দীর্ঘ প্রায় দুই যুগের উপরে আমি অষ্ট্রিয়ার প্রবাসী । ভূগোলের জ্যামিতি হিসেবে ইউরোপের হার্ট বলে অষ্ট্রিয়া পরিচিত । কেননা এই দেশটি ইউরোপের মধ্যকার দেশ। আয়তনে বাংলাদেশের অর্ধেকের চেয়ে কিছুটা বড় । অস্ট্রিয়া ৮৩, ৮৭৯ কিলো স্কোয়ার মিটার মাত্র আয়তনে, আর জনসংখ্যা মাত্রই ৮,৭৭৩ মিলিয়ন ২০১৭ এর হিসেবে। আমাদের দেশ আয়তনে ১৪৭,৫৭০ কিলো স্কোয়ার মিটার আর জনসংখ্যার দিক দিয়ে বাংলাদেশ প্রায় ১৫৫ মিলিয়ন লোক বেশি। এই হিসেবটি বলার কারণ, সত্যি বলতে আমাদের দেশের সাথে ইউরোপের এই দেশের তুলনা করাটা সমীচীন নয়। সেটা রাজনৈতিক হোক বা অর্থনৈতিক হোক। কেননা দুটি দুমেরুর দেশ এবং জনসংখ্যার দিক দিয়ে আকাশ পাতাল তফাৎ। কৃষ্টি-কালচার , সামাজিকতা, আচার -আচরণ সাধারণ ভাবেই এশিয়া কন্টিনেন্ট আর ইউরোপ কন্টিনেন্ট এ একেবারেই ভিন্ন । তবে রাজনীতিতে যে গণতন্ত্রের কথিত সংজ্ঞা ” অফ দা পিপল, বাই দা পিপল, ফর দা পিপল” এটা কিন্তু পৃথিবীর সব মেরুতেই কাছাকাছি হওয়ার কথা। সেই দিক দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি যেহেতু প্রচলিত গণতান্ত্রিক রাজনীতি, সেই হিসেবে অষ্ট্রিয়া আর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক তুলনা করলে তেমন অযাচিত হবার কথা নয়। কতটুকু রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক মিল এই দুই প্রান্তের রাজনীতিতে আছে সেটা বলার জন্য নয় , তবে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে কি উদহারণ হতে পারে সেটাই আমার ছোট্ট করে বলার উদ্দেশ্যে ।
বিশ্বায়নের এই যুগে আমাদের দেশের পত্র পত্রিকা সহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায়শই পৃথিবীর অনেক দেশের গণতান্ত্রিক উদহারণ পাওয়া বা দেখা যায় । তবে বাস্তবতা হচ্ছে সেই উদহারণ আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা তৈরি করতে হয় পারেন না , অথবা করতে শতভাগ অক্ষম। কেন আমাদের দেশে এমন হয় সেটা সকলের বিবেচনায় রেখে দিয়েই এখন আসি অষ্ট্রিয়ার রাজনৈতিক স্ক্যান্ডাল এবং গণতান্ত্রিক উদহারণে।
ইতিমধ্যেই ইউরোপ সহ পৃথিবীর সব দেশেই অষ্ট্রিয়ার রাজনৈতিক স্ক্যান্ডাল প্রকাশ হয়ে গেছে এবং সে খবর বাংলাদেশের পত্রিকায়ও প্রচার পেয়েছে। তাই ঘটনার গভীরে না গিয়ে গণতান্ত্রিক উদহারণের কথাই বলি। গত প্রায় ১৭ মাস যাবত্ অস্ট্রিয়ায় একটি কোয়ালিশন গভর্নমেন্ট চলছে। বর্তমানে পৃথিবীর সব চাইতে কম বয়সি ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী ( চ্যান্সেলর ) অষ্ট্রিয়ার জনাব সেবাস্তিয়ান কুর্জ। বর্তমানে তার বয়স মাত্রই ৩৪ বছর। তার রাজনৈতিক দল কালো রং এর ওফাওপে (ÖVP) এবং নীল দল এফপেও (FPÖ) ক্ষমতাসীন এই দেশে। এফপেও দলের প্রধান জনাব হাইন্স ক্রিস্টিয়ান স্ট্রাখে এই দেশের উপ প্রধানমন্ত্রী ( ভাইস চ্যান্সেলর) । এই উপ প্রধানমন্ত্রী ২০১৭ সালে স্পেনের একটি দ্বীপ শহর ” ইবিচ্ছা ” তে ছুটি কাঁটাতে গিয়ে রাশিয়ার একজন স্বর্ণালি চুলের ধনী মহিলা ব্যবসায়ীর সাথে আলোচনায়, নিজ দেশের ভিতরে কিভাবে রাজনৈতিক গ্যাম খেলা যায় , তার একটি ভিডিও স্বত্বই প্রকাশিত হয়েছে। এই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, কিভাবে অস্ট্রিয়ায় পরিচিত একটি বা একাধিক পত্রিকা প্রয়োজনে টাকা দিয়ে কিনে, নিজেদের মত ব্যবহার করে ভবিষ্যতে দেশের রাজনীতিতে কিভাবে প্রভাব বিস্তার করা যায়, তার কথাবার্তা । ভিডিওটি সম্ভবত প্রথম প্রকাশ পায় জার্মানির একটি প্রভাবশালী ” স্পিগেল” নামক পত্রিকায় । বেশ অষ্ট্রিয়ায় রাজনৈতিক ভূমিকম্প শুরু ।
ফলাফল এফপেও এর হাইন্জ ক্রিস্টিয়ান স্ট্রাখে ( ভাইস চ্যান্সেলর) কিছুক্ষণ পরেই নিজের দল এবং ভাইস চ্যান্সেলর পদ থেকে পদত্যাগ করেন । চ্যান্সেলর সেবাস্তিয়ান কূর্জ আর এফপেও এর সাথে জোটগত ভাবে ক্ষমতা চালিয়ে যেতে নাড়াজ। লক্ষ্যণীয় ওফাওপের এই ভিডিওর সাথে বিন্দুমাত্র যোগাযোগ নেই অথচ স্রেফ এই ভিডিওর ব্যাক্তিটি তাদের সাথে ক্ষমতায় বলেই ক্ষমতাকে আর দীর্ঘায়িত করতে সম্পূর্ণরূপে নাড়াজ। ইতিমধ্যেই সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে আগামী সেপ্টেম্বর মাসেই নতুন করে জাতীয় নির্বাচন হবে। চ্যান্সেলর সেবাস্তিয়ান কূর্জ দেশের প্রেসিডেনটের সাথে একটি সাক্ষাত্কার শেষেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন। এই সিদ্ধান্ত আসতে প্রায় ১৭ ঘন্টা সময় নেয়। এই ১৭ ঘন্টাকে অনেকেই অনেক লম্বা সময় বলেও ধিক্কার দিচ্ছে।
লেখার উপরে আমাদের দেশের আয়তন এবং জনসংখ্যার উল্লেখ করার কারণ হলো , অষ্ট্রিয়ার মত কম জনসংখ্যার দেশ আমাদের দেশ নয়, তাই নিশ্চয়ই এক বিষয় নয়, তবে গণতন্ত্রকে বলিষ্ঠ করতে একদিন না একদিন জনমানুষের ভোটকে সম্মান করতেই হবে এবং এরকম তড়িৎ সিদ্ধান্তে গণতন্ত্রের জন্যেই আসতে হবে, যা কিনা দেশ ও জাতির জন্যই মঙ্গল জনক । তবে একথা বলতেই হয়, আমরা না হয় সেই ভোট দিয়েই নতুন করে শুরু করি ।

বুলবুল তালুকদার
সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

