানকে অস্বীকার করার অর্থ সমগ্র স্বাধীনতাকে অস্বীকার করা।

ইতিহাসকে বানিয়ে লেখা যায় না। ইতিহাস লিখতে হলে উপাদান লাগে।যার উপরে ভিত্তি করে ইতিহাস লিখতে হয়।। লরেন্স লিফশুলজ-এর ‘অসমাপ্ত বিপ্লব’, হায়দার আকবর খান রনো-এর ‘মার্কসবাদ ও সশস্ত্র সংগ্রাম’, আলতাফ পারভেজ-এর ‘মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী’, মনিরুল ইসলাম(মার্শাল মনি)-এর ‘জাতিরপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও সমাজতন্ত্র’, তালুকদার মনিরুজ্জামান-এর ‘Radical Politics and the Emergence of Bangladesh’ ও, ‘The Bangladesh Revolution and Its Aftermath’, জাতীয় অধ্যাপক ও ইতিহাসবিদ এ. এফ. সালাহউদ্দিন আহমদ-এর ‘Bengali Nationalism and the Emergence of Bangladesh: an Introductory Outline’ আর কাজী আরেফ আহমেদ-এর সাপ্তাহিক তারকালোক পত্রিকায় ধারাবাহিক লেখা ও স্কোয়াড্রন লিডার আ্হসানউল্লাহ সম্পাদিত বাংগালী জাতি রাষ্ট্র লেখক কাজি আরেফ আহমেদ, আমি সিরাজুল আলম খান একটি জীবনালেখ্য, শামসুদ্দিন পেয়ারা সম্পাদিত, ও সিরাজুল আলম খান স্বাধীনতা,-সশস্ত্র সংগ্রাম এবং আগামীর বাংলাদেশ তাজউদ্দীন কন্যা শারমীন আহমেদের নেতা ও পিতা বইগুলিতে বাংগালীর মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়েে যা বর্ননা করা হয়েছে তার সবটাই আজ মিথ্যা প্রমানিত করা যাবে না ।

“যে জাতি তার পূর্ব পুরুষের বীরত্বগাঁথা এবং ত্যাগের কথা জানে না; সে জাতির জাতীয়তাবোধ এবং দেশাত্মবোধ তিল মাত্র জন্মাতে পারে না। সে জাতি পৃথিবীতে কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। তাই আজ দেশের ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের উচিত নিরপেক্ষ ইতিহাস রচনায় উদ্যোগী ভূমিকা রাখা। স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ের নেতা ও সংগঠকদের উচিত সেই ইতিহাস রচনায় সহযোগিতা করা। আর স্বাধীনতা আন্দোলনে ও মুক্তিযুদ্ধে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের উচিত নিজেদের কৃতিত্ব উপস্থাপনের পাশাপাশি অন্যের অবদানকে খাটো বা অস্বীকার না করে নিরপেক্ষ ইতিহাস রচনায় সচেষ্ট হওয়া।”কথাটা বলেছেন নিউক্লিয়াস নেতা কাজি আরেফ আহমেদ।।

আহমেদ ফজলুর রহমান মুরাদ

সাবেক ছাত্রনেতা এবং রাজনীতি বিশ্লেষক ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.