আমি সিরাজুল আলম খান নামে একটি গ্রন্থ নিয়ে ইতিমধ্যে ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় ১৫ টি সিরিজে আলোচনা-সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছে। আরো আলোচনা এই সিরিজে প্রকাশিত হবে বলে জানা গেছে। এই তথ্য দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, “আমি সিরাজুল আলম খান” গ্রন্থটি ইতিহাসকে এমনভাবে উন্মোচিত করেছে যাতে গ্রন্থটি নিজেই ইতিহাস সৃষ্টি করলো। এই উপমহাদেশে একটি গ্রন্থ নিয়ে এতো আলোচনা-সমালোচনার নজির নেই। সোশ্যাল মিডিয়া ও ফেসবুকেও এই গ্রন্থ নিয়ে আলোচনার ঝড় অব্যাহত রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া ও ফেসবুকে এই গ্রন্থ নিয়ে লক্ষাধিক পোস্ট প্রকাশিত হয়েছে বলে জানা যায়। নানামুখী চাপে গ্রন্থের প্রকাশক বাজার থেকে গ্রন্থটি প্রত্যাহার করা সত্তেত্বও গ্রন্থের গণচাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। হাজার হাজার ফটোকপি গণ-মানুষের হাতে হাতে ঘুরছে। তোফায়েল আহমেদ এবং আমীর হোসেন আমুর মতো দু’জন বিশিষ্ট রাজনীতিক এই গ্রন্থের সমালোচনা করে যে অভিমত প্রকাশ করেছেন তাতে এই গ্রন্থের ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরো বেড়ে গেছে। ইতিহাসের গবেষক এবং পাঠক মাত্রই এখন ইতিহাস জানার প্রয়োজনেই এই গ্রন্থকে তাদের জ্ঞান-গবেষণার নিত্যসঙ্গী বিবেচনা করতে বাধ্য হবেন।
‘আমি সিরাজুল আলম খান’ গ্রন্থে সিরাজুল আলম খান-এর জবানীতে শামসুদ্দীন পেয়ারা ইতিহাসের পাতা উন্মোচন করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে সিরাজুল আলম খান’র কর্মতৎপরতার সংক্ষিপ্ত বিবরণ এই গ্রন্থে ফুটে উঠেছে। কিভাবে স্বাধীনতার মন্ত্র ছাত্র-যুব সমাজের মধ্যে বিস্তৃত হয়, স্বাধীনতার বীজ কিভাবে অংকুরিত হলো, কিভাবে ছাত্র-যুব সমাজ সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য সংগঠিত হলো-তার খানিকটা বিবরণ সিরাজুল আলম খান’র জবানীতে এই গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। এতেই তৎকালীন পাকিস্তানিমনা রাজনীতিকদের গাত্রদাহ সৃষ্টি হয়েছে।
এই পুস্তক পাঠে পাঠক উপলব্ধি করবেন যে স্বাধীনতার ইতিহাস কোনো একক ব্যক্তির জাদু মন্ত্রে সংঘটিত হয়নি। সুপরিকল্পিত কর্মযজ্ঞের ফসল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এই কর্মযজ্ঞে অবদান রেখেছেন অনেক নেতা, হাজারো তরুণ সংগঠক, লাখো মুক্তি যোদ্ধা। বিশাল কর্মযজ্ঞে একক স্বত্বার কৃতিত্বের দাবি খন্ডিত হয়েছে এই গ্রন্থের ছত্রে ছত্রে। এই গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’র ভূমিকাকে অনন্যভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক হিসেবে বর্ণনা করে বলা হয়েছে ‘আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর কথা আলাদা’। বলা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ‘৬দফা কর্মসূচিই ছিলো বাঙালির মুক্তি সনদ এবং সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি-মন্ত্র’। বিবৃত হয়েছে কিভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ এবং ‘জাতির জনক’ খেতাব প্রদত্ত হলো।

এতদসত্ত্বেও তোফায়েল আহমদ ও আমীর হোসেন আমু যেভাবে গ্রন্থটির নেতিবাচক সমালোচনা করেছেন, তাকে সমালোচনা না বলে ‘বাহাস’ বলাই যুক্তিযুক্ত। ইতিহাসের সত্য উদঘাটনের প্রয়োজনেই তাদের উত্থাপিত ‘বাহাস’-এর প্রত্যুত্তর প্রদান আবশ্যক হয়ে পড়েছে।
তোফায়েল আহমদ ও আমীর হোসেন আমুর চোখে এই গ্রন্থে কোনো ইতিবাচক বিষয় নেই, কাল্পনিক ঘটনা ও মিথ্যাচার রয়েছে। তারা ব্যক্তিগতভাবে সিরাজুল আলম খানকে ষড়যন্ত্রকারী, ব্যর্থ রাজনীতিক এবং ষড়যন্ত্র- ব্যর্থতা ঢাকার জন্য ‘রাজনীতির রহস্য পুরুষ’ অভিধায় অভিহিত করতে চেয়েছেন। তাদের বক্তব্য যতোটা না ঘটনাভিত্তিক তার চেয়ে অধিকতর ব্যক্তিবিদ্বেষপ্রসূত।
তাদের উত্থাপিত বিষয় হলো: ১) নিউক্লিয়াস’র অস্তিত্ব ছিলো না, ২) স্বাধীনতা সংগ্রাম রচনার ক্ষেত্রে সিরাজুল আলম খান’র কর্মকান্ড ষড়যন্ত্রের নামান্তর, ৩) স্বাধীনতার পরে সিরাজুল আলম খান সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র করে ব্যর্থ হয়েছেন, ৪) সিরাজুল আলম খান না বিপ্লবী, না গণতন্ত্রী এবং ৫) সিরাজুল আলম খান এই গ্রন্থে কল্পকাহিনী ও মিথ্যাচার প্রচার করেছন।
‘নিউক্লিয়াস’ সম্পর্কে গত এক যুগে প্রয়াত নেতা আবদুর রাজ্জাকের কয়েকটি সাক্ষাৎকার বিভিন্ন পত্রিকা এবং জাতীয়-আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সহ অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে। কাজী আরেফ আহমেদ রচিত একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ কয়েক বছর আগেই নামকরা প্রকাশনা সংস্থা প্রকাশ করেছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময়ে প্রদত্ত তার বক্তব্য উল্লেখ করেছেন যে বঙ্গবন্ধু নিজেই নাকি ছাত্র-যুবকদের মধ্যে স্বাধীনতার লক্ষ্যে ‘নিউক্লিয়াস’ গড়ে দিয়েছেন। এরপরেও যদি আমু-তোফায়েলরা ‘নিউক্লিয়াস’র অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেন তাহলে তাকে ‘জ্ঞানপাপী’ ছাড়া আর কি বলা যায়? তারা এই ‘নিউক্লিয়াস’-এর সাথে যুক্ত না থাকার দু:খ মোচনের জন্যই আজ সত্যকে অস্বীকার করছেন। বাস্তবে ‘নিউক্লিয়াস’র সাথে যুক্ত প্রায় ৭ হাজার মুক্তিযোদ্ধার অনেকেই এখনো জীবিত আছেন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে সারা দেশের বিভিন্ন জেলা-থানায় বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা যারা উত্তোলন করেছিলেন-তারা সকলেই ছিলেন ‘নিউক্লিয়াস’র সদস্য। ঢাকায় ২রা মার্চের স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন এবং ৩ মার্চে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করে প্রকাশ্যে লিখিত স্বাধীনতার ঘোষণা, ‘আমার সোনার বাংলা’ কবিতাকে ‘জাতীয় সংগীত’, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক’ ঘোষণা যারা করেছিলেন তারা সকলেই ‘নিউক্লিয়াস’র সদস্য ছিলেন। এছাড়াও পাকিস্তান সরকারের গোয়েন্দা তথ্যে ‘নিউক্লিয়াস’র কর্মকান্ডের শত শত রিপোর্ট রয়েছে। অথচ, আমু-তোফায়েল গং আজ ‘ছুম্মুম বুকমুম অমিউন ফাহুম…’ অর্থাৎ ‘কালা বোবারা কোনো দিনই জ্ঞান লাভ করবে না’- এই কুরআনিক বাণীর সত্যতা প্রমাণ করলেন।
সিরাজুল আলম খান তার গ্রন্থের প্রতিটি ছত্র প্রমাণ রেখেছেন তিনি কিভাবে স্বাধীনতার মন্ত্রে দেশের ছাত্র-তরুণদের উজ্জীবিত করতে রাজনৈতিক-সাংগাঠনিক ভূমিকা রেখেছেন। তিনি কিভাবে আন্দোলনে স্লোগান রচনা, পতাকা প্রস্তুত, ‘৬৯ এর গণ-আন্দোলন, ‘৭০ এর নির্বাচন এবং সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য জাতীয় প্রস্তুতি গ্রহণে ভূমিকা রেখেছেন। এটাই যদি ষড়যন্ত্র হয়ে থাকে, তাহলে যারা বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী করার রাজনীতি উক্ত সময়ে অনুশীলন করতেন তাদেরকে কি খেতাব দেয়া উচিত? ১৯৭০ সালের পরে মোশতাক-মণি গংদের রাজনীতির অনুশীলন নিয়ে গবেষণা করলেই প্রমাণিত হবে স্বাধীনতা সংগ্রামী আসলে কে কে ছিলেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে ‘কনফেডারেশন’ করার ষড়যন্ত্র এবং তাজউদ্দীনের নেতৃত্ব গঠিত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বিরোধিতা কারা কেন করেছেন তা উন্মোচিত হবে। স্বাধীনতার পরে সিরাজুল আলম খান বঙ্গবন্ধুর নিকট দেশ গঠনের জন্য ‘১৫ দফা সুপারিশনামা’ পেশ করেছিলেন বলে তার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। এই ১৫ দফা আজ ইতিহাসের দলিল। ‘আমি সিরাজুল আলম খান’ গ্রন্থ প্রকাশের আগেই এই ১৫ দফা সুপারিশ বিভিন্ন গ্রন্থ ও প্রকাশনা প্রচার করেছে। এই ১৫ দফায় কি কি ষড়যন্ত্রের আলামত আছে তা আমু-তোফায়েল গং চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। সিরাজুল আলম খান এই ১৫ দফার আলোকেই পরবর্তীতে রাজনীতির নীতি ও কৌশল (Strategy and tactics) প্রণয়ন ও অনুশীলন করেছেন। বঙ্গবন্ধুকে বলে-কয়েই তিনি তার রাজনীতির পথ অনুসন্ধান করেছেন। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চে স্বাধীনতা দিবসে জাতির উদ্দেশ্যে প্রচারিত বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ এবং ‘সামাজিক বিপ্লব’ এর প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি নিজেই ব্যক্ত করেছেন। তাই ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ এবং ‘সামাজিক বিপ্লব’ এর লক্ষ্যে অনুসৃত সিরাজুল আলম খান-এর রাজনীতিকে ষড়যন্ত্র তো নয়ই বরং বঙ্গবন্ধুর আকাঙ্খার বাস্তবায়ন বলা চলে। এক নেতা এক দেশ পন্থীরা এই আদর্শিক রাজনীতি না বোঝারই কথা।
তোফায়েল আহমেদ বলেছেন সিরাজুল আলম খান না বিপ্লবী, না গণতান্ত্রিক। বিপ্লব ও গণতন্ত্রের কোন চিরায়ত সংজ্ঞা নেই। বাস্তব অবস্থার বাস্তব বিশ্লেষণের আলোকে বিপ্লব এবং গণতন্ত্রের নীতি-কৌশল প্রনীত হয়। গণতন্ত্র যুগে যুগে বিকশিত ও সম্প্রসারিত হয়ে আসছে। এ যুগে গণতন্ত্র নেহায়েত কথা বলা, সংগঠন করা এবং ভোট দানে সীমায়িত নেই। গণতন্ত্র এখন অধিকার, ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। সর্বস্তরের সকল মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার মাধ্যমেই অধিকার, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার রাজনীতিই এখন গণতান্ত্রিক রাজনীতি। সিরাজুল আলম খান সমাজের সর্বস্তরের জনগণের অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই আধুনিক গণতান্ত্রিক রাজনীতি অনুশীলনের আহবান জানাচ্ছেন।
গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হলেই, ফ্যাসিবাদ বলবৎ হলেই বিপ্লবের আবশ্যিকতা দেখা যায়। এই অবস্থায় বিপ্লব করাও গণতান্ত্রিক সংগ্রামেরই অংশ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জনগণের সশস্ত্র অংশগ্রহণের বিষয়টাও ছিলো গণতান্ত্রিক অধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে। গণতন্ত্রের এই পর্যায়কে রাজনৈতিক তাত্ত্বিকগণ ‘বিপ্লবী গণতান্ত্রিক’ পর্যায় বলেছেন। সিরাজুল আলম -এর রাষ্ট্রীয়-রাজনৈতিক ভাবনায় এই চিন্তা-চেতনারই প্রতিফলন ঘটছে। বস্তুত: পক্ষে, বাঙালির ১৯৭১ সালের সশস্ত্র যুদ্ধ হলো বিপ্লবী গণতান্ত্রিক আন্দোলনেরই ঐতিহাসিক উদাহরণ।
আমু-তোফায়েল গং সিরাজুল আলম খান-এর বক্তব্য কল্পকাহিনী ও মিথ্যাচার বলতে চেয়েছেন। অনেকে ঐতিহাসিক ঘটনার অংশীদার না হতে পারার বেদনা থেকেই আমু-তোফায়েলের কন্ঠে এই ভিত্তিহীন অভিযোগ উৎসারিত হয়েছে। কল্পকাহিনী ইতিহাসের কষ্টিপাথর টিকে না। শত বছর পরে যখন ঐতিহাসিক গণ ইতিহাস রচনা করবেন, তখন বিকৃত ইতিহাস বাদ যাবেই। যথাযথ সত্য প্রতিষ্ঠিত হবেই। এ নিয়ে আমু-তোফায়েলরা নিশ্চিত থাকতে পারেন। এ ব্যপারে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা প্রদত্ত ঐতিহাসিক রায়টি প্রণিধানযোগ্য। এই রায়ে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে বিশদ আলোচনা রয়েছে। এই রায়ের কারণে তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে।
‘আমি সিরাজুল আলম খান’ গ্রন্থে মিথ্যাচার থাকলে তা চিহ্নিত করে আমু-তোফায়েলরা গং যদি স্বনামে গ্রন্থ রচনা করেন, তাহলে সেটাই হবে যথাযথ পদ্ধতি। সাংবাদিকের বয়ানে পত্রিকার পাতায় বিষোদগারকরণ এবং সস্তা প্রচারের পথ-মাড়ানো কোনো যোগ্য রাজনীতিকদের কাজ নয়।
আমু-তোফায়েলকে ধন্যবাদ যে, তারা “আমি সিরাজুল আলম খান” গ্রন্থটি পাঠ করে মুখ খুলেছেন। অন্যরাও পাঠ করবেন এবং আরোও মুখ খুলবেন- এই প্রত্যাশা রইলো।
লেখক: মুক্তিযোদ্ধা। সমাজ বিপ্লবের সংগঠক। সার্বক্ষণিক রাজনীতিক। সাবেক সংসদ সদস্য।

