সাদাত হোসাইনের ‘নিষিদ্ধ নিশীথে’: রহস্যের ফাঁদে পাঠক

 

থ্রিলার লেখা মোটেও সহজ কাজ নয়। বিশেষ করে এই সময়ে, যখন নানা তথ্য ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পাঠক প্রতিনিয়ত নিজের বিশ্লেষণী ক্ষমতাকে শাণিত করছেন। একটি রহস্য তৈরি করা, একের পর এক সূত্র ছড়িয়ে দেওয়া, সেই সূত্র ধরে গল্পকে এগিয়ে নেওয়া, প্রতিটি ঘটনার বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা—অথচ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত খুনির পরিচয় আড়াল করে রাখা—সবই লেখকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিটি ধাপে তাঁকে নিতে হয় অসংখ্য হিসাবি সিদ্ধান্ত। কোথায় পাঠককে সম্ভাব্য সমাধানের কাছাকাছি নিয়ে যেতে হবে, কোথায় তাঁর অনুমান ভেঙে দিতে হবে, আর কোথায় গল্পের মোড় এমনভাবে ঘুরিয়ে দিতে হবে, যা তাঁর কল্পনারও বাইরে—থ্রিলারের প্রকৃত কারিগরি বোধ হয় সেখানেই।

সাদাত হোসাইনের রেজা সিরিজের নতুন থ্রিলার উপন্যাস নিষিদ্ধ নিশীথে পড়তে গিয়ে এই কারিগরিরই এক চমৎকার প্রয়োগ লক্ষ করেছি। প্রকাশের আগেই বইটি পড়ার সুযোগ হয়েছে আমার।

পুরোনো এক জমিদারবাড়ি। তার গায়ে লেগে আছে সময়ের ধুলো, অজানা ইতিহাস আর অস্বস্তিকর এক রহস্যের ছায়া। সেই বাড়িকে ঘিরে ঘটতে থাকে একের পর এক ঘটনা। প্রতিটি ঘটনা যেন আগের রহস্যের জট খুলে দেওয়ার বদলে আরও জটিল করে তোলে সবকিছু। যাকে সন্দেহ হয়, তার আচরণেই মেলে নতুন প্রশ্ন। যে সূত্রকে সত্য বলে মনে হয়, পরক্ষণেই তা উসকে দেয় অন্য সম্ভাবনা। পাঠক যখন একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাইছেন, ঠিক তখনই লেখক গল্পের গতিপথ ঘুরিয়ে দিচ্ছেন অন্যদিকে।

সবচেয়ে বড় কথা, গল্পের শেষ পর্যন্ত যাকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র বলে মনে হয়, যার উপস্থিতি ঘিরে পাঠক নানা হিসাব মেলাতে থাকেন, লেখক অকস্মাৎ তাকেই খুন করে বসেন! এমন আকস্মিকতায় শুধু চমক নেই, আছে পাঠকের অনুমানের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা। মুহূর্তেই বদলে যায় গল্পের সমীকরণ। যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলাম, তার বদলে সামনে এসে দাঁড়ায় আরও কয়েকটি প্রশ্ন। কে খুনি? কেন এই খুন? খুনের মোটিফ কী? যে সত্য এতক্ষণ চোখের সামনেই ছিল, তাকে চিনতে পারলাম না কেন?

এভাবেই রহস্যের পর রহস্য জমতে থাকে। উত্তেজনার পারদ ওঠানামা করে, সন্দেহের দিক বদলায়, আর পাঠক ক্রমেই জড়িয়ে পড়েন এক দুর্ভেদ্য গোলকধাঁধায়। কয়েকটি জায়গায় পড়তে গিয়ে সত্যিই শ্বাসরুদ্ধকর অনুভূতি হয়েছে; শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেছে। বইটি একবার হাতে নিলে পরের ঘটনা না জেনে থামতে ইচ্ছে করে না। আর থামলেও মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে গল্পের চরিত্র, ঘটনা আর অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো।

লেখার সময়ে সাদাতের সঙ্গে থ্রিলার রচনার নানা দিক নিয়ে কথা হয়েছে। একটি বিশ্বাসযোগ্য ও টানটান রহস্যের জাল বুনতে লেখককে যে সূক্ষ্ম পরিকল্পনা, নিরন্তর হিসাব-নিকাশ এবং নিজের নির্মিত ধারণাকেও বারবার ভেঙে নতুন করে বিন্যস্ত করার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, সে সম্পর্কে আমার কিছুটা ধারণা আছে। নিষিদ্ধ নিশীথে পড়তে গিয়ে সেই সৃজনশীল শ্রম ও নির্মাণকৌশলের পরিচয় নতুন করে পেয়েছি। সাদাত তাঁর মুন্সিয়ানা, সংযম ও গল্প বলার দক্ষতায় রহস্যের আবহকে শেষ পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ রেখে নির্মাণ করেছেন একটি শ্বাসরুদ্ধকর থ্রিলার।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সাদাত হোসাইনের রেজা সিরিজের সবচেয়ে আলোচিত বইগুলোর একটি হয়ে উঠবে নিষিদ্ধ নিশীথে। কারণ, এই উপন্যাস শুধু একটি খুনের রহস্য সমাধানের গল্প নয়; এটি পাঠকের বুদ্ধি, অনুমান ও ধৈর্যের সঙ্গে লেখকের এক নিরন্তর লুকোচুরি। এখানে সত্যের খুব কাছাকাছি গিয়েও তাকে চিনতে ভুল হতে পারে, আর নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়া ধারণাটিই মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে।

থ্রিলারের সার্থকতা এখানেই—লেখক পাঠককে শুধু গল্প শোনাবেন না, তাঁকে গল্পের ভেতরে টেনে নিয়ে যাবেন; এমন এক জায়গায় দাঁড় করাবেন, যেখান থেকে চোখ সরানো কঠিন, অথচ সামনে কী অপেক্ষা করছে, তা অনুমান করা আরও কঠিন।

নিষিদ্ধ নিশীথে পড়ে আমার সেই অভিজ্ঞতাই হয়েছে। এবার অপেক্ষা পাঠকের হাতে বইটি পৌঁছানোর। দেখা যাক, এই রহস্যের গোলকধাঁধায় ঢুকে কে কতটা পথ পেরোতে পারেন, আর শেষ পর্যন্ত কতজন খুনির পরিচয় আগেভাগে অনুমান করতে পারেন!

সাদাত, রেজা সিরিজের এই নতুন সংযোজনের জন্য তোমাকে অভিনন্দন ও ভালোবাসা।

মাজহারুল ইসলাম
লেখক,  সম্পাদক , এবং প্রকাশক

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.