জ্ঞানেশ কুমারকে সরালেও বিপদ, রাখলেও বিপদ—নিজেদের পাতা ফাঁদে মোদি সরকার

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিতর্কে রাজনৈতিক চাপে পড়েছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগ, বিরোধীদের পদত্যাগের দাবি এবং তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ—সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে সরালে বিরোধীদের অভিযোগের কাছে সরকারের নতি স্বীকারের বার্তা যেতে পারে। অন্যদিকে, তাঁকে বহাল রাখলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক আন্দোলন জোরালো হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে তাঁকে রাখা বা সরানো—দুই সিদ্ধান্তই সরকারের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিক্ষোভ ঠেকাতে রাজধানীতে কড়াকড়ি
১০ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সমাবেশের ডাক দেয় তরুণদের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ও বিরোধী দলগুলো। বিক্ষোভ মোকাবিলায় রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। বিভিন্ন সড়কে ব্যারিকেড বসানো, তল্লাশিচৌকি স্থাপন এবং চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের অভিযোগ ওঠে।

সমাবেশের আগে আন্দোলনের পরিচিত মুখ অভিজিৎ দিপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়। পরে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আরও অনেককে আটক করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভের সময় এক আন্দোলনকারীকে আটক করে নিয়ে যাচ্ছেন নিরাপত্তাকর্মীরা

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে তাঁদের প্রতিবাদের কণ্ঠ রোধের চেষ্টা চলছে। তাঁদের মতে, ভয়ভীতি দেখিয়ে নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি থামানো সম্ভব নয়।

ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে বিতর্ক
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর। নির্বাচন কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, মৃত, অন্যত্র চলে যাওয়া, একাধিক স্থানে নাম থাকা কিংবা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না—এমন ভোটারদের শনাক্ত করে তালিকা হালনাগাদ করাই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।

তবে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক যোগ্য ভোটারের নাম বাদ পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। পরিচয় ও ভোটার হওয়ার যোগ্যতার প্রমাণ দিতে জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে গিয়ে অনেকেই ভোটাধিকার হারাতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তাঁরা।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিতর্ক আরও গভীর হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটার তালিকা সংশোধন ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্য দুই কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে একাধিকবার উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। বিরোধীদের মতে, এসব আপত্তি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। এতে কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সংস্থাটির দাবি, যোগ্য ভোটারদের বাদ দেওয়া নয়, বরং তথ্য হালনাগাদ করাই তালিকা সংশোধনের লক্ষ্য।

জ্ঞানেশকে সরানো নিয়ে সরকারের দ্বিধা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর দাবি মেনে নিলে বিরোধীরা এটিকে নিজেদের অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরতে পারে। এতে মোদি সরকারের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আবার তাঁকে পদে বহাল রাখলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘায়িত হতে পারে। বিরোধীদের অভিযোগ, কমিশনের নেতৃত্বে পরিবর্তন না এনে সরকার প্রতিষ্ঠানটির প্রতি মানুষের আস্থার সংকট আরও বাড়াচ্ছে।

এ ছাড়া উত্তরসূরি নির্বাচনও সরকারের বিবেচনায় থাকতে পারে বলে বিশ্লেষকদের আলোচনায় উঠে এসেছে। জ্ঞানেশ কুমার সরে গেলে নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে হবেন এবং তাঁর নেতৃত্বে কমিশন কীভাবে কাজ করবে, তা নিয়েও সরকারের হিসাব-নিকাশ থাকতে পারে। তবে সরকারের সিদ্ধান্তের পেছনে এমন উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

বিরোধীদের আন্দোলনে নতুন মাত্রা
কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন জোরদার করেছে। তাদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনও এই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। আন্দোলনকারীরা নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, ভোটাধিকার সুরক্ষা এবং প্রতিবাদের অধিকার বজায় রাখার দাবি জানাচ্ছেন।

তবে সরকারপক্ষ বিরোধীদের অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে। বিজেপি নেতাদের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশন নিয়ম অনুযায়ী কাজ করছে। বিরোধীরা নিজেদের রাজনৈতিক ব্যর্থতার দায় নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে বলেও তাঁদের অভিযোগ।

মোদির সামনে কঠিন রাজনৈতিক সমীকরণ
জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিতর্ক এখন আর শুধু একজন সাংবিধানিক কর্মকর্তার পদে থাকা বা না-থাকার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা, বিরোধীদের রাজনৈতিক অধিকার এবং সরকারের প্রতি জনআস্থার বিষয়গুলো।

জ্ঞানেশ কুমারকে সরানো হলে বিরোধীরা নিজেদের দাবির সাফল্য হিসেবে বিষয়টি তুলে ধরতে পারে। আর তাঁকে বহাল রাখা হলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ও রাজনৈতিক আন্দোলন অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে এই বিতর্কের শেষ পরিণতি কী হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার কী পদক্ষেপ নেয় এবং নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে কতটা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে, তার ওপরই পরবর্তী পরিস্থিতি অনেকাংশে নির্ভর করবে।

তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা, রয়টার্স, ইনডিপেনডেন্ট, হিন্দুস্তান টাইমস ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.