পূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রীর সফর : সম্প্রীতির বার্তা, রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা ও বাংলাদেশের বহুত্ববাদী ভবিষ্যৎ

 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। শারদীয় দুর্গাপূজার মহানবমীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামরিক বিমানে এক দিনে রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম সফর, পূজামণ্ডপ পরিদর্শন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় নিছক একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়। এটি রাষ্ট্রের ধর্মীয় অন্তর্ভুক্তি, রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব এবং নাগরিক সমতার প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী পদক্ষেপ। এর মধ্য দিয়ে সরকারপ্রধান এমন একটি বার্তা দিয়েছেন, যার তাৎপর্য শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বাংলাদেশের প্রতিটি ধর্মের মানুষের জন্যই তা প্রাসঙ্গিক।

১৭ অক্টোবর রাতে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর রায় এম পির টেলিফোনে এই সফরের পরিকল্পনার কথা জানতে পেরেছিলাম। তখনই মনে হয়েছিল, উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি ও রাষ্ট্রীয় আচরণের আলোচনায় একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হবে। মঙ্গলবার সেই কর্মসূচি বাস্তবে রূপ নেয়। ঢাকা থেকে সামরিক বিমানে সৈয়দপুর পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী সড়কপথে রংপুরের পূজামণ্ডপে যান। এরপর রাজশাহী হয়ে চট্টগ্রামে পৌঁছে একই দিনে ঢাকায় ফেরার কর্মসূচি পালন করেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার বাইরে দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শনে সরকারপ্রধানের এই সফরকে একটি নজিরবিহীন উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

এই সফরের প্রথম তাৎপর্য হলো, রাষ্ট্রের উপস্থিতিকে রাজধানীর আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি থেকে বের করে আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে যখন জনপরিসরে আলোচনা হয়, তখন সরকারপ্রধানের সরাসরি উপস্থিতি একটি দৃশ্যমান আশ্বাস তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যেসব নাগরিক নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কখনো কখনো নিরাপত্তাহীনতা বা সামাজিক অনিশ্চয়তা অনুভব করেন, তাঁদের কাছে এই উপস্থিতির প্রতীকী মূল্য রয়েছে। তবে প্রতীকী আশ্বাসকে দীর্ঘস্থায়ী আস্থায় পরিণত করতে হলে রাষ্ট্রীয় নীতি ও প্রশাসনিক আচরণেও তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

রংপুরের তারাগঞ্জ ও পাগলাপীর এলাকায় পথসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে দেশ গঠনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। পাগলাপীরের বক্তব্যে তিনি বলেন, “এই দেশ আমাদের সবার।” মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান—সব ধর্মের মানুষকে নিয়ে কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি। রংপুরের রাধাগোবিন্দ ধর্মসভা মন্দিরে পূজারিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, বিভিন্ন ধর্মের মানুষের দীর্ঘদিনের সহাবস্থান ও সম্প্রীতি যেন ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকে। তিনি এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান, যেখানে মানুষ আগামী হাজার বছরও শান্তি ও সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করতে পারে।

এই বক্তব্যের তাত্ত্বিক গুরুত্ব রয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, নাগরিকত্বের ধারণা ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ করে। একজন নাগরিকের অধিকার তাঁর ধর্মবিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী যখন বাংলাদেশের মালিকানা সব ধর্মের মানুষের বলে ঘোষণা করেন, তখন তিনি মূলত নাগরিক জাতীয়তাবাদের ধারণাকেই সামনে আনেন। এই ধারণায় রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর একক সম্পত্তি নয়; বরং সব নাগরিকের সম্মিলিত প্রতিষ্ঠান।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও এই বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে বিভিন্ন ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী ও সামাজিক পরিচয়ের মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। সেই ঐতিহাসিক ঐক্যের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী যে সম্মিলিতভাবে দেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন, তা স্বাধীনতার অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনাকে সমকালীন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করে। কিন্তু ইতিহাসের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা কেবল বক্তব্যে নয়, নাগরিক অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হয়।

রাজশাহীতে ধর্মসভা বা রাধাগোবিন্দ মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধর্ম, বর্ণ, পেশা কিংবা সামাজিক পরিচয় নির্বিশেষে দেশের সব নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার ভোগের ক্ষেত্রেও প্রত্যেক নাগরিক সমান মর্যাদার অধিকারী—এমন বক্তব্য দেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, কোনো সম্প্রদায়কে পেছনে ফেলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। ওই অনুষ্ঠানে মন্দির কর্তৃপক্ষের হাতে ১০ লাখ টাকার একটি চেকও তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।

এই বক্তব্যের সঙ্গে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সমান নাগরিকত্বের অর্থ শুধু ধর্মীয় উৎসবে শুভেচ্ছা জানানো নয়; বরং নাগরিকের জীবন, সম্পদ, উপাসনালয়, মতপ্রকাশ, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ন্যায়বিচারের অধিকার সমানভাবে নিশ্চিত করা। কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ যদি অন্যায়ের শিকার হন, তবে অপরাধীর পরিচয় বিবেচনা না করে দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করাই হবে রাষ্ট্রের প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ দায়িত্ব। অর্থাৎ ধর্মীয় সম্প্রীতি শুধু সামাজিক সৌজন্যের বিষয় নয়, এটি সুশাসনেরও অন্যতম মানদণ্ড।

প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এবং সংসদ সদস্য ও হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের সহসভাপতি নিপুণ রায় চৌধুরীর উপস্থিতিও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের উপস্থিতি সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সনাতন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সংযোগের একটি দৃশ্যমান দিক তুলে ধরে। তবে এই প্রতিনিধিত্বের প্রকৃত সার্থকতা নির্ভর করবে সম্প্রদায়টির মানুষের দাবি, উদ্বেগ ও সমস্যাগুলো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কতটা গুরুত্ব পায়, তার ওপর।

এক দিনে তিন অঞ্চলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের কর্মসূচি রাজনৈতিক যোগাযোগের নতুন মাত্রাও তৈরি করেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একে প্রতীকী রাজনীতি ও জনসম্পৃক্ত নেতৃত্বের সমন্বয় হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। নেতা যখন কোনো জনগোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মুহূর্তে সরাসরি উপস্থিত হন, তখন তাঁর বক্তব্যের পাশাপাশি উপস্থিতিটিও রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। এটি আস্থা তৈরি করতে পারে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে অন্তর্ভুক্তির অনুভূতি বাড়াতে পারে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে সহনশীলতার ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। একই সঙ্গে এমন সফরকে কেবল রাজনৈতিক প্রচার হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে রূপ দেওয়াই হবে নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা।

চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জের জে এম সেন হল পূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রীর সফর এই কর্মসূচির শেষ পর্যায়। রংপুর থেকে রাজশাহী, এরপর চট্টগ্রাম—এই ভৌগোলিক বিস্তৃতি দেখিয়েছে যে ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তাটি শুধু একটি অঞ্চল বা একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই সফর মুসলমানদের প্রতিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে: অন্য ধর্মের মানুষের উৎসব, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করা তাদের নাগরিক দায়িত্বের বিরোধী নয়; বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের অপরিহার্য শর্ত।

তবে কোনো একটি সফর দিয়ে বাংলাদেশের ধর্মীয় সম্প্রীতির সব সংকটের সমাধান হবে, এমন দাবি বাস্তবসম্মত নয়। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা প্রতিরোধ, উপাসনালয়ের নিরাপত্তা, ধর্মীয় বিদ্বেষের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ, সংখ্যালঘুদের সম্পত্তির অধিকার রক্ষা এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলোতে ধারাবাহিক অগ্রগতি প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত ধর্মীয় পরিচয়কে ভোটের হিসাবের বাইরে রেখে নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে ঐকমত্য গড়ে তোলা।

তারেক রহমানের ২০ অক্টোবরের সফর তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা ও প্রতীকী অঙ্গীকার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এতে পেয়েছেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী নেতৃত্বের কাছ থেকে দৃশ্যমান সম্মান ও অন্তর্ভুক্তির বার্তা। অন্য ধর্মের নাগরিকেরাও পেয়েছেন এই আশ্বাস যে বাংলাদেশের পরিচয় কোনো একক ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই বার্তা কতটা বাস্তব নীতিতে রূপ নেয়। রাষ্ট্র যদি কথার সঙ্গে কাজের মিল ঘটাতে পারে, তাহলে এই সফর নিছক একটি দিনের রাজনৈতিক ঘটনা হয়ে থাকবে না; বরং বহুত্ববাদী, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ নির্মাণের পথে একটি স্মরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম
ফ্রাঙ্কফুর্ট, জার্মানি

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.