শহীদ প্রজন্মের এরকম একটা জলন্ত ও বিদ্রোহী উদাহারন আমি আজ অবধি দেখি নি। ও যখন সাত মাসের মায়ের পেটে, একাত্তরের সেই্ অগ্নিঝরা দিনে, নৃসংস আলবদরদের হাতে ওর শিক্ষক পিতা শহীদ হন। খুলনার এক মফ:স্বল শহরে উনি ছিলেন ই্ংরেজীর অধ্যাপক। মাকেও দুর্বৃত্তরা রেহাই দেয় নি। ডান পায়ে একজন বেয়নেটের আঘাত করে। দুরাত্মাটি নাকি ওর পিতার একজন ছাত্র ছিল, বাবাকে সরাসরি ওরা বুকে গুলি করে এবং উনি সাথে সাথে মারা যান। মাকে পাড়া প্রতিবেশীরা হাসপাতালে নিয়ে প্রান রক্ষা করেন। হয়ত বাবলুকে জন্ম দেবার জন্যই উনি বেঁচে যান। সুস্থ হয়ে নিয়ে অনেক কষ্টে হাটতেন। ডান পা প্রায় অবশ হয়ে গিয়েছিল।
বোনের বিয়ের সময়, সব ভ্রাতাই শোকে দু:খে কাতর হন। সে বোন যখন ভাগ্যের দুর্বিপাকে বিধবা হয়ে
সন্তান নিয়ে ভাইয়ের শরণাপন্ন হন, ভ্রাতার তখন আর এক রূপ ! স্বামীর সদ্য মৃত্যতে কাতর বোনের অবনর্নীয় শোকে সংগ দেয়া ত দুরের কথা, বাড়ীর একজন ঝিকে বিদায় দিয়ে, অসহায় ভগ্নিকে তার স্থলাভিষিক্ত করতে ভাতৃবধূর কোন দ্বিধা হয় না। এতে তার স্বামীর পূর্ন সমর্থনও থাকে। বিনা পয়সায় ত ভাত খাওয়ানো যায় না !
ব্যতিক্রম যে নেই, তা নয়। কিন্ত বাবলুর মার নিতান্তই দুর্ভাগ্য, তার নিজের বিয়ের আগে সে নাকি তার ভাইয়ের এই বধূটির সাথে বিবাহের বিরোধিতা করেছিল। ভাতৃবধুর আজ বদলা নেবার দিন। মনে মনে কষ্ট পেলেও বাংগালী স্বামীরা এ সব পারিবারিক ব্যাপারে মুখ বুজে নির্বিবাদে স্ত্রীর পক্ষ নিয়ে পতœী প্রেমের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
মাস দুই্ ভাতৃবধু বাড়ীর ঝিকে বিদায় দিতে পারলেন না। বাবলুর জন্মাবধি অপেক্ষা করতে হলো। তারপÍই্, একদা যে কন্যাটি বাবামার চোখের মণি ছিল, ভাইয়ের ছিল আদরের বোন, তাকে নিতে হল, ভাইয়ের হেঁসেলের পূর্ন দায়ীত্ব। এসব কথা আমি বাবলুর কাছে শুনেছি। অদ্ভুদ সহ্য শক্তি ছিল ওর। এসব বলার সময় সে মোটেই কাতর হত না। বরং এক দুস:হ ক্রোধ আর ঘৃনায় তার মুখচোখ লাল হয়ে যেত, দুই্ চোখে ফুটে উঠত সমগ্র পৃথিবীর প্রতি প্রতিশোধের হুমকি। তার কাহিনী শুনে আমার ভীষন খারাপ লাগত, বহু কষ্টে চোখের জল সামলাতাম, বলতাম, থামো বাবলু, এসব থাক। কিন্ত ও থামত না, যেন ও নয়, ওর ভেতর থেকে অন্য কেউ বলছে।
সেই্ শৈশব থেকেই্ সে শুধু অনাদর আর অবহেলা পেয়েছে। ও বলত, মাকে কোনদিন সে ঘুমুতে দেখেনি। সকালে উঠে দেখত, মা রান্নাঘরে। রাতে শুতে যাওয়ার সময়ও দেখত মা পরদিনের নাস্তা আর সারাদিনের রান্নার প্রস্ততি নিচ্ছেন। মা লাঠি নিয়ে সারাদিন কত কষ্টে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাটতেন আর মামী, প্রতিবেশীনিদের সাথে মোড়ায় বসে সারাটা সময় গল্প গুজব করতেন এবং তাদের চা পান ই্ত্যাদীও মাকেই্ পরিবেশন করতে হত। একটু দেরী হলে, মামী গালাগালী করতেন এবং পাড়া পড়শীদের বড় গলা করে শুনাতেন, এই আক্রার বাজারে দুটো পেটের ফ্রি খাওয়া আর কাপড় চোপড়ের ব্যবস্থা কতগুলো টাকার ব্যাপার। মার থালায় কোনদিন বাবলু ২/৩ মুঠোর বেশী ভাত দেখেনি, তাও তিনি প্রায় সবই্ বাবলুকে খাওয়াতেন। মামীর বুড়ো মা বলতেন, তোর মার কোন জ্বীন পরী আছে, নাহলে একদম না খেয়ে ও বেঁচে আছে কি করে ?
বাবলুকেও খেতে হত যা মামাত ভাইবোনেরা তাদের খাওয়ার পর উচ্ছিষ্ট থালায় রেখে যেত। ওদেরই পুরোনো শার্ট প্যান্ট ও পড়তে পেত। নুতন কাপড় সে প্রথম জার্মান এসে পড়েছে। ওরা স্কুলে যেত। মা ভাইকে বাবলুকে স্কুলে পাঠানোর কথা বললে, উনি বলতেন, ও এখন ছোট, আগে বড় হোক, তারপর দেখা যাবে। অথচ ছোট মামাত ভাই্টা যে তার চেয়েও তিন বছরের ছোট, যে এক বছর যাবত স্কুলে যাচ্ছে, তার কথা মামা বেমালুম চেপে যেতেন। অনেক রাতে রান্নাঘরের কাজ সেরে, মা ঘুমন্ত বাবলুকে জোর করে উঠাতেন এবং পিদিমের আলোয় ওকে বর্নশিক্ষা দিতেন। মা কোথা থেকে শে¬ট আর একটা ছেঁড়া ”এসো পড়া শিখি” বই্ যোগাড় করেছিলেন, তা বাবলু কোনদিনই্ জানতে পারেনি। মার কাছেই্ ও বাবার কথা শুনেছে। মা বলতেন, কত বড় শিক্ষিত লোকের সন্তান তুই্, তোর বাপের কাছে কত শত ছাত্র ছাত্রীরা লেখাপড়া শিখেছে, আর তোর অক্ষরজ্ঞান হবে না, তা হয়না বাবা।
মার কাছ থেকেই্ ও লিখতে পড়তে শিখেছে, কোনদিন স্কুলে যায় নি। মামার কাছে সে কোনদিনই্ স্কুলে যাবার মত বড় হয়নি ! ৪/৫ বছর বয়স থেকেই্ সে মামাবাড়ীর আবদুল। বাজার করা, কাঠ চেরা, মামাত ভাইবোনদের সর্বক্ষন ফাই্ফরমাস খাটা এবং অষ্টপ্রহর তাদের গালিগালাজ খাওয়া। বাবলু বলত, সে সব সহ্য করতে পারত, কিন্ত তার অসুস্থ মা যখন, শরীরের সমস্ত শক্তি একত্র করে দিবারাত্রি রান্নাঘরের কাজ করতে করতে ক্রম:শ নি:শেষ হয়ে তার চোখের সামনে ধীরে ধীরে মৃত্যর দিকে এগিয়ে চললেন, তখন জগত সংসারের প্রতি তার তীব্র ঘৃনার জন্ম হল। মা প্রায়ই্ বলতেন, তুই্ কোথাও চলে যা বাপধন। এখানে অল্পাহারে, অনাহারে আর অমানুষিক পরিশ্রম কÍে করে তুই্ মরে যাবি। কথাটা যে তার জন্য অধিকতর প্রযোয্য, সেটা ভাবতেন না। ঐতিহ্যময়ী, সর্বংসহা বাংলা মায়ের সার্থক প্রতিভু হিসেবে শুধু সন্তানের কথাই্ ভাবতেন। মা একা হয়ে যাবেন, এ কথা ভেবেই্ বাবলু, কোথাও চলে যায় নি, যদিও ভেগে যাবার ইচ্ছেটা দিন দিনই্ বাড়ছিল। ১২ বছর বয়স যখন, মা বিনা চিকিৎসায় অসুখে ভুগে ভুগে মারা গেলেন, সেই্ রাত্রেই্, মায়ের শেষকৃত্যের পরোয়া না করে, মামার বাক্স ভেংগে পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে ঢাকা চলে এল।
মফ:স্বলবাসী আর সবার মত তারও ধারনা ছিল, রাজধানী ঢাকায় এলেই্ সব মুস্কিল আসান ! একটা ঠিকানা তার কাছে ছিল। মামার বাসায় আমানভাই্ জায়গীর থেকে ওর বাবার কলেজ থেকে বি এ পাশ করে ৩/৪ বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য ঢাকায় আসেন। স্কুলের ছাত্র হিসেবে উনি ওর বাবাকে চিনতেন। ওর মাকে খুব শ্রদ্ধা ভক্তি করতেন। মাও তাকে সুযোগ পেলেই ভালোমন্দ এটা সেটা খাওয়াতেন। বাবলু আর তার মার প্রতি সবার অবহেলা ও অনাদÍ দেখে তার খুব দু:খ হত। কিন্ত তিনি নিজেই্ ছিলেন পরাশ্রীত, নিজে থেকে কিছুই্ করতে পারতেন না। বাবলুকে মাঝে মাঝে পড়াতেন বা ”দিন কখনও সমান থাকে না” ইত্যাদী বলে সান্তনা দিতেন। ঢাকা যাওয়ার সময় ওর মাকে ঠিকানাটি দিয়ে যান। যখন বেচেছিলেন, মা প্রায়ই্ বলতেন, তুই্ ঢাকায় আমানের কাছে চলে যা, ছেলেটা ভালো, তোর বাবাকে খুব ভক্তি শ্রদ্ধা করত, ও তোকে ফেলবে না। মার অসহায়তার কথা ভেবেই্ ও, ইচ্ছে হলেও ঢাকার কথা তখন ভাবেনি।
্আজ সে ঢাকায় ঠিকই্ এলো, মা শুধু জানতে পারলেন না। ভালোই্ হলো, সবসময় বাবার কথা ভাবতেন, বলতেন, এখন ওর কাছেই্ চলে গেলেন। সেখানে নিশ্চয়ই্না খেয়ে, নিরাদরে দিবারাত্রি রান্নাঘরে কাজ করতে হবে না।
আমানভাইকে দেখে চিনতে পারে না বাবলু। ই্য়া দশাশই্ চেহারা, মোটা পুরুষ্টু গোঁফ। পুরোনো ঢাকায় এক গ্যাংগ লীডার হয়ে গেছেন। কিছুদিন নাকি কোন এক সর্বহারা পার্টিতে বামপন্থি রাজনীতিও করেছেন। এখন রাহাজানি, ব্যাংক ডাকাতি, ছিনতাই্, ধনীদের ছেলেমেয়েদের জিম্মি করে মোটা টাকা আদায় করে ব্যক্তিগত সসস্ত্র সংগ্রামটি চালিয়ে যাচ্ছেন।
এর পরের ঘটনা সংক্ষিপ্ত ও গতানুগতিক। প্রথম ২/৩ বছর ও আমানভায়ের বাসায় বেশ আরামেই্ থাকল। কিন্ত আমানের শত চেষ্টাতেও ও স্কুলে গেল না লেখাপড়া করতে। একবার নুতন করে স্কুলের কথা উঠতেই্ ও বলল, আমানভাই্ আপনিও ত বি এ পাশ করে ঢাকায় এসেছিলেন, পড়াশুনা করতে, কই্ গেল আপনার উচ্চশিক্ষা? এরপর আর কোনদিন ওর লেখাপড়ার কথা উঠেনি।
পনর বছর বয়েসে প্রথম সসস্ত্র সংস্খ্রাম। একটা বড় দোকানে স্টেনগান নিয়ে সংগীসাথীদের সাথে ঢুকে সন্ত্রাসবাদী জীবনের হাতেখড়ি হল। পরের বছর পুলিশের গুলি লাগল ডান হাটুতে। ছয়মাস ঢাকার অদুরে এক গন্ডগ্রামে গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হল। তার আগে আমানভাই্ মোটা টাকার বিনিময়ে একটা প্রাইভেট ক্লিনিক থেকে গুলিটা বের করে নিয়েছিলেন। মাঝে মাঝেই্ আসতেন গ্রামে ওকে দেখতে। একবার একটা ক্যাসেট রেকর্ডার নিয়ে এলেন, সাথে ৪/৫টি রবীন্দ্রসংগীতের ক্যাসেট। বললেন, তুই্ জানিস নিশ্চয়ই্, স্যার (ওর শহীদ পিতা), খুব রবীন্দ্র ভক্ত ছিলেন, নিজেও খুব ভালো রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন। মৌলভীরা তোর বাবাকে বলত হাফ হিন্দু, এ্ জন্যই্ আল বদররা স্যারকে হত্যা করল। দু:খের কথা হলো, হত্যাকারীদের মধ্যে ওর একজন ছাত্রও ছিল। তোর মাকে ত ঐ শালাই্ বেয়নেট দিয়ে হিট করেছিল। হঠাৎ মা আর শালা শব্দটি একসাথে শুনে ওর গাটা ঘিন ঘিন করে উঠল।
বাবলু কোনদিন মার কাছে এসব কথা শুনেনি। মা কোনদিন তাকে বলেননি তার বাবা শুধু শিক্ষকই ছিলেন না, গানও গাইতেন। আমানভাই্ আরও বললেন, আমার মনে হল, তুই্ রবীন্দ্রভক্তের ছেলে, ওর গান নিশ্চয়ই্ ভালো লাগবে। ৩/৪টা গান শোনার পর, রবীন্দ্রসংগীতের উপর একটা বিরাট অনীহা এসে ওকে গ্রাস করল। এই গান শোনার ও গাওয়ার জন্য, ওর বাবাকে খুন করা হয়েছে। হত্যাকারীকে যে গান উস্কে দেয়, জন্মের আগেই যাকে পিতৃহীন করে, সে গান আর সে কোনদিন শুনবে না।
বাংলাদেশে তার শেষ বছরটি শুধু পালিয়ে পালিয়ে কেটেছে। ৪/৫টি কেসে তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট বেড়িয়েছে, পুলিশ খুঁজছে সব জায়গায়। বিরুদ্ধ পক্ষও বসে নেই্, একবার ত মাত্র ২/৩ মিনিটের জন্য প্রানে বেঁচে গেল।
ঢাকায় এসে মামার পাঁচ হাজার টাকা ও আমানভাইকে রাখতে দিয়েছিল। ৩/৪ বছরের সসস্ত্র সংগ্রামের ফসলও কম নয়। আমানভাইয়ের মারফত তথাকথিত আদমব্যাপারীদের সাহায্যে কয়েক লাখ টাকার বিনিময়ে একদিন ৮৯ সালের অগাষ্টে পুর্ব জার্মান হয়ে একেবারে আমাদের কাছাকাছি স্টুটগাট শহরে এসে পৌছল। বেশ কিছু টাকা আমানভাইয়ের কাছে রয়ে গিয়েছিল। উনাকে বলে এসেছিল, মার নামে গরীবদের মধ্যে সব বিলিয়ে দিতে। ওর ভাগ্য ভাল, ও জার্মান এসে পৌছবার দু মাস পরেই্, নভেম্বরে বার্লিন ওয়াল ভেংগে গেল। এরপর পুর্ব জার্মান হয়ে আসা একেবারেই্ বন্ধ হয়ে গেল। পুর্ব ও পশ্চিমের সীমানা উঠে গিয়ে আবার নুতন করে জার্মান ঐক্যবদ্ধ হল।
জার্মানীতে ও বছর দেড়েক ছিল। আমার সাথে প্রথম দেখা হল, স্টুটগাটের এক পারিবািরক সন্ধায়। পরিচিত এক স্বজন বাংগালী তার মেয়ের জন্মদিনে আমন্ত্রন করেছিলেন। সেখানেই্ প্রথম দেখি বাবলুকে। ঐ দিনই্্ ওর রাগী আর অসন্ত—ষ্ট মনের পরিচয় পেলাম। দেশে মদ্যপানের অভ্যাস খুব কম বাংগালীরই্ থাকে। কিন্ত— এখানে কোনরকম নিষেধাজ্ঞা না থাকায় এবং প্রতিটি স্টোরেই্ ঢালাও বোতলের সমাহাÍে অনেক বাংগালীই্ এলকোহলের প্রতি জন্মগত ও দেশীয় বিতৃষ্ণাটি হারিয়ে ফেলেন। মেয়ের ৪র্থ জন্মদিবস হেতু, পিতা কোন মদ্যপানের ব্যবস্থা রাখেননি। উত্তেজিত কন্ঠে বাবলু বলছিল, বাচ্চা মেয়ের জন্মদিন ত বয়স্কদের দাওয়াত করেছেন কেন ? আর যদি করেই্ থাকেন, অবশ্যই্ মালপানির ব্যবস্থা করুন। কথাটা ত খুবই যুক্তিসংগত ! আমি উপলদ্ধি করলাম, এ ছেলেটি প্রতিবাদ পছন্দ করে না, এ জন্মগতভাবে একতরফা যুদ্ধ করে, ন্যায়সংগত হারও স্বীকার করে না। জার্মানে ততদিনে আমার একটা মুরুব্বীভাব (১২/১৩ বছর যাবত আছি, বয়সও কম নয়) এসে গেছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে, উপস্থিত সবাই্ আশা করেন, আপোষমুলক একটা বানী আমিই্ দেব। আমি নিমন্ত্রনকর্তাকে বললাম, উনি ত ঠিকই্ বলছেন, বয়স্কদের দাওয়াত করেছেন, তাদের ই্চ্ছাপুরন ত আপনার দায়ীত্ব। বাবলুর দিকে তাকিয়ে বললাম, পিতৃøেহে অন্ধ হয়ে উনি একটা ভুল করে ফেলেছেন, এবারের মত মাফ করে দিন। ভবিষ্যতে উনি অবশ্যই্ আপনাকে নিরাশ করবেননা। সবাই্ হেসে উঠলেন, বাবলুও বাক্যবানে আহত গৃহকর্তার হাত মর্দন করে মৃদু স্বরে মাফ চাই্ল। আসরের গুমোট ভাবটা কেটে গেল।
ঐ আসরেই্ বাবলু আমাকে বিনীত ভাবে বলল, ওকে তুমি করে বলতে। তারপর থেকে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই্ একবার দেখা করতে আসত আমাদের শহরে। মাঝে মাঝে রাত্রিবাসও করত।
ওর সাথে আমার কোন মিলই্ ছিল না। ও ছিল সম্পুর্ন অরাজনৈতিক, কোন বই্ পুস্তক পড়ত না, পপ ছাড়া কোন গানই্ শুনত না। এমনকি হিন্দি ফিল্মও দেখতনা। কোন কাজেই্ ২/৩ সপ্তাহের বেশী টিকত না। শুনেছি, কোন কোন সময় নাকি ৫/৭ দিন একটানা শুধু মদ্যপান করত, পপ গান শুনত, কোন কিছু খেত না।
আমাদের এখানে এসে আবার মদ বা বীয়ার কিছুই্ খেত না। আমি একদিন বললাম, ইচ্ছে হলে, মদ এখানেও খেতে পার। আমিও তখন একটু আধটু বীয়ার খেতাম। ও বলল, না মামা (আমি তখন জার্মানে বাংগালী সমাজে অবিসম্বাদিত মামা হয়ে গেছি), আপনার সাথে ঝগড়া করে যে আনন্দ পাই্, তা মদের চাই্তেও অনেক কড়া। অর্থাৎ আমাদের সব কথাবার্তাই্ প্রায়শ:ই্্ ঝগড়ায় পরিসমাপ্তি হত। দু একটা নমুনা দিচ্ছি।
একদিন ও আমাকে সরাসরি ভীতু ও সুযোগসন্ধানী বলল। মামা, আপনি শুনেছি দেশে অধ্যাপক ছিলেন, তা এখানে কি করছেন ? দৈনিক ৩/৪টে হিন্দি ফিল্ম দেখেন, বীয়ার খান, কাজ করেন না, (তখন আমার কাজের অনুমতি নেই্), মাসে মাসে জার্মান সরকারের সোসাল সাহায্য নিয়ে, ভিক্ষুকের জীবন যাপন করছেন কেন ? কথাটা সত্যি।
আরও বলল, দেশে আপনার সমস্যা আছে ত দেশে গিয়ে তার মোকাবেলা করুন। জেল খাটতে হলে খাটুন। আপনারাই্ত বলেন, বিদেশের কুকুর পুজি, দেশের ঠাকুর ফেলিয়া” ! কথাটা ১০০ ভাগ ঠিক না হলেও, কিছুটা ত ঠিক!
শেষে বলল, আ্পনাদের মত প্রতিভাবান লোকেরা যদি সবাই বাইরে চলে আসে, তাহলে দেশের হবেটা কি?
বলার অনেক কিছুই্ ছিল, শুনে গেলাম শুধু। জানি ও যুক্তি মানে না, তর্কে কোনদিনও হার স্বীকার করে না। ততদিনে দেশের সব কথাই্ ওর কাছে শুনেছি। শুধু মাতৃপিতৃহীনই নয়, সারা জীবন শুধুই্ অবহেলা আর উপেক্ষা পেয়েছে। আমাকে যদি দু একটা কটু কথা বলে ওর বিতৃষ্ণ হৃদয় একটু আরাম পায়, পাক না !
আমি আজন্ম রবীন্দ্রসংগীতের ভক্ত। বাবলু রবীন্দ্রনাথের নামই্ শুনতে পারত না। আমার রবীন্দ্রসংগীত শোনার সময় ও এলে, আমি অনিচ্ছাসত্বেও তা বন্ধ করে দিতাম। মাঝে মাঝে খুবই্ বাজে কথা বলত কবিগুরুকে নিয়ে। ওর অভক্তির ব্যাপারটা জানতাম বলেই্ সহ্য করে যেতাম।
একবার বলল, এই্ (অশ্রাব্য কথা) বুড়োটাই আমাদের মেরুদন্ড ভেংগে দিয়ে গেছে। খালি ইনিয়ে বিনিয়ে প্রেম, মিষ্টি মিষ্টি কথা, ওগো, হ্যাগো, আমি, তুমি, আমি তোমার, তুমি আমার, আসো গো, আমাকে আসতে দাও, পাশে বসতে দাও, আর কত বলব ! কাজের কোন কথা নাই্, ঝড়, বৃষ্টি, আকাশ, বাতাস, কেবলি পুজা আর প্রকৃতি, খালি ভ্যান ভ্যান ! আমি যদি ঐ সময় জন্মাতাম, তাহলে একটা স্টেন গান নিয়ে (আবার ছাপার অযোগ্য অশালীন কথা) এসব গান আর কবিতা লেখার বারোটা বাজিয়ে দিতাম। আমি শিউরে উঠলাম। আমাদের সৌভাগ্য, কবিগুরু ১৯৪১ এ স্বর্গবাসী হয়েছেন আর এই্ স্টেনগানধারী ৭২ এ জন্মেছে! বিধাতা যদি ৪০/৫০ টা বছর এদিক ওদিক করে দিতেন, তাহলে বাংগালীর রবীন্দ্রসংগীত শোনা লাটে উঠত!
একবার আমাকে আমার এক ভক্ত ভাগ্নে জানাল (তার বড়ই্ দু:খ হত যে আমি বাবলুর মত একজন মুর্খ, আনপড় জাহেলকে অহেতুক ভাবে এতটা পাত্তা দেই্), ও নাকি বাবলুকে জিজ্ঞাসা করেছে, তুমি মামার কোন কথাই মানো না, শুধু ঝগড়া করতে উনার কাছে যাও কেন ?
অনেক্ষন চুপ করে থেকে ও নাকি বলেছে: মামার কাছে গেলে আমি আমার বাবার ছোঁয়া পাই। বাবাকে ত দেখিনি, মায়ের পেটে আমি যখন সাত মাসের, বাবাকে (অশ্রাব্য কথা) মেরে ফেলেছে। ক্ষাবাও মামার মত ই্ংরেজীর অধ্যাপক ছিলেন। আজ বেচে থাকলে হয়ত দেখতে এরকমই্ হতেন। এভাবেই্ কথাবার্তা বলতেন।
আমারও এ ধরনের একটা বোধ হত। যে বাবা তার জন্ম হবার আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, যার দরুন জন্মাবধি তাকে এবং তার অসহায় মাকে অবর্ননীয় অবহেলা ও উপেক্ষার শিকার হতে হয়েছে, সে পিতার প্রতি তার আছে এক তীব্র ক্রোধ ও অভিমান। আমার সংগে প্রতি কথায় ঝগড়া করে এবং আমার প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করে সে তার শহীদ পিতাকেই তার মত করে স্মরন করে।
১৯৯০ সালের নভেম্বরের এক শীত বিকেলে, প্রচন্ড কুয়াসায় যখন চারিদিক অন্ধকার, কে যেন এসে বলল, বাবলু ৪/৫ দিন আগে বাহামা হয়ে আমেরিকা চলে গেছে। মনের কোথায় যেন একটু ব্যাথা পেলাম, একটিবার বলে গেল না ? তারপরই্ ভাবলাম, ঠিকই্ করেছে ও। আজন্ম যে সবার কাছে উপেক্ষার বস্তু, তার সম্পুর্ন অধিকার আছে অন্যকে উপেক্ষা করার। ও যেখানেই্ থাকুক, ভালো থাকুক।
আবদুল্লাহ আল-হারুন ,
জার্মান প্রবাসী কথাসাহিত্যিক

