ভারতে মোদি আর বাংলাদেশে যদি

প্রথমেই ভারতে বিজয়ী মোদি সাহেবকে শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন । যে যত কথাই বলুক ভারত এখনও একটি আদর্শ ভিত্তিক রাষ্ট্র । তাদের রাষ্ট্রের প্রশাসনে প্রাতিষ্ঠানিক দিকগুলো এখনও সঠিক পথেই আছে। যদিও এবারের নির্বাচনে কিছু আক্ষরিক অর্থের দূর্বলতা পত্র-পত্রিকায় এসেছে। সেখানে একটি ছিলো ইভিএম বিষয় । যেটা নিয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিও কথা বলতে বাধ্য হয়েছেন। ইতিহাসের পাতায় ভারতে টিএন শেসন যে নির্বাচনী উদহারণ তৈরি করে গেছেন, যা কিনা আজকের ভারতের নির্বাচনের শক্ত ভিত্তি । তবে এটাও তো ঠিক সবাই তো আর টিএন শেসন হতে পারবেন না।  তারপরেও বলতেই হয় ভারতের নির্বাচন কমিশন সঠিক কক্ষ্ পথেই আছেন , যা কিনা একটি গণতান্ত্রিক দেশের জন্য একান্তই প্রয়োজন । ভারতের যেকোনো বিষয়ে আলোচনা মানেই আমাদের সাথে কি কি সাদৃশ্য আছে বা নাই  , সেটাই মূখ্য বিষয় । তাছাড়া  ভারত ডুবলো কি ভাসলো সেটা আমাদের খুব বেশি মাথা ব্যাথা হবার কথা নয়।

যদিও এই বিশ্বায়নের যুগে ভারত একটি পরাশক্তির রূপ লাভ করেছে, সেই অর্থে তাদের সব কিছুই আমাদের মাথা ব্যাথা । কেননা আমাদের সাথে ভারতের সেই যুদ্ধকালিন থেকেই সম্প্রতি রয়েছে। তাছাড়াও প্রতিবেশী বলে একটা কথাতো আছেই। যদিও এই প্রতিবেশী প্রায়শই দাদা আকাড়ে আবির্ভূত হয়। একবার ভাবুন তো ভারত আমাদের সাথে দাদাগিরি না করে সত্যি সত্যি প্রতিবেশী স্বাধীন দেশ হিসেবে আচরণ করে। তাহলে কি হতো ? আমাদের দেশে সেই স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যে কয় পার্সেন্ট নিজের দেশের  বিপরীতেও পাকি পিড়িতের কুলাঙ্গাররা ছিলো, তারা হয়ত বা থাকতো , তবে ভারতের বিরুদ্ধে কি কথা বলার সাহস পেত? উত্তর হচ্ছে পেতো না । বর্তমানে দেশে যে ভারত বিরোধী জনমানুষের সংখ্যা বেড়ে চলেছে , সেটার জন্য একমাত্র ভারতই দোষি। সুতরাং কেন এমন সেটা ভারতকেই ভাবতে হবে। এর সমাধান ৫৪ নদীর জল আঁটকিয়ে রেখে কখনোই হবে না। 

যা বলছিলাম, ভারতে যাই ঘটুক সেটার সাদৃশ্য বাংলাদেশে কোন পর্যায়ে আছে সেটাই মূলত দেখার বিষয় । আর কারণটিও খুব সহজ, বৃহত্তর গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে যা ঘটে আমাদের উপরে তার প্রভাব পরেই এবং ভবিষ্যতেও পরবে। তারচেয়েও বড় বিষয় হলো আমরাই ভারতের দিকে দু পা আগিয়ে থাকি। জ্বলন্ত উদহারণ মোদি গতবার ভোটে জিতে ভালো করে ফলাফলও হাতে পাননি, তার পূর্বেই আমাদের রাজপথের বিরোধী দলের স্বয়ং মহা সচিব ভারতের দূর্গায় ( দূতাবাস) গিয়ে ফুলের তোড়া নিয়ে হাজির। আর অন্যদিকে আমাদের সরকার প্রধানও কংগ্রেসের আশা ভুলতে দেরি না করেই স্বাগতমের উচ্চস্বর শুনিয়েছেন ।

আজকের মোদির বিজয়, ছোট্ট করে প্রথমেই দেখার চেষ্টা করি , বিজয়ের প্রধান কারণ কি ? যদিও আমরা সবাই বলছি এর পেছনের মূল কারণ ধর্ম। হ্যাঁ  তা সত্যি বটে , কিন্তু ধর্মই জয়ী হওয়ার পিছনে আন্তত এবারের জন্য একান্তই মূল কারণ নয়। মনে আছে সবার নিশ্চয়ই, এই কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদের দলটি যখন এর পূর্বে বাজপেয়ী সরকার জয়ী হয়ে ছিলো, সেই সময়ে বাজপেয়ী ভোটের বাজারে একটি কমন স্লোগান ছিলো , ”  ভোট হামারা লিয়ে নেহি মাঙতা হু, ইয়ে ভোটতো হামলোক হামারা মা দেবী কা লিয়ে মাঙতাহু” !  সেই সময়ে বাজপেয়ীর সেই সূত্র বেশ কাজেও দিয়েছিলো । যার অনুস্বরণ করে মোদিও গতবার সেই ধর্মের কাহিনীই বেশি গেয়েছিলেন এবং ফলাফল কট্টর ধর্মান্ধের কারণে সুফলতা এসেছিলো। এবার কিন্তু একটি ভিন্ন বিষয় লক্ষ্য করার মত। এবারের ভোটের বাজারে মোদি আর অমিত শাহ্কেই বেশি দেখা গিয়েছে প্রচার প্রচারণায়। গতবারের মত মিডিয়ার সংশ্লিষ্টতা এত বেশি লক্ষ্যণীয় ছিলো না, যা গতবার ছিলো। ইনারা যতটুকু ধর্ম নিয়ে প্রচার চালিয়েছেন, যতটুকুন কটূক্তি করেছেন,  তার চেয়েও বেশি আগামীর ভারতের গতিপথ বেশি বলেছেন। ভবিষ্যতে ভারতের অর্থনীতি, ভারতের নিরাপত্তায় করণীয়, বিশ্বায়নে ভারতের ভবিষ্যতে কি করণীয় , এমনকি ভারতীয়দের প্রাকৃতিক কার্য সম্পাদন করবার জন্য ( টয়লেট)  ভবিষ্যতে সরকার কি করবে, অর্থাত সার্বিকভাবে পজিটিভ এবং ভিশনের কথা বেশি বলেছেন। অন্যদিকে কংগ্রেসের তরুণ রাহুল গান্ধীর প্রচার প্রচারণায় কোনো ভিশনের বাণী ছিলো না, এমনকি গত পাঁচ বছরের বিজেপি সরকারের দূর্বলতা গুলোকেও ভালো করে ফোকাসে আনতে পারেনি। পারবেই বা কি করে ? রাহুণ গান্ধী বেশ তরুণ এবং এই প্রজন্মের একজন রাজনীতিবিদ হয়েও প্রচারণায় ছিলো সারাক্ষণ গিবত্, ” চৌকিদার চোর হ্যায় ” ইত্যাদি ইত্যাদি ।  লক্ষ্যণীয় যে পশ্চিমবঙ্গের মমতার এক গণতান্ত্রিক থাপ্পরকে মোদি উল্চো আর্শীবাদ বলে গ্রহণ করে জনমানুষের আরো হৃদয়ের মানুষ হয়ে উঠে। বিষয়টি এমন হয়েছিলো , থাপ্পর দেয় মমতা, চোর বলে রাহুল কিন্তু ভোট পায় মোদি। কেন এমনটি হলো, সেটা ভাববার বিষয় বটে। সহজ ভাবে বলা যায়, এই উপমহাদেশের রাজনীতি ভীষণ গিবত আর গালাগালের রাজনীতি । এটা মনে হয় আজকের বিশ্বায়নের যুগে পৃথিবী সমন্ধে সবার বেশি বেশি জানা থাকার ফলে কেউ বেশি গ্রহণ করে না। কেননা পৃথিবীতে এই উপমহাদেশের মত নোংরা ভোটের রাজনীতি কেউ যে করে না , তা হয়তোবা জনমানুষের বিবেকে আঘাত হানে। ফলাফল হোক বা না হোক, পারুক বা না পারুক তবুও ভিশন শুনতে জনমানুষরা বেশি আগ্রহী বলেই মনে হয়, সুতরাং ফলাফল  মোদির ঘরেই যাবে ,এটাই ছিলো কাঙিক্ষত এবং হয়েছেও তাই। যেখানে সরকার গঠনে ২৭২ টি আসন প্রয়োজন, সেখানে বিজেপি গতবারের ২৮২ টার চেয়েও বেশি আসনে জয়ী ।

এবার ছোট্ট করে আমাদের সাথে ভারতের ভোটের সাদৃশ্য দেখি । সবার মনে আছে নিশ্চয়ই, ২০০৮ সালের সেই তথাকথিত আর্মি শাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জাতীয় ভোটের সময় বিএনপির স্লোগান ছিলো , ” দেশ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও” বিপরীতে আওয়ামী লীগের ছিলো , ” ভিশন 2020 “। ফলাফল ভিশনের জয়। যদিও আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো সব নির্বাচনেই সূক্ষ্ম/স্থূল/ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং চোখে দেখেন, যখনই ফলাফল বিপরীতে যায় । সেটা আরেক আলাপ। বলাই যায় জনমানুষের মনে ভিশন, ভীষণ ভাবে নাড়া দিয়েছিলো। ২০১৪ নির্বাচন নিয়ে কথা বলাটা একটু এলার্জিকর বটে। ভারতের দাদাগিরিকে আমরাই যে আমন্ত্রণ করি , সেটার সাক্ষাত্ প্রমাণ এই ১৪ এর নির্বাচন । স্বয়ং ভারতের বিদেশ মন্ত্রীর সচিব সুজাতা সিং এর সরাসরি হস্তক্ষেপ কে আমরাই আমন্ত্রণ করেছি। তার চাক্ষুষ প্রমাণ আবার আমাদের কবি এরশাদ সাহেব। কেননা উনি সেই সময়ে মাথায় লোর্ড করা রিভলবার ঠেঁকিয়েও সুজাতার প্যাঁচ থেকে বেড়োতে না পেরে বাজারে হাড়ি ভেঙে দিয়েছিলেন , সুজাতার সরাসরি হস্তক্ষেপের কথা। এমনকি কপালের এরশাদ গল্ফক্লাব টু সিএমএস হসপিটাল । আর এবারের ২০১৮ এর নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের সরাসরি প্রমাণ না থাকলেও, সরকার বাহাদুর ক্ষমতার পুরো ব্যবহারটা ভালোই করতে পেরেছেন। নৈশভোট তো এখনও গলায় আঁটকিয়ে আছে এবং থাকবেও সেই শেষ অব্দি । এমনকি এই সুজাতার হস্তক্ষেপ আর নৈশভোট আজীবনের ইতিহাস হয়েই থাকবে। যেমনটি এখনও বাকশাল আছে এবং থাকবে। ইতিহাস ভীষণ নির্মম কেননা বারবার চোখের সামনে এসে ধরা দেয়।এবারের নৈশভোটের মূলে কারণটি আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় আগামীতে বিজয়ের ৫০ তম উৎসব এবং বঙ্গবন্ধুর ১০০ তম জন্মবার্ষিকী পালন বর্তমান সরকার যে করেই হোক ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকে করার প্রতিজ্ঞায় থেকেই মরন কামর দিয়েছিলো।

যা হোক , ভারতের ভোটের সাথে আমাদের ভোটের এই কাসুন্দি ঘাটার কারণ সেই গণতন্ত্র । আর গণতন্ত্রের মূলে থাকে দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা ।আর ভোটের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন থাকে সর্বে উচ্চে। এসব এখন জনমানুষের মুখস্থ বিষয় । সমস্যা আমাদের সেই গোড়ায়ই রয়ে গেছে। এই গোড়া যতদিন শক্ত না হবে , ততদিন ভোটের লীলাখেলা না খেলাই সমীচীন । কেননা অযথা গরিব দেশের জনমানুষের টাকার অপচয় না করে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে  সমঝোতায় এসে ক্ষমতা ভাগ করে নেওয়াই হবে উত্তম ।

লেখার শেষে এসে বলি, যদি সঠিক পন্থায় দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এখনই দ্রুতর না করা হয় , তাহলে আগামীতে ভারতের বিজেপির মতন কট্টর হিন্দুত্ববাদের মোদির মত আমাদের দেশেও কট্টর মৌলবাদের অপেক্ষা করাই উত্তম । তবে একটি কথা সবার ভালো করে মনে রাখা দরকার , ভারতের হিন্দুত্ববাদ কট্টর বিজেপির সাথে আমাদের কট্টর মৌলবাদের মিল থাকবে না। কেননা ভারতের রাজনীতিতে যতই বিভেদ থাকুক না কেন , ওরা কিন্তু জাতীয় স্বার্থে সবাই এক। কট্টর হোক আর সেকুলার হোক ভারতীয়রা ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে ধ্বংস হতে দেয় না, অনেক প্রমাণ  আছে। কিন্তু আমাদের  বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক দলগুলো কোনো দিন এক বিন্দুতে মিলতে পারেন নাই।  এর প্রমাণ স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে আজ অব্দি বহাল আছে।

20190210_195317

বুলবুল তালুকদার

সহকারী সম্পাদক ,শুদ্ধস্বর ডটকম 

 

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.