স্যাক্সনি-আনহাল্টে এএফডির ঝড় : জার্মান রাজনীতিতে ভাঙনের সংকেত

 

জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ স্যাক্সনি-আনহাল্টের আইনসভা নির্বাচনের ফল শুধু একটি অঙ্গরাজ্যের ক্ষমতার পালাবদলের সম্ভাবনা তৈরি করেনি; এটি জার্মানির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং ইউরোপের গণতান্ত্রিক রাজনীতির গতিপথ নিয়েও গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। অভিবাসনবিরোধী ও কট্টর ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি—এএফডি—প্রায় ৪৩.৮ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে। দলটি আগের নির্বাচনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ভোট পেয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির কোনো অঙ্গরাজ্যে চরম ডানপন্থী দলের সরকার গঠনের সম্ভাবনা এতটা বাস্তব হয়ে ওঠেনি।

তবে শুরুতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। ৪৩.৮ শতাংশ ভোট মানেই এএফডি এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে—এমন নয়। জার্মানির অঙ্গরাজ্যগুলোর সংসদীয় ব্যবস্থায় সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য অন্য দলের সমর্থন বা জোট দরকার। এএফডির সঙ্গে জোটে যেতে মূলধারার দলগুলো এখনো ‘ফায়ারওয়াল’ বা রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখার কথা বলছে। ফলে নির্বাচনী জয় এবং সরকার দখল—এই দুই বিষয়কে এক করে দেখা ঠিক হবে না।

কিন্তু রাজনৈতিক বার্তাটি তাতে বিন্দুমাত্র ছোট হয় না। বরং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—জার্মানির ভোটারদের একটি বড় অংশ কেন এমন একটি দলকে সমর্থন করছে, যাকে দেশটির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো চরম ডানপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করেছে? এর উত্তর শুধু অভিবাসনবিরোধী মনোভাবের মধ্যে খুঁজলে ভুল হবে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানির উচ্চ মূল্য, পেনশন নিয়ে উদ্বেগ, কর্মসংস্থান ও শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা এবং বার্লিনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর আস্থাহীনতা—সবকিছু মিলে একটি বড় অসন্তোষের জমি তৈরি হয়েছে। স্যাক্সনি-আনহাল্টে ৮৭ শতাংশ ভোটার কেন্দ্রীয় সরকারের নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তুষ্ট বলে জরিপে উঠে এসেছে।

অর্থাৎ এএফডির ভোটকে শুধু ‘বিদেশিবিরোধী ভোট’ হিসেবে ব্যাখ্যা করাও যথেষ্ট নয়। বরং এটি প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ভোটেরও বহিঃপ্রকাশ। এএফডি সেই অসন্তোষকে অভিবাসন, জাতীয় পরিচয়, নিরাপত্তা, জার্মান সংস্কৃতি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূমিকার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই কৌশলটি শুধু পূর্ব জার্মানিতেই নয়, দেশের অন্য অংশেও প্রভাব ফেলছে।

এই নির্বাচনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্ৎসের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর। স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফল সরাসরি বার্লিনের সরকার পরিবর্তন করে না, জাতীয় সংসদের আসনও বদলায় না। কিন্তু এটি জাতীয় রাজনীতির ক্ষমতার ভারসাম্যকে মানসিক ও রাজনৈতিকভাবে নাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে CDU/CSU যদি এএফডির উত্থান ঠেকাতে অভিবাসন ও নিরাপত্তা প্রশ্নে আরও কঠোর অবস্থান নেয়, তাহলে জার্মানির মূলধারার রাজনীতির কেন্দ্র আরও ডানদিকে সরে যেতে পারে।

এখানেই রয়েছে এএফডির সবচেয়ে বড় সাফল্য। কোনো সরকারে না থেকেও দলটি মূলধারার দলগুলোর রাজনৈতিক এজেন্ডাকে প্রভাবিত করতে শুরু করেছে। গত কয়েক বছর ধরে জার্মানিতে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, সীমান্ত নজরদারি, আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার, নাগরিকত্ব এবং নির্বাসন—এসব প্রশ্নে নীতির কঠোরতা বেড়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারও ইতিমধ্যে অভিবাসন ও নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ কঠোর করেছে। ফলে এএফডি সরকারে না থেকেও রাজনৈতিক বিতর্কের সীমারেখা পরিবর্তন করছে।

জার্মানিতে অবস্থানরত বিদেশিদের জন্য এ ফলের অর্থ কী?

এখানে আতঙ্ক ছড়ানো যেমন ঠিক হবে না, তেমনি বিপদের সম্ভাবনাকে হালকাভাবে দেখাও ভুল। প্রথমত, স্যাক্সনি-আনহাল্টের একটি অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন জার্মানিতে বসবাসরত সব বিদেশির আইনি অবস্থান রাতারাতি বদলে দিতে পারে না। অভিবাসন, আশ্রয়, নাগরিকত্ব ও সীমান্তনীতি—এসবের বড় অংশ ফেডারেল সরকারের এখতিয়ারভুক্ত। তাই নির্বাচনের পরদিন কোনো বৈধভাবে বসবাসরত বিদেশি নাগরিকের ভিসা, রেসিডেন্স পারমিট বা নাগরিকত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক পরিবেশ বদলানোর ঝুঁকি অবশ্যই আছে। এএফডির ঘোষিত কর্মসূচিতে দ্রুত নির্বাসন, অভিবাসন সীমিত করা, নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে আসা শরণার্থীদের মর্যাদা পুনর্বিবেচনা, বিদেশি শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং জার্মান সমাজে জাতীয়-সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর বেশি জোর দেওয়ার মতো নীতি রয়েছে।

এর ফলে প্রথম চাপ পড়তে পারে আশ্রয়প্রার্থী, সাময়িক সুরক্ষা পাওয়া মানুষ, নতুন অভিবাসী এবং নাগরিকত্বের অপেক্ষায় থাকা বিদেশিদের ওপর। তবে ইতোমধ্যে বৈধভাবে বসবাসকারী ইইউ নাগরিক, স্থায়ী রেসিডেন্সধারী বা দীর্ঘদিনের বৈধ অভিবাসীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আলাদা; তাদের অধিকার জার্মান ও ইউরোপীয় আইনের বিভিন্ন স্তরে সুরক্ষিত। রাষ্ট্রীয় নীতির পরিবর্তন হলেও তা আদালত, সংবিধান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইনি কাঠামোর সীমার মধ্যে থাকতে হবে।

বিদেশিদের জন্য আরেকটি সম্ভাব্য সমস্যা আইনগতের চেয়ে সামাজিক। এএফডির শক্তিশালী নির্বাচনী ফল অভিবাসনবিরোধী বক্তব্যকে আরও স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে। রাজনৈতিক ভাষায় বিদেশি, মুসলিম, শরণার্থী বা অভিবাসীকে ‘সমস্যা’ হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা বাড়লে সমাজে বৈষম্য, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও রাজনৈতিক মেরুকরণও বাড়তে পারে। জার্মানির শরণার্থী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

তবে জার্মান রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি এখানে রয়েছে। কোনো দল নির্বাচনে বিপুল ভোট পেলেই সংবিধান, আদালত, মানবাধিকার আইন কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিধান অকার্যকর হয়ে যায় না। জার্মানির ফেডারেল কাঠামো এবং সাংবিধানিক আদালত রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। ফলে এএফডি কোনো অঙ্গরাজ্যে সরকার গঠন করলেও তার ক্ষমতা সীমাহীন হবে না।

জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফল আরও গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী নিয়মিত ফেডারেল নির্বাচন ২০২৯ সালে হওয়ার কথা। সেখানে আজকের ৪৩.৮ শতাংশ ভোটকে সরাসরি জাতীয় ভোটে রূপান্তর করা যাবে না। পূর্ব জার্মানির সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা পশ্চিম জার্মানির তুলনায় ভিন্ন এবং রাজ্যভেদে রাজনৈতিক আচরণেও বড় পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু এই ফল একটি শক্তিশালী ‘ট্রেন্ড সিগন্যাল’—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এএফডি এখন আর কেবল প্রতিবাদী বা প্রান্তিক দল নয়; জার্মান রাজনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি।

এটি CDU-এর জন্য বিশেষ সংকেত। মের্ৎসের দল যদি এএফডির ভোটারদের ফেরাতে গিয়ে এএফডির ভাষা ও নীতিকে অতিরিক্তভাবে গ্রহণ করে, তাহলে এএফডি হয়তো আরও শক্তিশালী হবে—কারণ ভোটার তখন মূল দলটির পরিবর্তে ‘আসল’ কট্টর বিকল্পটিকেই বেছে নিতে পারেন। আবার CDU যদি এএফডির সঙ্গে কোনো ধরনের সহযোগিতার দরজা খুলে দেয়, তাহলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জার্মান রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অলিখিত নীতি—চরম ডানপন্থার সঙ্গে ক্ষমতার অংশীদারিত্ব না করা—ভেঙে পড়তে পারে।

এএফডির জন্যও এই ফল বড় পরীক্ষা। বিরোধী দল হিসেবে সরকারবিরোধী অসন্তোষকে ভোটে রূপান্তর করা এক জিনিস; প্রশাসন চালানো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, জনসংখ্যার বার্ধক্য এবং শিল্পনীতির মতো বাস্তব সমস্যা সমাধান করতে হলে স্লোগানের বাইরে যেতে হবে। যদি দলটি সরকার গঠনের সুযোগ পায়, তখন তার জনপ্রিয়তা বাস্তব প্রশাসনিক ফলাফলের পরীক্ষার মুখোমুখি হবে। এই কারণেই মূলধারার কয়েকটি দলের মধ্যে এমন ধারণাও আছে যে এএফডিকে সরকার পরিচালনার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করলে তার জনপ্রিয়তা কমতে পারে। কিন্তু বিপরীত ঝুঁকিও আছে—ব্যর্থতা যদি অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক সমস্যার কারণে হয়, এএফডি সেটিও ‘পুরনো ব্যবস্থার ষড়যন্ত্র’ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে।

ইউরোপের জন্য স্যাক্সনি-আনহাল্টের বার্তাটি আরও বিস্তৃত। ইতালি, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া, নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জাতীয়তাবাদী, অভিবাসনবিরোধী ও ইউরোসংশয়ী দলগুলো শক্তিশালী হয়েছে। কোথাও তারা সরকারে আছে, কোথাও প্রধান বিরোধী শক্তি। স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফল এই প্রবণতাকে আরও জোরালো করেছে।

এর ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসননীতি, ইউক্রেনকে সহায়তা, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক, প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং ইউরোপীয় একীকরণ—সব প্রশ্নেই নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি হবে। এএফডি রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং ইউক্রেনকে জার্মান সহায়তার বিরোধিতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ফলে দলটির জাতীয় উত্থান শুধু জার্মানির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়; এটি ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোকেও প্রভাবিত করতে পারে।

সবশেষে স্যাক্সনি-আনহাল্টের ভোটকে জার্মান গণতন্ত্রের পতনের ঘোষণা বলা যেমন অতিরঞ্জিত, তেমনি এটিকে সাধারণ একটি প্রাদেশিক নির্বাচন হিসেবে উপেক্ষা করাও বিপজ্জনক। এই ফল বলছে, জার্মান সমাজের একটি বড় অংশ প্রচলিত রাজনীতিতে হতাশ। তারা অভিবাসন, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে দ্রুত ও কঠোর পরিবর্তন চাইছে। মূলধারার দলগুলো যদি এই অসন্তোষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণ মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এএফডির মতো দল আরও শক্তিশালী হবে।

জার্মানির সামনে তাই মূল প্রশ্ন শুধু ‘এএফডিকে কীভাবে ঠেকানো হবে’ নয়। বরং কেন এত মানুষ এএফডিকে বেছে নিচ্ছে—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে কার্যকর পথ শুধু রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নয়; মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, কার্যকর রাষ্ট্র, বিশ্বাসযোগ্য অভিবাসননীতি, সামাজিক সংহতি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনা।

স্যাক্সনি-আনহাল্টের ভোট সেই সতর্কবার্তাই দিয়েছে। এটি শুধু একটি প্রদেশের নির্বাচনী ফল নয়; এটি বার্লিনের জন্য সতর্ক সংকেত এবং ইউরোপের জন্যও একটি আয়না—যেখানে দেখা যাচ্ছে, মূলধারার রাজনীতি মানুষের উদ্বেগের উত্তর দিতে যত বেশি ব্যর্থ হবে, তত দ্রুত প্রান্তিক রাজনীতি কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে আসবে।

লেখক: হাবিব বাবুল, প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.