তারেক রহমানের কাছে এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি মন্ত্রিসভায় কে আছেন, কে নেই—সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, তিনি কি রাজনীতিবিদদের বিশ্বাস করেন? নাকি রাজনীতিবিদদের পাশ কাটিয়ে উপদেষ্টা, ঘনিষ্ঠজন ও ব্যক্তিগত বলয়ের ওপর ভরসা করে রাষ্ট্র ও দল চালাতে চান?
এই প্রশ্নটি অস্বস্তিকর। কিন্তু অস্বস্তিকর প্রশ্ন এড়িয়ে গেলে রাজনীতি নিরাপদ হয় না। বরং সংকট আরও গভীরে যায়।
তারেক রহমান আজ দেশের প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি বিএনপির চেয়ারম্যান। অর্থাৎ তাঁর একটি সিদ্ধান্ত একই সঙ্গে সরকার, দল এবং দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে। তাই তাঁর চারপাশে কে থাকছেন, কার কথা তিনি শুনছেন, কার হাতে কতটা ক্ষমতা যাচ্ছে এবং দলের অভিজ্ঞ নেতারা কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন—এসব আর ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয় নয়।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা থাকবেন—এটাই স্বাভাবিক। একজন প্রধানমন্ত্রীকে অর্থনীতি, প্রশাসন, কূটনীতি, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি কিংবা অন্যান্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতেই হবে। কিন্তু উপদেষ্টা আর রাজনীতিবিদ এক জিনিস নন। উপদেষ্টা রাষ্ট্র পরিচালনায় সহায়তা করবেন; দলের রাজনৈতিক নেতৃত্বের জায়গা দখল করবেন না। এখানেই সীমারেখাটি পরিষ্কার থাকা দরকার।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠতা রাজনৈতিক ক্ষমতার বিকল্প মুদ্রা হয়ে ওঠে।
কে এমপি হবেন, কে কমিটিতে ঢুকবেন, কার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে, কোন ছাত্রনেতা বা যুবনেতা পদ পাবেন—এসব যদি দলের পরীক্ষিত নেতাদের পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর আশপাশের লোকজন নির্ধারণ করতে শুরু করেন, তাহলে সেটি শুধু সিনিয়র নেতাদের অপমান নয়; দলের সাংগঠনিক কাঠামোর ওপর সরাসরি আঘাত।
একজন ছাত্রনেতা কেন একজন উপদেষ্টার দরজায় ঘুরবেন পদ পাওয়ার জন্য? একজন ত্যাগী কর্মী কেন রাজনৈতিক নেতার কাছে নয়, প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ কারও সুপারিশের অপেক্ষায় থাকবেন? কমিটি হবে দলীয় সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায়, নাকি ব্যক্তিগত আনুকূল্যের বাজারে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বিএনপির নেতৃত্বকেই দিতে হবে।
কারণ রাজনীতির মাঠে পদ-পদবি দিয়ে নেতৃত্ব তৈরি হয় না। নেতৃত্ব তৈরি হয় রাস্তায়, আন্দোলনে, কারাবন্দিত্বে, নির্যাতনে, কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়ে এবং বছরের পর বছর মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে। একজন উপদেষ্টা প্রধানমন্ত্রীর কক্ষে বসে যত ক্ষমতাবানই হোন, তাঁর সেই রাজনৈতিক পুঁজি কোথায়?
প্রধানমন্ত্রী পাশে না থাকলে তাঁর ডাকে পাঁচশ মানুষ নামবে কি?
এই প্রশ্নটি কাউকে হেয় করার জন্য নয়। বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার মৌলিক পার্থক্য বোঝানোর জন্য।
আজ যারা প্রধানমন্ত্রীর পাশে আছেন, আগামীকাল তিনি পাশে না থাকলে তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান কী হবে—এটি তাঁর নিজেরই একবার খোঁজ নেওয়া উচিত। কারণ ক্ষমতার করিডোরে সম্মান পাওয়া আর রাজনৈতিক মাঠে সম্মান অর্জন করা এক কথা নয়।
বিএনপির বহু প্রবীণ নেতা এই সম্মান কিনে নেননি; তাঁরা অর্জন করেছেন। চার দশক, পাঁচ দশক রাজনীতি করে অর্জন করেছেন। মামলা খেয়ে, জেল খেটে, হামলা সহ্য করে, দলকে প্রতিকূল সময়ে টিকিয়ে রেখে অর্জন করেছেন। সেই রাজনৈতিক পুঁজিকে কোনো উপদেষ্টার সরকারি পদ দিয়ে অতিক্রম করা যায় না।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়েও তাই প্রশ্ন উঠেছিল। তিনি শেষ পর্যন্ত বলেছেন, তাঁর শেষ ঠিকানা বিএনপি। প্রশ্ন হলো—তাঁকে কেন এটা বলতে হবে? একজন দলের মহাসচিবকে কেন বারবার নিজের আনুগত্যের সার্টিফিকেট দিতে হবে?
খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। যাঁরা বিএনপির দুঃসময়ের রাজনীতির সাক্ষী, তাঁদের কেন নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে?
একজন সিনিয়র নেতা দলের সঙ্গে আছেন কি না, সেটি তাঁকে বলতে হবে না; এমন পরিবেশ তৈরি করা নেতৃত্বের দায়িত্ব, যেখানে তাঁর অবস্থান নিয়ে প্রশ্নই উঠবে না।
আর মির্জা আব্বাস ?
দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে তিনি দেশে ফিরলেন। তিনি দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতা। বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানাতে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কোনো প্রতিনিধি গেলেন না কেন—এই প্রশ্নের উত্তর কী? এটিকে নিছক প্রটোকলের প্রশ্ন বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। রাজনীতিতে প্রতীক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কখন, কে পাশে দাঁড়ালেন, কে দাঁড়ালেন না—কর্মীরা এসব মনে রাখে।
একটি ফুলের তোড়া অনেক সময় একটি দীর্ঘ বক্তৃতার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক বার্তা দেয়।
গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে ঘিরে মন্ত্রিসভা গঠনের সময় যে অপমানের অভিযোগ ও আলোচনা সামনে এসেছে, সেটিও তাই গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। একজন প্রবীণ নেতার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বা প্রশাসনিক ব্যবস্থার আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে প্রধানমন্ত্রীর নীরব থাকা যথেষ্ট নয়। কী ঘটেছিল, কেন ঘটেছিল, দায় কার—তা পরিষ্কার করা দরকার।
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মন্ত্রিসভা গঠনের আগে দলের স্থায়ী কমিটির সঙ্গে কতটা আলোচনা হয়েছিল?
দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের নেতাদের মতামত কতটা নেওয়া হয়েছিল?
মাঠে বছরের পর বছর ত্যাগ করা নেতাদের কতটা মূল্যায়ন করা হয়েছিল?
নতুন মুখ আনা হয়েছে—এটি অপরাধ নয়। বরং নতুন প্রজন্মকে সামনে আনা দরকার। কিন্তু নতুনদের জায়গা করে দিতে গিয়ে পুরোনোদের অপমান করা কেন প্রয়োজন হবে?
রাজনীতিতে প্রজন্ম পরিবর্তন দরকার, প্রজন্মের সঙ্গে যুদ্ধ নয়।
তারেক রহমানকে মনে রাখতে হবে, বিএনপি কোনো করপোরেট কোম্পানি নয়। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর একটি। এখানে সিইও-সদৃশ একক সিদ্ধান্ত দিয়ে সবকিছু চালানোর চেষ্টা করলে হয়তো প্রশাসনিক দক্ষতা পাওয়া যাবে, কিন্তু রাজনৈতিক আনুগত্য পাওয়া যাবে না।
বাংলাদেশের রাজনীতি কাগজে-কলমে চলে না। এখানে আবেগের মূল্য আছে। সম্পর্কের মূল্য আছে। অপমানের স্মৃতি আছে। আবার সম্মানের ঋণও আছে।
যে নেতাকে সম্মান দেওয়া হয়, তিনি দলের জন্য জান দিতে পারেন। যে নেতাকে অপমান করা হয়, তিনি হয়তো মুখ বন্ধ রাখবেন; কিন্তু তাঁর কর্মীদের মন কি বন্ধ থাকবে?
এ কারণেই ‘হাওয়া ভবন’ নিয়ে অতীতের যে সমালোচনা ছিল, সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়া দরকার। ইতিহাসের ভুল যদি নতুন নামে, নতুন লোকের মাধ্যমে পুনরাবৃত্তি হয়, তাহলে ইতিহাস ক্ষমা করবে না।
কেউ যদি প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে দলের ওপর প্রভাব বিস্তার করেন, রাজনীতিবিদদের ওপর খবরদারি করেন, প্রার্থী বাছাই থেকে কমিটি গঠন পর্যন্ত নেপথ্য নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা নেন—তাহলে প্রশ্ন উঠবেই: দলটি কার? রাজনীতিবিদদের, নাকি প্রধানমন্ত্রীর আশপাশের একটি অনানুষ্ঠানিক বলয়ের?
আর এই জায়গাতেই সবচেয়ে বড় বিপদ।
ক্ষমতার সময় সবাই পাশে থাকে। সবাই প্রশংসা করে। সবাই বলে, ‘আপনিই নেতা।’ কিন্তু ক্ষমতার বাইরে গেলে কে পাশে থাকবে—সেটিই আসল পরীক্ষা।
তাই প্রধানমন্ত্রী চাইলে তাঁর উপদেষ্টা একশ জনও করতে পারেন। কিন্তু একজন উপদেষ্টাকেও এমন জায়গায় বসানো উচিত নয়, যেখানে বিএনপির একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদকে তাঁর সামনে গিয়ে রাজনৈতিক অনুমতি নিতে হয়।
কারণ এতে শুধু নেতার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় না; কর্মীর মনেও একটি বিপজ্জনক বার্তা যায়—রাজনীতি করে নয়, কারও ঘনিষ্ঠ হয়ে ক্ষমতার দরজা খোলা যায়।
এটি কোনো দলের জন্যই ভালো বার্তা নয়।
তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি তাঁর চারপাশের উপদেষ্টারা নন। তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি বিএনপির সেই লাখ লাখ কর্মী, যারা দুঃসময়ে দল ছেড়ে যায়নি। আর তাঁদের রাজনৈতিক অভিভাবক হলেন দলের দীর্ঘদিনের নেতারা।
সুতরাং তাঁদের দূরে ঠেলে দিয়ে, তাঁদের আত্মসম্মানে আঘাত দিয়ে, তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে রেখে কোনো ‘নতুন টিম’ দিয়ে স্থায়ী রাজনৈতিক শক্তি তৈরি করা যাবে—এমন ধারণা বিপজ্জনক।
ডিপ স্টেট থাকুক, প্রশাসনিক ষড়যন্ত্র থাকুক, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ থাকুক—এসব মোকাবিলার জন্য শেষ পর্যন্ত মাঠের মানুষই প্রয়োজন। গোয়েন্দা রিপোর্ট দিয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য তৈরি হয় না। উপদেষ্টার অফিস দিয়ে কর্মীর হৃদয় জয় করা যায় না।
সম্মান আদায় করা যায় না; অর্জন করতে হয়।
বিএনপির সিনিয়র নেতারা সেই সম্মান অর্জন করেছেন। তাঁদের সঙ্গে ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া দুর্বলতা নয়। তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ করা নেতৃত্বের দুর্বলতা নয়। বরং সেটিই শক্তিশালী নেতৃত্বের পরিচয়।
তারেক রহমানের এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তিনি কি এমন একটি বিএনপি চান, যেখানে রাজনীতিবিদরা তাঁর পাশে দাঁড়াবেন, নাকি এমন একটি কাঠামো চান যেখানে তাঁর পাশে দাঁড়ানো কিছু মানুষই রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবেন?
তিনি যদি প্রথমটি চান, তাহলে এখনই তাঁকে তাঁর চারপাশের ক্ষমতার বলয় ও দলীয় রাজনীতির মধ্যে একটি স্পষ্ট সীমারেখা টানতে হবে।
কারণ মানুষ প্রধানমন্ত্রীকে ভয় পেতে পারে, তাঁর ক্ষমতাকে সমীহ করতে পারে; কিন্তু দলের কর্মীকে দীর্ঘদিন পাশে রাখতে হলে শুধু ক্ষমতা যথেষ্ট নয়।
ভালোবাসা লাগে। সম্মান লাগে। আত্মমর্যাদা রক্ষা করতে হয়।
আর সবচেয়ে বড় কথা—রাজনীতিবিদদের সঙ্গে রাজনীতি করতে হয়।
রাজনীতিবিদদের বাদ দিয়ে রাজনীতি করার কোনো শর্টকাট নেই।
হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

